Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

     এক যে ছিল গভীর বন। আর সেই বনে বাস করত এক মাকড়সা । ঘন-পাতার এক বিরাট গাছের নীচে ছিল তার কুঁড়ে। মাকড়সা ছিল ভীষণ দুষ্ট আর তেমনি আলসে। ক...

মাকড়সা সব ধার শোধ করল - আদিবাসী লোককথা

     এক যে ছিল গভীর বন। আর সেই বনে বাস করত এক মাকড়সা । ঘন-পাতার এক বিরাট গাছের নীচে ছিল তার কুঁড়ে। মাকড়সা ছিল ভীষণ দুষ্ট আর তেমনি আলসে। কোন কাজ সে করত না, বসে বসে খেতেই তার ভালো লাগে। কুঁড়েমি যার স্বভাব, তার কি আর খাটতে ইচ্ছে হয়। আর কুঁড়ে হলেই যত বদ বুদ্ধি আনতেই হবে। কেননা, কাজ না করলে খাবার আসবে কোথা থেকে? কিন্তু খিদে তো পাবেই। খেতেও হবে। আর খাবার জোগাড় করতে ফন্দি অাঁটতেই হবে। তাই মাকড়সা সবার কাছে ধার চাইত। বনের এমন কোন পশুপাখি ছিল না যারা তাকে ধার দেয়নি। আহা বেচারা মাকড়সা, না হয় ধার নিলই—বলেছে তো শোধ দিয়ে দেবে।
     বনের সব পশুপাখিই মাকড়সাকে ধার দিয়েছিল। কিন্তু ধার শোধের নামগন্ধও নেই। এমনি করে অনেক কাল কেটে গেল ।
     এখন হয়েছে কি, একদিন মাকড়সা মিঠে রোদে ফুরফুরে হাওয়ায় ঘাসে ঘাসে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ একসঙ্গে অনেক পশুপাখির সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। কেমন করে যেন জানাজানি হয়ে গিয়েছিল, মাকড়সা সবার কাছে ধার নিয়েছে, কিন্তু ধার শোধ করছে না। সবাই ঘিরে ধরল তাকে। সবাই একসঙ্গে তাদের পাওনা চাইল । এবারে মাকড়সা ধার শোধ করবে কেমন করে? তার যে কিছুই নেই। খুব ফাঁপরে পড়ল সে। আর বুঝল আজ আর বাঁচার পথ নেই। কিন্তু দুষ্টুবুদ্ধি মাকড়সার মাথায় এক ফন্দি এল ।
     সে দাঁড়াগুলো নেড়েনেড়ে বলল, “হায় কপাল, আমি ধার শোধ করে দেব বলেই আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমি কি তেমন লোক যে ধার নিয়ে শোধ দেব না? শুনুন, আপনারা সবাই শুক্লবারে আমার বাড়িতে যাবেন, আমি সবার পাওনা-গন্ডা মিটিয়ে দেব। হ্যাঁ, এই সামনের শুক্লবারে। ভুলবেন না কিন্তু।"
     সবাই রাজি হল। মনে মনে লজ্জাও পেল। ছিঃছিঃ মাকড়সা আমাদের ধার শোধ করবার জন্য এত কষ্ট করে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, আর আমরা কিনা ভুল বুঝলাম। মানুষকে এত ছোট কখনও ভাবতে হয়! লজ্জা, লজ্জা ! শেষকালে শুক্রবার এল। মাকড়সাও তৈরি হয়ে রইল।
     সাত সকালে মাকড়সা বাড়ির পাশে এক গাছতলায় বসে রয়েছে। সূর্য সবে উঠেছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মিষ্টি রোদ্দুর এসে পড়েছে। এমন সময়ে মুরগি এল। মাথা নামিয়ে তাকে অভিবাদন করে মাকড়সা বলল, “এসো, এসো। তোমার জন্যই বসে আছি, তা, তুমি ঘরের মধ্যে বসে একটু বিশ্রাম কর, আমি তোমার জন্য একটু খাবার বানিয়ে আনি। হাজার হলেও তুমি তো আমার অতিথি। যাও, ঘরে বিশ্রাম করো।"
      মুরগি খুশিমনে ঘরে ঢুকল। মাকড়সার বুক ধুকপুক করতে লাগল। এমন সময় জুলজুল চোখে বনবিড়াল এল। তাকে দেখেই মাকড়সার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাসিমুখে বলল, “বন্ধু বনবেড়াল, তোমার দেনা শোধের ব্যবস্থা করে রেখেছি। আমায় তোমরা যাই বল না কেন, কাউকে আমি ফাঁকি দেব না। যাও, ঘরে যাও। তোমার পাওনা রেখে দিয়েছি।"
     “আরে ওসব কথা কেন "—বলতে বলতে বনবেড়াল ঘরে ঢুকল। মুরগি কিছু বুঝবার আগেই বনবেড়াল ঘাড় মটকে দিল। তারপরে একটু ঝটফট করেই মুরগি মরে গেল। বনবেড়াল তাকে দাঁতে চেপে চলে যাবে ভাবছে, তাই একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। এমন সময় কুকুর এল। তাকে দেখেই মাকড়সা বলে উঠল, "বাঃ বন্ধু, ঠিক সময়েই এসেছ। তোমার পাওনা ঘরেই রেখে দিয়েছি। আমার কি কখনও কথার খেলাপ হয়? যাও, ঘরে যাও।"
     ঘরে ঢুকল কুকুর। বনবেড়াল মুরগিকে দাঁতে চেপে বেরুতে যাবে, সামনে পড়ল কুকুর। এক লাফে পড়ল বনবেড়ালের ওপর। পালাবার পথ খোঁজার আগেই বনবেড়াল মারা পড়ল। মুরগিটা দূরে ছিটকে পড়েছে। কুকুর ভাবল, কাল রাতে তো কিছু জোটেনি। এখন মুরগিটাকে খাই, বনবেড়ালকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে ছেলে-বউ সবাই মিলে খাওয়া যাবে। কুকুর দাঁত বসাল মুরগির নরম দেহে।
     মাকড়সা বেশ ফুর্তিতেই রয়েছে। এমন সময হায়না এল। মাটি শুকতে শুকতে ধারালো দাঁত বের করে সে মাকড়সার সামনে দাঁড়াল ।
     মাকড়সা বলল, “আঃ আপনার কি সময়জ্ঞান ! সব ঠিকঠাক আছে, পাওনা তৈরি। সোজা ঘরে চলে যান।"
   হায়না ঘরে ঢুকল। পেছন ফিরে কুকুর মাংস চিবোচ্ছে। হঠাৎ হায়নার গায়ের গন্ধে কুকুর লাফিয়ে উঠল। লেজ গুটিয়ে পালাবার আগেই হয়না লাফিযে পড়ল তার ওপরে। একটু ধস্তাধস্তির পরেই কুকুরের দেহ নিথর হয়ে গেল।
হায়না ফ্যাকফ্যাক করে হেসে উঠল গোটা কুকুর, আস্ত বনবেড়াল, অর্ধেকটা মুরগি। না, মাকড়সাটা লোক ভালো, কথা রেখেছে। হায়না আধখানা মুরগি চিবোতে বসল। সকালবেলা খিদেটা ভালোই পেয়েছে। এখনি কিছুটা না খেলেই নয় ।
     মাকড়সা চোখ পিটপিট করছে আর এধার ওধার চাইছে। এমন সময় চিতা এল দুলকি চালে। বিরাট দেহ এলিয়ে দিয়ে সে মাকড়সার সামনে বসল।
     মাকড়সা খুব বিনয় করে বলল, “আমি আপনার জন্যই বসে রয়েছি। বনের সবাইকে তো আর আপনার মতো ভক্তি করা যায় না! আপনি হলেন বনের প্রভু। তা, আপনারা যে যাই বলুন, আমি কিন্তু খারাপ নই। কাউকে আমি ফাঁকি দেব না। আপনার পাওনা ও ঘরে তৈরি রেখেছি। যান, ঘরে যান।"
     জিভ দিয়ে কয়েকবার গোঁফ চেটে, দুবার হাই তুলল চিতা। লেজ নেড়ে সে ঘরে ঢুকছে।
     গন্ধ পেয়েই হায়না লাফিয়ে উঠেছে। টেনে দৌড় দিতে যাবে, এমন সময় মুখের ওপরে পড়ল এক প্রচণ্ড থাবা। উলটে পড়ল হায়না। আবার উঠতে যাবে, আর এক থাবায় তার কোমর গেল ভেঙে। যন্ত্রণায় সে চিৎকার করছে। গলার কাছে চেপে বসল ধারালো দুটো দাঁত। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। হায়নার দেহ কাঁপতে কাঁপতে পাথর হয়ে গেল, চারটে পা ছড়িয়ে পড়ল কাঠির মতো।
     চিতাবাঘ ভাবল, নাঃ মাকড়সা তো মন্দ লোক নয়, বেশ ভালো। বিবেচনা আছে। গোটা তরতাজা হায়না, আস্ত কুকুর, বেশ বড়গোছের একটা বনবেড়াল। আর সবই টাটকা। মাকড়সা খুব ভালো। তারিয়ে তারিয়ে শিকারের খাদ্য দেখছে চিতা। কীভাবে তিনটেকে একসঙ্গে নিয়ে যাবে তাই ভাবছে।
     এমন সময় কেশর ফুলিয়ে সিংহ এল গাছের নীচে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল মাকড়সা। দাঁড়া উঠিয়ে মাথা নিচু করে মাকড়সা বলল, “প্রভু, আপনি বনের রাজা। সেই সাতসকাল থেকে আপনার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি। এই বুঝি আপনি আসেন, এই বুঝি আসেন। যাক সব তৈরি। আপনার পাওনা আপনি বুঝে নিন।
আপনি আমাদের প্রভু, দোষত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন। যান প্রভু, ঘরে যান।”
     সিংহ ঘরের দিকে পা বাড়াল। আর মাকড়সা তরতর করে গাছের উঁচু মগডালে চেপে বসল।
     সিংহ ঘরে ঢুকেই দেখে চিতা তিন শিকারকে এক জায়গায় করছে। এতবড় স্পধা! গরগর শব্দ বেরিয়ে এল তার গলা থেকে। কেশরগুলো ফুলেফুলে উঠল। পেছন দিকে টানটান হয়ে মস্ত লাফ দিল চিতার ঘাড়ে। চিতাও তৈরি। সেও লাফিয়ে পড়ল।
     তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেল সিংহ আর চিতার। মাকড়সার বাড়ি কাঁপছে, এই বুঝি ভেঙে পড়ে। দুজনেই হুংকার ছাড়ছে। আছাড়ি-পিছাড়ি লড়াই চলছে। দুজনের দেহেই অসীম শক্তি, দুজনের দাঁতই ধারালো তীরের মতো, দুজনের থাবাতেই ক্ষুরধার নখ। একজন আর একজনকে হারিয়ে দেবে, অত সহজ নয়। লড়াইয়ে বাড়ি কাঁপছে, বন কাঁপছে। মাকড়সাও কাঁপছে, ধরা পড়ে যাবে না তো?
     লড়াই এখন তুঙ্গে। মাকড়সা তৈরিই ছিল। আস্তে আস্তে গাছের মগডালে থেকে নেমে এল। পাতায় মোড়া জিনিসটা লুকনো গর্ত থেকে বের করে তার বাড়ির কাছে গেল। তারা দুজনেই তখন এমন লড়াই করছে যে, মাকড়সাকে দেখতেই পেল না। দেয়াল বেয়ে সামান্য ওপরে উঠে মাকড়সা অপেক্ষা করতে লাগল। আস্তে আস্তে পাতার মোড়ক খুলল। তার ভেতরে ছিল শুকনো লংকার গুড়ো। যেই সিংহ-চিতা লড়াই করতে করতে মাকড়সার কাছে এসেছে, অমনি সবটুকু লংকার গুড়ো ছিটিয়ে দিল তাদের চোখেমুখে। ছিটিয়েই নেমে এল দেয়াল থেকে। লংকার ঝালে তাদের চোখ কটকটু করে উঠল, তারা আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আন্দাজে লড়াই করে চলেছে।
     মাকড়সা বাইরে থেকে মস্ত বড় একটা মোটামোটা গাছের ডাল নিয়ে এল। আর তাই দিয়ে পেটাতে লাগল দুজনকে। নিজেদের মধ্যে লাড়াই করে এমনিতেই তারা ক্ষতবিক্ষত, তার ওপরে চোখে জ্বালা, চারিদিক অন্ধকার। এমন সময় শুরু হল ডালের আঘাত। মাকড়সা মারছে তো মারছেই, তারও কাণ্ডজ্ঞান নেই। এরা না মরলে তাকে যে মরতে হবে। মারের পর মার, আঘাতের পর আঘাত। শেষকালে সিংহ ও চিতা দুজনেই কাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
     সব মাংস জড়ো করে মাকড়সা ঘরের এককোণে রেখে দিল। অনেক অনেক দিন চলবে। সমস্ত ধার শোধ করে দিল মাকড়সা। আর কারও কাছে সে ঋণী রইল না।

0 coment�rios: