বনের কুকুর গাঁয়ে এল - আদিবাসী লোককথা

     আজকে পশুতে পশুতে শুধুই ঝগড়া। কিন্তু এমন এক সময় ছিল যখন সব পশুর মধ্যে খুব ভাব-ভালোবাসা ছিল। সে অনেক অনেককাল আগের কথা। তখন তারা সবাই ভাই ও বন্ধুর মতো বাস করত। সে সব দিন ছিল কত সুন্দর !
     সেই কালে এক পাহাড়ি ঢালু জমিতে বসত একটা হাট। সে হাটের নাম লুরি-লরা। কাছের দূরের নানা ছোট বড় বন থেকে বুনো পশুরা পাখিরা আসত সেই হাটে। সেই সাত সকালে বসত হাট। সারা দিন ধরে চলত বিক্রি-বাটা। সন্ধের আঁধার নেমে এলে হাট যেত ভেঙে। সবাই গাছের কোটরে, গুহায়, গর্তে ফিরত। সারা দিনে কত খাটুনি, বাড়ি ফিরত ক্লান্ত হয়ে। তবু সেসব দিন ছিল কত-না-আনন্দের!
     একদিন নিয়মমতো হাট বসেছে। কুকুরও এসেছে হাটে। সে শুধুই মটরশুটি বিক্রি করে। সেদিনও এনেছে তাই। কিন্তু সেগুলো খুব পেকে গিয়েছে। তার ওপরে পথে আসতে আসতে বৃষ্টির জল লেগেছে। সেগুলো কেমন যেন গেজিয়ে উঠেছে। কুকুর চিৎকার করে খদের ডাকছে, ‘আসুন, আসুন মটরশুটি। ভাল মটরশুটি। খুব সস্তায়। কুকুরের সামান্য একটু মটরশুটিও বিক্রি হল না। হবেই বা কেমন করে? প্রায় পচে-ওঠা শুটি থেকে কেমন যেন গন্ধ বেরুতে শুরু করেছে। কুকুর বড় গরিব। বাড়িতে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। সারাদিন হয়তো খাওয়া হয়নি। কেউ আসছে না তার দোকানের সামনে। কুকুরের চোখে জল এল।
     পাহাড়ের কোলে সূর্য নেমে যাচ্ছে। রোদ পড়ে বিকেল গড়িয়ে আসছে। মটরশুটির পচা গন্ধও তত বেড়ে যাচ্ছে। সারা তল্লাট বিচ্ছিরি গন্ধে ভরে যাচ্ছে। গা গুলিয়ে উঠছে। আর তো সহ্য করা যায় না। পশুরা ক্ষেপে উঠল। ধেয়ে এল কুকুরের কাছে। এমন পচা জিনিস কেউ হাটে আনে? সবাই কুকুরকে গালাগাল দিতে লাগল। হট্টগোল বেধে গেল। এরই মধ্যে কয়েকজন শক্তিশালী হিংস্র পশু কুকুরের ঝুড়ি ফেলল উলটে। রাগে তারা কাঁপছে। কুকুর বাধা দিতে গেল। ছিটকে পড়ল দূরে। তারা পা দিয়ে পচা সব মটরশুটি দলে-পিষে নষ্ট করে দিল। তারপরে কুকুরকে হাট থেকে তাড়িয়ে দিল। আর যেন কুকুর কখনও না আসে হাটে। কুকুর বড় গরিব। তার পক্ষে কেউই কথা বলল না। কুকুরের খুব মন খারাপ। এমনভারে অপমান করল! এমন করে সব জিনিস নষ্ট করে ফেলল! বাড়িতে যে তার অনেকগুলো ছেলেমেয়ে! সে ফিরে এল হাটে। নালিশ জানাল বাঘের কাছে। বাঘই হাটের কর্তা। সে পশুদের সর্দার। বাঘের কাছেও তাকে বকুনি খেতে হল। বাঘ বিরক্ত হয়ে বলল, “তোমার লজ্জা করে না? আবার এসেছ নালিশ করতে? পশুরা ঠিক কাজই করেছে। পচা গন্ধে তুমি কি আমাদের মেরে ফেলতে চাও? বেরোও এখান থেকে। আবার নালিশ? বাঘ গর্জন করে উঠল। কুকুরের বুক গেল কেঁপে। পেছনের পায়ের মধ্যে লেজ ঢুকিয়ে কুকুর চলে গেল।
      সন্ধে প্রায় হয়ে এসেছে। আধো আঁধারে মুখ নিচু করে কুকুর পথ হাটছে। চলেছে বাড়ির পথে। কিন্তু পা যেন তার চলছে না। কেউ একটা ভালো কথা বলল না। হায় কপাল!
     এমন সময় সে পায়ের শব্দ শুনতে পেল! চমকে উঠল। আজ শুধুই সে ভয় পাচ্ছে, তাকিয়ে থেকে দেখে অন্য এক পথ দিয়ে একজন মানুষ আসছে। মানুষটি তাকে দেখে থামল। খুব মিষ্টি গলায় কুকুরকে বলল, “কি কুকুর। খুব মন খারাপ মনে হচ্ছে। দুঃখ পেয়েছ নাকি? মনমরা মনে হচ্ছে।
     এমন মিষ্টি সহানুভূতির কথা শুনে কুকুর কেঁদে ফেলল। সে পথিককে সব কথা খুলে বলল। পথিক অচেনা, তবু মনের দুঃখ খুলে বলল। এমন আপন করে তার সঙ্গে আজ আর কেউ কথা বলেনি।
     পথিক বলল, ‘ও নিয়ে আর মাথা ঘামিয়ো না। যা হবার হয়ে গিয়েছে। আর দুঃখ করে লাভ নেই। আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু হলে। চলো আমার কাছেই তুমি থাকবে।
     কুকুর রাজি। সঙ্গে সঙ্গে রাজি। চলল মানুষের পিছে পিছে লেজ নাড়তে নাড়তে। তবু মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। হাটের কথা সে ভুলতে পারছে না। বারবার সে কথা পথিককে বলে ফেলছে।
     পথিক এবার আস্তে আস্তে বলল, ‘সত্যি, এসব কথা ভোলা যায় না। ঠিক আছে। তোমার তো বেজায় সাহস। তোমাকে আমি এমনভাবে গড়ে তুলব যাতে তুমি এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে পার। ঠিক আছে, তাই হবে। এবার বুঝবে হিংস্র পশুরা। কুকুরের দুঃখ মিলিয়ে গেল। মন উঠল আনন্দে নেচে। সে পথ পাবে। অপমানের প্রতিশোধ নেবে। কুকুর মানুষের পাশে পাশে চলল। শেষকালে এল মানুষের গাঁয়ে, পথিকের বাড়িতে। সুখে দিন কাটতে লাগল।
     সেই মানুষটি ছিল সে এলাকার এক মস্ত শিকারি। বনের হেন জায়গা নেই যা সে চেনে না। দূর দূর পাহাড়ি জঙ্গলেও সে শিকার করতে যায়। অসাধারণ সাহসী সে। তার ভয়ে গাঁয়ে কোন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার ঢুকতে সাহস পায় না। তীর, কুঠার আর বর্শা তার সবসময়য়ের সঙ্গী। আজ থেকে আর এক নতুন সঙ্গী হল। সে সেই কুকুর।
     সেদিন থেকে শিকারে যাওয়ার সময় মানুষটি কুকুরটিকে সঙ্গে নিতে যেতে শুরু করল। কুকুরও বেজায় খুশি। সেও বনে বনে ঘুরতে ভালোবাসে। সে তো বনের পশুই ছিল। আরও একটা কারণ আছে—কুকুর চায় প্রতিশোধ, অপমানের প্রতিশোধ। মানুষটি ধীরে ধীরে কুকুরকে শিক্ষা দিতে লাগল। প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে কুকুরের সারা মনে—সেও সবকিছু চটপট শিখে নিতে লাগল। খুব মন দিয়ে সে সবকিছু শিখছে। কিছুদিনের মধ্যেই কুকুর হয়ে উঠল শিকারির সবচেয়ে যোগ্য বন্ধু, তার একমাত্র সহায়। শিকারি আর কুকুর এক হয়ে গেল।
     হাটে হিংস্র পশুরা কুকুরের পচে-ওঠা মটরশুটি ঝুড়ি উলটে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে দলে-পিষে দিয়েছিল। আর মটরশুটিগুলি সত্যিই তো পচে গিয়েছিল। সেই পচা গন্ধ লেগে রইল হিংস্র পশুদের পায়ে। চার থাবায় সে গন্ধ চিরকালের জন্য আটকে গেল।
      আর সেই পচা মটরশুটি ছিল কুকুরের নিজের, তাই সে গন্ধ সে খুব ভালোভাবেই চেনে। যেখানেই পশুরা যায়, দেহের সঙ্গে থাকে সেই গন্ধ। কুকুরের অতি-চেনা গন্ধ। তার সঙ্গে রয়েছে কুকুরের তীব্র ঘ্রাণশক্তি, এটা তার জন্ম থেকেই রয়েছে। দুয়ে মিলে কুকুর হয়ে উঠল হিংস্র পশুদের আতঙ্ক। পশুরা যেখানেই যত ঘন ঝোপ কিংবা পাহাড়ি গুহায় লুকোক না কেন, পথের ওপর মাড়িয়ে-যাওয়া থাবার পচা গন্ধ শুকে শুকে মুখ নিচু করে তরতর করে এগিয় যায় কুকুর। ঠিক হদিস পেয়ে যায় সেই পশুর। কুকুর এসে থেমে পড়ে ঠিক জায়গায়, একটু দূরে। চোখ তুলে শিকারিকে নিশানা জানিয়ে দেয়। মানুষ তাক করে আগের চেয়ে অনেক সহজে সেই পশুকে শিকার করে। একদিন সবাই মিলে গরিব কুকুরকে যে অপমান করেছিল, আজ সে তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। এই তো হয়। আজ তার আনন্দের দিন।
     এমনি করে একদিন বনের পশু দূর বনভূমি ছেড়ে মানুষের কাছে এল, তার সাথী হল। সে হল মানুষের সবচেয়ে বিশ্বাসী বন্ধু। কেনই বা বিশ্বাসী হবে না? মানুষ তো তাকে ভালবেসেছে, ওদের মতো অপমান করেনি।
     কিন্তু কুকুর আর কোনদিন অরণ্যে ফিরে যেতে পারল না। বনের পশুরা তাকে তো আর রেহাই দেবে না? সেদিন থেকে কুকুরও বন ছাড়ল। বনের পশুরাও কুকুরকে দেখলেই আরও ক্ষেপে যায়। কুকুরের জন্যই তাদের এমন দশা। শিকারি কুকুরকে পেয়েই তো এত সহজে মানুষ তাদের শিকার করতে পারে। বনের পশু কুকুর গাঁয়ের হল, মানুষের সঙ্গী হল। আজও তেমনই রয়েছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য