আলিওনুশকা বোন আর ইভানশকা ভাই - রাশিয়ার উপকথা

     এক বুড়ো আর বুড়ী। তাদের একটি মেয়ে আলিওনুশকা, একটি ছেলে ইভানুশকা।
     বুড়ো  ‍বুড়ী মারা গেল। সংসারে আলিওনুশকা ইভানুশকার আর কেউ রইল না।
     আলিওনুশকা ছোট ভাইয়ের হাত ধরে কাজে বেরিয়ে পড়ল। চলেছে তারা দূরের পথ ধরে, মস্ত মাঠ পেরিয়ে; ভারি তেষ্টা পেল ইভানুশকার।
     ‘বড় তেষ্টা পেয়েছে রে দিদি !’
     ‘দাঁড়া ভাইটি, কুয়ো আসুক।
      যায়, যায়, সূয্যি মাথার পরে, কুয়ো অনেক দূরে, কেবলি তাপ বাড়ে, কেবলি ঘাম ঝরে। দেখে, একটা জলভরা গরুর খুর।
     ‘এই জলটা খাই দিদি ?’
     ‘না ভাই, খাসনে, তাহলে বাছুর হয়ে যাবি!’
     ইভানুশকা দিদির কথা মেনে নিয়ে চলল এগিয়ে।
     সূয্যি মাথার পরে, কুয়ো অনেক দুরে, কেবলি তাপ বাড়ে, কেবলি ঘাম ঝরে। দেখে, একটা জলভরা ঘোড়ার খুর।
     ‘এই জলটা খাই দিদি ?’
     ‘না ভাই, খাসনে, ঘোড়ার বাচ্চা হয়ে যাবি!’
     নিঃশ্বাস ফেলল ইভানুশকা। আবার চলল এগিয়ে ।
     হাঁটছে তো হাঁটছেই, সূয্যি মাথার পরে, কুয়ো অনেক দূরে, কেবলি তাপ বাড়ে, কেবলি ঘাম ঝরে। দেখে, একটা জলভরা ছাগলের খুর।
     ইভানুশকা বলে: ‘আর পারি না দিদি, এই জলটা খাই ?’
     ‘না ভাই, খাসনে, ছাগলছানা হয়ে যাবি!’
     ইভানুশকা এবার আর দিদির কথা না শুনে ছাগলের খাবরের জলটা খেয়ে ফেলল।
     খেতেই ছাগলছানা হয়ে গেল ইভানুশকা ...
     আলিওনশকা ভাইকে ডাকে, ভাইয়ের বদলে ছুটে এল এক ধবল পানা ছাগলছানা !
     আলিওনুশকা কাঁদতে লাগল। খড়ের গাদায় বসে বসে কাঁদে আর ছাগলছানাটা তার চারপাশে লাফিয়ে বেড়ায়।
     ঠিক সেই সময় এক সওদাগর যাচ্ছিল ঐ রাস্তা দিয়ে।
     বলল, “কাঁদছ কেন, সুন্দরী কন্যে?’
     আলিওনুশকা তার দুঃখের কথা খুলে বলল।
     সওদাগর বলল : ‘তুমি আমায় বিয়ে করো। সোনায়  ‍রূপোয় সাজিয়ে রাখব, আর ছাগলছানাটি আমাদের কাছে থাকবে ।”
     ভেবেচিন্তে সওদাগরকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল আলিওনুশকা। সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটতে লাগল। ছাগলছানাটাও ওদের কাছেই থাকে। আলিওনুশকার সঙ্গে একই থালা একই বাটি থেকে সব খায়।
     একদিন সওদাগর বাড়ী নেই। হঠাৎ কোথা থেকে এক ডাইনী এসে হাজির। আলিওনশকার জানলার নীচে দাঁড়িয়ে আদর করে ডাকে, বলে: চল নদীতে চান করব।
     আলিওনুশকাকে নদীতে নিয়ে এল ডাইনী, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, গলায় একটা বড়ো পাথর বেঁধে তাকে ছুড়ে ফেলে দিল নদীতে।
     তারপর নিজে আলিওনুশকা সাজল, তার জামাকাপড় পরে বাড়ী ফিরে গেল। কেউ ওকে ডাইনী বলে চিনতেও পারল না। সওদাগর বাড়ী ফিরল, কিন্তু সেও কিছু ধরতে পারল না।
     কেবল ছাগলছানাটা জানত কী হয়েছে। বেচারা মাথা নীচু করে ঘুরে বেড়ায়, খায় না, দায় না। সকাল সন্ধ্যায় নদীর পারে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় আর ডাকে:

‘আলিওনাশকা দিদিরে !
সাঁতরে আয় নদীরে...’

     টের পেয়ে ডাইনী রোজ তার স্বামীকে বলে: মার বাপু, মেরে ফেল ছাগলটাকে ... ছানাটার ওপর মায়া পড়ে গিয়েছিল সওদাগরের। কিন্তু ডাইনীটা খালি ঘ্যান ঘ্যান করে, খালি পেড়াপীড়ি করে, উপায় কী, তাই শেষপর্যন্ত সে সায় দিল।
     বলল, “বেশ, মার ওটাকে ...’
     মস্ত আগুন জ্বলাল ডাইনী, বড়ো বড়ো কড়াই চাপল, বড়ো বড়ো ছুরিতে শান পড়ল...
     ছাগলছানাটা দেখল তার মরণ ঘনিয়েছে। সওদাগরকে বলল: ‘মরার আগে আমায় একটু ছেড়ে দাও নদীতে যাব, জল খাব, গা ধোব।’
     `বেশ, যাও।’
     ছাগলছানাটা দৌড়ে নদীর ধারে গিয়ে করণস্বরে কাঁদতে লাগল:

‘আলিওনাশকা দিদিরে! 
সাঁতরে আয় নদীরে। 
আগুন জ্বলে উনানে, 
কড়াই চাপে ভিয়ানে, 
ঝন ঝন ঝন ছুরি, 
বুঝি এবার মরি!

     আলিওনুশকা জলের ভিতর থেকে উত্তর দিল:

ইভানুশকা ভাইটি মোর! 
তলায় টানে ভারী পাথর, 
ঘাসেতে পা চেপে ধরে,
হলুদ বালি বুকের পরে।

     ছাগলছানাটা কোথায় খুঁজে না পেয়ে ডাইনীটা চাকরকে ডেকে বলল: ‘যা শীগগির, ছাগলছানাটা আমায় খুঁজে এনে দে।’
     নদীর কাছে গিয়ে চাকর দেখে, ছাগলছানাটা নদীর পার ধরে দৌড়চ্ছে আর করণস্বরে কাঁদছে:

‘আলিওনুশকা দিদিরে! 
সাঁতরে আয় নদীরে। 
আগুন জ্বলে উনানে, 
কড়াই চাপে ভিয়ানে, 
ঝন ঝন ঝন ছুরি, 
বুঝি এবার মরি!’

আর নদীর ভিতর থেকেও স্বর ভেসে আসছে:

ইভানুশকা ভাইটি মোর! 
তলায় টানে ভারী পাথর, 
ঘাসেতে পা চেপে ধরে,
হলুদ বালি বুকের পরে।

     চাকরটি তাড়াতাড়ি বাড়ী গিয়ে কী দেখেছে,কী শুনেছে— সব কথা মনিবকে খুলে বলল। সওদাগর লোকজন জড়ো করে নদীর পারে চলে গেল। তারপর রেশমের জাল ফেলে টেনে তুলল আলিওনুশকাকে। গলার পাথরটা খুলে, ঝরণার জলে চান করিয়ে সুন্দর করে কাপড় পরিয়ে দিল আলিওনুশকাকে। জীবন ফিরে পেল আলিওনাশকা, রুপ তার আরো যেন ফুটে বেরুল।
     ছাগলছানাটা আনন্দে তিনবার ডিগবাজী খেতেই আবার হয়ে গেল সেই ছোট খোকন ইভানুশকা।
     ডাইনীটাকে তখন একটা বুনো ঘোড়ার লেজের সঙ্গে বেঁধে খোলা মাঠে ছেড়ে দেওয়া হল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য