আমরা এলাম কোথা থেকে - আদিবাসী লোককথা

     আজ আমরা সবাই এই পৃথিবীতে বাস করছি। আমরা দ্বীপে দ্বীপে থাকি। কিন্তু এমনটা চিরকাল ছিল না। আমরা তখন আকাশের ওপাশে থাকতাম। সব মানুষ ওখানেই থাকত।
     একবার আমাদের সর্দারের মেয়ের খুব অসুখ করল। সে অসুখ আর সারেই না। কত বদ্যি, কত ওঝা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। শেষকালে এক নুয়ে-পড়া বুড়ো ওঝা বলল, ‘মেয়ের অসুখ সারবে। তবে ওভাবে নয়। বুনো ডুমুর গাছের শেকড়ের মধ্যে মেয়ের রোগ সারাবার উপায় রয়েছে। ডুমুর গাছের গোড়ায় মাটি সরিয়ে ফেলো, নীচের শেকড়ে হাত ছোয়ালেই মেয়ের অসুখ সেরে যাবে।
     কয়েকজন যুবক লেগে গেল বুনো ডুমুর গাছের গোড়ার মাটি সরাতে। অনেক নীচে শেকড়। মাটি উঠছে, মাটি উঠছে, ওরা নিচু হচ্ছে, আরও নিচু। নীচের শেকড় বেরিয়ে পড়ল।
     বাবা মেয়েকে ধরে ধরে গাছের গোড়ায় নিয়ে এল। মেয়ে নিচু হয়ে শেকড় স্পর্শ করতে গেল। হাত পেল না। আরও নিচু হতে হবে। মেয়ে মাথা নুইয়ে পিঠ বেঁকিয়ে আরও নিচু হল। হাত ছোয়াল শেকড়ে। কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে গর্তে ঢুকে গেল। বুরোকুরো আলগা মাটি, মেয়ে পিছলে গেল। গর্তে পড়ে গেল।
     আকাশের ফুটো দিয়ে মেয়ে নীচে পড়ে যাচ্ছে। সবাই হাহাকার করে উঠল। কিন্তু কিছুই করার নেই। পড়ছে শুকনো পাতার মতো উলটে-পালটে । নীচে পড়ছে। মেয়ে আর বাঁচবে না। কেননা, আকাশের নীচে শুধুই জল। দাঁড়াবার কোন ঠাঁই নেই। আর ওপর থেকে অত জোরে নীচে পড়লে, জলে আঘাত পেয়েই মেয়ে মরে যাবে। হায় ! হায় ! হায় !
     এমন সময় দুটো বুনো হাঁস উড়ে যাচ্ছিল। তারা মেয়েকে দেখতে পেল। চমকে উঠল। প্রাণ কেঁদে উঠল। গলা লম্বা করে পা দুটো পেছনে সোজা করে তারা উড়ে এল মেয়ের কাছে। গলা নীচে নামিয়েই দুটো হাঁস মেয়ের দেহের নীচে নেমে এল । মেয়ে এখন হাঁস দুটির পিঠে শুয়ে রয়েছে। তারা নামছে, নামছে – নীচের জলের দিকে নামছে।
     নীচে জলের ওপরে ভেসে রয়েছে বিশাল কচ্ছপ। মুখ তুলে সে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। মেয়ে নামছে বুনো হাঁসের নরম পিঠে। কচ্ছপ তাড়াতাড়ি সব সাতারু জন্তুকে ডাকল ; সঙ্গে সঙ্গে সভা বসে গেল। সবাই তাকাল আকাশের দিকে। বলল, ‘যেমন করে হোক মেয়েকে বাঁচাতেই হবে। তাকে আশ্রয় দিতেই হবে । আহা, আকাশের ওপাশের মেয়ে। তাদের প্রাণ কেঁদে উঠল।
      দলপতি কচ্ছপ সোনা ব্যাঙকে আদেশ করল, ‘সোনা ব্যাঙ, জলের নীচে ডুব দাও। নীচে অনেক নীচে চলে যাও। জলের তলায় অনেক গাছ আছে। সেই গাছের গোড়া থেকে কাদা তুলে আনো। দেরি করবে না।
     সোনা ব্যাঙ একবার ওপরে মেয়ের দিকে তাকাল, তারপর জলে ডুব দিল। জলে কয়েকটা বুদবুদ দেখা গেল, আবার শান্ত হল জল। সবাই তাকিয়ে রয়েছে জলের সেই খানটায়, যেখানে সোনা ব্যাঙ ডুব দিয়েছিল। তাদের প্রাণ কাঁদছে। ভস করে সোনা ব্যাঙ জলে মাথা তুলল। না, সে পারেনি। জলের নীচে গাছের গোড়া থেকে কাদা তুলে আনতে পারেনি।
     দলপতি কচ্ছপ শুশুককে আদেশ দিল, “জলের নীচে গাছের গোড়া থেকে কাদা নিয়ে এসো। দেরি করবে না। আদেশ পেয়ে পাছা উলটিয়ে শুশুক জলের নীচে ডুব দিল । তাদের প্রাণ কাঁদছে। ওপরের মেয়ে আস্তে আস্তে নেমে আসছে।
     কিছুটা জল ছলকে পড়ল। জলের গর্তে মুখ তুলল শুশুক। হা করে নি:শ্বাস নিচ্ছে সে। না, সে পারেনি। জলের নীচে গাছের গোড়া থেকে কাদা তুলে আনতে পারেনি। শেষকালে কোলা ব্যাঙ নিজে থেকেই বলল, “আমি চেষ্টা করে দেখি। কাদা তুলে আনতে পারি কিনা |
     একথা শুনেই সাঁতারু জন্তুরা আনন্দে লাফিয়ে উঠল ; তারা কোলা ব্যাঙকে উৎসাহ দিল। কিন্তু বিশাল কচ্ছপ চুপ করে রইল। গম্ভীর হয়ে বলল, ‘কোলা ব্যাঙ, বেশ, তুমি চেষ্টা করে দেখো। মনে হয় তুমি পারবে। যে ভাগ্যবান সে-ই পারবে। তাদের প্রাণ কাঁদছে।
     কোলা ব্যাঙ বুক ফুলিয়ে গলা ফুলিয়ে জোরে নি:শ্বাস টেনে নিল, তারপর মুখচোখ বন্ধ করে জলের নীচে ডুব দিল। নীচে, আরও নীচে। পেছনের পা দুটো লম্বা করে মাথা নিচু করে কোলা ব্যাঙ নীচে নেমে যাচ্ছে। দম আটকে আসছে, বুক ফেটে যাচ্ছে, চোখ বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবু কোলা ব্যাঙ হাল ছাড়েনি। সবাই চেয়ে আছে সেইখানটায়, যেখানকার জলে ডুব দিয়েছে কোলা ব্যাঙ। জলের ওপরে কয়েকটা বদবুদ ফেটে গেল। কোলা ব্যাঙের মাথা জেগে উঠল জলের ওপরে। আহ, কি আনন্দ। কোলা ব্যাঙের মুখে কিছুটা চকচকে বালি। কোলা ব্যাঙ পেরেছে।
     বালি নিয়ে কোলা ব্যাঙ বিশাল কচ্ছপের ঢালু পিঠে ছড়িয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বিশাল কচ্ছপের পিঠে গজিয়ে উঠল একটা দ্বীপ। এই দ্বীপটিই হল বোহোল দ্বীপ। জলের বুকে প্রথম ডাঙা। বুনো হাঁসের নরম পিঠ থেকে মেয়ে নামাল এই দ্বীপে। মেয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের প্রাণ শান্ত হল।
     নাতি-নাতনিরা, খুব ভালো করে যদি কচ্ছপের পিঠ দেখ, তবে দেখবে আমাদের এই বোহোল দ্বীপের মতোই কচ্ছপের পিঠ। আসলে, কচ্ছপের পিঠই তো এই বোহোল দ্বীপ। কি মিল। এই মেয়েই আমাদের আদি মাতা। আমরা সবাই তার ছেলেমেয়ে। তখন থেকেই আমরা পৃথিবীতে থাকি, দ্বীপে দ্বীপে থাকি।
     কিন্তু তখন আর এক বিপদ। মেয়ে শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। হাঁটুর মধ্যে মুখ রেখে মেয়ে বসে রয়েছে, মেয়ে কাঁপছে। তাদের প্রাণ আবার কেঁদে উঠল। তার আরও আলো চাই। পৃথিবীতে তখন এত আলো ছিল না। চাই আরো আলো। তবেই মেয়ের দেহ গরম হবে।
     সব সাঁতারু জন্তু মিলে আবার সভায় বলল, অনেক সলা পরামর্শ হল। ছোট্ট কচ্ছপ গলা নেড়ে বলল, আমি যদি আকাশে উঠতে পারতাম, তবে সব বিদ্যুৎ এক জায়গায় জড়ো করে অনেক আলো তৈরি করতাম। মেয়ের কষ্ট ঘুচত। শীতে এমন করে বসে থকেত হত না। সকলের প্রাণ কাঁদছে।
     বিশাল কচ্ছপ গম্ভীর হয়ে বলল, “তুমি চেষ্টা করে দেখতে পার। হয়তো তুমি পারবে। যে ভাগ্যবান সেই-ই পারবে ।
     এক পাশে সরে গিয়ে ছোট কচ্ছপ চুপ করে বসে রইল। সে যেতে চায় দূর আকাশে। কিন্তু কেমন করে? কেমন করে দূর আকাশে যেতে হয় তা সে জানে না। কিন্তু যেতে চায়। মেয়ের বড় কষ্ট। আহা, ও কেমন অন্ধকারে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছে। চারিদিকে কি অন্ধকার। মেয়ে তো আলোর দেশের মেয়ে। ধবধবে আকাশ। চমকানো বিদ্যুৎ। সে পারবে কেন এই অন্ধকারে থাকতে?
     ভাবছে, ভাবছে—ছোট্ট কচ্ছপ ভাবছে, বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, আর কষ্টে মাথা নিচু করে নিচ্ছে। শেষকালে খোলের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে নিল। কোন আশা নেই, আকাশে উঠবার কোন পথ নেই!
     হঠাৎ আকাশে মেঘগুলো কেমন ভেঙে ভেঙে যেতে লাগল। কেমন এধার ওধার সরে সরে যাচ্ছে। নীচে নেমে আসছে। হাওয়া বইছে এলোমেলো। দ্বীপের চারপাশের জলে ঢেউ। ভীষণ ঝড়। শোঁ শোঁ শব্দ। জল আছড়ে পড়ছে। দমকা হাওয়া। হঠাৎ এক দমকা ঝোড়ো হাওয়ায় ছোট্ট কচ্ছপের দেহ মাটি থেকে ওপরে উঠল। হাওয়ার বেগে আকাশের দিকে চলেছে ছোট্ট কচ্ছপ। কোন চেষ্টাই তাকে করতে হচ্ছে না। সে পৌছে গেল আকাশের রাজ্যে। আহ, কি শান্তি। আর কষ্ট পাবে না আকাশের মেয়ে। অনেক আলো, দিনে আলো, রাতে আলো।
     ছোট্ট কচ্ছপ অনেক বিদ্যুৎকে জড়ো করল,—অনেক অনেক অনেক। বেশি বিদ্যুৎ দিয়ে গড়ল একটা গোলাকার সুন্দর জিনিস, অল্প বিদ্যুৎ দিয়ে তৈরি করল আর একটা গোলাকার সুন্দর জিনিস। একটার মধ্যে বেশি সাদা উজ্জ্বল আলো। অন্যটার আলো কম, নরম মিষ্টি আলো। একটা আলো দেবে একসময়। অন্যটা অন্যসময়। মেয়ে বাঁচবে, মেয়ে বেঁচে রইল।
     এ দুটাে হল সূর্য আর চন্দ্র। একটা দিনের আলো, আরেকটা রাতের আলো। সমসময় আলো। আকাশের আলো আমাদের দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন থেকে ছড়িয়ে পড়েছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য