আদ্যিকালের কথা - আদিবাসী লোককথা

     শোনো বাছারা আদ্যিকালের কথা। এ কথা সবাইকে শুনতে হয়। শুনে মনে রাখবে। আবার বলবে তোমাদের ছেলেমেয়েদের, তোমাদের নাতিপুতিদের। শোন সেই আদ্যিকালের কথা।
     সেই আদ্যিকালে কিছুই ছিল না। ছিল শুধু ফুলুগা। আমাদের এই পৃথিবী সৃষ্টি করলেন ফুলুগা। চারিদিকে ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মধ্যে মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে একটা মস্ত তালগাছ। আর তারই মাথায় বসানো রয়েছে এই পৃথিবী। নীচে শুধুই ডাঙা। সমুদ্র নেই, তখনও সমুদ্র জন্মায়নি। নীচের অন্ধকার জঙ্গলে বাস করে অনেক অনেক আত্মা। তারা বনের জীবজন্তু শিকার করে আর তাই খেয়ে বনেই থাকে। তারা শুয়ে থাকে এক বিশাল ডুমুর গাছের নীচে। ডুমুরও খায় তারা।

     আর একটা জায়গা ছিল। সেটা সেই পুবদিকে। সেখনে থাকে যত শয়তান আত্মা। বড় পাজি তারা। এখানকার সঙ্গে শয়তান আত্মাদের দেশের মধ্যে আসা-যাওয়ার একটা ব্যবস্থা ছিল। সেটা একটা সাঁকো। সব সময় কিন্তু সেই সাঁকোকে দেখতে পাওয়া যায় না। দিন যখন খুব খারাপ যায়, আকাশে ফুটো হয়ে বৃষ্টি নামার কালে, চারিদিকে যখন থমথম তখন সাঁকো দেখা যায়। সাঁকোর নাম হল রামধনু। মস্ত বড়। পৃথিবী তো হল। ফুলুগা চিন্তা করলেন। শেষকালে তৈরি করলেন মানুষ। একটা মানুষ। এই মানুষটার নাম দিলেন তোমো। তার গায়ের রং বেজায় কালো, ঠিক আমাদের এখনকার মতো। কিন্তু তার মুখভর্তি লোম আর সে বেজায় লম্বা। আমাদের এখনকার মতো নয়।
     তখন সমুদ্র হয়েছে। সমুদ্রের মধ্যে দুটো ডাঙা ছিল। এই দুই ডাঙার মধ্যিখানে আবার এক ঘন জঙ্গল। তার নাম ওতিমি। মানুষ তোমোকে ফুলুগা রাখলেন সেই ওতিমির জঙ্গলে। গাছে গাছে ফল ধরে রয়েছে, অনেক ফল। ফুলুগা তোমোকে একটা একটা করে ফল চিনিয়ে দিলেন। সব চিনল মানুষ। ফুলুগা বললেন, ‘সব সময় গাছের ফল খাবে। কিন্তু আকাশ থেকে যখন জল পড়বে, এক নাগাড়ে অনেক দিন ধরে পড়তে থাকবে তখন কিন্তু কয়েকটা ফল খাবে না। এই কটা বাদ দিয়ে অন্য ফল খাবে। মনে রাখবে ’ তোমো মাথা নাড়ল।
     ফুলুগা ডাকলেন তোমোকে। দুটো গাছের কয়েকটা শুকনো ডাল ভেঙে আনলেন। প্রথমে মাটিতে রাখলেন এ গাছের একটা ডাল, তার ওপরে ও গাছের ডাল, তার ওপরে এ গাছের। এমনি করে বেশ উঁচু হল ডালের ওপরে ডাল। সূর্যকে ডাকলেন। সূর্য ফুলুগার কথায় ডালের ওপরে বসল। দেখতে দেখতে আগুন জ্বলে উঠল। জ্বলন্ত ডাল দিলেন তোমোকে। একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। মানুষ তোমো আগুন পেল।
      এতদিন তো সবকিছু কাচাই খেত তোমো। এখন আগুন আছে। রান্না শেখালেন ফুলুগা। বুনো শুয়োর মেরে তার মাংস রাঁধতে শেখালেন। বুনো শুয়োর এখনকার মতো ছিল না। তখন ছিল বেজায় বোকা। তাদের নাক ছিল না, কান ছিল না। নাক নিয়ে তেড়ে আসতে পারত না, কানে শুনে পালিয়ে যেতেও পারত না। শুধুই মারা পড়ত। তোমোর বেজায় সুবিধে। ওরা তখন নিজেরা খেতে জানত না।
     মানুষ তোমো সব শিখল। ফুলুগা আর থাকবেন কেন এখানে? তিনি চলে গেলেন ওই দূর পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা বোধহয় ওই সাদা মেঘের আকাশে। মানুষ আর কোনদিন দেবী ফুলুগাকে দেখে নি। তিনি আছেন, কিন্তু দেখা পাওয়া যাবে না।
     তোমো ছিল পুরুষ। প্রথম নারীর নাম চানা ইলেওয়াদি। তাকেও সৃষ্টি করেছেন ফুলুগা, ফুলুগাই সব সৃষ্টি করেছেন। তবে পুরুষের পরে জন্মেছে নারী। তোমো যখন আগুন পেল তার অনেক পরে নারী জন্মাল। তাকেই তো ঘর গেরস্থালি দেখতে হবে। জন্মাবার পরে সে জলে সাঁতার কাটছিল। তোমোর আস্তানা দেখে, আগুন দেখে জল থেকে উঠে এল তোমোর কাছে। সে হল তোমোর বউ।
     এমনি করে দিন যায়। শেষকালে চানা ইলেওয়াদির হল দুটো ছেলে আর দুটো মেয়ে। আমরা এখন যারা এখানে থাকি তারা সবাই ওদেরই বংশধর। হ্যাঁ, ওরাই আমাদের সবচেয়ে পুরনো বাবা-মা।
     মানুষ বাড়ছে। বনের শুয়োর বাড়ছে। কিন্তু শুয়োর বাড়ছে অনেক বেশি। বেজায় অসুবিধে। শুয়োররা তো নিজেরা খেতে পারে না। এত শুয়োরকে খাওয়ানোই হল এক দায়। চানা ইলেওয়াদি আর কি করে? সে এক বুদ্ধি করল। ছোট্ট শুড়ের নীচে খুঁচিয়ে ফুটো করে দিল। মুখ হল শুয়োরের। এখন নিজেরাই খুঁজেপেতে খাবার খেতে লাগল। ঝামেলা কমল। কিন্তু আবার কষ্টও বাড়ল। শুয়োরগুলো নিজেরা খেতে শিখে চালাক হয়ে উঠল। মানুষের ওপর আর নির্ভর করতে হচ্ছে না। নিজেরাই খাবারদাবার খুঁজে নিচ্ছে। ঘন বনে ঢুকে পড়ছে। তাদের শিকার করা কঠিন হয়ে পড়ল। তোমো তীর-ধনুক নিয়ে অনেক কষ্টে তবেই শুয়োর শিকার করতে পারে। আগে হাতের কাছেই শুয়োর পাওয়া যেত। এখন তীর-ধনুক নিয়ে শিকার করতে হয়। অবশ্য তীর-ধনুক ভালোই চালাতে পারে মানুষ। কেননা, ফুলুগা আকাশে কিংবা পাহাড়ের চুড়োয় যাবার আগে তোমোকে গাছের ডাল থেকে তীর-ধনুক বানাতে শিখিয়েছিল, তীর ছুড়তে শিখিয়েছিল। এখন তো তোমো জলেও তীর ছুড়তে পারে, মাছের গায়ে বিঁঁধে যায় সেই তীর।
     সেই চলে যাওয়ার পরে ফুলুগা আর একবার পৃথিবীতে এসেছিলেন। চানা ইলেওয়াদির কাছে এসেছিলেন। তিনটে কাজ তিনি শিখিয়ে গেলেন। ঝুড়ি আর জাল বুনতে শেখালেন। বড় কাজে লাগল মানুষের। আর মেয়েদের কীভাবে সাজতে হবে তাও শেখালেন। লাল-সাদা কাদামাটি দিয়ে কীভাবে মুখে-হাতে-বুকে-পায়ে ছবি আঁকতে হয় তা শিখিয়ে দিলেন চানা ইলেওয়াদিকে। না সাজলে কি মেয়েদের মানায়?
     হ্যাঁ, বলতে ভুলে গিয়েছি। ফুলুগা তো চলে যাবেন, তিনি নিষেধ করলেন কয়েকটা কাজ করতে। ঝমঝম বৃষ্টির সময়ে কয়েকটা ফল খাবে না, ঝমঝম বৃষ্টির সময়ে সূর্য চলে গেলে চারিদিকে অাঁধার হলে তারা যেন কোন কাজ না করে। শুধুই বিশ্রাম। অাঁধার হবার পরে কাজ করলে পোকা-জন্তু-জানোয়ার বিরক্ত হবে। তারা বিরক্ত হলে মানুষের ভালো হবে না। সন্ধের পরে কুঠার দিয়ে গাছ কাটবে না, কাঠ কাটবে না। বড় বিশ্রি শব্দ হয়। তাতে মানুষের মাথা ধরবে, ফুলুগারও মাথা ধরতে পারে। বড় বিরক্তিকর। ওসব করবে না। যাওয়ার আগে দেবী ফুলুগা আর একটা মস্ত উপকার করলেন। স্বামী-স্ত্রী, তোমো ও চানা ইলেওয়াদিকে কথা বলতে শিখিয়ে গেলেন। সেটাই তো আমাদের আদি ভাষা।
     তোমো একদিন সমুদ্রের ধারে বসে মাছ ধরছে। ধরা পড়েছে একটা বিরাট মাছ। ডাঙার কাছে আসতেই মাছটা এমন জোরে লেজের ঝাপটা দিল যে চারিদিকে চৌচির হয়ে গেল। অনেক ছোট ছোট নদীর জন্ম হল। ছোট ছোট নানা ডাঙা হল। তখন সেইসব ডাঙায় জোড়ায় জোড়ায় নারী-পুরুষ ছড়িয়ে পড়ল। তারা সঙ্গে নিল জলন্ত আগুন আর ঘর-সংসার পাতার টুকিটাকি জিনিসপত্র। লোক তো তখন অনেক বেড়ে গিয়েছে। এমনি করে নানা ডাঙায় নানা ধরনের লোকজন বসতি করল। কত রকমের মানুষজন, কত রকমের ভাষা।
     অনেক কাল কেটে গিয়েছে। অনেক ছেলেমেয়ে তোমো ও চানা ইলেওয়াদির। এখন তারা বুড়ো-বুড়ি হয়েছে। চারিদিকে তাদের বংশধর। শেষকালে একদিন তোমো জলে নামল, ডুব দিল,—আর উঠল না। তার পরেই বউ জলে নামল, ডুব দিল,—আর উঠল না। তোমো হয়ে গেল সমুদ্রের তিমিমাছ—যাকে দেখে সমুদ্রের সব জন্দুই ভয় পায়। এমন কি এতবড় কচ্ছপও ভয় পায়। চানা ইলেওয়াদি হয়ে গেল সমুদ্রের কাঁকড়া। দুজনেই সমুদ্রে মিলিয়ে গেল। আর তারা মানুষ রইল না।
     তোমোর চলে যাবার পরে ওতিমির সর্দার হল কোলয়োত। সে ছিল তোমোর নাতি। কোলয়োত ছিল মহা শক্তিশালী পরুষ। যা আগে কেউ পারেনি, সে তা পেরেছিল। সে সমুদ্রের এক বিরাট কচ্ছপকে শিকার করেছিল। আশ্চর্য শক্তি। খুব ভালো সর্দার। কোলয়োত একদিন বুড়ো হল। সে মারা গেল। তখন থেকেই আমাদের কপাল খারাপ হতে শুরু হল। দেবী ফুলুগা যা যা নিষেধ করেছিলেন, তোমো তা শুনত, কোলয়োত তা শুনত। কিন্তু তাদের পরে আর তেমন কেউ ওসব নিষেধ গ্রাহ্য করত না। যা খুশি তাই করত। নিষেধের কথা মনেই আনত না।
     দূর আকাশ কিংবা পাহাড়ের চূড়ো থেকে সবই দেখছেন ফুলুগা। তাকে দেখা যায় না, তিনি সব দেখেন। ভীষণ রেগে গেলেন তিনি। তার নিষেধ অমান্য করা? এবার বুঝবে মজা। বন্যা বইয়ে দিলেন চারিদিকে। সেই পাহাড়ের চূড়ো ছাড়া আর সবকিছু জলের তলায়। সবাই ডুবে মরল। শুধু চারজন বাদে। দুজন পুরুষ ও দুজন মেয়ে তখন নৌকোয় ছিল। জল যত বাড়ছে, নৌকো ওপরে উঠছে। তাই তারা বেঁচে গেল। বন্যা সবাইকে ডুবিয়ে দিল। চারজন শুধু বেঁচে রইল।
     অনেক দিন পরে জল নামল। একে একে ডাঙা ভেসে উঠল, জেগে উঠল বন আর মাটি। কোন জন্তু নেই, মানুষ নেই। ওই চারজন ওতিমিতে ফিরে এল। কিন্তু সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। আগুন নেই, আগুন নিভে গিয়েছে। সর্বনাশ।
      হাজার হলেও ফুলুগা দেবী। কতক্ষণ আর রেগে বসে রইবেন তিনি? আবার সৃষ্টি করলেন সমস্ত প্রাণী। মানুষ তো আছেই। প্রাণী সৃষ্টি করে তিনি আর কিছু করলেন না |
     মানুষের মধ্যে আগুন নেই। দিন কাটে, রাত কাটে। বড় কষ্ট মানুষের। আগুন নেই– যেন কিছুই নেই। মুখে কিছুই রোচে না, রান্না করা যাচ্ছে না। উপায়ও নেই।
     একদিন একটা মাছরাঙা পাখি তীরের বেগে ছুটে চলেছে। সে আনবে আগুন। আগুন আছে ফুলুগার ডেরায়। কিন্তু খুব সাবধানে যেতে হবে। ফুলুগা দেখলে আর আস্ত রাখবেন না। ফুলুগা তখন আগুন পোয়াচ্ছিলেন। একটু আনমনা ছিলেন। ঠোঁটে এক টুকরো জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিয়েই উড়ে চলল মাছরাঙা। ডানার শব্দে চোখ ফেরাতেই ফুলুগা দেখতে পেলেন মাছরাঙার কাণ্ড। একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিয়ে মাছরাঙার দিকে ছুড়ে মারলেন। মাছরাঙা একেবেঁকে উড়ছে, জ্বলন্ত কাঠ তার গায়ে লাগল না। ফসকে গেল। জ্বলন্ত কাঠ এসে পড়ল,— পৃথিবীতে, ওতিমিতে। সেই জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিল চারজন মানুষ। সে আগুন আর কোনদিন নেভেনি। এখনও জ্বলছে।
     ওই চারজন মানুষ থেকে আরও বাড়তে লাগল। ওই চারজন তো বন্যার কথা জানে, ফুলুগা যে বন্যায় ডুবিয়েছে পৃথিবীকে তাও জানে। তারা প্রায়ই এসব কথা বলাবলি করে। সবাই জানে বন্যার কথা, ফুলুগার রাগের কথা। মানুষ তখন ঠিক করল— ফুলুগাকে বরং মেরে ফেলাই ভালো। তারা ভাবল, তাদের পরামর্শের কথা অন্য কেউ জানতে পারবে না। তারা ভুল করল।
     ফুলুগা সব জানলেন। শেষ বারের মতো নেমে এলেন পৃথিবীতে, বললেন, ‘তোমরা মানুষেরা আমার নিষেধ অমান্য করেছিলে, তাই শাস্তি পেতে হয়েছিল। এখন আমাকে মেরে ফেলবার কথা ভাবছ। আমার দেহ শক্ত কাঠে গড়া। যদি কারও সাহস থাকে আগে আমার দেহে তীর ছোড়।
     মানুষেরা ভয়ে বিস্ময়ে চুপ করে রইল। ফুলুগা আবার বললেন, ‘আবার তোমরা আমার নিষেধগুলো অমান্য করে চলেছ। আমার নিষেধ মনে রেখো। আমাকে মেরে ফেলার কথা মন থেকে মুছে ফেলবে। নইলে বিপদ হতে পারে। ফুলুগা চলে গেলেন। আর ফেরেননি।
     সেদিন থেকে ফুলুগার সব নিষেধ তারা মেনে চলল। আমরাও মেনে চলেছি। তাই কোন বিপদ আসেনি। ফুলুগার নিষেধ মেনে চললে বিপদ আসবে কেন?
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য