রামপিয়ন - জার্মানের রূপকথা

     অনেক দিন আগেকার কথা । একটি লোক আর তার বউ সংসার চালাত। সুখের তাদের সংসার। শুধু একটিমাত্র অভাব। তাদের সংসারে কোনো ছেলেপুলে ছিল না। সেই লোকটির বউ দিনরাত ঈশ্বরকে ডাকে ছেলেপুলে দেবার জন্য। বউটির বিশ্বাস ঈশ্বর তার প্রার্থনা পূর্ণ করবেন ।
     তাদের বাড়ির পিছনে ছোটো একটা জানালা ছিল। সেটা দিয়ে তাকালে চোখে পড়ে আশ্চর্য একটা বাগান। সেই বাগানে ভারি সুন্দর হরেক রকমের ফুল আর গাছ। বাগানটার চার দিকে উঁচু দেয়াল। লোকে সেখানে ঢুকতে ভয় পায়। কারণ বাগানটা ছিল এক ডাইনির। অনেক তুকতাক সে জানত। তাই সবাই তাকে ভয় পেত।
     একদিন বউটি তাদের বাড়ির পিছনকার সেই ছোটো জানলা দিয়ে আশ্চর্য বাগানটার দিকে তাকিয়ে দেখে সেখানে ভারি সুন্দর রসাল রামপিয়ন রয়েছে। এত সবুজ আর তাজা যে দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে। তাই সেগুলো খাবার ভারি লোভ হল বউটির। আর তার লোভ দিনকের দিন বেড়েই চলল। সে জানত ঐ রামপিয়ন পাওয়া তার সাধ্যের অতীত। তাই, দেখতে-দেখতে বউটির শরীর শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে উঠতে লাগল। সেটা লক্ষ্য করে তার বর খুব ভয় পেয়ে বলল, “বউ, কেন তোমার শরীরের এরকম হাল?”
     বউটি বলল, “আমাদের বাড়ির পেছনকার বাগানের গোটা কয়েক রামপিয়ন খেতে না পেলে আমি আর বাঁচব নুা।”
     লোকটি তার বউকে খুব ভালোবাসত। তাই ভাবল “বউকে তো মরতে দিতে পারি না। তার জন্যে গোটা কয়েক রামপিয়ন যেমন করে পারি নিয়ে আসবই।” 
      সন্ধের ঝাপসা আলোয় সেই ডাইনির বাগানের পাঁচিল টপকে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে এক মুঠো রামপিয়ন তুলে সে এনে দিল তার বউকে। সঙ্গে সঙ্গে তার বউ সেগুলো দিয়ে স্যালাড বানিয়ে খুব তারিয়ে-তারিয়ে খেল। বউটির এত ভালো লেগেছিল যে পরের দিন রামপিয়ন খাবার লোভ তার বেড়ে গেল তিনগুণ। তার বর আবার পাঁচিল টপকে গিয়ে তার জন্যে আর কিছু রামপিয়ন নিয়ে এলো।
      তার পর দিন সন্ধেয় আবার সে গেছে বাগানে—এমন সময় সেই ডাইনির সঙ্গে তার একেবারে মুখোমুখি দেখা। ডাইনিকে দেখে ভয়ে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত থর থর করে কাঁপতে লাগল।
      তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে ডাইনি বললে, “তোমার সাহস তো কম না—আমার বাগান থেকে চোরের মতো রামপিয়ন চুরি করা। দাঁড়াও তোমায় মজা দেখাচ্ছি।”
      লোকটি বলল, “দোহাই তোমার, আমার প্রতি সদয় হও। এখানে না এসে আমার উপায় ছিল না। জানলা দিয়ে আমার বউ তোমার রামপিয়নগুলো দেখে। দেখে খাবার জন্যে পাগল হয়ে ওঠে । খেতে -না পেলে সে বাঁচত না।”
      তার কথাগুলো শুনে ডাইনির রাগ খানিক কমল। সে বলল, “বেশ–তাই যদি হয় যত খুশি রামপিয়ন নিয়ে যেতে পার । কিন্তু একটা শর্তে—তোমার বউয়ের ছেলেপুলে হলে আমাকে দিয়ে দিতে হবে। তাকে আমি মানুষ করব।”
      লোকটি দারুণ ঘাবড়ে গিয়েছিল। তাই ডাইনির শর্তে রাজি হয়ে গেল। যথা সময়ে তার বউয়ের একটি মেয়ে জন্মাল । সঙ্গে সঙ্গে ডাইনি হাজির হয়ে মেয়েটির নাম দিল, রামপিয়ন । তার পর তাকে নিয়ে চলে গেল।
      ভারি সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে রামপিয়ন। মেয়েটির যখন বারো বছর বয়েস বনের মধ্যে এক, উঁচু দুর্গে তাকে বন্দী করে রাখল ডাইনি । সেই দুর্গে কোনো সিঁড়ি বা দরজা ছিল না। থাকবার মধ্যে ছিল শুধু ছোট্টো একটা জানলা। সেই দুর্গের উপর ওঠবার দরকার হলে ডাইনি নীচে দাঁড়িয়ে বলত:
      “রামপিয়ন, রামপিয়ন তোমার চুল খুলে দাও।”
     রামপিয়নের ছিল ভারি সুন্দর সোনালী লম্বা চুল। কথাগুলো শুনলেই রামপিয়ন তার বিনুনিগুলো খুলে পর্দার আংটায় জড়িয়ে জানলা দিয়ে কুড়ি হাত নীচে ঝুলিয়ে দিত আর সেগুলো ধরে ডাইনি আসত উঠে ।
      বছর কয়েক বাদে একদিন রাজার বড়ো ছেলে ঘোড়ায় চড়ে সেই বনের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দুর্গটার কাছে পৌছল। সেটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে তার কানে ভেসে এল ভারি মিস্টি সুরের গান। গানটা শোনার জন্য সে থামল। নিঃসঙ্গ সময় কাটাবার জন্য গান গাইছিল রামপিয়ন।
      রাজপুত্রের খুব ইচ্ছে হল উপরে উঠে মেয়েটিকে দেখতে। কিন্তু অনেক খোঁজাখূজি করেও দুর্গের কোনো দরজা তার চোখে পড়ল না। ঘোড়ায় চড়ে সে বাড়ি ফিরল। কিন্তু গানের সেই মিষ্টি সুর সে কিছুতেই ভুলতে পারল না। সেটা শোনার জন্য প্রতিদিন সে যেতে লাগল সেই বনে। একদিন একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে গান শুনছে—এমন সময় সেই ডাইনিকে এসে সে বলতে শুনল :
      “রামপিয়ন, রামপিয়ন, তোমার চুল খুলে দাও।”
      সঙ্গে সঙ্গে সে দেখল সেই বিনুনিগুলো ঝুলে পড়তে আর সেগুলো ধরে ডাইনিকে উপরে উঠে যেতে।
      রাজপুত্ৰ মনে মনে বলল, “এই মই দিয়ে ওপরে উঠতে হয় দেখছি। পরের বার আমিও চেষ্টা করে দেখব ।”
      পরদিন—তখন সন্ধে হয়ে আসছে—রাজপুত্র সেই দুর্গের কাছে গিয়ে বলল :
      “রামপিয়ন, রামপিয়ন,  তোমার চুল খুলে দাও।”
      সঙ্গে সঙ্গে সেই বিনুনিগুলো ঝুলে পড়ল আর সেগুলো ধরে উঠে এল রাজপুত্র।
      একজন পুরুষ মানুষকে উঠে আসতে দেখে রামপিয়ন প্রথমটায় দারুণ ভয় পেয়ে গেল। কারণ আগে কখনো কোনো পুরুষ মানুষকে সে দেখে নি । কিন্তু রাজপুত্রকে মিষ্টি হেসে সে যখন বলতে শুনল— তার গান শুনে সে মোহিত হয়েছে, তাকে দেখবার জন্য মন তার আকুলি-বিকুলি করছে—তখন রামপিয়নের সব লজ্জা ভয় কেটে গেল। রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল তাকে সে বিয়ে করতে রাজি কি না। রামপিয়ন দেখল রাজপুত্র বয়সে তরুণ আর দেখতেও খুব সুন্দর । তার মনে হল, বুড়ি ডাইনির চেয়ে নিশ্চয়ই আমাকে সে অনেক বেশি ভালোবাসবে  তার হাতে হাত রেখে রামপিয়ন তাই বলে উঠল, “হ্যাঁ, খুব রাজি। সানন্দেই তোমার সঙ্গে যাব। কিন্তু এখান থেকে নামি কী করে? প্রতিবার তুমি যখন আসবে সঙ্গে এনো খানিকটা করে রেশম নিয়ে এসো। সেটা পাকিয়ে আমি একটা মই বানাতে শুরু করব। মই শেষ হলে সেটা বেয়ে আমি নেমে আসব। তখন তোমার ঘোড়ায় আমাকে তুমি নিয়ে যেতে পারবে।
      ঠিক হল রাজপুত্র আসবে রোজ সন্ধেয় । কারণ বুড়ি ডাইনি আসে দিনের বেলায়।
      প্রথমটায় ডাইনি কিছুই টের পেল না। কিন্তু একদিন রামপিয়ন তাকে প্রশ্ন করল, “মাদাম গথেল ! তোমাকে টেনে তুলতে অত কষ্ট হয় কেন? রাজপুত্ত্বর তো চক্ষের নিমেষে উঠে আসে?”
      শুনে ডাইনি ব্যাপারটা বুঝল। দারুণ রেগে সে চেঁচিয়ে উঠল, “শয়তান মেয়ে, বলছিস কী? আমার ধারণা ছিল তোকে আমি সবাইকার কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছি—আর এদিকে তুই কিনা আমায় ঠকিয়ে চলেছিস।” এই-না বলে ভীষণ রেগে তার সুন্দর তুলের গোছা বাঁ হাতে জড়িয়ে ডান হাতে একটা কাচি ধরে সেই ডাইনি কুচ্‌কুচ্‌ করে কেটে দিল। সেই লম্বা চুলের গোছাগুলো পড়ল মেঝেয় লুটিয়ে। ডাইনির স্বভাবটা ছিল ভারি খারাপ। তাই সেখান থেকে সরিয়ে একটা মরুভূমির মধ্যে নিয়ে গিয়ে সে রাখল রামপিয়নকে। সেখানে ভারি কষ্টের তার দিন কাটে। রামপিয়নকে মরুভূমিতে রেখে এসে সেদিনই ডাইনি সেই কাটা বিনুনিগুলো পর্দার আংটায় জড়াল আর সন্ধেয় রাজপুর এসে বলল :
      “রামপিয়ন, রামপিয়ন, তোমার চুল খুলে দাও ।”
      তথুনি সে ঝুলিয়ে দিল বিনুনিগুলো ।
      উপরে উঠে রাজপুত্র দেখে রামপিয়নের জায়গায় রয়েছে এক বুড়ি ডাইনি। ভীষণ রেগে হিসহিস্ করতে করতে ডাইনি বলল, “হা-হা । তুমি দেখছি এসেছ তোমার বউকে নিয়ে যেতে। কিন্তু সেই সুন্দর পাখিটা এখন আর তার বাসায় বসে গান গাইছে না। একটা বেড়াল এসে তাকে নিয়ে গেছে। সাবধান না হলে বেড়ালটা তোমার চোখদুটো উপড়ে ফেলবে । রামপিয়নের দেখা জীবনে আর পাবে না।”
      দুঃখে-শোকে পাগল হয়ে রাজপুত্র সেই দুর্গ থেকে ঝাঁপ দিল। প্ৰাণে সে বাঁচল বটে, কিন্তু ঝোপঝাড়ের কাটায় তার চোখদুটো উপড়ে গেল। অন্ধ হয়ে বনে বনে সে ঘুরে বেড়ায়। ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকে। আর রামপিয়নকে হারাবার জন্য সব সময় সে কাঁদে । এইভাবে এক বছর ঘুরে বেড়াবার পর শেষটায় একদিন সে পৌছল একটা মরুভূমিতে। সেই মরুভূমিতেই রামপিয়নের জন্মেছিল যমজ শিশু— একটি ছেলে আর একটি মেয়ে৷ ভারি দুঃখে-কষ্টে সেখানে তাদের দিন কাটছিল। সেখানে পৌছে রাজপুত্রের কানে ভেসে এল একটা স্বর। সেই স্বর শুনে এগিয়ে যেতে রামপিয়ন তাকে দেখতে পেল। আর দেখেই চিনল। দৌড়ে এসে রাজপুত্রের গলা জড়িয়ে ধরে সে কাঁদতে লাগল। তার দু ফোটা চোখের জল পড়ল গিয়ে রাজপুত্রের অন্ধ দুই চোখে । আর সঙ্গে সঙ্গে রাজপুত্র ফিরে পেল তার দুটিশক্তি। আগের মতো ভালো হয়ে গেল তার দু চোখ। নিজের রাজত্বে নিয়ে গেল সে রামপিয়নকে। সমস্ত রাজ্য জুড়ে আনন্দের বাণ ডাকল। আর তার পর অনেক বছর ধরে রইল তারা সুখে-শান্তিতে।

(রামপিয়ন- এক ধরনের বারোমেসে বিদেশী গাছ। তার শেকর খেতে খুব ভাল।)
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য