হাঃ হাঃ দুই কান কাটা - আদিবাসী লোককথা

     কোন এক সময় এক গাঁয়ে দুই ভাই বাস করত। তারা দুজনেই অন্ধ। অন্ধ হলে কি হবে, তারা ছিল সুখি। কেননা তারা ছিল বেজায় পরিশ্রমী। কোন কিছু তারা দেখতে পেত না, কিন্তু তারা সুখি ছিল। কেননা, তাদের জীবন ছিল সহজ-সরল। সবসময় তারা কিছু না কিছু কাজ করত। তারা সুখি। 
     একদিন সন্ধে হয়ে এসেছে। সারা দিন ধরে তারা নিজেদের জমিতে জুম চাষ করেছে। বেশ ক্লান্ত তারা। ক্লান্ত দেহে আস্তে আস্তে বাড়ির পথে রওনা দিল। আহা! তারা তো খুব জোরে জোরে হাঁটতে পারে না! মহা আনন্দে তবু তারা পথ চলছে। তাদের দেখেই মনে হয়, তাদের বড় আনন্দ। 
     সেই সময় তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক পথিক। পথিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তা এত খুশি খুশি কেন? ব্যপারটা কি? 
     তারা বড় সহজ-সরল। তারা জানাল, মাঠে একটা মৌচাক পেয়েছে। মধু টসটস করছে। মধু-ভরা মৌচাক। আনন্দ হবে না? কতদিন তারা মধু খায় না। অতি উৎসাহে তারা কাঁধের ঝুলি থেকে কলাপাতায় জড়ানো মৌচাক বের করল। কলাপাতা খুলে ফেলল। পথিককে মৌচাক দেখাল। কি যে আনন্দ মনে! মধু-ভরা মৌচাক। 
     পথিক বলল, ‘হ্যাঁ, খুশি হওয়ার মতোই মৌচাক বটে। মধুভর্তি মৌচাক। আনন্দ তো হবেই। 
     ভাই দুজন বলল, “ঠিক বলেছ। তা হাতে নিয়ে পরখ করেই দেখ না কেমন মৌচাক পেয়েছি। 
    ভাই দুজন বড় সরল। মনে কোন সন্দেহ নেই। আর তারা যে অন্ধ! সন্দেহ করবেই বা কেন? 
   পথিকের লোভ হল। হাতে নিয়ে দেখে সুন্দর মৌচাক। অন্ধ ভাই দুজনের সরলতার সুযোগ নিয়ে, অন্ধত্বের সুযোগ নিয়ে সে তাড়াতাড়ি মৌচাকটা তার ঝুলিতে ঢুকিয়ে নিল। পাশে পড়ে ছিল প্রায় শুকিয়ে-ওঠা এক তাল গোবর। তাই তুলে নিয়ে এক ভাইয়ের হাতে দিল। ভাই কলাপাতায় জড়িয়ে ঝুলিতে রেখে দিল সেই শুকনো গোবরের তাল। আহা! তারা জানেও না কি হয়ে গেল এক মুহুর্তে। পথিক অন্য পথে চলে গেল। তারা ধরল বাড়ির পথ। আনন্দে বুক নাচছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পরে তাদের দুজনেরই বড় খিদে পেল। সেখানে এক গাছতলায় তারা বসল। অত বড় মৌচাকের কিছুটা করে মধু তারা এখন খাবে। কলাপাতার মোড়ক খুলতেই কেমন বিশ্রি গোবরের গন্ধ তাদের নাকে ঢুকল। এক ভাই বলল, 'এঃ, পাশেই কোথাও গোবর রয়েছে। খারাপ গন্ধ বেরুচ্ছে।
     অন্য ভাই সায় দিয়ে বলল, “ঠিক কথা। আমারও তাই মনে হচ্ছে। আর একটু দূরে গিয়ে বসি। অন্যখানে বসল। সব জায়গায় বিশ্রি গন্ধ। কি আর করে দুজনে। ভাবল, আজকে এই রাস্তার সবখানেই গোবর রয়েছে। কি আর করা। এর মধ্যেই মধু খেতে হবে। যাকগে, মধু খেলে আর ওসব বাজে গন্ধ পাওয়া যাবে না। শেষকালে এক জায়গায় দুজনে বসল। এবার মৌচাক ভেঙে মধু খাবে। 
     কলাপাতা-জাড়ানো মৌচাক খুলল। দু-টুকরো দুজনে ভেঙে নিল। ওয়াক খুঃ। তাদের বমি উঠে এল। মধুতে এ কি বিশ্রি গন্ধ? গোবরের গন্ধ। বারবার থুথু ফেলতে লাগল। মুখের চেহারা অন্য রকম হয়ে গেল। একটু পরে দুজনের চোখে জল এল তারা সরল, তারা দেখতে পায় না। তারা অন্ধ। তাদের এভাবে কেউ ঠকায়? হায়! কপাল। 
     অনেকক্ষণ চুপ করে তারা ঘাসের ওপরে বসে রইল। কেউ কোন কথা বলল না। এবার ধীরে ধীরে তাদের দুঃখ ঘুচে গেল, রাগে ফেটে পড়ল তারা। অপমানের প্রতিশোধ চাই। তাদের সারল্য ও অন্ধত্বের সুযোগ নিয়ে যে পথিক এভাবে ঠকাল, তাকে শাস্তি পেতেই হবে। তাকে শাস্তি দিতেই হবে। তাদের অপমান করল, মধু খাওয়াও হল না। পথিক এতবড় ঠগ, এতবড় নিষ্ঠুর! 
     দুজন অনেকক্ষণ ধরে পরামর্শ করল। একমত হল। পথিককে এ পথেই তার বাড়ি ফিরতে হবে। তারা অপেক্ষা করবে। দুজনে রাস্তার দুপাশে ঝোপে ঝোপে লুকিয়ে থাকবে। বেশ অাঁধার হয়ে এসেছে। দুদিকে লুকিয়ে থাকার সুবিধাও অনেক। দুদিক থেকে তারা পথিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। হাতে ছুরি বাগিয়ে দুজন দুদিকের ঝোপে লুকিয়ে পড়ল।
     অপেক্ষা করছে, অপেক্ষা করছে। অনেকক্ষণ কেটে গেল। কেউ আসছে না। তবু অপেক্ষা করতেই হবে। হঠাৎ রাস্তার পাশের এক ঝোপে খসখস আওয়াজ হল। দুজনে সতর্ক হল। কান খাড়া করে শুনল। হঠাৎ দুজনে চিৎকার করে উঠল, শয়তান! এবার তোমাকে পেয়েছি। এবার পালাবে কোথায়? 
     লাফিয়ে পড়ল সামনে। দুজনেই। একজন রাগে বলে উঠল, "তোমার কলজে ছিড়ে নেব। এই ছুরিতে তোমার বুক দুফাঁক করে দেব। শয়তান কোথাকার! 
     দুজনেই পথিকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল মারামারি। 
    আসলে শব্দটা ঠিকই হয়েছিল। কিন্তু সে শব্দ পথিকের পায়ের নয়। একটা গোরু ঘাস খাচ্ছিল। ঝোপের পাতা মুখ দিয়ে টানতেই অমন খসখস আওয়াজ হয়েছিল। আহা! ওরা যে অন্ধ। অতশত বুঝবে কেমন করে ? ওরা যে চোখে দেখে না। 
    তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল একজন আর একজনের ওপর। এ ভাই ভাবল,—এই তো পথিক। ও ভাই ভাবল-এই তো পথিক। তারা কিছুই জানল না, এক ভাই আর এক ভাইকে পথিক ভেবে আক্ৰমণ করে বসেছে। দুজনেই একে অপরকে শযতান পথিক ভাবছে। হায়! কপাল! লাথি মারছে, কিল মারছে চুল ধরে টানছে আর ছুরি চালাচ্ছে। তারা অন্ধ, তাই অধিকাংশ ছুরির আঘাতই তাদের গায়ে লাগছে না, ফসকে যাচ্ছে। ছুরি হাওয়ায় ঘোরাঘুরি করছে। নইলে কি যে হত ! আহা, বেচারি অন্ধ দুভাই কি করছে তা তারা জানে না, কেননা তারা দেখতে পায় না।
    শেষকালে পথিক মরে পড়ে গেল না। তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। বেশি রাগ হলে শরীর ক্লান্ত লাগে। তার ওপরে এতক্ষণ মারামারি। ভাবল, খুব উচিত শিক্ষা দিয়েছে পথিককে। বুক ওঠানামা করছে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে। সারা দেহ ঘামে ভিজে গিয়েছে। দুজনে পাশাপাশি ঘাসে বসে পড়ল। নাঃ, পথিক দুজনের হাত ছাড়িয়ে শেষকালে পালিয়েছে। মরে নি, কিন্তু খুব বুঝেছে মজা। টের পেয়েছে কাকে বলে মার! নিষ্ঠুরতার জবাব পেয়েছে। তাদের হাতে যে মার খেয়েছে, তাতে পথিক কোনদিন দুভাইকে ভুলতে পারবে না। 
     এক ভাই হঁপাতে হাঁপাতে বলল, ভাই, আমার কিন্তু তেমন কিছু আঘাত লাগে নি। শুধু শুয়োরটা আমার একটা কান কেটে নিয়ে গিয়েছে। অবশ্য আমিও ছাড়ি নি, আমিও তার একটা কান কেটে রেখেছি। আমার হাতেই রয়েছে সেই কান। তোর খুব লাগেনি তো? 
    অন্য ভাই অবাক হয়ে বলল, "আরে! অবাক কাণ্ড। শুয়োরটা আমারও একটা কান কেটে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমিও ছাড়ি নি। তারও একটা কান কেটে রেখেছি। এই তো সেটা আমার হাতে। মজাটা বুঝেছে শয়তান। 
    দুজনের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটায় তারা অবাক হয়েছে। অল্পক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। তারপরে ব্যাপারটা বুঝে ফেলল বড় ভাই। সে কথা বলল। 
    ক্লান্তি অনেক কেটেছে। শান্ত হয়ে খুশি মনে বড় ভাই বলল, ‘খুব ভালো কথা। আমাদের অবস্থা খারাপ। কিন্তু শয়তানটার আরও খারাপ। আমদের গিয়েছে একটা করে কান। আর ওর খোয়া গিয়েছে দুটোই। ওটা এখন দুকান কাটা। এখন থেকে আমরা চুল বড় রাখব। তারপরে একপাশে সিঁথি করে চুলটা অন্যধারে নামিয়ে দেব। ব্যাস, কাটা কান ঢাকা পড়ে যাবে। কেউ বুঝতে পারবে না, আমাদের একটা কান নেই। কিন্তু ওই শুয়োরের বাচ্চা শয়তানটা তো আর দুদিকে চুল নামিয়ে দিতে পারবে না? ওর সুকান কাটাই দেখা যাবে। সবাই ওকে কানকাটা বলে ডাকবে। গাঁয়ে যখন ফিরবে, সবাই ওকে ওই নামে ডাকবে। ওর পরিচয় হবে কানকাটা। সবাই ঠাট্টা করবে, হাততালি দিয়ে ক্ষেপাবে। কেমন মজা হবে বল! আমাদের ঠকানো? আমাদের পেছনে লাগা? এই কষ্ট নিয়েই সারাজীবন কাটাতে হবে। রেহাই নেই, কান ঢাকার উপায় নেই। ওর নিষ্ঠুর কাজের যোগ্য জবাব পেয়েছে। কি বল ভাই? 
    এই মজার কথায় দুজনে প্রাণভরে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল। কেমন মজা! এবার টের পাবে। দুজনেই পথিকের দুটো কান কেটে নিতে পেরেছে। একজন একটা, আর একজন আর একটা। মনের সব দুঃখ, সব অপমান ঘুচে গেল। আর কোন ব্যথা-বেদনা মনে নেই। দুজনেই খুশি। লাফিয়ে উঠল পায়ের ওপর। হাঁটা দিল বাড়ির পথে। হেলে-দুলে আনন্দে হাঁটছে। মনে আজ বড় ফুর্তি। শত্ৰুকে জব্দ করতে পেরেছে। অন্ধ হয়েও প্রতিশোধ নিতে পেরেছ। পথে হাঁটছে আর বারবার বলছে-ওঃ কানকাটা পথিক। হাঃ হাঃ হাঃ ! একটু পরে পরেই বলছে আর প্রাণ খুলে হাসছে। ওঃ, কানকাটা পথিক। হাঃ হাঃ হাঃ। বলছে আর হাঁটছে, হঁটিছে আর বলছে। দুজনে চলেছে বাড়ির পথে। আনন্দে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য