একশ গরুর বদলে একটি বউ-১ - আদিবাসী লোককথা

     অনেক পুরনো কালের কথা। সেই কালে এক গায়ে থাকত একজন লোক আর তার বউ। বহুদিন ধরে তারা সেই গায়ে ঘর-সংসার করছে। অনেক অনেক বয়সে তাদের একটা ছেলে হল। দুজনের মনেই খুব আনন্দ। সকাল বেলার রোদের মতো ঘর আলোতে ভরে গেল। সে যে কি আনন্দ তা তারা বোঝাবে কেমন করে?
     তাদের অবস্থা মোটামুটি বেশ ভালোই ছিল। কেননা, তাদের ছিল একশো গোরু। যদিও গোরুগুলোর কোন বাছুর ছিল না তবু সুখে দিন কেটে যেত। তাদের জমিজিরেত ছিল না, কিন্তু একশোটা গোরু কম কিসে !
     বাগানের গাছ যেমন দেখতে দেখতে বড় হয়, পুষ্ট হয়, ছেলেও তেমনি বেড়ে উঠল। ছেলের বয়স হল পনেরো। মাঠে-বনে গোরু চরিয়ে ছেলের স্বাস্থ্য হয়েছে সুন্দর, সবল। তাকে এখন জোয়ান মনে হয়।
     কিন্তু হঠাৎ ছেলেটির বাবা মারা গেল। একটু মুষড়ে পড়ল সে। আবার কয়েকদিন পরে সব ঠিক হয়ে গেল। বছর তিনেক পরেই তার মা-ও মারা গেল। ছেলেটি খুব কাঁদল। বড় একা সে। বাবা-ও নেই, মা-ও নেই। শুধু বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া একশো গোরু সে পেল। আর তো কেউ নেই, তাই সে-ই হল এসবের উত্তরাধিকারী। কয়েকদিন সে বাড়িতেই রইল। মায়ের শ্রাদ্ধশ্রান্তি করল। যা যা ছেলেদের করতে হয়, সবই ভালোভাবে করল। বাবা-মা যে তার বড় আপনার জন ছিল।
     এমনি করে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। যতক্ষণ বাইরে থাকে, বেশ থাকে। কিন্তু বাড়িতে এলেই বড় একা লাগে। কথা বলার কেউ নেই, সুখ-দুঃখের গল্প করার কেউ নেই। এমনি করে আর কতদিন চলবে? তাই ছেলেটি ঠিক করল,—সে বিয়ে করবে। একদিন এক পড়শিকে সে বলল, “আমি বিয়ে করব। বাবা মা মারা গেল, আর তো আমার কেউ নেই। আমি বড় হয়েছি। একা একা ভালো লাগে না । তাই বিয়ে করতে চাই। তুমি কি বল?
     পড়শি খুব খুশি হয়ে বলল, “ঠিক কথা, বিয়ে তো করাই উচিত। বড় হয়েছ, তার ওপর বাবা মা নেই। একা একা তো লাগবেই ! বিয়ে তো করতেই হবে।
     ছেলেটিও পড়শির কথা শুনে খুব খুশি হল। লাজুক লাজুক মুখে বলল, তাহলে, তাহলে মেয়ে তো তোমাদেরই খুঁজেপেতে দিতে হবে। আমি তো কিছু জানি না।
     পড়শি মাথা নেড়ে বলল, ‘আরে! সে তো আমাদেরই করতে হবে। এ তো আমাদের কর্তব্য। তোমার বাবা নেই, মা নেই, আমরাই তো এসব দেখব। তোমার জন্য একটা খুব সুন্দরী মেয়ে দেখব, সে তোমার খুব ভালো বউ হবে।
     ‘তাহলে, তাই দেখ।’ ছেলেটি বলল। একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘একজন যদি মেয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে তবে খুব ভালো হয়। তাড়াতাড়ি করাই ভালো।
     পড়শি বলল, “বনের দেবতা, থানের দেবতা ভালো করবেন। তার ইচ্ছেতেই সব হবে।
    গাঁয়ের সবাই মিলে পরামর্শ করল। বউ হবে সুন্দরী আর খুব ভালো। পরের দিন সকালে একজন পড়শি বেরিয়ে পড়ল মেয়ের খোঁজে। অনেক অনেক দূর যেতে হতে পারে, তাই সঙ্গে নিল খাবার। যতক্ষণ আর যতদিন সে ময়ে খুঁজে না পাবে, ততদিন আর গাঁয়েই ফিরবে না। ঘুরতে ঘুরতে সে ভালো পাত্রী পেল। গায়ে ফিরে এল।
     পড়শি ছেলেটিকে বলল, ‘হ্যাঁ, শেষকালে পাত্রী পেলাম। কিন্তু সে এ গায়ের মেয়ে নয়, পাশের গায়েরও নয়। সে থাকে এখান থেকে অনেক দূরে। তবে তুমি যেমনটি চাও ঠিক তেমনি।
     ছেলেটি বলল, সে কার মেয়ে? 
     পড়শি খুব উৎসাহে বলতে লাগল, সে মেয়ে খুব বড়লোকের মেয়ে। তার ছয় হাজার গোরু-মোষ আছে। শুধু কি তাই? ওই মেয়েই তার একমাত্র সন্তান। একটাই মেয়ে, আর কোন ছেলেপুলে নেই। বুঝতেই পারছ, সব পাবে ওই মেয়েই।
একথা শুনেই ছেলেটি খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল। সে ভাবল, এমন মেয়েকেই বিয়ে করতে হয়। এ মেয়েকেই সে বিয়ে করবে। মুখে বলল, ‘ভাই, আমি রাজি। এই মেয়েকেই আমি বিয়ে করব। তুমি কালকেই মেয়ের বাবাকে মতটা জানিয়ে দিতে পারবে?
     পড়শিও পাত্রী ঠিক করতে পেরে খুব খুশি। তার পছন্দ-করা মেয়েকে ছেলেটি বিয়ে করতে চেয়েছে, এটা কি কম কথা? তাই তাড়াতাড়ি বলল, ‘আরে, এ আর বেশি কথা কি? বনের দেবতা, থানের দেবতা ভালো করবেন, তার ইচ্ছেতেই সব হবে। কাল সকালেই আমি মেয়ের বাবার গায়ে রওনা হব। কোন কিছু ভেবো না তুমি?
     সবে পুব দিকে সূর্য লাল হয়েছে। লাল ছটা আকাশে রক্ত ছড়াচ্ছে। পড়শি খাবার বেঁধে রওনা দিল দূর গায়ের পথে। সূর্য যখন আকাশে আগুন ছড়াচ্ছে, পথের মাটি যখন উনুনের ধারের মতো গরম হয়ে উঠেছে, তখন পড়শি পৌঁছল সেই গায়ে, মেয়ের বাবার বাড়িতে। ছেলেটির মনের কথা সব জানাল। ছেলেটির কথা সব খুলে বলল।
     বাবা বলল, “বেশ, শুনলাম তোমার কথা। শুনলাম ছেলেটির মনের কথা। কিন্তু বাপু, আমার মেয়ে কেমন তা-তো জানই। কন্যাপণ তো তেমন কম নিতে পারি না। তা যখন ছেলেটির মনে ধরেছে, তখন একশোটা গোরু দিলেই চলবে। ছেলে যদি রাজি থাকে, তবে আমি কথা দিচ্ছি মেয়েকে আমি তার হাতেই দেব। একশোটা গোরু। দেখ, সে রাজি কিনা?
সব হবে। আমি একথাই ছেলেটিকে জানাব। তাহলে চলি।
     বাবা বলল, ‘হ্যা, ওই কথাই রইল ।
   ঘটক পড়শি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে সেখান থেকে রওনা হল। গায়ে ফিরে এসে সে সব কথা ছেলেটিকে জানাল। মেয়ের বাবার সঙ্গে যা যা কথা হয়েছিল, সব খুলে বলল।
     সব শুনে ছেলেটি বলল, “ভাই, সব তো বুঝলাম। কিন্তু মেয়ের বাবা একশোটা গোরু চেয়েছে, আর আমার তো ওই একশোই সম্বল। জমি নেই, জিরেত নেই, অন্য কোন কিছুই নেই। মনে কর আমি তাকে সব দিয়ে দিলাম, তাহলে আমি আর বউ খাব কি? বঁচিব কেমন করে? আমার তো একশোটা গোরু ছাড়া আর কিছুই নেই। বাবা-মা আমার জন্য আর তো কিছু রেখে যায়নি। কি করি বলতো?
     পড়শি বলল, “সে তো ঠিক কথা। সব দিয়ে দিলে তোমরা দুজনে খাবে কি? তা এই যখন অবস্থা, তুমি কি আর সেই মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে? তুমি বলে দাও, ও মেয়েকে তুমি বিয়ে করতে পারবে না। বড় বেশি চাহিদা। আমি তাহলে মেয়ের বাবাকে সে কথাই জানিয়ে আসি। আর তোমার যদি বাপু মত থাকে, তাও বলো। সে খবরও পৌঁছে দিতে পারি।
     চুপ করে রইল ছেলেটি, মাথাটি তার ঝুঁকে রয়েছে, হাতদুটো কোলের ওপরে। বেশ চিন্তিত। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল তারা। ছেলেটি কোন কথা বলছে না দেখে পড়শি উঠে পড়ল। হঠাৎ ছেলেটি বলল, “নাঃ, যা হবার হবে, ওই মেয়েকেই আমি বিয়ে করব। বাবার শর্তে আমি রাজি। তুমি সেকথাই বল, একশো গোরু আমি দেব, অমন মেয়ের বদলে সবই আমি দেব। মেয়ের বাবাকে খবর দাও, আমি একশো গোরু দিয়ে তার মেয়েকে নিয়ে আসব।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য