অভাব - রাশিয়ার উপকথা

     এক গাঁয়ে ছিল দুই ভাই চাষী। একজন গরীব আর একজন ধনী। ধনী চাষী গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে মন্ত একটা বাড়ী তৈরী করে বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসল। ওদিকে গরীব চাষীর বাড়ীতে মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হত যে একটুকরো রুটিও থাকত না। চাষীর ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো সারাক্ষণ খিদেয় কাঁদত। সকাল থেকে রাত অবধি চাষী খেটে খেটে হয়রান, জলের তলের মাছগুলো যেমন বরফে মাথা কুটে মরে, চাষীরও সেই দশা। শত চেস্টাতেও কোন ফল হত না।
     একদিন চাষী তার বৌকে বলল: ‘যাই, সহরে গিয়ে দাদাকে বলি, হয়ত কিছু সাহায্য করবে।’
     এই ভেবে চাষী গেল ধনী দাদার কাছে।
    বলল, ‘দোহাই দাদা, কিছু সাহায্য করো। বড় অভাব। একটু রুটিও নেই যে স্ত্রী-পুত্রের মুখে দিই। দিনের পর দিন ওরা না খেয়ে থাকে।
     “এ সপ্তাহটা আমার কাছে কাজ করো, তাহলে দেব।’ 
     গরীব চাষী কী আর করে? কাজেই লেগে গেল। জ্বালানি কাঠ কাটে, জল তোলে, ঘোড়াগুলোকে দলাই-মলাই করে আর উঠোন ঝাঁট দেয়।
     সপ্তাহের শেষে বড়লোক দাদা চাষীকে একটা রুটি দিল। বলল, “এই নাও তোমার কাজের মজুরি।’ 
     ‘তা যা দিলে তার জন্যেই ধন্যবাদ।’ এই বলে চাষী বেরিয়ে যাবে, এমন সময় ধনী দাদা আবার ডাকল:
     ‘দাঁড়াও দাঁড়াও ! কাল আমার বাড়ী তোমাদের নেমন্তন্ন। তোমার বৌকেও এনো। কাল আমার জন্মদিন জানো তো?’
     ‘না ভাই, তা কী করে হয়। তুমি নিজেই জানো, কত বড় বড় সওদাগরেরা নেমন্তন্নে আসবেন ভাল ভাল জুতো, লোম-দেওয়া কোট পরে, আর আমার পায়ে লাপতি*(* লাপতি — গাছের ছাল বুনে তৈরী করা জুতো, সাধারণত সেকালের রাশিয়ায় গরীব চাষীরা পরত।), গায়ে ছেড়া জামা!
     আরে, তাতে কিছু হবে না! চলে এসো, জায়গা একটা করে দেব, দাদা বলল।
     চাষী বলল, ‘বেশ, তাহলে আসব।'
     ‘শুনছো বৌ, কাল আমাদের নেমস্তন্ন।’ 
     ‘তার মানে? কে করলে নেমস্তন্ন?’ 
     ‘দাদা নেমস্তন্ন করেছে, কাল দাদার জন্মদিন।’ 
     ‘তা বেশ, যাব।’ পরদিন সকালে উঠে ওরা তো শহরে গেল। ধনী দাদার বাড়ীতে পৌছে, শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ল। বহু ধনী অতিথি এর মধ্যেই টেবিলে বসে গেছে, প্রচুর পরিমাণ আয়োজন করেছে বাড়ীর কর্তা। সকলকেই মক্তহস্তে দিচ্ছে। কিন্তু গরীব ভাই আর ভাইয়ের বৌয়ের কথা একবারও মনে পড়ল না তার, কিছু খেতেও দিল না। কাজেই বসে বসে ওরা শুধু অন্যের খাওয়া দেখে গেল।
     ভোজ শেষ হল। কর্তাগিন্নীকে ধন্যবাদ দিয়ে সবাই টেবিল ছেড়ে উঠতে লাগল। গরীব ভাইও উঠে দাঁড়িয়ে বিনীত অভিবাদন করল। ধনী অতিথির দল নেশা করে ফুর্তি করে, কলরব করে গান করতে করতে গাড়ী চড়ে বাড়ী গেল।
     আর গরীব ভাই ফিরে চলল খালি পেটে হেটে হোটে। বৌকে বলল, “আমরাও একটা গান ধরি, কেমন ?’ 
     ‘বোকার মতো করো না। ওরা পেটপুরে খেয়েছে তাই গান করছে! তুমি গান গাইতে যাবে কেন?’
     যাই হোক ভাইয়ের জন্মদিন, গান না গেয়ে বাড়ী ফেরা লজ্জার কথা, গান করলে লোকে ভাববে সবার মত আমাকেও যত্ন আত্যি করেছে ...’
     ‘তা, ইচ্ছে হয় গান ধরো, কিন্তু আমি বাপ গাইছি নে।’ 
      চাষী গান ধরল, কিন্তু মনে হল যেন দুটো গলা শুনতে পাচ্ছে। তাই গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করল:
     ও বৌ, তুমিও বুঝি সরল গলায় আমার সঙ্গে গান ধরেছিলে?’ 
     ‘তোমার হয়েছে কী বলো তো? গান গাইতে আমার বয়ে গেছে।’ 
     ‘তাহলে কে গাইল ?’ 
     ‘আমি কী জানি? আচ্ছা, আবার গাও তো এবার আমি শুনব, চাষীর বৌ উত্তর দিল।
     চাষী আবার গাইতে শুরু করল। গাইছে একজন, কিন্তু শোনা যাচ্ছে দুটো গলা। চাষী থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করল:
‘অভাব, ও অভাব! তুমিই গান ধরছো বুঝি!’ 
     অভাব বলল, ‘হ্যাঁ মালিক, আমিই।’ 
     ‘তাহলে এসো, আমাদের সঙ্গে চলো।’ 
     ‘তাই যাব মালিক, কখনও তোমায় ছেড়ে যাব না।’
     বাড়ী এল চাষী, আর অভাব তাকে শুড়ীখানায় যাবার জন্যে ডাকতে লাগল। চাষী বলল: ‘উহু, আমার টাকাকড়ি নেই, যাব না।’ 
     ‘কেন, টাকার কী দরকার? তোমার ভেড়ার চামড়ার কোটটা দেখছো না? ওটার কী দরকার? গ্রীষ্মকাল এসে গেছে। আর তো ওটা পরবে না! তার চেয়ে চলো ওটার বদলে কিছু মদ খেয়ে আসা যাক ...’
     চাষী আর অভাব তাই শুড়ীখানায় গিয়ে কোটটার বদলে মদ খেল। পরদিন সকালে অভাব মাথার ষন্ত্রণায় “বাবারে মারে" করতে লাগল। গত রাত্রের ফল। তারপর সেদিনও আবার মালিককে মদ খেতে যাবার জন্যে টানাটানি করতে লাগল অভাব। চাষী বলল, ‘টাকা নেই।’ অভাব বলল, ‘টাকার কী দরকার? তোমার গাড়ীটা আর স্লেজটা নিয়ে চলো, ওতেই হয়ে যাবে!’
     কোন উপায় নেই – অভাবের হাত থেকে রেহাই নেই চাষীর। কাজেই গাড়ী আর স্লেজ টেনে নিয়ে চলল শুড়ীখানার দিকে। সেখানে গিয়ে সেগুলো বেচে মদ খেল।
     পরদিন অভাব মাথার যন্ত্রণায় আরও কাহিল। চাষীকে ডাকে মদ খেয়ে যন্ত্রণা সারাতে। চাষী আর কী করে! সেদিনও মই আর লাঙল বেচে মদ খাওয়া হল। একমাসের মধ্যেই চাষী সব কিছু উড়িয়ে দিল। এমনকি বসতবাড়ীটাও প্রতিবেশীর কাছে বাঁধা রেখে সেই টাকা দিয়ে মদ খাওয়া হল। কিন্তু তবু অভাব ছাড়ে না। পেড়াপীড়ি করে, চলো যাই, চলো যাই শুড়ীখানায়।
     ‘না অভাব, যতোই বলো, আর কিছুই নেই যার বদলে মদ খাওয়া চলতে পারে।”
   কিছু নেই মানে? তোমার বৌয়ের দুটো সারাফান* (* সারাফান – হাতকাটা লম্ববা ঢোলা মেয়েদের পোষাক।) রয়েছে না ? একটা ওর থাক। অন্যটা নিয়ে চলো যাই, মদ খেয়ে আসি।”
   চাষী সারাফানটা বিক্রি করে মদ খেল, তারপর ভাবল: "এবার একেবারে পরিস্কার, চাল নেই, চুলো নেই। গায়ে দেবার জামা নেই, আমারও না বৌয়েরও না।’
   অভাব সকালে উঠে দেখে মালিকের কাছে চাইবার মতো আর কিছুই নেই। 
   ডাকল, ‘মালিক!’ 
   ‘কী অভাব, কী চাও?’
   ‘শোন বলি, তোমার প্রতিবেশরি কাছে গিয়ে গাড়ীটা আর বলদজোড়া চেয়ে আনো।’
   চাষী তাই প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে বলল: ‘তোমার গাড়ীটা আর বলদজোড়া আমায় দেবে? তাহলে আমি সারা সপ্তাহ তোমার হয়ে খাটব।’
     প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করল, ‘কেন ? কী দরকার বলো তো ?’
     'জঙ্গল থেকে কিছ জালানি কাঠ আনব।’ 
    ‘তা নিয়ে যাও, তবে বেশী বোঝা চাপিও না।’ 
     ‘না, না, কী যে বলো, অন্নদাতা!’ চাষী বলদ আর গাড়ীটা নিয়ে এল। তারপর চাষী আর অভাব তাতে চড়ে চলে গেল খোলা মাঠে।
       অভাব জিজ্ঞেস করল, ‘মাঠের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাথরটা কোথায় জানো?’ 
      ‘তা আর জানব না কেন!’ 
       ‘তাহলে সিধে ওটার কাছে চলো।’ 
      পাথরটার কাছে পৌছে চাষী গাড়ী থামাল। গাড়ী থেকে নেমে অভাব চাষীকে পাথরটা তুলতে বলল। চাষী হাঁপায়, অভাব কাঁধ দেয়। পাথরটা তুলেই দেখে একটা গর্ত, সোনায় ভর্তি ।
       ‘হাঁ করে দেখছো কি, চটপট গাড়ীতে তোলো।’ 
       চাষী লেগে গেল কাজে। সোনা দিয়ে গাড়ীটাকে বোঝাই করে ফেলল। একটি মোহরও আর গর্তে পড়ে রইল না। গর্তটা খালি দেখে চাষী অভাবকে ডেকে বলল :
       ‘দ্যাখো তো অভাব, মোহর কিছু পড়ে রইল কি না ?’
       অভাব ঝুকে দেখে বলল: ‘কোথায়? আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না!’ 
       ‘ঐ ষে কোণে, চকচক করছে!’ 
       ‘না তো, দেখতে পাচ্ছি না।’ 
      ‘গর্তের ভিতরে নামো, তাহলে ঠিক দেখতে পাবে।’ অভাব তো গর্তে নামল। আর যেই না নেমেছে, অমনি চাষী পাথরটা দিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিল।
       বলল, “এই বরং ভাল, সঙ্গে নিয়ে গেলে সব টাকা তুমি আজ না হোক কাল মদ খেয়ে উড়িয়ে দিতে, হতভাগা অভাব!’
       তারপর চাষী বাড়ী ফিরল। মাটির নীচের গুদামঘরে সব টাকা জমা করে, প্রতিবেশীর বলদ গাড়ী ফিরিয়ে দিয়ে চাষী ভাবতে লাগল কী করে একটু গুছিয়ে বসা যায়। কিছু কাঠ কিনে একটা সুন্দর বাড়ী বানাল সে, তারপর দাদার চেয়ে দ্বিগুণ সুখেস্বচ্ছন্দে বাস করতে লাগল।
       একদিন যায়, দুদিন যায়, চাষী একদিন শহরে গিয়ে ধনী দাদা বৌদিকে নিজের জন্মদিনে নেমস্তন্ন করে এল।
       দাদা বলল, বলছো কী তুমি? নিজেরই তোমার খাবার কিছু নেই, জন্মদিন পালন করার শখ?’
       ‘আগে সত্যিই কিছু ছিল না দাদা, কিন্তু এখন আছে। ভগবানের কৃপায় তোমার চেয়ে কিছু কম নয়। গিয়ে নয় দেখে এসো !’
       ‘বেশ, যাব!’ 
       পরদিন সকালে ধনী ভাই আর তার বৌ ভাইয়ের বাড়ী জন্মদিনের নেমন্তন্নয় গেল। কপদকহীন ভাইয়ের বিরাট সুন্দর বাড়ী দেখে তো ওরা অবাক। শহরের বড় বড় সওদাগরেরও অমন বাড়ী নেই। চাষী ভাইকে বৌদিকে আদর যত্ন করে চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খাওয়াল ।
       খাওয়া দাওয়ার পর ধনী দাদা ভাইকে জিজ্ঞেস করল: বলো তো শুনি, এত ধনদৌলত পেলে কী করে?
       গরীব চাষী সব কথা খুলে বলল। কেমন করে হতভাগা অভাব জুটেছিল তার সঙ্গে, কেমন করে অভাবের পীড়নে সবকিছু বেচে শুড়ীখানায় ছুটতে হত। যখন কেবল প্রাণটুকু শুধু সমবল, তখন কেমন করে অভাব মাঠের মধ্যে লুকনো ধনদৌলতের সন্ধান দেয়, কী করে অভাবের হাত থেকে রক্ষা পেল।
       ধনী দাদা এদিকে হিংসেয় বাঁচে না। মনে মনে ভাবল, ‘যাই গিয়ে খোলা মাঠে পাথরটা তুলে অভাবকে বার করে দিই, ভাইটাকে আবার সে সর্বস্বান্ত করে দিক, জীবনেও যেন আর আমার সঙ্গে দৌলতের বড়াই করতে না আসে।” তাই সে বৌকে বাড়ী পাঠিয়ে দিয়ে নিজে চলল মাঠের দিকে। গর্তটার কাছে এসে, মুখ থেকে পাথরটা একটানে পাশে সরিয়ে বলল:
       “যাও অভাব আমার ভাইয়ের কাছে, ভাইটিকে একেবারে সর্বস্বান্ত করে দিও!”
       অভাব বলল: “উহু, আমি বরং তোমার কাছেই থাকব। ওর কাছে যাব না। তোমার দয়ামায়া আছে, আমায় ছেড়ে দিলে। আর ঐ হতভাগা আমায় কিনা আটকে রেখেছিল!”
       কিছুদিনের মধ্যেই হিংসুকে দাদা সর্বস্বান্ত হল। বড়লোকি রইল না, হয়ে গেল কর্পদকহীন কাঙাল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য