তিমুর গল্প - কাইয়ুম চৌধুরী

     তিমু হাঁফিয়ে উঠল শেষ পর্যন্ত। 
     কি যে ছাই বৃষ্টি নেমেছে। পড়ছে তো পড়ছেই। কালো ঘোড়ার মত লাফাতে লাফাতে মেঘগুলো ছুটে যাচ্ছে। মেঘের যেন শেষ নেই। মনে হচ্ছে একপাল বুনো ঘোড়া চারদিক আঁধার করে বনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে।
     তিমু একটা ছবি দেখেছিল। বুনো ঘোড়ার ওপর। নানান রঙের ঘোড়া। কালো, মিশকালো, ছাই, গাঢ় ছাই, সাদা, ফিকে সাদা সব রং এর ঘোড়া নাচতে নাচতে যাচ্ছে। ঘাড় বেঁকিয়ে, সোজা হয়ে, কেশর দুলিয়ে, বাতাসে সিল্কের রুমালের মত পতাকা উড়িয়ে মিষ্টি সুরের মতো ভেসে যাচ্ছে। আজকে মেঘের ঘনঘটা দেখে তিমুর আবার ছবিটার কথা মনে হলো। ঠিক সে রকম। অবাক হয়ে ছবি দেখেছিল। দেখেছিল কি করে বুনো ঘোড়াকে পোষ মানাতে হয়। তিন চারটে পোষা ঘোড়াকে বুনোদের দলে ভিড়িয়ে দিয়ে বুনোদেরকে দলে টানার চেষ্টা।
     অবাক হয়ে দেখেছিল তিমু। মোটেও বিরক্ত হয়নি। 
     আজকের বুনো মেঘগুলোকে তো বশ মানাবার উপায় নেই। কোথেকে যে এত মেঘ উড়ে আসছে। কি চেপে বৃষ্টি।
     কলোনীর দালানগুলো সাদাটে হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে ঘসা কাগজের চশমা চোখে এঁটে দেখছি। মাঝে মাঝে বাতাস যেন কাগজটাকে ঢেউ খেলিয়ে যাচ্ছে। ,
     শিমু আপার কাছে মেলা ঘসা কাগজ আছে। শিমু আপা ঘসা কাগজ দিয়ে কাপড়ে নকশা তোলে। একটু কাগজ চেয়েছিল বলে একদিন শিমু আপার কি রাগ। ঘর থেকে প্রায় বার করে দিয়েছিল।
     তিমু বাবাকে নালিশ করেছিল।
     খববের কাগজ থেকে মুখ তুলে বাবা বলেছিলেন, বকে দেব আপাকে। তুমি কিচ্ছু নিওনা আপার কাছ থেকে। আমি এনে দেব।
     শিমু আপার দেয়া চকলেট সে নেয়নি।
     বাদামওয়ালা চকলেট। যা তিমু খুব পছন্দ করে।
     কেন নিবিনা? শিমু আপা অবাক হয়ে যায়।
     কেন ? আমিতো ছবির বই-এর ঘোড়াটা বাংলা খাতার মলাটে তুলতে চেয়েছিলাম।
     না খেলি। বয়ে গেল। শিমু আপা চকলেট চিবুতে চিবুতে চলে যায়।
     অবাক হয়ে গেল তিমু। এতক্ষণ খেয়াল করেনি। বৃষ্টিটা বাইরে কমে এসেছে। কলোনীর একটা জানালাও খোলা নেই। এরকমটি তিমু কোনদিন দেখেনি। অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে বিরাট বিরাট দৈত্যগুলো চোখ বুজে ঘুমুচ্ছে। হাত, পা ছড়িয়ে। দালানগুলো অবশ্য হাত, পা নেই। তবুও তিমু যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
     জানালা থেকে একটু সরে বসলো তিমু। বসেই অবাক হলো। হঠাৎ সে জানাল থেকে সরে এলো কেন? হেসে ফেললো তিমু।
     দৈত্যগুলোর যদি ঘুম ভেঙ্গে যায় মানুষ দেখে। রাস্তাঘাটে জনপ্রাণী নেই। ঘুমপুরীতে জেগে আছে একমাত্র সেইই। যেন জিয়নকাঠি তাকে খুঁজে বার করতে হবে। তারপরে রাজকন্যে।
     না, ভুল হলো। প্রথম ঘুমস্ত রাজকন্যে। তারপর জিয়নকাঠি। আবার হাসলো তিমু। রাজকন্যে কেমন দেখতে? ভাবতে পারেনা তিমু। যতবারই চেষ্টা করে রাজকন্যে সোনার পালঙ্কে গভীর ঘুমে অচেতন ততোবারই তিমু দেখে শিমু আপা ঘুমিয়ে।
     ছবিতে দেখা রাজকন্যের চেহারাটা মনে নেই। সেটাও নাকি আঁকা ছিল, বাবা বলেছিলেন। আঁকা ছবি মানুষের মতো হাঁটে, কথা কয়। তিমুর খুব ভালো লাগছিল। যেমনটি বই পড়ে মনে হয় ঠিক তেমনটি।
     ছবিটি যে বানিয়েছিল বাবা তার নামও বলেছিলেন। ওয়ান্ট ডিজনী। সে যেখানে ছবি বানায় সে জায়গাটার নাম ডিজনীল্যাণ্ড। হ্যাঁ, তিমুর এখনো মনে আছে। শিমু আপা বোধহয় ভুলে গেছে। তিমু ভোলেনি।
     আঁকা লোকগুলোকে কেন জানি খুব আদর করতে ইচ্ছে করছিলো তিমুর। এরা এতো ভালো, এতো সুন্দর। এরা সত্যি হয়না কেন?
     তিমু ভেবে পায়না। মানুষের আঁকা মানুষ যদি এতো ভালো এতো সুন্দর হতে পারে, সতিকারেরটা হয়না কেন?
    কলোনীর বিদঘুটে দালানগুলো ছাই আর দেখতে ইচ্ছে করে না। অথচ দেখ মানুষের আঁকা শহর কত্তো সুন্দর। নিজের শহর মানুষ ওভাবে বানাতে পারেনা।
     বাবাকে একথা তিমু বলেছিল। 
     বাবা বলেছিলেন, ও ছবি যারা এঁকেছে তাদের দেশটা আঁকা ছবির চাইতেও সুন্দর। 
     আমাদেরটা নয় কেন বাবা? 
     আমাদের দেশ সুন্দর নয়? বাবা হেসে ফেলেছিলেন। পরে গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, আর একটু বড়ো হও তখন বুঝবে।
     তিমু ভাবে। হাতে এঁকে ওরা মিথ্যের দেশ বানালো। আহা! সেই মিথ্যেগুলোও যদি আমাদের এখানে সত্যি হতো। কি মজাই না হত !
     আচ্ছা কান্ড।
     সেতো জানালা খুলে বৃষ্টি দেখছে, মেঘ দেখছে। কলোনীর জানালাগুলো বন্ধ কেন এরকম? ওরা মেঘ দেখেনা? বৃষ্টি?
     এই তিমু খাবি? কাঠাল বিচি?
     শিমু আপা কোঁচড় থেকে বার করে দেয় একমুঠো। শিমু আপাটা বৃষ্টি হলেই কাঁঠাল বিচি খাবে, টুকটুক করে। ভাজা কাঁঠাল বিচি পট্‌পট্‌ করে ভাঙবে আর খাবে।
     বৃষ্টি হলে আরেকজন একটা জিনিস খেতে খু-উ-ব ভালোবাসে।
     শিমুকে বলে, আপা? আজ রাতে আমরা খিচুড়ী খাবো, তাই না?
     কাঁঠাল বিচি চিবুতে চিবুতে শিমু আপা জবাব দেয়। তুই টের পেলি কি করে?
    তিমু হেসে বলে। বা—রে। বৃষ্টি হলে আগে বাবাইতো, হাকডাক সুরু করে। কোন কথা নেই। বৃষ্টি হয়েছেতো। বাবার জন্যে খিচুড়ী।
     শিমু আপা হঠাৎ খিলখিলয়ে হেসে ওঠে। 
     তোর মনে নেই তিমু? একবার খুব জোর বৃষ্টি। বাবাতো হাঁকডাক। খিচুড়ী চাই। বাজার হলো। রান্না হলো। সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। মা শুদ্ধ। খেতে বসে দেখি খটখটে রোদ। ভ্যাপসা গরম। বাবার মন খারাপ।
     বাবা আরেকটা জিনিস খুব পছন্দ করেন, শিমু আপা বলে, রবীন্দ্রনাথের গান। বাবা বলেন, বর্ষা দিনের গান হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের গান।
     তিমু কাঁঠাল বিচি চিবোয়। তার লজ্জা করল বলতে—রবীন্দ্রনাথের গান সেও তো খুব পছন্দ করে। বিশেষ করে বাবার গলায় সেই গানটা—
‘সঘন গহন রাত্রি
     ঝরিছে শ্রাবণ ধারা—’ 
     আমিও গান শিখব, তিমু হঠাৎ বলে।
     তবেই সেরেছে ; একটা গাধাও এ তল্লাটে থাকবেনা আর।
     তুমি যে থাকবেনা এ আমি হলপ করে বলতে পারি। তিমু গম্ভীর গলায় জবাব দেয়।
     তবে রে। পাজী। শিমু আপা কান টেনে ধরে। কথাতো বেশ শিখেছো—বাবাতো আমাদের দুজনকেই গান শেখাবেন বলেছিলেন।
     তিমু হঠাৎ বলে,—আচ্ছা বাবাটা এখনো আসছেনা কেন? কটা বাজেরে আপা? অফিস ছুটি হয়নি?
     বাইরেটা আরো আঁধার হয়ে এসেছে।
     অন্যদিন কিন্তু এসময় সুন্দর বিকেল। রাস্তায়, মাঠে লোকজন, চলাফেরা। কলোনীর ছেলেদের হুটােপুটি। তিমুও যায় খেলতে। চার দালানের মাঝের মাঠটায়। ওরা পাঁচ-ছ বন্ধু মিলে বল খেলে। হ্যাঁ, ফুটবল। বলটা দীপুর।
     বাবাকে একবার তিমু বলেছিল বল কিনে দিতে। বল কিনতে গিয়ে তিমু শেষ পর্যন্ত কেনেনি। তার বদলে কিনেছে সুন্দর ছবির বই। প্রায়ই সে পাতা উল্টে উল্টে ছবি দেখে। একই ছবি বার বার। অনেকবার। এখন ছবিগুলো প্রায় মুখস্ত।
     একটা জিনিস তিমু ভালো করেই বুঝেছে—একবারে সবকিছু ভালো করে দেখা যায়না। নজরেই আসেনা অনেক কিছু। বার বার দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হয় ছবির এ জিনিসগুলো আগে দেখিনি। এক এক সময় হঠাৎ আশ্চর্য রকম নতুন হয়ে দেখা দেয় ছবিটি। তিমু হঠাৎ লক্ষ্য করে বৃষ্টি দিনে জানালার পাশে বসে ঘন্টার পর ঘন্টু মেঘ দেখার মতো আনন্দ সে বই দেখেও পায় ।
     ছবির সে বইটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরা ছিল। একটা ছবির কথা এখনো তার মনে আছে। ছবিটা শ্যাম দেশের। পাতলা কুয়াশার মতো বৃষ্টির মাঝে দুটো ঘোড়া মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ছাই ছাই সবুজ ছবিটা, কেন যে তার ভালো লেগেছিল তিমু জানে না |
     বৃষ্টি অনেক কমেছে এখন। সামনের পীচের রাস্তা সন্ধ্যার মৃদু আলোয় অদ্ভুত চকচকে দেখাচ্ছে। রাস্তার পাশে সবুজ মাঠ এখন থৈ থৈ। কলোনীর দালানগুলো পানিতেই যেন ভাসছে।
     তিমু দেখে সেই পানিতে ছপ ছপ শব্দ তুলে একটা ঘোড়া নিচু মাথা করে আস্তে আস্তে তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়াল।
    সারা গা বেয়ে পানি ঝরছে। টপ টপ করে। এই অল্প আলোতেও তিমু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে একটা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ঘোড়াটাকে কাঁপিয়ে যাচ্ছে।
     ঘোড়াটা ঢুলছে চার পা এক করে। মনে হচ্ছে এখুনি বুঝি পা ছড়িয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। কষ্ট হল তিমুর। হঠাৎ ঘোড়াটা এখানে এলো কেন? তিমু ঘোড়া দেখে আনন্দ পায়। সে ঘোড়াতো টগবগানো। কেশর ফুলানো। যার চামড়া মখমলের মতো মিহি।
     এতো নিজের শরীরই টানতে পারে না। তাই বোধ হয় এখন এর কোন মালিক নেই। কে এখন শুধু শুধু বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে?
     মালিক নেই এরকম ঘোড়ার ছবি তিমু দেখেছিল পত্রিকায়। আঁকা ছবি। সেটা কেটে তার ছবির এ্যলবামে রেখেছে। জোছনা রাতে দুটো ঘোড়া আপন মনে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। বাবাকে সে ছবিটা দেখিয়েছিল। বাবা হেসে বলেছিলেন, তোর ভালো লাগে এ সব ছবি?
     যিনি এঁকেছিলেন বাবা তার নামও বলেছিলেন। মনে নেই এখন। আমাদের দেশের কার যেন আঁকা। বাবা সেই সঙ্গে আরেকটা ছবি দেখিয়েছিলেন। ছবিটা ছাপা ছিল ডাকটিকেটের ওপর। কালো কালিতে আঁকা। জাপানের একজন নামকরা ছবি আঁকিয়ের। ডাকটিকেটটা বাবা তাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে আরো রঙীন রঙীন ছোট্ট ছোট্ট টিকেট। সব জমা করে রেখেছে তিমু।
     তিমু ভাবে বড় হলে আরো ছবি দেখবে। ছবির বই কিনবে। ঘোড়ার ছবি। নানান দেশের। একটা খালি ঠেলাগাড়ি আস্তে আস্তে বাড়ির সামনে আসে। তিমুর মনে হল ভিজে ক্লান্ত ঠেলা গাড়িটার কোথাও যাবার যেন ইচ্ছে নেই। শব্দ শুনে ঘোড়াটা চকিতে মুখ তোলে। এগুতে থাকে একপা একপা করে। তারপর মিশে যায় দূর দালানের কাল অন্ধকারে।
     তিমুর হঠাৎ মনে হলো ভিজে জবুথবু ঠেলাওয়ালাটার সঙ্গে ওই বুড়ো ঘোড়াটার কো তফাৎ নেই।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য