জেগে-ওঠা ভাগ্য - আদিবাসী লোককথা

      এক মায়ের পেটের দুই ভাই ছিল। হলে কি হবে, বড় ভাই ভীষণ হিংসুটে আর দুষ্ট্র স্বভাবের। ছোট ভাইকে দুচোখে দেখতে পারত না। সংসারের যত কঠিন আর নোংরা কাজ ছোট ভাইকে দিয়েই করাত। ছোট ভাই শক্ত পাথুরে জমি চাষ করত, গোরুমোষদের মাঠে নিয়ে যেত। সারাদিন তার এইভাবে খাটুনিতে কাটত। এত খাটুনি। কিন্তু খেতে পেত চারটে মাত্র চাপাটি। এই খেয়েই তাকে সারাদিন কাটাতে হত।
      একদিন ছোট ভাই জমিতে বীজ ছড়াচ্ছে। বেশ কয়েকদিন ধরেই জমিতে লাঙল দিয়ে জমিকে তৈরি করে নিয়েছে। বীজ ছড়াচ্ছে। কিন্তু বীজ কম পড়ে গেল। ফিরে এল বাড়িতে। আরও বীজ নিয়ে যেতে হবে। বাড়িতে ভাই নেই, বড় ভাইয়ের বউও নেই। কোথায় তারা বাইরে গিয়েছে। সে বীজ খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে সে রান্নাঘরে গেল। একটা হাড়ির মুখ খুলতেই দেখল, কি সুন্দর ভাত রান্না করা রয়েছে। কতদিন সে এমন ধপধপে সাদা চালের ভাত খায়নি। ঢেকে রাখল হাড়ি, অন্য হাড়ি থেকে বীজ নিয়ে জমিতে গেল। মনে বড় ফুর্তি। আঃ কতদিন পরে ভাত খাবে।
      সারাদিনের কাজের পরে ফিরে এল ঘরে। গোয়ালে রাখল গোরু-মোষ। খেতে দিল তাদের। খেতে বসল সে। সেই অন্য দিনের মতো শুকনো চাপাটি আর অল্প ডাল। সে কি? সে যে ভাত দেখে গেল হাঁড়িতে? কোনদিন রাগে না সে। আজ রেগে গেল। বড় ভাইয়ের এ কি ব্যবহার? বড় ভাইয়ের বউয়ের এ কি নিষ্ঠুর ব্যবহার? সে রেগে গিয়ে প্রতিবাদ করল। কেন তাকে ভাত দেওয়া হয়ন ? অথচ আজ তো বাড়িতে ভাত রান্না হয়েছে?
      বড় ভাই বলল, “তোকে চাপাটি খেতে দেওয়া হয়েছে? রোজ তাই দেওয়া হয়? কেন জানিস না? তোর ভাগ্য সাত সমুদ্রের ওপারে যে ঘুমিয়ে আছে! ভালো জিনিস জুটবে কি করে? ভাগ্য যে ঘুমিয়ে রয়েছে। বড় ভাই হাসছে, ঠাট্টা করছে। সে নিষ্ঠুর। ছোট ভাই অতশত বোঝে না। সে ভাবল, তাই তো, ভাগ্য যদি সাত সমুদ্রের ওপারে ঘুমিয়ে থাকে, তবে ভালো জিনিস জুটবে কেমন করে? সে বিশ্বাস করল বড় ভাইয়ের কথা, বড় সরল সে। বড় ভাইয়ের নিষ্ঠুর ঠাট্টা সে বুঝতে পারল না। কিন্তু সে বিশ্বাস করেছে ভাগ্যের ঘুমিয়ে থাকার কথা।
      বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। ঘুমন্ত ভাগ্যকে জাগিয়ে তুলতে হবে। সাত সমুদ্রের ওপারে যেতে হবে। ছোট ভাই চলেছে গভীর বনের পথে। এই পথেই নাকি সেখানে যেতে হবে। আরও দূরে অনেক দূরে।
      যেতে যেতে হঠাৎ সে দেখতে পেল, একটা মস্ত সাপ গাছে ওঠার চেষ্টা করছে। ওপরে তাকিয়ে দেখল, গাছের ডালে একটা মস্ত পাখির বাসা আর তার মধ্যে বাচ্চা পাখিদের কিচির-মিচির শোনা যাচ্ছে। তক্ষুনি সে সাপটকে মেরে ফেলল। বেঁচে গেল পাখির বাচ্চারা ।
      সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সারাদিন হেঁটেছে। কোথায় আর যাবে? সে সেই গাছের নীচেই শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল।
     সেই গাছে ছিল শকুনের বাসা। বাবা-মা ফিরে আসতেই বাচ্চারা বলল। ওই লোকটা নিশ্চত মৃত্যুর হাত থেকে তাদের বঁচিয়েছে। নইলে সাপ ঠিক তাদের খেয়ে ফেলত। সন্ধেবেলা খাবার এনেছে বাবা-মা, বাচ্চারা তাই খাচ্ছে। নীচের দিকে তাকিয়ে বাবা-মার চোখে জল এল।
      সকাল হলেই শকুন-শকুনি বিরাট ডানা মেলে নেমে এল গাছের নীচে। লোকটিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাল। তার জন্যই তাদের বাচ্চারা বেঁচেছে। এখন সে কি চায়? প্রাণ দিয়েও তারা লোকটির উপকার করবে।
      ছোট ভাই তার সব কথা বলল। সে যেতে চায় সাত সমুদ্রের ওপারে, তার ভাগ্যকে জাগাতে। এ আর এমন কি কথা? পিঠে চাপিয়ে তাকে সাত সমুদ্রের ওপারে নিয়ে যাবে শকুন। সে তৈরি। ভাগ্যকে জাগানো হয়ে গেলে আবার তাকে পিঠে করে এখানে নিয়ে আসবে।
      পাশে এক মস্ত গাছ। সে তাদের কথা শুনতে পেয়েছে। সে বলল, তাহলে আমার জন্যও একটা উপায় দেখ। আমার ভাগ্য এমন কেন জেনে এস। আমি এত বিরাট গাছ, কিন্তু দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছি। ফিরে এসে জানিও কেন এমন হচ্ছে? বারবার অনুরোধ করল সেই গাছ।
      শকুন-শকুনি উড়ে চলল। তাদের মেলে-দেওয়া ডানার ওপরে বসে রয়েছে ছোট ভাই। শেষকালে সাত সমুদ্রের ওপারের দেশে পৌঁছল তারা তিনজন। ছোট ভাই তার ঘুমিয়ে-থাকা ভাগ্যকে জাগিয়ে তুলল। বলল, “আমি বড় হতভাগা। আমাকে যে সাহায্য করতে হবে। আর তো ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না ! প্রথমেই জেগে-ওঠা ভাগ্যকে সে জিজ্ঞেস করল, “ওই বিশাল গাছ কেন শুকিয়ে যাচ্ছে? সে বাঁচবে কেমন করে?
      তার ভাগ্য বলল, “ওই গাছের নীচে রয়েছে এক মস্ত সাপ। সে এক গুপ্তধন পাহারা দিচ্ছে। বহুকাল থেকে ওখানে পোতা রয়েছে। তুমি গিয়ে ওই সাপটকে মারবে। গাছ আবার সবুজ পাতায় ভরে যাবে। আর গাছের নীচে যত মণি-মাণিক্য সোনাদানা আছে সব তুমি নেবে।
      মেলে-দেওয়া ডানায় চেপে সাত সমুদ্রের ওপর দিয়ে ফিরে এল তারা। এসে নামল সেই বনে। সাপ মারা পড়ল। গুপ্তধন বেরিয়ে পড়ল, অনেক মণি-মাণিক্য সোনাদানা। শুকিয়ে ওঠা গাছ আবার সবুজ পাতায় ভরে গেল। জেগে-ওঠা ভাগ্য যা যা বলেছিল তাই হল। শকুন-শকুনির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছোট ভাই নিজের দেশে ফিরছে। বনের পথে দেখতে পেল এক বুনো ঘোড়াকে । বুনো ঘোড়াকে সে কৌশল করে ধরল। তাকে পোষ মানাল। দুরন্ত সুন্দর ঘোড়া তার বশ মানল। তার সঙ্গী হল।
      ঘোড়ায় চাপল সে। বনের পথে রওনা দিল। যেতে যেতে সে এল এক রাজ্যে। দেখল, সেখানকার সব মানুষ কেমন মনমরা হয়ে রয়েছে। কারণ কি? জানতে পারল, গোষ্ঠীপতির একমাত্র মেয়ে খুব অসুস্থ। ধীরে ধীরে সে শুকিয়ে যাচ্ছে। কত চেষ্টা করা হয়েছে, কত চিকিৎসা করা হয়েছে, কত গাছ-গাছড়া খাওয়ানো হয়েছে—কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। গোষ্ঠীপতি সব দেবে যে তার মেয়েকে ভালো করে দিতে পারবে ।
      ছোট ভাই গেল গোষ্ঠীপতির বাড়িতে। নিজের গাঁয়ে থাকতে সে খুব সাধারণ অতি সামান্য একটা টোটকা ওষুধ জানত। অতশত না ভেবে মেয়েকে খেতে দিল সেই ওষুধ । আশ্চর্য! মেয়ে ভালো হয়ে উঠল। অল্পদিনেই সেরে উঠল।
      গোষ্ঠীপতির আর আনন্দ ধরে না। ছোট ভাইকে সে অনেক কিছু দেবে, এমন কি মেয়েকেও। সে চাইলে তার জামাইও হতে পারে। সে কি চায়? ছোট ভাই গোষ্ঠীপতির ধন-দৌলত পেল, সবচেয়ে মূল্যবান রত্নও পেল। গোষ্ঠীপতির মেয়ে তার বউ হল।
      শেষকালে ছোট ভাই নিজের পাহাড়ি গাঁয়ে পৌছল। গুপ্তধন, ধনদৌলত, বউ— সব নিয়ে। তার ভাগ্যকে সে জাগিয়ে তুলেছিল। এখন সুখে শাস্তিতে বাস করতে লাগল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য