হাভরোশেচকা - রাশিয়ার উপকথা

     পৃথিবীতে কেউ ভাল কেউ মন্দ। কেউ আবার এতই খারাপ, যে লজ্জাও নেই।
      ‍খুকুমণি হাভরোশেচকা পড়েছিল এই রকম সব লোকের পাল্লায়। হাভরোশেচকা ছিল অনাথ। ওরা তাকে নিয়ে গিয়ে পালে আর কেবল খাটিয়ে মারে। সুতো কাটে সে, কাপড় বোনে, ঘরের কাজ করে, সব কাজই তার ওপর।
     বাড়ীর গিন্নীর তিন মেয়ে। বড়োটির নাম এক-চোখো, মেজোর নাম দু-চোখো আর ছোটোটির নাম তিন-চোখো।
   তিন বোন সারাদিন কুটোটি নাড়ে না। কেবল ফটকের পাশে বসে বসে রাস্তার দিকে চেয়ে দেখে। খুকুমণি হাভরোশেচকা ওদের জন্যে জামা সেলাই করে, সুতো কাটে, কাপড় বোনে। কিন্তু তার বদলে দুটো মিষ্টি কথাও কখনো শুনতে পায় না।
     খুকুমণি হাভরোশেচকা চলে যেত মাঠে। তারপর নিজের দাগ-ফুটকি গরুটার গলা জড়িয়ে ধরে মনের দুঃখ জানাত:
     ‘গরু আমার মা-জননী, ওরা আমায় মারে, বকে, খেতে দেয় না, কাঁদাও বারণ। কালকের মধ্যে আমায় পাঁচ পুদ শণ পাকিয়ে সুতো কেটে, ধুয়ে, সাদা করে গুটিয়ে ঘরে তুলতে হবে।’
     গরুটি বলে: ‘বলি শোন সুন্দরী। আমার এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে আয়, দেখবি কাজ হয়ে গেছে।’
     গরু যা বলে, তাই হয়। হাভরোশেচকা এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে আসে। দেখে সব তৈরী: বোনা, ধোয়া, গোটানো – সব।
     হাভরোশেচকা তখন গাঁঠরি নিয়ে গিন্নীর কাছে যায়। গিন্নী তাকিয়ে দেখে ঘোঁৎ ঘোৎ করে সিন্দুকে তুলে রাখে, তারপর ফের আরও কাজ ঘাড়ে চাপায়।
     খুকুমণি হাভরোশেচকা আবার যায় গরুটির কাছে। গলা জড়িয়ে আদর করে, তারপর এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে আসে। তৈরী গাঠরিটা তুলে নিয়ে আবার গিন্নীর কাছে ফিরে যায়।
     বুড়ী একদিন এক-চোখোকে ডেকে বলল: ‘যা তো আমার সোনা, যা তো আমার মণি, দেখে আয় কে ওর কাজ করে দেয়। কে ওর কাপড় বোনে, সুতো কাটে, গুটিয়ে দেয়।’
     হাভরোশেচকার সঙ্গে বনে গেল এক-চোখো, মাঠে গেল, কিন্তু মার হুকুম ভুলে গিয়ে সে ঘাসের ওপর রোদ পোহাল, গা গড়াল। আর হাভরোশেচকা ফিসফিস করে বলে:
     ‘ঘুমো রে চোখ ! ঘুমো রে চোখ !’ 
     এক-চোখোর চোখ বুজে গেল। এক-চোখো ঘুমোয় আর ওদিকে গরম শণ থেকে সুতো কাটে, কাপড় বোনে, তারপর ধুয়ে গুটিয়ে তৈরী করে রাখে।
     গিন্নী কিছুই জানতে পারল না। তাই পরদিন মেজো মেয়েকে ডেকে বলল: ‘সোনা আমার, মণি আমার, গিয়ে দেখ তো কে ঐ অনাথটার কাজ করে দেয়।’
     দু-চোখো গেল হাভরোশেচকার সঙ্গে। কিন্তু মা’র হুকুম ভুলে গিয়ে সে ঘাসের ওপর রোদ পোহাল, গা গড়াল। আর হাভরোশেচকা ফিসফিস করে বলে:
     ‘ঘুমো রে চোখ এটা, ঘুমোরে চোখ ওটা!’ 
     দু-চোখোর চোখ বুজে গেল। দু-চোখো ঘুমোয় আর ওদিকে গরুর সাতো কাটা, কাপড় বোনা, ধোয়া, গুটানো শেষ ।
    বুড়ী রেগে আগুন। তিন দিনের দিন তার ছোট মেয়ে তিন-চোখোকে পাঠাল। আর হাভরোশেচকার ঘাড়ে চাপাল আরো বেশী কাজ।
     তিন-চোখো সারাদিন রোদে রোদে লাফালাফি করে খেলল। তারপর রো্দ্দুরে হয়রান হয়ে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল।
     হাভরোশেচকা গান ধরল: ‘ঘুমো রে চোখ এটা, ঘুমো রে চোখ ওটা!" 
     কিন্তু তিন নম্বর চোখটার কথা ওর এক্কেবারে মনে ছিল না। 
     তিন চোখোর  ‍দুচোখে ঘুম এসে গেল। কিন্তু তৃতীয় চোখটা জেগে জেগে সব দেখতে লাগল। দেখল মেয়েটি গরুর এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে এসেই তৈরী পোটলাটা তুলে নিল।
     তিন-চোখো বাড়ী এসে যা যা দেখেছে মাকে বলল। বুড়ী আহাদে আটখানা। পরদিনই স্বামীকে গিয়ে বলল: ‘দাগ-ফুটকি গরুটাকে বাপু জবাই করো!’ 
     বুড়ো তো কথা শুনে থ। একথা বলে, ওকথা বলে: বলিস কী বুড়ী, ভীমরতি হয়েছে নাকি? বকনা গরু, ভালো গরু!’ 
     ‘মেরে ফেলো, কোনো কথা শুনতে চাই না!’ 
     বুড়ো কী আর করে । ছুরি শান দিতে বসল। হাভরোশেচকা সব টের পেয়ে দৌড়ে মাঠে গিয়ে গরুর গলা জড়িয়ে বলে: ‘গরু আমার মা-জননী, তোমায় ওরা কেটে ফেলবে বলছে।’ 
     গরু বলল: ‘তোকে বলি সুন্দরী, আমার মাংস খাস না। আমার হাড়গুলো জড়ো করে রুমালে বেঁধে গোর দিস বাগানে। আমায় কোনো দিন ভুলিস না, রোজ জল দিস সেখানে৷’
     বুড়ো গরুটাকে কাটল। গরু যা বলেছিল হাভরোশেচকা সব তাই করল। না খেয়ে কাটাল সে, মাংস মুখে তুলল না। হাড়গুলো রুমোলে বেঁধে কবর দিল বাগানে। রোজ গিয়ে জল দিত।
     সে হাড় থেকে হল একটি আপেল গাছ। সে কী গাছ ! আপেল তার রসে রসাল, নুয়ে আসে রুপোর ডাল, সোনার পাতায় শনশন। পথের লোক থমকে দাঁড়ায়, কাছের লোক চেয়ে দেখে ।
     কত দিন যায়। একদিন এক-চোখো, দু-চোখো আর তিন-চোখো বাগানে বেড়াচ্ছে, এমন সময় ঘোড়ায় চেপে কে আসে, না এক বীর তরুণ – কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, অনেক তার ধনদৌলত। রসে ভরা আপেলগুলো দেখে সে রগড়
করে বলল :  ‍সুন্দরীরা শোন, আপেল পেড়ে দেবে যে, আমার কনে হবে সে!’ 
     তিন বোন অমনি আথালি-পাথালি ছুট, এ আগে যায় তা সে আগে ছোটে। আপেলগুলো ছিল নিচে হাতের নাগালে, হঠাৎ সেগুলো উঠে গেল উঁচুতে মাথার ওপরে।
     তিন বোন তখন ঝাঁকিয়ে পাড়তে চায় — ঝুরঝুরিয়ে চোখে এসে পড়ে শধেন পাতা। হাত বাড়িয়ে ছিড়তে চায় – ডালপালায় আটকে যায় বেণী। যতই ঝাঁপায় যতই লাফায় – আপেল আর পাড়তে পারে না, ছড়ে যায় শুধু হাতপা।
     তখন এগিয়ে গেল খুকুমণি হাভরোশেচকা। নুয়ে এল ডালপালা, নেমে এল আপেলগুলো। বীর তরুণটিকে আপেল এনে দিল হাভরোশেচকা। তরুণ তাকে বিয়ে করল। সেদিন থেকে সুখেস্বচ্ছন্দে ঘর করতে লাগল হাভরোশেচকা।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য