দুঃখ এল মানুষের জীবনে - আদিবাসী লোককথা

     সবার আগে এল মানুষ, তারপরে দেবতাদের জন্ম হল। দেবতাদের আগেই মানুষের সৃষ্টি হল। কিন্তু সেই পুরনো কালে মানুষ দেবতাদের কোন পুজো দিত না, তাদের নামে প্রসাদ দিত না, কোন জন্তুকে বলি দিত না। তারা সারাদিন জমিতে চাষ করত, বনে কাঠ কাটত, খাওয়া-দাওয়া করত,– আর নাচে-গানে সময় কাটিয়ে দিত। এসব করে মানুষের আর কোন সময় হাতে থাকত না, তাই সে দেবতাদেরও পুজো দিত না। ওসব কোন খেয়ালও তার থাকত না। সেই পুরনো কালে দেবতারা দূরে গভীরে বনের মধ্যে বাস করত। তারা মানুষের থেকে অনেক দূরে একা একাই থাকত।

বনের ফল আর ফুল খেয়ে কোনরকমে বেঁচে ছিল। আর খেত নদীর জল আর হাওয়া। মানুষ কোন ধৰ্ম্মকৰ্ম্ম করত না, তার জন্য কিছু ব্যয়ও হত না। বেশ সুখে দিন কাটাত মানুষ। এমনি করে মানুষ শেষকালে খুব বড়লোক হয়ে উঠল। কোন কিছুরই অভাব নেই তার।
     মহাপ্রভু সব দেখলেন। মানুষের সম্পদ দিনে দিনেই বেড়ে যাচ্ছে। তিনি সব বুঝলেন। শেষকালে তিনি মানুষকে ভয় পেতে শুরু করলেন। ভাবলেন,— মানুষ যদি এভাবে সম্পদের অধিকারী হতেই থাকে, তাহলে তো সে কোনদিন কাউকে আর ভয়ই পাবে না। নিজেই নিজেকে নিয়ে থাকবে। তাহলে? এমন কিছু করতে হবে যাতে তার ধনদৌলত ছিনিয়ে নেওয়া যায়। ধন-দৌলত গেলেই সে কাবু হয়ে পড়বে। 
     যেমন ভাবা তেমনি কাজ। মহাপ্ৰভু সব দেবতাকে নিজের কাছে ডাকলেন। তাদের বেশ কিছুদিন তার কাছেই থাকতে বললেন। দেবতারা খুব আরামে রইল। দুধ আর চিনি খেতে লাগল। বড় সুস্বাদু, পুষ্টিকর। তারা মহা আরামে দিন কাটাতে লাগল।
     এমনি করে বেশ কিছুকাল কেটে গেল। শেষকালে মহাপ্রভু একদিন দেবতাদের ডেকে বললেন, ‘এবার তোমাদের যেতে হবে। অনেকদিন রইলে আমার কাছে। আর, মানুষের মধ্যে গিয়ে তোমাদের থাকতে হবে। না কোন ভয় নেই। মানুষের মধ্যে আমার এক বন্ধু আছে। তার নাম সেতি সিসা। সেই শুধু দেবতাদের মেনে চলে। তোমরা সোজা তার কাছে চলে যাও। সে সব ব্যবস্থা করবে। তোমাদের যা যা দরকার সে সবকিছুই দেবে। তার কথামতো চলবে। যাও, নিৰ্ভয়ে যাও । কোন ভয় নেই।
     দেবতারা চলল সেতি সিসার কাছে। মহাপ্রভু বলেছেন, তবু দেবতাদের মানুষকে বড় ভয়। শেষকালে তারা সেতি সিসার কাছে পৌছল। সে তাদের জন্য সব ব্যবস্থা করল। কাকে কোথায় থাকতে হবে সব বলে দিল। দেবতাদের ভয় একটু কমল।
     আগে দেবতাদের কোন নামধাম ছিল না । সেতি সিসা তাদের আলাদা আলাদা নাম দিল।
    সে একজন দেবতার নাম দিল দুম্বার। তাকে থাকতে দিল পবিত্র কুঞ্জবনে, সুন্দর তরুবীথিতে। দুম্বার হল পবিত্র কুঞ্জের দেবতা। গাঁয়ের পাশেই এই পবিত্র কুঞ্জবন।
     আর একজনকে সে বাঘের দেবতা করল। তার নাম দিল ওরসেলে। পাহাড়ি বনে তাকে থাকতে বলল। গাঁয়ের পাশেই পাহাড়ি বন।
     আর একজন দেবতার নাম রাখল রুনকতা। তাকে করল পাহাড়ি নদীর দেবতা। সেখানে তাকে থাকতে বলল। গাঁয়ের কাছেই পাহাড়ি নদী। এখানে মানুষজন স্নান করতে আসে, খাবার জল নিতে আসে।
     গাঁয়ের পাশেই উঁচু পাহাড়। সেখানে থাকতে দিল একজন দেবতাকে। তার নাম হল সাওরুলি।
     গাঁয়ের কাছেই ঘন বনভূমি। সেখানে রইল আর এক দেবতা। এ দেবতার নাম হল বুগাবোর।
     ঝরনার দেবতা হল সিংরাজ। সেতি সিসা নিজের বাড়িতে থাকতে দিল দুজন দেবতাকে। তারা হল ঘরের দেবতা। একজনের নাম দাগোই, অন্যজনের নাম গুরাঙপোই। একটা পাথরের আসন করে থানের দেবতা করল একজনকে। তার নাম সিনদিবোর। গায়ের মধ্যে, ঘরের মধ্যে, গাঁয়ের আশেপাশে, বনে-নদীতে-ঝরনায়-পাহাড়ে সব জায়গায় রইল এক এক দেবতা। সেতি সিসার জন্য দেবতারা এখন ভালোভাবে রয়েছে, তাদের ভয় কমেছে।
     আগে মানুষ দেবতাদের নিয়ে মোটেই ভাবনা-চিন্তা করত না। তারা থাকত গাঁয়ে, চাষ করত জমিতে, নাচে-গানে সময় কাটত। দেবতারা থাকত দূর বনে। কিন্তু এখন গাঁয়ের মধ্যে, চারপাশে শুধুই দেবতা। বনে-পাহাড়ে-নদীতে,- কোথায় নেই দেবতা?
     এত দেবতা চারিদিকে। তাদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য তো অনেক খাদ্য চাই। দেবতারা নিজে কোন কাজকর্ম করে না। তাদের খাবার জোগাড় করে দিতে হয়।
     তাই সেতি সিসা আদেশ করল, দেবতাদের ভরণ-পোষণের জন্য গ্রামবাসীদের সবাইকে কর দিতে হবে। তারা যা দেবে তাতেই দেবতাদের ভরণ-পোষণ চালাতে হবে। প্রতিটি গ্রামবাসীকেই কর দিতে হবে।
     এখন হয়েছে কি, দেবতারা মহাপ্রভুর কাছে ভালো ভালো খাবার খেতে শিখে গিয়েছে। আগের মতো ফল-ফুল-হাওয়া-জল মুখে রোচে না। বনে থাকতে এগুলো খেতেই বাধ্য হত। কিন্তু এখন চাই ভালো খাবার। আর কাজ না করেই যখন পাওয়া যাচ্ছে, তখন সুখি দেবতারা সেসব ছাড়বে কেন? তাদের লোভও অনেক বেড়ে গিয়েছে। মহাপ্ৰভু দেবতাদের কাছে রেখেছিলেন তো এই জন্যই। তারা জানুক ভালো খাবারের স্বাদ, তারা জানুক বনের ফলমূল ছাড়াও অন্য অনেক ভালো খাদ্য আছে, দেবতাদের লোভ বাড়ুক। বাড়তে বাড়তে সীমা ছাড়িয়ে যাক। তখন আরও দাও, আরও দাও । মহাপ্ৰভু যে সব বোঝেন।
     গ্রামবাসীরা যা দিত দেবতাদের তাতে কিছু হত না। আরও চাই, নতুন জিনিস চাই। চারিদিকে দেবতা, মানুষও ভয় পেয়ে যেতে লাগল। দেবতাদের মন পাওয়ার জন্য আরও জিনিস দিতে লাগল। দেবতারা সাদা চালের ভাত আর মাংস চাইল। মানুষও তাই দিতে শুরু করল। মানুষের মনে এক নতুন চিন্তা বাসা বাঁধল,— সে হল দেবতা, চারপাশের অনেক দেবতা ।
     এমনি করে মানুষ একদিন গরিব হয়ে গেল। দেবতার পুজো দিতে দিতে সে দরিদ্র হয়ে গেল। আগে পুজো ছিল না-মানুষ গরিব ছিল না। এখন পুজো এল, মানুষ গরিব হল। মানুষের জীবেন দুঃখ এল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য