গেছো বাঘের কবলে - পরেশ দত্ত

     এককালে আমাদের দেশে রাজা, মহারাজা, বাদশারা পরবর্তকিালে বৃটিশরা শিকার অভিযানে বেরুতেন। গভীর জঙ্গলে গা-ছমছম-করা নিস্তব্ধ পরিবেশে যমদূতের মতো ভয়ংকরের মুখোমুখি হতেন। শিকার করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেরাই শিকার হতেন। জঙ্গল থেকে আর ঘরে ফেরা হতো না। আবার সামান্যর জন্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেও আসতেন কেউ কেউ। হিমালয় অঞ্চলের জঙ্গলে তেমনই এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল বৃটিশ শিকারী ইভলিন স্মাইথিস ও তার স্ত্রী অলিভ স্মাইথিসের জীবনে।
     ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাস। তুষার-মুকটপরা হিমালয়ের কোলে উত্তর ভারতের এক গভীর জঙ্গলে এসে পৌছলেন স্মাইথিস দম্পতি। চারিদিকে বোল্ডারের ছড়াছড়ি। বন্য বনস্পতির গায়ে জড়াজড়ি করে উঠেছে ঘন লতা। হাওয়ায় দুলছে অর্কিড়ের বিচিত্র বহুবর্ণ ফুলের স্তবক এ জঙ্গলে প্রচুর সম্বর হরিণ আছে। মাংসাশী ডোরাকাটারা অতর্কিতে প্রায়ই ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ওপর। লক্ষ্য ব্যর্থ হয় কদাচিৎ৷
     বাঘ শিকারের জন্য মিঃ স্মাইথিস যে জায়গাটি বেছেছিলেন দুটো শীর্ণ পাহাড়ী নদী সেখানে এসে মিশেছে স্বচ্ছ নীলাভ জল উপলশয্যার ওপর দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে। স্মাইথিস খবর পেয়েছেন একটা বড় বাঘ ঘুরছে এই অঞ্চলে। এখানেই টোপ হিসেবে একটা মোষের ছানাকে বেঁধে রাখা হলো।
     শিকারীরা জানেন বাঘ তার মড়ি নিয়ে গভীর জঙ্গলে সেঁধিয়ে যায়। সারাদিন শুয়ে বসে আরাম করে শিকার উদরস্থ করে। বিশ্রামের সময় বাঘকে শিকার করা সহজ। হাঁকাওয়ের সময় তাড়া খেয়ে বাঘ যেদিক দিয়ে সরে পড়তে চায় সেদিক থেকে হাঁকাওরা তাকে অন্যদিকে অর্থাৎ শিকারীর মাচানের দিকে তাড়িয়ে আনে।
     স্মাইথিস দেখলেন, যে জায়গায় বাঘের লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি তার বাদিকে কিছুটা দূর দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ী নদী। নুড়িপাথর ভরা বেলাভূমি আর নদীখাত মিলিয়ে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। বাঘ ঐ খোলা জায়গা দিয়ে পালাবার চেষ্টা করবে না। সুতরাং ঐদিকে ষ্টপার না রাখলেও চলে। ডানদিকে অরণ্যময় পাহাড়ী ঢাল। তার নিচে ষ্টপারদের একটা লাইন দরকার। যাতে বাঘ পাহাড়ে বা জঙ্গলে গা-ঢাকা দিতে না পারে।
     পরদিন সকালে মিঃ স্মাইথিসের বাংলোয় খবর এলো বাঘ মোষের ছানাটাকে মেরে নিয়ে গেছে। মিঃ স্মাইথিস স্টপার, হাতি, রাইফেল নিয়ে তৈরি হলেন। এই শিকার অভিযানে তার সঙ্গিনী হবেন তার স্ত্রী অলিভ স্মাইথিস। তাই পাছের ওপর মাচনে ওঠার জন্য একটা দড়ির ব্যবস্থা করা হলো। মিসেস স্মাইথিস মাচানে বসে বাঘ শিকার দেখবেন। জরুরী অবস্থায় মোকাবিলার জন্যে তার হাতেও একটা রাইফেল থাকবে।
     মহিষটাকে বাঘ যেখানে নিয়ে রেখেছে তার থেকে সিকি মাইল দূরে সকলে হাতির পিঠ থেকে নামলেন। বাঘকে বিরক্ত না করে নিঃশব্দে সার দিয়ে পায়ে হেঁটে মাচানের দিকে এগিয়ে গেলেন। লোক পাঠিয়ে মাচন বাঁধার ব্যবস্থা আগেই করেছিলেন। বরাতক্রমে বাঘ মহিষটাকে তার কাছাকাছিই এনে রেখে নিজে আরও একটু গভীর গাঢাকা দিয়েছে।
     বন্ধুর পথে হেঁটে মাচানের কাছে যখন তারা পৌছলেন তখন সকলেই গরম বোধ করছেন। কিছুটা ক্লান্ত। প্রথম মাচানটা মিঃ স্মাইথিসের। পেছনে চল্লিশ পঞ্চাশ গজ দূরে তার স্ত্রীর সাপ। বাঘ জখম হয়ে পালাবার চেষ্টা করলে মিসেস চেষ্টা করবেন তাকে খতম করতে ।
     মিসেস স্মাইথিসের মাচান বাঁধা হয়েছিল যে গাছটায় তার গোড়ার বেড় চার থেকে পাঁচ ফুট। মাটি থেকে ফুট চৌদ্দ উঁচুতে গাছের কাণ্ড যেখানে দুফাঁক হয়েছে মাচানটা সেখানেই । গাছে হেলান দিয়ে মিসেস স্মাইথিস আরাম করে মাচানে বসলেন। পা দুটো ঝুলতে লাগলো মাচানের নিচে ।
     স্বামী-স্ত্রী দুজনে আরাম করে দুটি মাচানে বসার পর আরদালি স্টপারদের ঠিক জায়গায় দাঁড় করাতে গেল। ওঁরা হাঁকাও শুরু হবার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। মিঃ স্মাইথিস মাচানে বসে ঘাসের ও আগাছার ওপর দিয়ে হাতির চলার শব্দ পেলেন । ঠিক তখনি একজন স্টপার হাততালি দিল।
     আ-উ-ফ!...আ-উ-ফ! সঙ্গে সঙ্গে দুবার বাঘের গর্জন শোনা গেল। মাচানের ঠিক সামনে ঘন নারফুল ঘাস ২৫ ফুট গোলাকার জায়গা জুড়ে গজিয়ে উঠেছে। কয়েক মিনিট পর মিঃ স্মাইথিস্ ওই ঝোপের ভেতর দিয়ে বাঘের এগিয়ে আসার শব্দ পেলেন। তারপর আচমকা দেখতে পেলেন বাঘটাকে। বেশি নয়, মাত্র ২০/২৫ গজ দূরে। মিঃ স্মাইথিস রাইফেল চালালেন।
     গুড় ম... 
     রাইফেলের নলের মুখে আগুন ঝলসে উঠল। গুলির শব্দে জঙ্গল কেঁপে উঠলো। কিন্তু গুলি বাঘের গায়ে লাগলো না।
     কিন্তু ও কি! মিসেস অলিভ স্মাইথিস সডভয়ে দেখলেন গুলির শব্দে ভয় পেয়ে ছুটে না পালিয়ে বাঘ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এগিয়ে আসছে মারফুল ঘাসের ঘন ঝোপের দিকে। ফের গুলি চালালেন মিঃ স্মাইথিস গুলি এবারও বাঘের গায়ে লাগলো না। বাঘকে পুরোপুরি দেখতে পাওয়া সত্ত্বেও লক্ষ্য ভুল হলো। গুলির শব্দে বাঘ ঝোপের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। বাঘকে দেখা না গেলেও শিকারীর কাছাকাছি আড়ালে গরগর করতে লাগলো। ইতিমধ্যে হাতিরা ঘাসের ঝোপের কাছাকাছি এসে পড়াতে অবস্থাও আরও ঘোরালো হয়ে উঠলো।
     বাঘ পালালো না। উল্টে দারুণ রেগে বারবার রক্ত হিমকরা গর্জন করতে লাগলে। বাঘের ডাকে থরথর করে কেঁপে উঠলো সমস্ত জঙ্গল কিছুটা ঠাণ্ডা মেজাজের হাতিটাও বারবার চিৎকার করতে লাগলো। দুটো হাতিই তখন গাছপালা উপড়ে ফেলে বাঘটাকে খেদিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর আরও ভয়ংকর গর্জন করে বাঘ হাতি দুটোর দিকে তেড়ে গেল। ভয় পেয়ে ছোট হাতিটা পালাবার চেষ্টা করলো। তবে মাহুত কোনোক্রমে তাকে থামালো, কিন্তু অন্য হাতিটা ও তার দুঃসাহসী মাহুত বাঘের দিকে তেড়ে গেল। বাঘটা ঘুরে মিঃ স্থাইথিসের মাচানের দিকে ঝড়ের মতো ছুটে এলো। মিঃ স্মাইথিস ফের গুলি চালালেন কিন্তু এবারও তার নিশানা ভুল হলো।
     গুলির শব্দে বাঘটা এবার মিসেস স্মাইথিসের মাচানের দিকে বিদ্যুৎবেগে ছুটে গেল। মিসেস স্মাইথিসের বন্দুক চালালেন । গু-ডু -ম! বাঘটা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। বুলেট তার শিরদাঁড়া ভেদ করে ছুটে গেছে। মিঃ স্মাইথিস তার স্ত্রীকে আবার গুলি চালাতে বললেন । কিন্তু পরের গুলিট বাঘের গায়েই লাগলো না। ওদিকে দ্বিতীয় গুলি চালাবার সময় রাইফেলের গর্জনে বাঘের নজর গেছে মাচানে মিসেস স্মাইথিসের দিকে। জখমী বাঘ রাগে ঘুরে দাঁড়িয়ে ভয়ংকর গর্জন করে উঠলো। তারপর থাবা দিয়ে গাছের গুড়ি আঁকড়ে ধরে প্রকাণ্ড শরীর নিয়েও বেড়ালের মতো গাছের ওপর উঠতে লাগলো।
     হায় ভগবান! মিঃ শ্বাইথিস আঁতকে উঠে স্ত্রীকে চিৎকার করে বললেন, অলিভ সাবধান! বাঘটা তোমার গাছে উঠছে।
     মাচানে সবেগে স্ত্রীর দিকে পাশ ফেরার সময় তাড়াহুড়োয় মিঃ স্মাইথিসের শরীরের ধাক্কা লেগে সব কটা আলগা কার্তুজ মাচান থেকে নিচে পড়ে গেল।
     স্ত্রীর গায়ে গুলি লাগার ঝুঁকি নিয়েও মিঃ স্মাইথিস বাঘটাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লেন। বাঘ তখন গাছের মাঝামাছি অবধি উঠেছে ; গুলিটা বাঘের গা ঘেঁষে ছুটে গেল ! ফের রাইফেলে গুলি ভরতে গিয়ে মিঃ স্মাইথিস দেখলেন আর মাত্র একটা কার্তুজই তার হাতে আছে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তার স্ত্রী মাচানের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছেন। তার বন্দুকের নল বাঘের মুখের ভেতর। ব্যারেলেরও ওপর বাঘের দাঁত বসে গেছে। বাঘের থাবা ও থুতনি মাচানের একটা দিক আঁকড়ে ধরেছে।
     এই ভয়ংকর অবস্থায় মিসেস স্মাইথিস রাইফেলের ট্রিগার টিপলেন। কিন্তু রাইফেলের নল দিয়ে গুলি বেরুলো না ! চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিদারুণ ভয়ে শ্বাসরোধ হয়ে এলো অলিভের।
     প্রকাণ্ড বাঘের বেশির ভাগ শরীরের ভার তখন মাচানের ওপর। শুধু পেছনের থাবা ছাড়া বাঘ তখন মাচানের নিচে ঝুলছে। হাঁচড়ে পাঁচড়ে মাচানের ওপর ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে মাচান ভয়ানক তোলপাড় হচ্ছে। মিঃ স্মাইথিস আতঙ্কের সঙ্গে দেখলেন তার মিসেস টাল সামলাতে না পেরে বেসামাল হয়ে খোলা মাচানের পেছনের দিকে টলে পড়ে গেলেন।
     বাঘটা বুঝতে পারেনি মিসেস স্মাইথিস মাচানের নিচে পড়ে গেছেন। সে তখনো থাবা ও দাঁত দিয়ে আঁচড়ে কামড়ে মাচানে ওঠার চেষ্টা করতে লাগলো ; ধারালো দাঁতে চিবিয়ে চিবিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে লাগলো মাচানের কাঠ।
     মিঃ স্মাইথিসের রাইফেলে তখন একটা মাত্র কার্তুজ। বুলেট বাঘের গায়ে না লাগাতে পারলে বাঘের মুখ থেকে কেউ তার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারবে না। ভালভাবে লক্ষ্য স্থির করে রাইফেলের ট্রিগার টেনে দিলেন। এবার আর নিশানা ভুল হলো না । গুলি খাওয়া বাঘ মাচান থেকে পিছলে মাটিতে পড়ে গেল। বড় বড় ঘাসের ভেতর তাকে আর দেখা গেল না ।      মিঃ স্মাইথিস ঠিক বুঝতে পারলেন না বাঘ মরেছে কিনা। স্ত্রীর কথা ভেবে তিনি তখন ভয়ানক উদ্বিগ্ন ও অস্থির হয়ে পড়েছেন। মাচানের পেছন দিকে পড়ে গেছেন তিনি। আর বাঘ অদৃশ্য হয়ে গেছে মাচনের উল্টোদিকের ঝোপে। হাতে আর একটাও কার্তুজ নেই। সুতরাং বাঘের মুখ থেকে স্ত্রীকে বাঁচানোর আর কোনো উপায়ও নেই। আতঙ্কিত ও অসহায় অবস্থায় মিঃ স্মাইথিস অপেক্ষা করে রইলেন একটি আর্ত চিৎকার শোনার জন্য ।
     ওদিকে মিসেস স্মাইথিস যখন দেখলেন তিনি মাচানের পেছনে নিচের জঙ্গলের ভেতরে গড়িয়ে পড়ছেন, তখন তিনি সভয়ে ভাবলেন বুঝিবা সোজাসুজি বাঘের ঘাড়েই পড়বেন। তারপর যখন বুঝতে পারলেন তিনি মাটিতে আছড়ে পড়েছেন তখনি উঠে পড়ে পাগলের মতো ছুটতে লাগলেন বড় বড় ঘাসের ঝোপের ভেতর দিয়ে। প্রতি মুহূর্তেই ভয় এই বুঝি বাঘটা তার ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়লো। সেই প্রকাণ্ড হাঁ আর রক্তমাখা দাত নিয়ে বাঘটা বুঝি তাড়া করে আসছে তাকে।
     ছুটতে ছুটতে কখন যে মিসেস স্মাইথিস ঝোপজঙ্গলের বাইরে এসে পড়েছেন নিজেই বুঝতে পারেননি। মিঃ স্মাইথিস ঠিক তখনই নিজেকে সামলে নিয়ে চিৎকার করে ডাকতে যাচ্ছিলেন মাহুতদের যাতে তারার হাতিদুটো নিয়ে এগিয়ে আসে। সময় একেবারে আচমকা দুজনে মুখোমুখি; বিস্ময়ে দুজনেই হতবাক, কেউই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। চমক ভাঙবার পর মিঃ স্মাইথিস দেখলেন তার স্ত্রীর আঘাত খুব সামানা, কিন্তু আতঙ্কে তার মুখের চেহারা যেন একেবারে অন্যরকম হয়ে গেছে।
     ততক্ষণে হাতি নিয়ে একজন মাহুত এসে পড়েছে। জখম হওয়া বাঘের কথা না জেনেই সে এগিয়ে এসেছে। মিসেস স্মাইথিসকে সেই হাতির পিঠে চড়িয়ে তাড়াতাড়ি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হলো। চোদ্দ ফুট উচু মাচান থেকে নিচে পড়েও দেহের কয়েক জায়গায় সামান্য কেটে ছিড়ে যাওয়া ও কব্জি মচকে যাওয়া ছাড়া আর কোনো আঘাত লাগেনি তার।
     একটা গাছের ষাট ফুট ওপর থেকে সমস্ত ঘটনা দেখছিল একজন ব্যাকস্টপ । সে চিৎকার করে জানাল, গুলি খাওয়া বাঘ জঙ্গলের ভেতর পড়ে রয়েছে স্থির হয়ে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই মরেছে ওটা।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য