শেয়াল কেন চাষ করে না - আদিবাসী লোককথা

     সবুজ পাহাড়ের কোলে ছিল এক গ্রাম। আর সেই গাঁয়ের পাশে ছিল মস্ত এক সবুজ বন। গভীর বনের মধ্যেও ছোট ছোট পাহাড়। সেই ছোট্ট পাহাড়ে থাকত এক শেয়াল আর তার বউ। শেয়ালের অল্পদিন হল বিয়ে হয়েছে। তাদের ছেলেমেয়ে নেই। বেশ সুখে দিন কাটে।
     একদিন বুনো মুরগির হাড় চিবোতে চিবোতে শেয়াল-বউ বলল, “দেখ, আমরা তো বেশ সুখেই আছি। কষ্ট করে শিকার ধরতে হয়। কিন্তু অভাব তো আর নেই। বেশ চলে যাচ্ছে। কিন্তু এভাবে তো চিরকাল কাটবে না। আজ বাদে দুদিন পরে আমাদের ছেলেপুলে হবে। সংসার বাড়বে। তখন তো আর শুধু আমরা দুজনে থাকব না! সবাই তাই চায়। কিন্তু যতদিন ওরা বড় না হয়, ততদিন সংসার চলবে কি করে? ভেবেছ কিছু?”

     হাড় চিবোনো থামিয়ে দিয়ে শেয়াল বউয়ের দিকে চোখ ফেরাল। বলল, “একেবারে যে ভাবিনি তা নয়। জানি সংসার বাড়বে। কিন্তু ভেবে তো কুল-কিনারা কিছু পাই না। তুমি কিছু ভেবেছ? কি করতে বল? একটা কিছু বুদ্ধি দাও।
     শেয়াল-বউ একটু ভেবে বলল, “আমি ঘরের বউ, আমার কিই-বা বুদ্ধি। আমি কি বলব?
     ‘সে কি ? তা কি হয় ? তুমি ঠিক কিছু ভেবেছ। নইলে একথা মনে এল কেন?" শেয়াল হাসিমুখে বলল।
     শেয়াল-বউ লজ্জা-লজ্জা ভাব করে বলল, “হ্যাঁ, তা কিছু ভেবেছি বৈকি। নইলে আর কথাটা তুললাম কেন। তুমি এক কাজ করো। পাশেই তো মস্ত গাঁ। সেখানে তো মাহাতো থাকে। তার কত জমি, সে কত বড়লোক। আর তোমায় তো সে খুব ভালোবাসে। তুমি তার কাছে যাও । তার সঙ্গে দেখা কর। "
     শেয়ালের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, “এ কথা তো আগে ভাবিনি। খুব ভালো বুদ্ধি। গিয়ে কি বলব?”
    শেয়াল-বউ বলল, “মাহাতোর কাছে তুমি এক খণ্ড জমি চাইবে। জমিটা যেন ঢালু হয়। ঢালু জমিতে ফসল ভালো হয়। ফসল ফলবে। ফসল আসবে ঘরে। খাবার থাকবে মজুত। ছেলেমেয়েদের জন্য আর ভাবতে হবে না। তুমি কি বল?”
     যুক্তি শেয়ালের বেশ মনে ধরেছে। বউ যে এত বুদ্ধিমতী তা সে আগে জানত না। মনে মনে বউকে সে আরও ভালোবাসল। এমন বউ যার ঘরে তার দুঃখ থাকবে না। শেয়াল খুশি হল। পরের দিন ভোরবেলা শেয়াল চলল গাঁয়ের পথে। মাহাতোর সঙ্গে দেখা করতে হবে। সকাল সকাল না গেলে দেখা পাওয়া যাবে না। কাজের লোক। কোথায় হয়তো কাজে বেরুবে। শেয়াল চলেছে খুশি মনে, হালকা পায়ে। বুকে আশা মনে আনন্দ।
      গায়ের মাঝখানে মাহাতোর মস্ত বাড়ি। বাইরে একটা ঘরে মাহাতো সকালে বসে। লোকজনের সঙ্গে দেখা করে, কাজের কথা হয়। শেয়াল ঘরে ঢুকেই মাথা নুইয়ে প্রণাম করল। বলল, “দাদা আপনাকে প্রণাম জানাই। আপনার পা ছুঁয়ে প্রণাম জানাই।"
     মাহাতো খুশি হল। বলল, “বেশ বেশ। ভাই, সুখে থাকো। শরীর ভালো থাকুক। তা বল কিসের জন্য এসেছ?”
     শেয়াল বলল, “শরীর ভালো। সব ভালো। তা এলাম একটা কাজে। একটা আর্জি আছে।"
    মাহাতো আনমনা হয়ে মাথা নাড়ল  সে এখন অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছে। শেয়াল নরম গলায় বলল, “আপনার ভাইবউ তো এবার মা হতে চলেছে। তা ছেলেপুলে হলে খাব কি? তখন তো দুজন থাকব না? তাই সে আপনার কাছে পাঠাল। এক খণ্ড জমি চাষ করতে চাই। জমি ধার নিয়ে চাষ করব। আপনার ভাগের ফসল, আপনার পাওনা ঠিকঠাক দিয়ে যাব। জমিতে খুব খাটব, দুজনেই। তাই এলাম।”
     মাহাতো এবার হেসে ফেলল। হাসি থামিয়ে বলল, “আচ্ছা ভাই, বলতো বছরের এই সময়ে তোমায় এখন কোন জমি বিলি বন্দোবস্ত করি। এখন তো চারা বোনার সময় হয়ে এল। তা নেহাৎই যখন এসেছ, দেখি ছেলেদের সঙ্গে পরামর্শ করে। তারা কি বলে। এখন তো সবকিছু আর আমি দেখি না। ওরা বড় হয়েছে। যাক, তুমি পরশু এসো। "
     আশায় বুক বেঁধে শেয়াল গুহায় ফিরে এল। সব কথা বউকে জানাল। এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সলা-পরামর্শ চলল। আশা যখন দিয়েছে মাহাতো, সুরাহা একটা হবেই। দুজনেই খুশি।
     মাহাতোর কথামতো শেয়াল আবার সেদিন গেল। বেশ খুশি খুশি ভাব। প্রণাম জানিয়ে শেয়াল বলল, “দাদা, ছেলেদের সঙ্গে জমির কথা বলেছিলেন? তারা মত দিয়েছে তো?" 
     মাহাতো মুখে চুকচুক আওয়াজ করে বলল, “এঃ, একেবারে ভুলে গেছি। ভাই তুমি কিছু মনে করো না। আচ্ছা, তুমি বরং কালকে এসো।"
     শেয়ালের মনটা খারাপ হল। কিন্তু কি আর করবে? ফিরে গেল গুহায়। তবু একেবারে নিরাশ হল না। মাহাতো খুব ব্যস্ত মানুষ, ভুলে যেতেই পারে। সব কথা মনে থাকে! শেয়াল মনকে বোঝাল।
     পরের দিন সকাল হতেই মাহাতো তার চারটে তেজী কুকুরকে বসিয়ে রাখল। তারপরে বড় বস্তা দিয়ে তাদের সামনে আড়াল দিল। বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না, ওখানে কি জিনিস লুকোনো আছে। কুকুরগুলো কয়েকবার ঘেউ ঘেউ করল। মাহাতো গায়ে হাত বুলোতেই তারা চুপ করে গেল। বড় বাধ্য তারা।
     সূর্যের আলো ফুটতেই শেয়াল রওনা দিল। পাহাড়ের কোলে তখনও সূর্যের আগুন। কিন্তু দেরি সইছে না শেয়ালের। বুক বড় কাঁপছে।
     ঘরের মধ্যে ঢুকেই শেয়াল কাঁপা গলায় বলল, “দাদা, প্রণাম করি। তা ছেলেদের সঙ্গে কথা হয়েছে? ওরা মত দিয়েছে? বউদি মত দিয়েছে তো?” শেয়ালের দেহে উত্তেজনা, বুকে আশা, চোখে-মুখে কেমন ভয়-ভয় ভাব। হবে তো?
     মাহাতো গোঁফের ফাঁকে হেসে বলল, “হাঁ, সলা-পরামর্শ হয়েছে। তা ভাই অত দুরে দাঁড়িয়ে কেন? কাছে এসো।”
      শেয়ালের বুক আরও বেশি কাঁপতে লাগল। চোখ চকচক করে উঠল আশায়। এগিয়ে গেল মাহাতোর কাছে। মাথাটা নুইয়ে এগিয়ে গেল। শান্ত হয়ে বসল। আনন্দে শরীর নাচছে, চোখে জল এসে পড়ছে।
     মাহাতো হঠাৎ ডানদিকে সরে বসল। খুব ঝটিতে ডান হাত দিয়ে এক টানে বস্তা সরিয়ে ফেলল। চিৎকার করে উঠল, “ চৌরা, ভৌরা, তিলকা, লোধা—ওকে ধর ”
     চারটে কুকুর জিভ-দাঁত বের করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শেয়াল কেমন ভড়কে গিয়েছিল। এমন তাড়াতাড়ি আচমকা ব্যাপারটা ঘটে গেল যে সে প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেয়াল বনের পশু। বনে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। স্বভাবই তাই। এক মুহুর্তেই সে ব্যাপারটা বুঝে নিল। তার তেজী ভাব ফিরে এল। ব্যাপার বুঝেই সে লাফিয়ে উঠল। শরীরটা লম্বা করে প্রস্তুত হল। মাহাতোর বাড়ির দরজা দিয়ে এক ঝলকে একটা তীর যেন বেরিয়ে গেল। সামনেই উঠোন, উঠোনের ওপারেই রাস্তা পেরিয়ে চষা জমি, জমির শেষেই বন। শেয়াল বনের পথে দৌড় দিল। বনের দিকে বর্ষার হাওয়ার বেগে ছুটছে। পেছনে চারটে কুকুরও মরিয়া হয়ে ছুটছে।
     বনের অাঁকাবাঁকা পথে, তার চেনা পথে, তার চেনা বনে শেয়াল ছুটে চলেছে। পেছনে আর শুকনো পাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে না, মাটি কাঁপছে না। শেয়াল দাঁড়াল। কুকুররা আর আসছে না। ঘরের পোষা কুকুর আদরে মানুষ, তৈরি মাংস খায়। ওরা পারবে কেন বনের শেয়ালের সঙ্গে।
     আস্তে আস্তে শেয়াল গুহায় এল। তার পা কাঁপছে। বুক ওঠানামা করছে, জিভ বেরিয়ে গিয়েছে, চোখে অন্ধকার। সে লম্বা হয়ে ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। সামনের পায়ে মুখ রেখে তাকিয়ে দেখতে লাগল। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। বউ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার মুখেও কোন কথা নেই।
     একটু শান্ত হয়ে শেয়াল মাথাটা তুলল। ভেজা চোখে বলল, “ও বউ, কি যুক্তিই দিয়েছিলে। আর একটু হলেই প্রাণ যেত। তা তুমিই বা কি করে এসব শয়তানি বুঝবে। তোমার আর কি দোষ। উঃ, বড় বাঁচাই বেঁচে গেছি। জমি চাইতে গিয়ে আর একটু হলেই মরেছিলাম আর কি। জমির বদলে মাহাতো চারটে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। কি শয়তান। আগেই বোঝা উচিত ছিল। ওদের তো চিনি। যাক, প্রাণে বেঁচেছি।" শেয়াল আরও কত কি বিড়বিড় করতে লাগল।
     শেয়াল বউ কেদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কে জানত এমন হবে! ভাবলে বুক কাঁপে। দরকার নেই জমির। এখানে অভাব, তবু ওরা তো নেই। প্রাণের ভয় কম। অনেক নিরাপদ। আর মাহাতোর বাড়ি যেয়ো না। আমাদের চলে যাবে। যেমন করে পারি ছেলেমেয়েদের মানুষ করে তুলব। দরকার নেই। এভাবেই চলবে।"
তারপর থেকে শেয়াল আর কোনদিন চাষ করার কথা ভাবেনি। জমি চায়নি। বনের পশু বনেই থেকেছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য