বরফ বুড়ো - রাশিয়ার উপকথা

     এক ছিল  ‍বুড়ো আর তার দ্বিতীয় পক্ষের বৌ । বুড়োর এক মেয়ে আর দ্বিতীয় পক্ষের বৌয়ের নিজের এক মেয়ে।
    সৎমায়েরা কেমন সে তো সবাই জানে। ভাল কাজ করলেও লাথি ঝাঁটা, মন্দ কাজ করলেও লাথি ঝাঁটা। নিজের মেয়েটির বেলায় কিন্তু অন্যরকম—সে যাই করে তাই ভাল: সবেতেই তার আদর।
     সূর্য ওঠার আগেই সৎমেয়েটি ওঠে, গরুবাছুরকে খাওয়ায়, জ্বলানি কাঠ আর জল আনে, উনানে আগুন দেয়, ঘর ঝাঁট দেয়। কিন্তু বুড়ীর আর মন ওঠে না, সবই তার খারাপ, সবই ঠিক তেমনটি নয়।
     ঝড় উঠলে ঝড়ও শান্ত হয়ে যায়, কিন্তু বুড়ীমায়ের রাগ একবার উঠলে আর শান্তি নেই। সৎমা ঠিক করল সংমেয়েটাকে দুনিয়া থেকেই সরাতে হবে।

     বুড়োকে বলে, ‘মেয়েটাকে এখান থেকে সরাও বাপু । যেখানে খুশি দিয়ে আয়, চোখে যেন না দেখতে হয়! বনে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আয় শীতের মধ্যে।’
     বুড়ো মনের দুঃখে কাঁদতে লাগল। কিন্তু জানে কোনো উপায় নেই। বুড়ীকে টলানো যাবে না। কাজেই লাগাম পরিয়ে ঘোড়া যুতে মেয়েকে ডাকল:
     ‘আয় মা, স্লেজে ওঠ।’ 
     অভাগা মেয়েটিকে দূরে বনে নিয়ে বড় ফার গাছের নীচে একটা বরফের স্তপের মধ্যে ফেলে রেখে ফিরে এল বুড়ো।
     সেদিন ভীষণ ঠান্ডা। মেয়েটি ফার গাছতলায় বসে বসে কাঁপছে, ঠকঠক করছে। হঠাৎ শোনে আশেপাশের গাছের ডালে চড়বড় আওয়াজ তুলে এগাছ থেকে ওগাছে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে বরফ-বুড়ো। চোখের পলকেই বরফবুড়ো মেয়েটি যে গাছতলায় বসেছিল সেই গাছে এসে হাজির।
     ওপর থেকে জিজ্ঞেস করল: বাছা, তোর শীত লাগছে না তো?’ 
     মেয়েটি নরম করে উত্তর দিল: 'না, শীতবাবাজি, শীত করছে না।’ 
     বরফ-বুড়ো তখন আরও নিচে নেমে এল । চড়বড় আওয়াজ উঠল আরও জোরে।
     ‘শীত করছে না, মেয়ে ? সত্যি শীত করছে না, কন্যে ?
     মেয়েটি নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না, তবু বলল, 'না, শীতবাবাজি, ঠান্ডা লাগছে না।’ বরফ- ‍বুড়ো আরও নিচে নেমে এল। বরফ পড়ার চড়বড় শব্দ বেড়ে উঠল ভয়ানক।
     জিজ্ঞেস করল, শীত লাগছে না, মেয়ে? এখনো শীত করছে না, কন্যে ? শীত লাগছে না তোর, সুন্দরী?’
     মেয়েটি তখন প্রায় জমে অবশ। জিভও যেন নড়ে না। কোনোরকমে বলল: 'না, শীতবাবাজি, শীত করছে না।’ 
     বরফ-বুড়োর তখন দয়া হল। মেয়েটিকে সে ফোলা ফোলা নরম লোমওয়ালা কোট আর গরম লেপের পোষাক দিয়ে জড়িয়ে দিল।
     এদিকে তো সৎমা মেয়েটির শ্রাদ্ধের জন্যে ভোজের আয়োজন করেছে। সরল চাকলি ভাজে আর বুড়োকে বলে:
এই মিনসে, যা বনে যা, মেয়েটাকে নিয়ে আয়, কবর দেব!’ বুড়ো বনে গিয়ে দেখে ঠিক যে জায়গাটায় রেখে গিয়েছিল সেই বুড়ো ফার গাছটির নিচে বসে আছে মেয়েটি। দেখাচ্ছে ভারি খুশী খুশী, লাল টুকটুক করছে মুখটি। গায়ে তার একটা লোমের কোট, সবাঙ্গে সোনা রপোর গহনা। পাশেই একটা মন্ত সিন্দুকে দামী দামী উপহারে ভরা।
     বুড়ো আহ্লাদে আটখানা। মেয়েকে স্লেজে বসিয়ে, ধনসম্পদ তুলে নিয়ে বাড়ী ফিরে এল সে।
     এদিকে সৎমা সর চাকলি ভাজে আর ওদিকে টেবিলের নীচ থেকে কুকুরটা বলে: ‘ভেউ ভেউ! বুড়োর মেয়ে বাড়ী ফেরে ধনদৌলত নিয়ে, বুড়ীর মেয়ে রইল পড়ে, হবে না তার বিয়ে!”
      ‍বুড়ী কুকুরটাকে একটা সরু চাকলি ছুড়ে দিয়ে বলে:
     ও কথা নয় কুকুর, বল: “বুড়ীর মেয়ের বিয়ে হবে, বর আসবে তার, বুড়োর মেয়ে হতচ্ছাড়ি বেঁচে সে নেই আর !" ”
     কুকুরটা সরু চালকি খেয়ে ফের শুরু করে: ‘ভেউ ভেউ! বুড়োর মেয়ে বাড়ী ফেরে ধনদৌলত নিয়ে, বুড়ীর মেয়ে রইল পড়ে, হবে না তার বিয়ে!”
     বুড়ী আরো কতগুলো সর চাকলি কুকুরটার দিকে ছুড়ে দিল। মারল কুকুরটাকে। তব কুকুরটার মুখে শুধু ঐ একই কথা...
     হঠাৎ ক্যাঁচকেচিয়ে উঠল ফটক, দরজা খুলে গেল। বুড়োর মেয়ে ঘরে ঢুকল। জামাকাপড় সোনা রপো, মণিমাণিক্যে ঝলমল করছে। পেছন পেছন  ‍বুড়ো ঢুকল মস্ত ভারী সিন্দুকটা নিয়ে। তাকিয়ে দেখেই বুড়ীর হাতদুটো ঝুলে পড়ল হতাশে...
     ‘যা মুখপোড়া বুড়ো, গাড়ী জুতে নে! তারপর তোর মেয়েকে যেখানে রেখে এসেছিলি, আমার মেয়েকেও সেখানে রেখে আয়...’
     বুড়ীর মেয়েকে স্লেজে বসাল বুড়ো, বনে গিয়ে লম্বা ফার গাছটার তলায় বরফের ঢিপির মধ্যে রেখে দিয়ে এল।
     বুড়ীর মেয়ে বসে আছে গাছতলায়। শীতের চোটে দাঁত-কপাটি। মড়মড়িয়ে ঠকঠকিয়ে, এগাছ থেকে ওগাছে লাফাতে লাফাতে বরফ-বুড়ো এসে হাজির। বুড়ীর মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে:
     ‘বাছা, তোর শীত করছে না তো?’ 
     বুড়ীর মেয়ে কিন্তু বলে: ‘মা গো, জমে গেছি! দোহাই শীতবাবাজি, অমন মড়মড়িয়ো না, ঠকঠকিয়ো না...’
     বরফ-বুড়ো আরও নিচে নেমে এসে আর জোরে জোরে ঠকঠকায়, চড়বড়ায়। বলল, "শীত করছে না, মেয়ে ? শীত করছে না তো, কন্যে ?’ মেয়ে বলল, “উহ্য রে, হাত পা জমে গেছে! তুমি চলে যাও, শীতবাবাজি...’ 
     আরো নিচে নেমে এল বরফ-বুড়ো, আরো জোরে ঝাপট মারে, ঠকঠকায়, চড়বড়ায় ।
     ‘শীত করছে না তো, কন্যে ? শীত লাগছে না তো, সুন্দরী ?’ 
    ‘মা গো, একেবারে হাড় জমে গেছে! দূর’হ, হতচ্ছাড়া শীত কোথাকার!’ 
     রাগ হয়ে গেল বরফ-বুড়োর, বুড়ীর মেয়েকে জাপটে ধরে জমিয়ে মেরে ফেলল।
    এদিকে সবে ভোর হয়েছে কি হয়নি, বুড়ী বড়োকে বলে: ‘তাড়াতাড়ি ওঠ মুখপোড়া বুড়ো, ঘোড়ায় লাগাম পরিয়ে চট করে যা, মেয়েকে নিয়ে আয়, সোনায় রূপোয় আনা চাই...’
     বুড়ো তো ঘোড়া ছটিয়ে চলে গেল। আর কুকুরছানাটা ওদিকে টেবিলের তল থেকে বলে :
     ‘ভেউ ভেউ! বুড়োর মেয়ের বিয়ে হবে, বর আসবে তার, বুড়ীর মেয়ে মরল শীতে, উঠবে নাকো আর।’
     বুড়ী কুকুরটাকে একটা পিঠে ছুড়ে দিয়ে বলে: ‘ও কথা নয়, বল: “বুড়ীর মেয়ে বাড়ী ফেরে ধনদৌলত নিয়ে...” ’
     কুকুর কিন্তু আগের মতো বলেই চলল:
     ‘ভেউ, ভেউ! বুড়ীর মেয়ে ,মরল শতে, উঠবে নাকো আর...’
     ফটক খোলার আওয়াজ হল। মেয়েকে এগিয়ে আনবার জন্যে বুড়ী ছুটল হড়মড় করে। তারপর ঢাকা সরিয়ে দেখে, স্লেজ ওপর তার মরা মেয়ে শুয়ে।
     ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল বুড়ী, কিন্তু আর তো উপায় নেই।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য