বড় ভালো বউ তারা দুজন - আদিবাসী লোককথা

      অনেক কাল আগে এক পাহাড়ি গাঁয়ে থাকত একটা লোক। তার ছিল একটি ছেলে। কিশোর বালক। তার নাম কারে। একদিন বাবা-ছেলে আগুনের পাশে বসে রয়েছে। গল্প-গুজব করছে। হঠাৎ ছেলে বলল, “বাবা, আমাকে কিন্তু একটা তীর-ধনুক দিতে হবে।
      বাবা কোনদিন তীর-ধনুক দেখেনি, এরকম কোন জিনিসের নামও শোনে নি। বাবা জানেই না, তীর-ধনুক আবার কিরকম দেখতে হয়। তাই বাবা কিছু বলতে পারল না। চুপ করে রইল। যে জিনিস সে কোনদিন দেখেনি, তা নিয়ে সে কথা বলবে কেমন করে? ছেলে ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল। তীর-ধনুক তার চাই-ই। বারবার একই কথা বলতে লাগল, একই জিনিস চাইতে লাগল। বাবা আর কি করবে ? জানতে চাইল—তীর-ধনুক কেমন দেখতে হয়। ছেলে বলল। বুঝিয়ে দিল বাবাকে। শেষকালে বাবা ধনুকের মতো একটা জিনিস বানিয়ে দিল। চুল্লি থেকে এক টুকরো কাঠ তুলে নিল, আগুন নিভিয়ে ফেলল আর সেই কাঠ থেকে তৈরি করল একটা তীর। ছেলে কারের আনন্দ দেখে কে ! সেই তীর-ধনুক নিয়ে সারাদিন সে খেলে বেড়াল।
      রাত্তীর হল। খেলা বন্ধ। ভোর হতেই আবার খেলা শুরু হল। হাতে তীর-ধনুক। বাড়ির বাইরে খুব কাছাকাছি খেলছে কারে। পাশ দিয়ে বড় বড় পা ফেলে যাচ্ছিল একটা মুরগি। নিজেদের মুরগি। তীর ছুটে গেল কারের ধনুক থেকে। উলটে পড়ল মুরগি। মরে গেল। পরের দিন খেলছে কারে, হাতে তীর-ধনুক। শুয়োরের একটা বাচ্চা ছাইগাদায় খাবার খুঁজছে। নিজেদের শুয়োর। তীর ছুটে গেল কারের ধনুক থেকে। ছটছট করল শুয়োরের বাচ্চা, চিৎকার করল, পা চারটে ছড়িয়ে পড়ল। মরে গেল শুয়োরের বাচ্চা।
      বাবা ভীষণ চটে গেল। দু-দুটো প্রাণী মারা পড়ল ছেলের হাতে। অকারণে। বাবা রেগে গিয়ে বলল, “তুমি যদি এভাবে নিত্যিনিত্যি ঘরের পোষা পশুপাখি মারতে থাকো তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। কয়েকদিনেই তো সব শেষ হয়ে যাবে। কিছুই বাকি থাকবে না। পশুশিকার যদি করতেই চাও, তবে বনে চলে যাও। সেখানে অনেক বুনো পশুপাখি আছে। ঘরের পশু আর মারবে না। বনে চলে যাও।
      ছেলে সঙ্গে সঙ্গে বলল, তাহলে আমাকে সত্যিকারের তীর-ধনুক বানিয়ে দাও। বাঁশের তৈরি বাঁকানো ধনুক, বাঁশের তৈরি ছুঁচলো তীর। আমি ঠিক বনে চলে যাব।
      কিন্তু তাদের এলাকায় ভালো বাঁশগাছ জন্মায় না। বাবা এখন কী করবে? এধারে বাঁশের ভালো তীর-ধনুক না পেলেও তো ছেলে ছাড়বে না? আর মারা পড়বে ঘরের নিরীহ মুরগি আর শুয়োরের বাচ্চা। বাবা আর কি করে? রওনা দিল দূর পাহাড়ি বনে। সেখানে রয়েছে খুব সুন্দর বাঁশের ঝাড়। চলেছে পাহাড়ি পথে, বাবা চলেছে বাঁশ আনতে। শেষকালে বাবা পৌঁছল এক পাহাড়ি গাঁয়ে। চারিদিকে বন। আবিঙ-নিবো-র গাঁয়ে। সেই গাঁয়ের পাশে একটি সমাধি রয়েছে। উইয়ু তেতিক-বোত্তের-সমাধি। সেই সমাধির ওপরে সুন্দর সুন্দর বাঁশের গাছ। এত সুন্দর গাছ আর কোথাও নেই। সেখান থেকে সে কেটে আনল একটা লম্বা লকলকে বাঁশ। তার থেকে তৈরি করল খুব শক্ত একটা ধনুক আর অনেক চলো তীর। ফিরে এল বাড়িতে। তুলে দিল ছেলের হাতে। কারে মহাখুশি। হাঁ, এতদিন যা সে চেয়েছে এবার সত্যিসত্যি তাই হাতে পেল। একেই বলে তীর আর ধনুক। প্রতিদিন সকাল হলেই কারে চলে যায় পাহাড়ি বনে। মনের সুখে বুনো জন্তু মারে, বুনো মুরগি মারে। মনে আনন্দ, হাতে সঠিক নিশানা। তাদের বাড়িতে অনেক মাংস, অভাব রইল না ।
      গাছের ডাল ডালে বাঁদররা কারের কাণ্ড-কারখানা দেখে। ভয় পায়। একদিন তারা বলাবলি করছে, "এই ছেলে তো সাংঘাতিক। এ দেখছি একদিন আমাদেরও মারবে। মেরে শেষ করে দেবে। ওর তো আছে তীর-ধনুক। আমাদের যা নেই। কি যে হবে?
      বাদুড় ওদের কথা শুনতে পেল। উড়ে এল বাঁদরদের কাছে। বলল, “কোন ভয় নেই। আমি আছি। আমি ঠিক তীর-ধনুক ছিনিয়ে আনব। তোমাদের দেব। তোমরাও তীরধনুক পাবে।
      পরের দিন সকালে কারে বেরিয়েছে শিকারে। হাতে ভয়ানক তীর-ধনুক। এক তীরের আঘাতে সে মেরে ফেলল একটা বুনো দাঁতাল শুয়োরকে। আশ্চর্য নিশানা তার। বেত গাছের দড়ি দিয়ে শুয়োরকে বাঁধল, পিঠে ফেলে রওনা দিল কারে। শুয়েরের মাথা নীচে ঝুলছে, দুলছে।
      বাদুড় উড়ে এল কারের কাছে। বলল, “কি শক্তিমান তুমি। আশ্চর্য তোমার গায়ের শক্তি। আমি জীবনে তোমার চেয়ে সাহসী আর শক্তিশালী মানুষ দেখিনি। সাবাস!
      কারে হাসল। তৃপ্তীর হাসি। বাদুড় আবার বলল, “কিন্তু, তুমি ওই বেত গাছের দড়ি নাও কেন? ও কি তোমায় মানায়? আমি আরও ভালো দড়ির খবর জানি। ওই দেখো, ওই গাছ থেকে লম্বা লম্বা লতা ঝুলছে। ওগুলো আরও শক্ত। এই নাও একটা। শুয়োরটাকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলো। ঝুলিয়ে নাও পিঠে। বাড়ির দিকে হাটা দাও। মানাবে ভালো। লতাটা কারের পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে বাদুড় উড়ে ঘন গাছের ফাঁকে চলে গেল। নতুন কিছু জানার আনন্দে কারে খুশি হল।
      দাঁতাল শুয়োরের দেহ থেকে খুলে ফেলল বেত গাছের শক্ত দড়ি। অনেক দিন থেকে সে এই দড়িই ব্যবহার কারে আসছে। শুয়োরের দেহে জড়াতে লাগল নতুন-পাওয়া লতার দড়ি। পিঠে ঝুলিয়ে নিল শুয়োরটাকে। মাথা নীচের দিকে, শুয়োর ঝুলছে, দুলছে।
      পটাং করে ছিড়ে গেল লতা। পিঠ থেকে শুয়োরের একটা দাঁত এসে বিধে গেল কারের পায়ে। যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে উঠল। গলগল করে রক্ত পড়তে লাগল। কারের মুখ-চোখের চেহারা পালটে গেল। খুঁড়িয়ে চলল বাড়ির পথে। বাদুড় ছিল কাছেই। নেমে এল। কারের তীর-ধনুক তুলে নিল। সেগুলো দিল বানরদের। তারা মহাখুশি।
      কারে যখন বাড়ি পৌঁছল তখন তার পা ভীষণ ফুলে গিয়েছে, যন্ত্রণায় সে ছটফট করছে। এসেই সে শুয়ে পড়ল। রক্ত-পড়া বন্ধ হয়েছে। কিন্ত দেহ পুড়ে যাচ্ছে, অসহ্য যন্ত্রণা। কয়েকদিন কেটে গেল। পা আরও ফুলছে। টোটকা ওষুধে কোন কাজ হল না। কারে মারা গেল।
      কারের দুই বউ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। এ তাদের কি হল? এই বয়সে স্বামী মারা গেল? আর তো কিছু করার নেই। যেখানে দাঁতাল শুয়োরটা পড়ে ছিল, যেখানে কারে আহত হয়েছিল,—কারের দেহকে সেখানে নিয়ে গিয়ে তাকে মাটির তলায় শুইয়ে দিল দুই বউ। সব কাজ করল, কিন্তু সবসময় তারা কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, তালেণ্ড উইয়ু এমন কাজ করল, সেই আমাদের স্বামীকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। তারা কাঁদছে ।
      দুই ভালো বউ তখন পাখি হয়ে গেল। পাখি হয়ে উড়ে চলল বনের ওপর দিয়ে। উড়তে উড়তে এল তালেঙ-এর গাঁয়ে। গাঁয়ে পৌঁছে দেখে, তাদের স্বামী কারে একজন উইয়ু হয়ে গিয়েছে। সে রয়েছে সেখানে।
      গাঁয়ের ঠিক মাঝখানে ছিল একটা গাছ। দুই পাখি-বউ সেই গাছের ডালে বসল। কাঁদতে কাঁদতে কারেকে ডাকতে লাগল,—স্বামী আসুক বউদের কাছে—আসুক আসুক আসুক। কাঁদছে আর বলছে, বলছে আর কাঁদছে।
      পাখিদের এই কান্না আর চিৎকারে উইয়ুরা ভীষণ রেগে গেল। বড় বিরক্ত করছে তো দুটাে পাখি। তারা তাদের দিকে তীর ছুড়ল। ফসকে গেল তীর। তীর তাদের গায়ে লাগল না। তখন তারা কারেকে ডাকল। তাকে তীর ছুড়তে বলল। সেই মারুক ওই পাখি দুটোকে। সে তো বিরাট শিকারি। কারে এল, ধনুকে তীর লাগিয়ে নিশানা করে ছেড়ে দিল তীর। ফসকে গেল নিশানা। পাখিদের গায়ে লাগল না।
      কারেকে তীর ছুড়তে দেখে অবাক হল দুই বউ। তাদের গায়ে তীর লাগল না, কিন্তু ঝপ করে নীচের ঝোপে পড়ে গেল। ওপর থেকে পড়েও তারা বেঁচে রইল। কারে গেল কাছে। ঝোপের মধ্যে। তাকে দেখেই পাখি দুটো আর পাখি রইল না। তারা সত্যিকারের বউ হয়ে গেল। তারা মানবী হয়ে গেল। দুজনে করেকে দুপাশ থেকে ধরে বাড়ির পথে নিয়ে চলল। পাহাড়ি পথে তারা তিনজনে চলেছে। অনেক কষ্টে তাদের স্বামীকে ফিরে পেয়েছে।
      এমন সময় তারা এল সেই সমাধির কাছে, যেখানে দুই বউ কারেকে মাটির তলায় শুইয়ে রেখেছিল। সমাধি দেখেই কারে বলল, সমাধির মধ্যে আমার অনেক কিছু রয়েছে। সেগুলো নিয়ে যাওয়া দরকার। সেসব তো আমারই।
      কারে সমাধির এক পাশে খুঁড়তে লাগল। নরম মাটি, হাত দিয়ে মাটি তুলছে। একটা গর্তের মতো হল। হাত অনেকটা ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। কারে গর্তেব মধ্যে নিজের মাথা ঢুকিয়ে দিল। মাথা দিয়ে নিজের মৃতদেহ স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে কারে হযে গেল একটা শুয়োর, আর দৌড় দিল বনের পথে।
      বউ দুজন পাশে দাঁড়িয়েছিল। অতশত বোঝেনি। এবার বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
      বলল, “কত কষ্ট করে তোমাকে ফিরিয়ে আনলাম। তুমি আবার আমাদের হলে। কত কষ্ট ! কত কষ্ট। কিন্তু এ তুমি কি করলে? তুমি আবার শুয়োর হয়ে বনের গভীরে হারিয়ে গেলে । হায়?
      তবু তারা ভালো বউ। হাল ছেড়ে দিল না। তারা তাদের পোষা কুকুরকে ডাকল। তাকে পাঠাল বনের গভীরে। স্বামীকে খুঁজতে। তাদের স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে।
      কুকুররা আজও শুয়োর দেখলেই নিজে থেকেই তেড়ে যায়। তারা আজও কারেকে খুঁজছে, বউ দুজনের স্বামীকে খুঁজছে। আজও পায়নি তাকে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য