বাদুড়ের স্বভাব - আদিবাসী লোককথা

    অনেকদিন আগের কথা। সেইকালে একবার পশু আর পাখিদের মধ্যে খুব যুদ্ধ হয়েছিল। সেইসময় পশু আর পাখিদের মধ্যে খুব তর্ক বাধল। তর্ক বাদুড়কে নিয়ে। বাদুড় কোন দলে যোগ দেবে? পশুদের দলে না পাখিদের দলে? বাদুড় খুব চতুর। সে জানে কেমন করে নিজেকে বাঁচাতে হয়। তার খুব বুদ্ধি। অনেক দিক ভেবেচিত্তে সে কাজ করে। পাখিরা যখন প্রভু ছিল, পাখিরা যখন পশুদের ক্রীতদাস করে রেখেছিল, তখন বাদুড় ছিল পাখিদের সঙ্গে। তার ভাগ্যকে সে পাখিদের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিল। তখন পাখিরা ছিল রাজা, পশুরা ছিল পরাধীন।
    এমনি করে চল্লিশ বছর কেটে গেল। পশুদের অশেষ কষ্ট, শেষকালে সহ্য করতে না পেরে সিংহ ও বাঘ প্রস্তাব দিল যে, অত্যাচারী পাখিদের সঙ্গে আমরা কখনও পেরে উঠব না, তাদের সঙ্গে রেষারেষি বা যুদ্ধ করেও কিছু হবে না, তাই এসো বন্ধুগণ, আমরা শান্তির প্রস্তাব রাখি। তাদের কাছে মাথা নত করলে তারা খুশি হয়ে আর অত্যাচার করবে না ।
    এই পরামর্শ শোনামাত্র অন্য সব পশু হৈ হৈ করে উঠল। তারা সবাই মিলে শান্তির প্রস্তাব অগ্রাহ্য করল। তারা বলল, এভাবে অত্যাচার বন্ধ হবে না। আমরা লড়াই করব, আর শেষ পর্যন্ত আমরাই জিতব। আমাদের শক্তি তো কম নেই। এসো, সবাই মিলে পাখিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। সিংহ আর বাঘ বাধ্য হয়ে মেনে নিল তাদের কথা। আবার যুদ্ধ বাধল অত্যাচারী পাখিদের সঙ্গে ।
    এতদিন বাদুড় ছিল অত্যাচারী নিষ্ঠুর পাখিদের দলে। কিন্তু যখনই পশু আর পাখিদের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল, তখন সে আলদা হয়ে থাকল। পাখিদের কাছ থেকে সরে গেল, কিন্তু পশুদের দলেও যোগ দিল না। সে দেখছে কে জেতে। তারপের তার দলে যোগ দেবে। পশুরা নজর রাখল, বাদুড়ের ভাবগতিক দেখল। সবই বুঝতে পারল তারা।
    পশুরা জোর লড়াই চালাচ্ছে। সেইসময় তারা শেয়ালকে পাঠাল বাদুড়ের কাছে। শেয়ালকে বলল, বাদুড়কে বন্দি করে নিয়ে এসো।
    শেয়াল তক্ষুনি বাদুড়ের কাছে গিয়ে তাকে বন্দি করে নিয়ে এল। পশুদের নেতারা বসে রয়েছে, বন্দি বাদুড়কে নিয়ে আসা হল তাদের সামনে। তারা বলল, বাদুড় দুরকম চরিত্রের। আগে ছিল পাখিদের দলে এখন আলাদা হয়ে সরে আছে। এ কাজ জঘন্য। বাদুড়কে আমরা অভিযুক্ত করছি। বাদুড় কেন এরকম করছে তার জবাব দিক। 
    বাদুড় বলল, ‘এতে কোন দোষ নেই। এরকম কাজ করতে আমি বাধ্য হয়েছি। আমার বউ আমাকে এই পরামর্শ দিয়েছে। আমার বউ আমাকে বলেছে, গন্ডগোলের সময় সরে থাকবে। আর যেই একদল জিতবে তখন তার দলে গিয়ে বলবে, আমি তো তোমাদের দলেই ছিলাম। তাতে যুদ্ধ জেতার ফলে যত ভালো ভালো জিনিস, তা সবই পাবে। আগে আমি বউয়ের কথায় জেতা দল পাখিদের সঙ্গে ছিলাম, আর এখন দেখছিলাম কি হয়। আমার কোন দোষ নেই।
    বাদুড়ের এই দুরকমভাবে চলাফেরার জন্য সব পশু তাকে ভীষণভাবে গালাগালি দিল। তারপর তাকে নিজেদের জঞ্জালে ঘেরা একটা ঘরে বন্দি করে রাখল। ঠিক হল, যুদ্ধের পরে তার বিচার হবে। এখন যুদ্ধ নিয়ে তারা ব্যস্ত, পরে ঠিকমতো বিচার করা যাবে।
    দশ বছর ধরে চলল এই ভীষণ যুদ্ধ। কত পাখি কত পশু মারা পড়ল, কতজন আহত হয়ে পড়ে রইল। শেষকালে পশুরাই জয়ী হল। তারা মরণপণ লড়াই চালিয়ে পাখিদের একেবারে হারিয়ে দিল ।
    পশুদের মধ্যে যাদের খুব বুদ্ধি তাদের নিয়ে দল করা হল। তারপরে তাদের সামনে বাদুড়কে ডাকা হল। এখন তার বিচার হবে।
    বাদুড় বুঝল, সে এবার শক্ত পাল্লায় পড়েছে। এতদিন বুদ্ধি করে সে নিজেকে বঁচিয়ে বঁচিয়ে এসেছে। কিন্তু এবার? ব্যাপারটা খুব শক্ত, তাই সে আরও বুদ্ধিমান একজনকে অনেক ভেট দিয়ে তার হয়ে কথা বলতে বলল। লোভে পড়ে সে রাজি হল।
    বাদুড়ের সেই বুদ্ধিমান বন্ধু বলল, “বাদুড়ের অধিকার আছে যে-কোন দলে যোগ দেবার। তার স্বভাব, তার চেহারা, তার চরিত্র এমনই যে, সে যে-কোন দলে সুন্দরভাবে মিশে থাকতে পারে। আর তাই সে করেছে। যদিও সে পাখি নয়, তবু তার দুটি ডানা আছে, সে আকাশে উড়তে পারে। তাই সে যখন আকাশে উড়ে বেড়ায় তখন কেউ বলবে না যে সে অন্যের এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই নিশ্চয়ই মানবে, তার যখন ডানা আছে, তখন তার আকাশে উড়বার অধিকারও আছে। আবার বাদুড়ের অন্যদিকে তাকান, দেখবেন যে, তার সারা দেহ লোমে ঢাকা, তার দাঁত আছে, বেশ বড় কান আছে। অথচ পাখিদের লোম দাঁত এবং কান কোনটাই নেই। লোমের বদলে রয়েছে পালক। তাহলে সে তো পশু। তাই যখন সে পশুদের দলে যোগ দিতে চায় তখন তার বাধা কোথায়? তার দেহই এমন যে, সে পাখি বা পশু যে-কোন দলেই ভিড়ে যেতে পারে। এতে তার নিজের দোষ কোথায়? বিচার করে দেখুন, বুঝতে পারবেন বাদুড় নির্দোষ, তার কোন দোষই নেই।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য