তারপর কী হল?

     একবার বাদশা আকবর অনিদ্রা রোগে ভুগছিলেন।
    ঘুমের জন্য অনেক ওষুধ-বিষুধ খেলেন কিন্তু কিছুতেই চোখে আর ঘুম আসে না। তখন একজন হাকিম বললেন, ‘এক কাজ করুন প্রতিদিন সন্ধেবেলায় সুন্দর সুন্দর গল্প শোনবার ব্যবস্থা করুন, তাহলে শরীর মন প্রফুল্ল হবে আর ঘুমও আসবে। অনিদ্রা রোগ দূর হবে।
     আকবর বললেন, কিন্তু প্রতিদিন গল্প বলে যাবে, এমন গল্প-বলিয়ে কথক আমি রোজ কোথায় পাব?
    হাকিম বললেন, জাঁহাপনা, আপনার দরবারে বহু জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি আছেন। আপনার দরবারে কীসের অভাব আছে? তাদের প্রত্যেককে এক-একদিন গল্প শোনবার জন্য আনিয়ে নেবেন। তাঁরাই প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প শোনাবেন। 
     প্রস্তাবটা বেশ মনঃপূত হল সম্রাটের। 
    দরবার থেকে প্রতিদিনই একজন করে নতুন ব্যক্তি এসে সম্রাটকে গল্প শুনিয়ে যেতেন। কিন্তু সম্রাটের গল্প শোনায় আর ক্লান্তি নেই। গল্পের পর গল্প। প্রত্যেক গল্প শোনার পরেই বাদশা বলতেন, তারপর কী হল? তারপর কী হল?
     বাদশার এই ‘তারপর কী হল’ কথা নিয়ে তো পারিষদবর্গের ভেতরে হাসি মশকরার ধুম পড়ে গেল। সবাই বলেন, ‘তারপর কী হল?’
     এরপর এক সন্ধ্যায় বীরবলের ওপর গল্প বলার ভার পড়ল।
     কিছুক্ষণ পর পরেই বাদশা জিজ্ঞেস করেন, তারপর কী হল ?"
     এই ‘তারপর কী হল’ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে করতে এক সময় গল্পটা অবশ্য শেষ হল।
     বীরবল তখন তাকে আর একটা মনের মতো গল্প বলেন।
     সে গল্প শেষের পর আবার সেই একই প্রশ্ন, ‘তারপর কী হল?’
     গল্প বলতে বলতে বীরবলও ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন এবং ঘুমের জন্য মনটা আনচান করছিল। এখন না ঘুমোতে পারলে নয়! কিন্তু বাদশাও ছাড়বার পাত্র নন।
     তাই এই ‘তারপর কী হল?’ বন্ধ করবার জন্য আবার এক নতুন গল্প ফেঁদে বসেন। কিন্তু এরপরও—তারপর কী হল?’
     বীরবল কোনও কুল-কিনারা না পেয়ে এবার অনেক ভেবেচিত্তে একটা গল্প বলতে লাগলেন:
     ‘কোনও এক বনে এক কুটির ছিল। সেখানে এক ভিল পরিবার বাস করত।
     সম্রাট বললেন, ‘তারপর কী হল?’ 
     ‘সেই বনে ছিল নানান রকমের পশু পাখির বাস। ভিলটি তার পারিবারিক নিরাপত্তার জন্য সমস্ত রাত ধরে আগুন জেলে রাখত যাতে জন্তু জনোয়ার এসে তাদের পরিবারের কোনও ক্ষতি করতে না পারে। কিন্তু ভিল পরিবারের
পাখির হাত থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব হল না। তারা অনেক সময় দল বেঁধে এসে ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে শস্য খেত এবং অনেক নষ্ট করত।
     ‘তারপর কী হল?’
     ‘তখন আবার পাখির দল ওই ভিলটির বাড়িতে গিয়ে আর কোনও শস্যকণা দেখতে পেল না। কতক পাখি জালাটির ওপর গিয়ে বসে ঠোক্কর মারল জালটির গায়ে, কিন্তু কী আর হবে—ভাঙতে পারল না জালাটি কোনওমতেই।’
     ‘তারপর কী হল?’
     ‘ফলে সকল পাখি নিরাশ হল। তারা কী করে জালাটিকে খোলা যায় তার উপায় স্থির করতে লাগল।’
     ‘তারপর কী হল ?’
     ‘দলের মধ্যে একটা চালাক চড়ুই ছিল। তার আবার ওই ভিলদের বাড়ির এক ইঁদুরের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ইঁদুরটি ওই জালাটির মধ্যে একটি গর্ত করে দিল।’
     ‘তারপর কী হল ?’
     ‘যখন সব পাখি জানতে পারল জালাটি গর্ত হয়েছে, তখন সবাই একসঙ্গে জমায়েত হল।’
     ‘তারপর কী হল ?’
     ‘প্রায় এক হাজার পাখি সেখানে জমায়েত হল। তাদের মধ্যে একটি পাখি কিছু খেয়ে উড়ে চলে গেল।’ -
     ‘তারপর কী হল ?’
    ‘ তারপর আর একটি পাখি উড়ে চলে গেল।’
     ‘তারপর কী হল ?’
     ‘তারপর তৃতীয় পাখিটি উড়ে চলে গেল।’
     ‘তারপর কী হল ?’
     ‘চতুর্থ পাখিটি চলে গেল।
     ‘তারপর কী হল ?’
     ‘পঞ্চম পাখিটি চলে গেল।’ 
     ‘তারপর কী হল ?’ 
     ‘ষষ্ঠ পাখিটি চলে গেল।’ 
     ‘তারপর কী হল ?’ 
     ‘সপ্তম পাখিটি চলে গেল।’ 
     ‘তারপর কী হল ?’ 
     ‘অষ্টম পাখিটি চলে গেল।’ 
     ‘তারপর কী হল ?’ 
     ‘নবম পাখিটি চলে গেল।’ 
     ‘তারপর কী হল?  
     ‘দশম পাখিটি চলে গেল।’ 
     তখন বাদশা বললেন, ‘বীরবল আর কত পাখি উড়বার বাকি আছে?
     বীরবল বললেন, জাঁহাপনা, মাত্র দশটি পাখি উড়ে গেল। এখনও নয়শত নব্বইটি পাখি উড়ে যাওয়ার বাকি আছে।’
     ‘বেশ, বেশ, খুব ভাল। কিন্তু এ যাত্রার শেষ হবে কখন, বীরবল?’
     বীরবল একটা হাই তুলে মৌজের সঙ্গে বলেন, যখন হুজুরের, “তারপর কী হল”— বলা বন্ধ হবে।’
    এ-কথার পর আকবর তার ভুল বুঝতে পারলেন। কারণ তিনি ছিলেন বাক্‌রসিক। তিনি অবুঝ সম্রাট ছিলেন না। মানীর মান দিতে বা গুণীর গুণপনার মর্যাদা দিতে কোনওদিন ভুলতেন না। এরপর তিনি তারপর কী হল শব্দের ব্যবহার করেননি। সভাসদরা যখন বীরবলের এ ব্যাপার জানতে পারলেন তখন তাদের আর আনন্দ ধরে না। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করলেন যে, ‘বীরবলই বাদশার জন্য একমাত্র উপযুক্ত পাত্র, যিনি বাদশাকে ঠাণ্ডা রাখতে পারেন। আর কারও সাধ্য হত না— “তারপর কী হল” বন্ধ করা।’
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য