অতৃপ্ত হৃদয় - আদিবাসী লোককথা

     এ তো শুধু গল্প নয়! এ এক শোকগাথা। সেই কবে কোন অতীতে দুটি হৃদয় মিলতে চেয়েছিল, মিলন হয় নি। এ গান আজও আমরা গাই, বেদনার গান। আমাদের সমাজের সবাইকেই এই শোকগাথা জানতে হয়। বাছারা, তোমরাও শোন সেই বেদনার গান। তোমারাও বলবে।
      ওই পাহাড়ের নীচে একসময় ছিল এক মস্ত গ্রাম। আজ নেই। আজ ওখানে শুধুই মাঠ। ভেড়া চরে, মোষ চরে। সেই গ্রামে ছিল এক নামজাদা গোষ্ঠীপতি। মস্ত ধনী সে। তার প্রাসাদে ছিল অফুরন্ত সোনা-হীরে-রত্ন। কিন্তু সবচেয়ে দামি রত্ব ছিল একটি। সে গোষ্ঠীপতির মেয়ে। সব ধনরত্ব এক করলেও মেয়ের সমান হবে না। দুর্লভ সে বস্তু। বাবার তাই গর্বের শেষ ছিল না।
      স্বর্গের সব সুন্দরী পরীদের মাঝখানে আমাদের মাটি-পাথরের পৃথিবীর মেয়েকে রেখে দিলেও তাকেই শুধু চোখে পড়বে। মেয়ের দেহের চামড়া ছিল গলে-পড়া মোমের মতো, আলুলায়িত কেশগুচ্ছের রঙ ছিল দাঁড়কাকের গলার পালকের মতো,
      ঠোঁটদুটি ছিল রক্তপদ্মের মতো। এই ছিল আমাদের মেয়ে।
      গ্রীষ্মকাল আমাদের বড় প্রিয়। মেয়ে সতেরোটি গ্রীষ্ম পেরিয়ে এসেছে। টলটলে পবিত্র জলের মতো স্নিগ্ধ যৌবন। এমনটি বুঝি আর হয় না। একদিন। ফুলের বাগানে ফুলের সঙ্গে খেলা করছে মেয়ে। ফুল নড়ছে, গাছ নড়ছে, সেও এদিক-ওদিক দুলছে। কে বেশি সুন্দর । ফুল না মেয়ে? বোধহয় মেয়েই।
      বাগানের ওপার থেকে ভেসে এল অপরূপ সংগীত! একটি কিশোর গান গাইছে। পুরনো দিনের, হারিয়ে যাওয়া দিনের শোকগাথা। এ কি কষ্ঠ ! এ কি সংগীত! হৃদয়ের সমস্ত বেদনা উজাড় করা সংগীত ! কেন এই বেদনা?
      মেয়ে মনে মনে বলল, এই সুন্দর সংগীত কে গাইছে? এমন কষ্ঠ কার? সে কোনজন? মেয়ে এল বাগানের ওই দিকে, যেখান থেকে গান ভেসে আসছে। উঁকি দিয়ে বাগানের বাইরে দেখতে চাইল। পারল না। এমন ঘন লতা-পাতায় ছাওয়া বাগানের বেড়া, যে গাইছে তাকে দেখতে পাচ্ছে না।
      বাগানের ফুল-লতা-পাতাবাহার মেয়ের বড় প্রিয়। ছেলেবেলা থেকেই সে বাগানে যায়। বাগান তার আর এক সখী। কিন্তু এদিন থেকে সময় পেলেই সে বাগানে আসে। বাগান তাকে টানে। না, ঠিক বাগান নয়, বাগানের ওপার থেকে যে গান ভেসে আসে সেই গান যেন মেয়েকে পাগল করে তুলেছে। এক অদেখা রহস্যময় শিল্পী তার মিষ্টি গানে সর্দারের মেয়ের মন চুরি করে নিয়েছে। এ ছাড়া তার আর কিছুই ভালো লাগে না। হায়, মেয়ে বোধহয় জানে না, এক অদেখা কিশোরের কাছে সে তার মনপ্রাণ দিয়ে বসে আছে। মেয়ে হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে।
      কাউকে বলতে পারে না। তার মনের জ্বালা-বেদনা-আকুতি সে কাউকেই জানাতে পারে না। গুমরে মরে নিজের মধ্যে। সে-ও তো কিশোরী! আর কত সহ্য করবে ! একদিন মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ল। বিছানা নিল। রোগ বেড়ে চলে। একবারটি দেখতে চায় তার হুদয়ের আপন প্রেমিককে। এই অজানা কিশোরকে একবার দেখলেই হয়তো সে সুস্থ হয়ে উঠবে।
      বাবাও পাগলের মতো হয়ে উঠল। আদরের মেয়ের এ কি হল? অনেক বদ্যি এল, ওঝা এল। অনেক মন্ত্রপড়া, অনেক শিকড়-বাকড় খাওয়া। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। মেয়ে দিনেদিনে আরও রোগা হযে যেতে লাগল। শেষকালে ওঝা-বদ্যি সাদা চুলের মাথা নেড়ে বলল, “না, আমরা পারলাম না। এ রোগ আমরা সারাতে পারব না। আমাদের সব কৌশল, সব বিদ্যে, সব ওষুধ ব্যর্থ হল। এ রোগ অন্যরকম। তারা মাথা নিচু করে চলে গেল। বাবা ‘হায় হায় করে উঠল।
      দুঃখী বাবা বসে থাকে মেয়ের পাশে। মেয়ে কোন কথা বলে না। একদিন বাবা মেয়ের হাত নিজের কাঁপাকাঁপা হাতের মধ্যে নিয়ে আদর করছে। হঠাৎ বাবা বলল, ‘সোনা, আমার ছোট সোনা, কি হয়েছে বলতো? লজ্জা করিস না। বাবাকে লজ্জা করতে নেই। বল।
      মেয়ে ডাগর চোখে চেয়ে রইল বাবার দিকে। রক্তপদ্মের মতো সুন্দর পবিত্র মুখ লজ্জায় আরও রাঙা হল। চোখের ভাষায়ও কেমন লজ্জা-লজ্জা ভাব। মেয়ে মিষ্টি সুরে খুব আস্তে আস্তে সেই কথাটি বলল। সেই সংগীতের কথা, সেই অজানা কিশোরের কথা। বলেই মেয়ে চোখ নামিয়ে বাবার কোলে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
      বাবা ভাবল, সবই তো করা হল। তাহলে আর একটি কাজ করতে হবে। মেয়ের জনা সর্দার সবই করতে পারে। এখন সেই রহস্যময় গায়ককে নিয়ে আসতে হবে মেয়ের পাশে। যেমন করেই হোক।
      খুব বেশি চেষ্টা করতে হল না। কিশোরকে পাওয়া গেল। সে এই গাঁয়েরই ছেলে। মাঠে-মাঠে ভেড়া চরায়। তাকে সহজেই খুঁজে পাওয়া গেল। বাবা বলল, ওগো ছেলে, গাঁয়ের সর্দার হয়েও তোমার কাছে মিনতি করছি, একবার তুমি আমার বাড়িতে চল। আমার বাড়িতে রয়েছে একজন রোগী। সে তোমার গানে মুগ্ধ। সে তোমায় দেখতে চায়। মেয়ের এমন অবস্থায় গাঁয়ের সর্দারও কেমন সাধারণ মানুষ হয়ে গিয়েছে। সে মিনতি জানাচ্ছে। সর্দার হলেও সে পিতা।
      কিশোর কিছুই জানে না। কার রোগ, কেন রোগ। সে পবিত্র মনে সর্দারের সঙ্গে চলল। ঘরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেল। স্বর্গের একটি পরি তার দিকে চেয়ে রয়েছে। পরি চেয়ে রয়েছে ওই কিশোরের মুখপানে, যার কষ্ঠ তাকে পাগল করে তুলেছিল। এ মেয়েকে কিশোর কোনদিন দেখেনি। এ কিশোরকে এ মেয়ে কোনদিন দেখেনি। দুজনে চেয়ে রয়েছে, অপলক চোখে। এ কি মুখ। এ কি পবিত্ৰ চাহনি! দুজনেরই। মাটির তলা থেকে যেন জেগে উঠল মৃত আত্মা। কিশোরকে দেখামাত্র মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠল। হাজারো ফুল পাপড়ি মেলল মেয়ের মুখে, বৃষ্টি-ধোয়া আকাশের নির্মলতা দেখা দিল
মেয়ের দেহে।
       কিন্তু এই সুন্দর পবিত্র মুখ এ কি সর্বনাশ ডেকে আনল? মেয়ে সুস্থ-সতেজ। আর সেদিন থেকে কিশোর বিছানা নিল। সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। দিনে দিকে কিশোর বিছানার সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। সে ওই পবিত্র মুখকে ভুলতে পারছে না। আর একটিবারমাত্র সে ওই পরিকে দেখতে চায়।
কিশোর আরও অসুস্থ হয়ে পড়ল। আর বোধহয় তাকে বাঁচানো যাবে না। তার বাবা ছেলের মুখ থেকে সব শুনল। চোখের জল মুছতে মুছতে গেল সর্দারের বাড়িতে। হাঁটু ভেঙে বসে হাত জোড় করে মিনতি জানাল, ‘আমার ছেলের বোধহয় এবার ডাক এসেছে। ওগো সর্দার, আমাদের সর্দার, তোমার মেয়েকে একবার আমার ছেলের পাশে যেতে দাও। আমার নিভে আসা ছেলের পাশে। দয়া কর।
      সর্দার গর্জে উঠল, “সর্দারের মেয়ে যাবে রাখালের বিছানার পাশে? আমার মেয়ে যাবে রাখলের বাড়ি? সব মর্যাদা কি ভুলে গেলে? কাকে কি বলছ?
      কিশোর রাখলের বাবা কেঁদে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, বলল, একদিন তোমার মেয়ের পাশে আমার ছেলে এসেছিল। তেমনি, তেমনি একবার তোমার মেয়েকে যেতে দাও। ওই সময় বংশের কথা ভাবতে নেই। ওগো সর্দার, আমিও যে পিতা।
      সর্দার কোন কথা শুনল না। বাড়ির উঠোন থেকে রাখালের বাবাকে বের করে দিল। বাবা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এল।
      ছেলে জানল আর কোনদিন ওই পবিত্র মুখ সে দেখতে পাবে না। তাকে দেখতে দেওয়া হবে না। আর একবার দেখলেই সে ধন্য হত। হয়তো বাঁচত। না, তা হবার উপায় নেই। কোথায় রাখাল আর কোথায় সর্দারের মেয়ে। পরের দিন ভোরবেলায় কিশোর মারা গেল।
      কিশোরের পূর্ব-পুরুষেরা যেখানে মাটির নীচে শান্তিতে ঘুমিয়ে রয়েছে, কিশোরকেও নিয়ে যাওয়া হল সেখানে। সে-ও ঘুমিয়ে রইল মাটির নীচে। চিরকালের জন্য।
      রাতের আঁধার নামে, মানুষজন বাড়ি ফেরে, চারিদিক নিঝুম। তখন মাটির তলা থেকে গান ভেসে আসে, বিষাদের গান, শোকগাথা। কখনও ভেসে আসে গভীর দীর্ঘশ্বাস, কখনও যন্ত্রণার আর্তনাদ। কখনও ভেসে আসে বুকফাটা কান্না, হাহাকার। কখনও ফিসফিস্ কথা—ওগো, তোমরা একবার আমাকে দেখতে দাও। একবার। আমার প্রেমিকাকে। ওই সুন্দর পবিত্র পরিকে। আমার প্রেমিকাকে।
      চারিদিকে আতঙ্ক। সূর্য ডোবার পরে কেউ আর ওপথে যায় না। যদি চেপে ধরে ওই অতৃপ্ত আত্মা! আশা-না-মেটা আত্মারা বড় ভয়ানক।
      একদিন এক পুরোহিত চলেছে ওই পথে। মুখে তার দেবতার নাম। উদার আকাশের দিকে চেয়ে শান্ত পথে চলেছে পুরোহিত। হঠাৎ তার কানে এল হাহাকার ধ্বনি। শান্ত চিত্তে শব্দ লক্ষ্য করে সে এগিয়ে গেল। ভালোভাবে শুনল সেই হাহাকার। মনে মনে বলল, ‘হায়, অতৃপ্ত আত্মা, তুমি চিরশান্তিতে ঘুমোতে পারছ না? সে কোনজন? যাকে জীবনে না পেয়ে তুমি এভাবে কান্নায় ডুবে রয়েছ? এ আকুলতা কোন নিষ্ঠুর প্রাণের জন্য?
      গভীর রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দ পুরোহিত মাটির তলা থেকে তুলে নিল সেই গায়ক হৃদয়টি। বুকে জড়িয়ে ধরল। পরম যত্নে, অশেষ প্রীতিতে। কাছেই পুরোহিতের ছোট্ট মন্দির। সেখানে এসে একটি সুন্দর পাত্রের মধ্যে রেখে দিল সেই হৃদয়কে। তারপরে মাথা নুইয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, অতৃপ্ত হৃদয়, আজ থেকে আমার সমস্ত প্রার্থনা তোমাকেই করব, তোমার উদ্যেশেই আমি সব মন্ত্র উচ্চারণ করব। হয়তো তোমায় শান্তি দিতে পারব। একটি অতৃপ্ত হৃদয়কে ঘিরে আজ থেকে আমার সকল সাধনা। আকাশে মেঘ জমে বৃষ্টি হয়, করুণা আর দয়ার এক বিরাট মেঘখণ্ড হল এই পুরোহিতের হৃদয়।
      দিন যায়, রাত যায়, মাস বয়ে চলে। আকাশের চাঁদ নিজের পথ পালটায়। পুরোহিত সব মন্ত্র উচ্চারণ করে অতৃপ্ত হৃদয়কে ঘিরে। চিরশান্তি লাভ করুক এই হৃদয়—পুরোহিতের সব সাধনা একে ঘিরেই। কিন্তু সব ব্যর্থ হল। হৃদয় শান্তি পেল না। পাত্রের মধ্যে প্রতিদিন হৃদয় কেঁদে ওঠে, হাহাকার করে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, গান গেয়ে ওঠে। বেদনার গান। কখনও ফিসফিস করে বলে,—একবার দেখতে দাও আমার প্রেমিকাকে। তার পবিত্র মুখ কিছুতেই ভুলতে পারছি না।
      শেষকালে একদিন সর্দারের মেয়ে এল সেই নির্জন মন্দিরে। তাদের বাড়িতে তাকে দেখাশোনা করে এক বুড়ি। তার সঙ্গে মেয়ে এল। আজ পুণ্য দিন। দেবতার পায়ে ধূপ জ্বালিয়ে প্রণাম করতে এসেছে মেয়ে।
      নত হয়ে ধূপ জ্বালাচ্ছে মেয়ে। হঠাৎ চমকে উঠল মেয়ে। ধুপকাঠি পড়ে গেল হাত থেকে। অতি-চেনা কার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে? খুব কাছ থেকে। কোথায় শুনেছি এ কষ্ঠ? কোথায়? কোথায়?
      অপরূপ ভঙ্গিতে উঠে পড়ল মেয়ে। নিঃশব্দ পায়ে মন্দিরের মধ্যে হেঁটে চলল মেয়ে। এদিক থেকে ওদিকে। এগিয়ে গেল ওই দিকে, যেদিক থেকে হৃদয়-নিংড়ানো কণ্ঠ ভেসে আসছে। কিন্তু কেউ তো নেই? হঠাৎ সে পুরোহিতের ছোট্ট কুঠুরিতে ঢুকে পড়ল। মনে হয়, শব্দ আসছে ওখান থেকেই। দেখতে পেল, একটি পাটাতনের ওপরে বসানো রয়েছে একটি সুন্দর পাত্র। শুধু একটি পাত্র। অপরূপ কারুকাজ করা পাত্র। ওই পাত্রের ভেতর থেকেই কি কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে? বেদনার হাহাকার?
      হঠাৎ মন্দিরের চারপাশের গাছ থেকে অসংখ্য চড়ুই পাখি একসঙ্গে বলে উঠল, ওগো সুন্দরী মেয়ে, ওগো স্বর্গের পরি একবার ওই পাত্রের ভেতরে তাকাও, মুখ নিয়ে যাও পাত্রের ওপরে।
      এ কি? পাখিরা তাকে এই পাত্রের মধ্যে তাকাতে বলছে কেন? কোন অমঙ্গল? কোন অশুভ ইঙ্গিত? কিংবা অন্যকিছু? এক মুহুর্তের জন্য মেয়ে দ্বিধা করল। কুষ্ঠায় বিব্রত হল। কিন্তু পর মুহুর্তেই মেয়ে এগিয়ে গেল পাত্রের কাছে, কম্পিত হুদয়ে, বিস্মিত চোখে।
      কাঁপাকাঁপা হাতে পাত্রের ঢাকনা তুলে ফেলল মেয়ে। আস্তে পাশে রেখে দিল। বুক কাঁপছে। প্রস্ফুটিত রক্তপদ্ম নত হল পাত্রের ওপরে। পবিত্রতা ঝরে পড়ছে। আর সেই মুহুর্তে........
      নিস্তদ্ধ হল পাত্র। হাহাকার থেমে গেল। কান্না মিলিয়ে গেল। অতৃপ্ত হূদয় যা চেয়েছিল তা পেল। একটিবারের দেখা। শেষবারের মতো দেখা। শান্তি, শান্তি, শান্তি চারিদিকে। রক্তপদ্ম তবু চেয়ে রয়েছে পাত্রের ভেতরে, রক্তপদ্মের পাঁপড়িতে কয়েক ফোটা শিশিরবিন্দু।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য