Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

     ধাব্‌ধাবাপুরের প্রকাণ্ড ময়দানে মেলা বসেছে। বাইরে ফটকের উপর লেখা আছে “বিরাট শিল্প-প্রদর্শনী ও মেলা”। কত রকমের জিনিষপত্র এসেছে, কত তামাস...

নাম-না-জানা কল -- সুবিনয় রায়চৌধুরী

     ধাব্‌ধাবাপুরের প্রকাণ্ড ময়দানে মেলা বসেছে। বাইরে ফটকের উপর লেখা আছে “বিরাট শিল্প-প্রদর্শনী ও মেলা”। কত রকমের জিনিষপত্র এসেছে, কত তামাসার ব্যবস্থা হয়েছে, কত কলকব্জা চারিদিকে সাজান রয়েছে। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার লোক প্রতিদিন মেলা দেখতে আসে।
     এক জায়গায় একটা প্রকাণ্ড কল বসান হয়েছে, তার চারি দিকে উঁচু বেড়া দিয়ে অনেকখানি জায়গা ঘেরা। বেড়ার ফটকে প্রকাণ্ড সাইন বোর্ড, তার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—

“হাজার টাকা পুরস্কার! এই অদ্ভুত, অত্যাশ্চৰ্য্য, অতিআধুনিক কলের নাম যিনি বলিতে পারিবেন তাহাকে উক্ত পুরস্কার দেওয়া যাইবে। দর্শনী মাত্র ১০ টাকা !”

     হাজারে হাজারে লোক প্রতিদিন কলটিকে দেখতে আসে। হ্যান্ডবিলে লেখা আছে —“এই কলের নাম কল আপনিই প্রমাণ করিবে—আমাদিগকে কোনরূপ প্রমাণ দিতে হইবে না।
     কলের নাম লিখিয়া জানাইবার সময় নিজের নাম ঠিকানা স্পষ্টভাবে লিখিবেন। একজনে একটি মাত্র নাম পাঠাইতে পারেন। দর্শনী অতি সামান্য; কাজেই, যতবার ইচ্ছা আসিয়া কলটিকে ভালরূপে দেখিয়া যাইতে পারেন। কলের চারিদিকে যে তারের বেড়া আছে তাহার ভিতরে যাওয়া নিষিদ্ধ। কলের কারিকরদের সহিত কথা বলাও নিষিদ্ধ। মেলার শেষ দিনে পুরস্কার ঘোষণা করা হইবে।”

     মেলার প্রথম থেকেই কল দেখার জন্য হাজারে হাজারে লোক প্রতিদিন আসতে লাগল। একটা হোগলার চালার নীচে কলটি বসান হয়েছে ; চেহারাও কিম্ভুত কিমাকার। তার ভেতর কত রকমের যে কল-কব্জা আছে তা’ বলা যায় না। উপরে চোঙা, দুটি ডানার মতনও আছে; কত চাকা আছে তার হিসাবই নাই; উপরে, নীচে, ডাইনে, বাঁয়ে কেবল চাকা, হ্যান্ডিল, বলটু, পাটি, দাঁতী, নল, চোঙা, মিটার ইত্যাদি। কলের আশে পাশে থলে, বালতি, টিন, বাক্স, বোতল, পিপে—কত কিছু যে রাখা আছে তা আর কি বলব। কলের কোন জায়গা কালো, কোন জায়গা সাদা, কোন জায়গা লাল, কোন জায়গা নীল, কোন জায়গা বেগুণী, কোন জায়গা সবুজ, কোন জায়গা হলদে। কলের খানিকটা লোহার তৈরী, খানিকটা তামার, খানিকটা পিতলের, খানিকটা সীসার, খানিকটা কাঠের, খানিকটা সিমেন্টের, খানিকটা কাপড়ের, খানিকটা
কাগজের ।
     সকালে মেলা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই কলটি চলতে আরম্ভ করে আর দেখতে দেখতে চারিদিক লোকে লোকারণ্য হ’য়ে যায়।
     সকলেই খুব মন দিয়ে কলটিকে দেখে তার নাম সম্বন্ধে ফিস ফিস্ পরামর্শও চলে। তর্ক-বিতর্কও যথেষ্ট হয়, কারণ কল দেখে বুঝবার জো নাই কিছুই। কত রকমারি তার আওয়াজ, কত অদ্ভুত তার চলার ভঙ্গি, কত রকমেরই গন্ধ তার ভেতর থেকে বের হচ্ছে, কত ধোঁয়া, কত অদ্ভুত জিনিষই বের হচ্ছে চারিদিক দিয়ে। যে লোকগুলো কলে কাজ করছে তাদের চেহারা দেখলে যতই কেন না হাসি পা’ক, তারা নিজে অতি গম্ভীরভাবে কাজ ক’রে চলেছে ।
     প্রতিদিন বড় বড় বৈজ্ঞানিক, পণ্ডিত, প্রোফেসার, ডাক্তার, সাহিত্যিক, উকিল, মোক্তার, জজ, দারোগা, এঞ্জিনিয়ার, ব্যবসাদার এর সব তো কল দেখতে আসেনই, তাছাড়া ছাত্র, নিষ্কৰ্ম্ম লোক, সাধারণ কারিগর ইত্যাদিও হাজারে হাজারে আসেন। যতই কলটিকে পরীক্ষা করা হয় ততই নূতন নূতন নাম মনে আসে।
     সেদিন তো প্রোফেসার শমনদমন চক্ৰবৰ্ত্তীর সঙ্গে বিখ্যাত এঞ্জিনিয়ার বিপদবারণ খাসনবিশের রীতিমত তর্কাতর্কিই হয়ে গেল। কলটি চলতে চলতে ‘কট-কট’ ‘খিট-খিট’ ‘ভি-র-র’—‘দুম দুম’ শব্দ ক’রে তার উপর দিয়ে কিছু ধোঁয়া বের হলো আর পাশ দিয়ে সাদা রঙের কি যেন হাল্কা জিনিষ বের হ’লো খানিকটা । শমনদমন বাবু বললেন, “এটা অটোমেটিক চরকা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।” বিপদবারণ বাবু মুচকি হেসে বললেন, “বরং তূলো ধোন কল বলতে পারেন, চরক হওয়া অসম্ভব। আমার মনে হয় এটা একটা নতুন প্যাটানের এরোপ্লেন। ডানা দুটির গড়ন দেখলে কোন এঞ্জিনিয়ার বলবে না যে এটা এরোপ্লেন নয়। এঞ্জিনের এ রকম ‘ভ-র-র’ আওয়াজ শুধু এরোপ্লেনেরই হয়।”
     ঠিক এমন সময় আবার কলটি অন্য সুর গাইতে আরম্ভ করল। কর্‌র’—‘কর্‌র ‘ঠ্যাস’—‘ঠ্যাস’—‘দ্রাম’—‘দ্রাম’—‘ঘর্‌র'—‘ঘর্‌র শব্দ ক’রে কলের মধ্যে কি যেন চিক্‌মিক্‌ ক’রে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে কতগুলো গুড়ো জিনিষ একটা থলের মধ্যে গিয়ে ভূস ক’রে পড়ল। বিপদবারণ বাবু মাথা নেড়ে বললেন, “ভেতরে স্পার্ক যখন বের হচ্ছে আর যখন কয়েল (Coil) রয়েছে ভেতরে তখন একটা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার কল ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।” শমনদমন বাবু চোখ টিপে অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, “ইঞ্জিনিয়ারের মাথায় কেবলই খট-মট রকমের নাম ঘুরছে। সহজ জিনিষটা বুঝি আর মাথায় আসে না? মোটা ভূমি শুদ্ধ আটাগুলো যে বস্তার মধ্যে গিয়ে পড়ল সেটা বুঝি আর আপনার চোখেই পড়ল না? আজকালকার দিনে ভূষিশুদ্ধ আটার বেশী আদর, কারণ তাতে পূরোমাত্রায় ভিটামিন থাকে। এটা আধুনিক আটাকল ছাড়া অন্য কিছুই হ’তে পারে না।”
     এভাবে তর্ক আরো কতক্ষণ চলত জানি না । হঠাৎ ঝমাঝম বৃষ্টি নামায় দু'জনেই ছাতা মাথায় দিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন।
     তা’র পরেও প্রতিদিনই হাজারে হাজারে লোক সেই কল দেখতে আসে আর একশ’ রকমের নাম তাদের মাথায় আসে। কলটি দেখে বা তার আওয়াজ শুনে ঘূণাক্ষরে কিছু বুঝবার জো নাই। কেউ বলে “এটা ছাপার কল,” কেউ বলে “ধান-ভাঙা কল,” কেউ বলে, “অটোমেটিক তাঁত,” কেউ বলে “করাত কল,” কেউ বলে “ষ্টিম-রোলার,” কেউ বলে “পাম্প করার কল,” কেউ বলে “গেঞ্জির কল”, কেউ বলে “মাখন-তোলা কল,” কেউ বলে “কাগজের কল,” কেউ বলে “পেরেক তৈরীর কল,” কেউ বলে “বরফ-কল”।
     একটা ছেলে রোজই কল দেখতে আসে আর দূরে থেকে হাঁ ক’রে চেয়ে থাকে। দুনিয়ার যত কল আছে, সবেরই নামের সে একটা ফৰ্দ্দ বানিয়েছে, কিন্তু তার একটা নামও পছন্দ হয় না ; সে শুধু মুণ্ডু নেড়ে বলে, “ওরকম নাম হ’তেই পারে না ।” সকলেই সেই ছেলেকে “হাঁদারাম” বলে, আর সকলেই তা’কে নিয়ে ঠাট্টা করে। সে কিন্তু দমবার পাত্র নয়। প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্য্যন্ত সে প্রত্যেক দিন ফর্দ হাতে নিয়ে হাঁ ক'রে কলের দিকে আর লোকের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দেখেছে। তার মুখে কেউ একটিবারও হাসি দেখতে পায় নি; শুধু শেষের দিনে সে একবার একটু মুচকি হেসে একখানা কাগজে কি-যেন লিখে কলের মালিকের হাতে দিয়ে দিল।
     মেলার শেষ দিনে সন্ধ্যার পর সেই কলের চারিদিকে লোকে লোকারণ্য হয়েছে; আর পাঁচ মিনিট পরেই পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। সকলেই উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে, এমন সময় কলের মালিক একখানা উঁচু টেবিলের উপর উঠে গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন, “উপস্থিত ভদ্ৰ-মহোদয়গণ! আপনাদের সহানুভূতি ও ধৈৰ্য্যের জন্য ধন্যবাদ । ১,২৫,৫৭৫টি নাম পড়া বড় সহজ নয়। তাহার মধ্যে একজন মাত্র কলের ঠিক নাম বলিতে পারিয়াছেন । তাঁহার নাম—স্ত্রীরামধন পোদ্দার ; ঠিকানা—ছাগলাপাড়া, গর্দ্দভপুর। ইহাকেই ১০০০ টাকার পুরস্কার দেওয়া হইবে।”
     অমনি সকলে বলতে লাগল, “রামধন পোদার কে রে?” “লোকটার তো খুব বুদ্ধি ” “দ্যাখ তো কোন লোকটা; একবার চোখে দেখা দরকার তা’কে ৷”
খানিক বাদেই দেখা গেল একটা লোক ভিড় ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আসছে আর বলছে, “রাস্তা ছাড়ুন মশায় ! পুরস্কার আনতে যেতে হবে।” 
     ও হরি ! এ যে সেই “হাঁদারাম " শেষটায় কিনা এই লোকট। পুরস্কার পেলে! —আরে রাম! রাম! রাম! –কিন্তু, তা' বললে কি হবে? লোকটা তো কলের নামটা ঠিকই বলেছে !
হ্যাঁ হ্যাঁ— কলের নামটা বলা হয় নি ! নামটি হচ্ছে— “ভিড়-জমানো কল।”
     এই নামটিই যে কলটার উপযুক্ত নাম সে বিষয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? এর প্রমাণও কি যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায় নি?

গল্পটির ইপাব(epub) ডাউনলোড করে রাখো
ডাউনলোড: Epub

0 coment�rios: