পিস্তলের গুলি -- সুবিনয় রায়চৌধুরী

বলবন্ত সিং ছেলেবেলায় আমাদের ক্লাসে পড়ত। তার বাড়ী পাঞ্জাবে; বেশ সুপুরুষ চেহারা; লম্বায় তখনই সাড়ে পাঁচ ফুট ছিল। তারপর আর তার সঙ্গে বহুদিন দেখা হয় নি,—প্রায় ১৫|১৬ বছর কেটে গেছে। দু'জনে খুবই বন্ধুতা ছিল বটে; কিন্তু তার ঠিকানা আমার জানা না থাকায়, আর আমার ঠিকানা ও তার জানা না থাকায় দু’জনে চিঠি লেখালেখি চলে নি।
     সেবার পূজোর ছুটিতে পাঞ্জাব বেড়াতে যাই। লাহোরে আমার বিশেষ বন্ধু বিজয় ঘোষ ওকালতী করে; তারই বাড়ীতে ওঠা স্থির হয়। লম্বা রাস্তা, যেন আর ফুরোয়ই না ; ঠাণ্ডাও বেশী পড়েনি তখনও। ট্রেণ তখন লাহোরের কাছাকাছি এসেছে; আমি ক্লান্ত হয়ে একটু ঝিমাচ্ছি। হঠাৎ দরজা খুলে একটি লোক কামরায় ঢুকে পড়ল আর সামনে আমাকে দেখে “আরে!” বলে আমার কাঁধে হাত দিল। চমকে চেয়ে দেখি বলবন্ত সিং আমার সামনে।
     তখনই আমি সরে গিয়ে বলবন্ত সিংকে পাশে বসালাম আর সঙ্গে সঙ্গে কুশল প্রশ্ন ইত্যাদি চলতে লাগল। বলবন্ত বলল, “আমি স্কুল ছেড়ে পাঞ্জাবে চলে আসি ; এখানের ইউনিভার্সিটিতে আইএসসি পাশ করে কৃষিবিদ্যা শিখবার জন্য এগ্রিকালচারাল কলেজে ভর্তি হই। সেখান থেকে পাশ করে কিছুদিন সরকারী চাকরী করি। সম্প্রতি সে চাকরী ছেড়ে নিজে চাষবাস করার মতলব করছি। চার বছর হলে আমার বাবা মারা গেছেন; তার সব সম্পত্তির অধিকারী আমিই। লাহোর থেকে প্রায় ২০০ মাইল দূরে কিষণপুরে আমার দু'হাজার বিঘে জমি আছে ; সেখানেই আমি থাকব স্থির করেছি। জায়গাটা খুব স্বাস্থ্যকর; সেখানকার দৃশ্যও বড় চমৎকার। অসুবিধার মধ্যে, ৩০ মাইল গরুর গাড়ীতে যেতে হয়; তবে আমি ঘোড়ার টঙ্গার ব্যবস্থা করছি। তোমাকে ভাই একবার আমার ওখানে যেতেই হবে; কিছুতে ছাড়ছি না।”
     আমি বললাম, “বন্ধু বিজয় বাবু যদি নিতান্ত নারাজ না হন, নিশ্চয়ই যাব। তোমার ঠিকানাটা দাও ভা ; আমার ঠিকানাটাও লিখে রাখ। ”
     কথা বলতে বলতে ট্রেন লাহোরে পৌছিয়ে গেল। ষ্টেশনে বিজয় এসেছিল; তার সঙ্গে বলবন্ত সিংএর আলাপ করিয়ে দিলাম। বিজয় বলবন্তকে অনেক পীড়াপীড়ি করল তার বাড়ীতে থাকবার জন্য; বলবন্ত কিছুতে রাজী হ’লো না; সে সরাইখানাতে গিয়ে উঠল। সেখান থেকে রোজই সে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে; অনেক গল্প-গুজব হয়। তিনদিন পর যখন আমার লাহোর দেখা শেষ হ’লো, তখন বলবন্ত বলল, “এবার আমার ওখানে যেতে হচ্ছে ভাই। বিজয় বাবুকে নিয়ে কাল দুপুরের গাড়ীতে রওয়ান হয়ে হারবনওয়ালা ষ্টেশনে পৌঁছাব। রাত্রে ওয়েটিং রুমে ঘুমিয়ে ভোর বেলা রওয়ানা হয়ে ১১টার মধ্যে কিষণপুর পৌছাব। আমিও অনেক দিন সেখানে যাইনি। কাল সেখানকার জমিদারের চিঠি পেলাম ; আমাকে চিঠি পেয়েই যেতে লিখেছে। হারবনওয়ালায় ঘোড়ার টঙ্গার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।”
     পরদিন খাওয়া দাওয়ার পর আমি, বিজয় আর বলবন্ত ১২টার ট্রেণে রওয়ানা হয়ে পড়লাম। সন্ধ্যার সময় হারবনওয়ালায় পৌছে ষ্টেশনের ওয়েটিং রুমে রাত্তিরটা কাটালাম । 
     ভোর বেলা উঠে, চা খেয়ে, আমরা ঘোড়ার টঙ্গায় রওয়ানা হয়ে পড়লাম। রাস্তা বেশ পরিষ্কার, ধূলো-বালি নাই বেশী। জঙ্গল মাঝে মাঝে রয়েছে, ছোট পাহাড়ও বিস্তর আছে। পথে এক জায়গায় ঘোড়া বদল হ’লো ; সেখান থেকে কিষণপুর ১৫ মাইল। বেলা সাড়েদশটায় আমরা বলবন্তের সম্পত্তির দরজায় পৌছালাম।
     গাড়ী থেকে নেমে যা দেখলাম তাতে আমার মনে বড়ই আনন্দ হ’লো। চারিদিক সুন্দর গাছপালায় সবুজ হয়ে আছে; পিছনে দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে, একটি ছোট নদীও বয়ে যাচ্ছে। বাগানের মাঝে একটি ছোট্ট বাংলো ধরণের বাড়ী। উঁচু থামের উপর তিনটি কাঠের ঘর, তার চারিদিকে বারান্দা ; কাঠের সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে ঘরে ঢুকতে হয়। ঘরের উপরে লাল টালির ছাত, ঘরের রং সবুজ। দূর থেকে সুন্দর ছবির মত দেখায়।
     আমরা পৌঁছাবামাত্র বলবন্তের জমিদার বুড়ে নিরঞ্জন সিং দৌড়ে এসে সকলকে সেলাম করল। তার বয়স প্রায় ৭০ বছর, কিন্তু শরীর খুব সবল আছে। লম্বায় প্রায় সাড়ে চার হাত; ধবধবে সাদা দাঁড়ি-গোঁফ। মুখে কিন্তু তার ভয়ের চিহ্ন। আমাদের বারান্দায় বসবার ব্যবস্থা ক’রে দিয়ে সে খাবার আনতে গেল।
     খেতে বসে আমরা নিরঞ্জনের কাছে যে ঘটনা শুনলাম তা’তে আমাদের মন অনেকটা দমে গেল। সে বলল যে কিষণপুরের ঐ  বাগানে নাকি অনেকদিন থেকে ভূতের বাস। সে প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস করে নি, এবং প্রথমে কিছুদিন ভূতের নাম-গন্ধও ছিল না। শেষে শুনতে পেল যে, ভূত নাকি শরৎকালে চাঁদনী-রাতে দেখা দেয়। প্রথমে সে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তিন দিন আগে যা সে নিজের চোখে দেখেছে তাতে ভূতকে আর অবিশ্বাস করা চলতে পারে না।
তিন দিন আগে সন্ধ্যার পর সে দক্ষিণের বারান্দার উপর বসে ছিল। সেদিন শুক্লপক্ষের একাদশী; সুন্দর জ্যোৎস্না হয়েছে। কতক্ষণ বসেছিল তার মনে নাই। বাগানের মালী শাৰ্দ্দূল সিং সঙ্গে ছিল। দু'জনে গল্প করতে করতে সবেমাত্র একটু ঘুমাবার চেষ্টা করছে, এমন সময় হঠাৎ মনে হ’লো যেন সোঁ সোঁ শব্দে ঝড় উঠেছে। চমকে সামনে চাওয়া মাত্র দেখতে পেল প্রকাণ্ড একটা সাদা মূৰ্ত্তি উর্দ্ধশ্বাসে তাদের দিকে ছুটে আসছে। দু'জনেই উঠে ঘরে পালাবার চেষ্টা করল, কিন্তু একটু দূরে গিয়েই মাথা ঘুরে পড়ে গেল। তারপর কি হ’লো মনে নাই। অনেকক্ষণ পরে যখন তাদের চেতনা হ’লো তখন দে ল যে ভোর হয়ে গেছে, আর তারা দু’জনেই ঘরের দরজার সামনে পড়ে আছে। সেদিন থেকে ভয়ে তা’রা রাত্রে ঘরের ভিতর শোয়, কিন্তু ভূত আর সেদিন থেকে আসে নি। এর আগেও নাকি একটি লোক ঐ দক্ষিণের বারান্দা থেকে শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্না রাতে ঠিক ঐ রকমের ভূত দেখতে পেয়েছিল। নিরঞ্জন সিং সাহসের জন্য বিখ্যাত ; লড়াইয়ে সে
অনেক মেডেলও পেয়েছে। কিন্তু সেদিনের ভূত তা’কে ভয়ে একেবারে কাবু ক’রে ফেলেছিল।
     খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা বাগানে বেড়াতে গেলাম আর পরামর্শ চলতে লাগল রাত্রে কি করা যায়। বলবন্ত ভূতে বিশ্বাস মোটেই করত না ; আমি আর বিজয়ও অনেকটা সাহসী ছিলাম ; কাজেই ভূতের ভয়ে আমরা পিছপা হ’লাম না। পরামর্শ করে ঠিক করলাম সেই রাত্রেই (সেদিন পূর্ণিমা ) আমরা তিনজনে দক্ষিণের বারান্দায় শুয়ে থাকব ; বলবন্তের হাতে পিস্তল থাকবে ; আমার কাছে বন্দুক থাকবে। ভূত দেখলেই তাকে গুলি করব।
     গল্প-গুজব, বেড়ান, চা খাওয়া, রাত্রের খাওয়া ইত্যাদি সারতে রাত ৮টা বাজল। ততক্ষণে দক্ষিণের বারান্দায় আমাদের বসবার জন্য গালিচা আর তাকিয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেছে ; আমরাও খাওয়া দাওয়া সেরে দিব্য আরামে তাকিয়া ঠেস দিয়ে গল্প-গাছা করতে লাগলাম, আর মাঝে মাঝে দক্ষিণের পাহাড়ের দিকে আর গাছপালার দিকে নজর দিতে লাগলাম। চমৎকার জ্যোৎস্না, দিব্য ফুরফুরে বাতাস, সুন্দর ফুলের গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে, তার উপর পথের ক্লান্তি—কাজেই ঘুম আর কতক্ষণ আটকা থাকে? ক্রমেই আমাদের তন্দ্রা বোধ হ’তে লাগল। বলবন্ত সিং কিন্তু তখনও সজাগ।
     কিছুক্ষণ বাদে বিজয় আর আমি একরকম ঘুমিয়েই পড়লাম ; বলবন্তও ঝিমাতে লাগল ;–হঠাৎ ঝড়ের মত সোঁ সোঁ আওয়াজ হ’লে আর সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পেলাম দক্ষিণ দিক থেকে প্রকাও একটা সাদা মূৰ্ত্তি শূণ্যপথে উদ্ধশ্বাসে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। আমি বন্দুক উঠাতে চেষ্টা করলাম; হাত কেঁপে বন্দুক পড়ে গেল। বলবন্ত দুড়ুম ক’রে পিস্তল ছাড়ল, কিন্তু মূৰ্ত্তির কিছুই হ’লো না। আমরা তিনজনেই উঠে ঘরের দিকে ছুটতে চাইলাম কিন্তু মাথা ঘুরে তিনজনেই পড়ে গেলাম।
     যখন চেতনা হ’লে৷ তখন দেখলাম ভোর হয়ে এসেছে। মাথা তখনও যেন ঘুরছে। আগের রাতের ঘটনা সব স্বপ্নের মত মনে হ’তে লাগল।
     সকালে চা খেয়ে আমরা তিনজনে আগের রাতের ঘটনার বিষয় আলোচনা করতে বসলাম। মূৰ্ত্তিটা যে কি রকম ছিল তা’ স্পষ্টভাবে কারো মনে নাই ;—শুধু আব ছায়া গোছের মনে আছে। ঝড়ের শব্দটা তিনজনেই এক সঙ্গে শুনেছি কি না তাও ঠিক বোঝা গেল না; তবে মোটামুটি এই বোঝা গেল যে, প্রথমে তিনজনেরই মাথা ঘুরেছিল, তারপর তন্দ্রার ভাব এসেছিল, তা’র কিছুক্ষণ পরে ঝড়ের শব্দ শোনা গেছিল।
     সেদিন রাত্রে কি করা হবে সে বিষয়ে আমরা ঠিক ক’রে নিলাম। বলবন্ত বলল, সে দক্ষিণের বারান্দায়ই থাকবে; আমি থাকব পশ্চিমের বারান্দায়, বিজয় থাকবে দক্ষিণের ঘরে। প্রত্যেকের হাতেই পিস্তল থাকবে ; মূৰ্ত্তি দেখা দিলেই ঐ ঐ বলে প্রত্যেকে অন্যদের জানিয়ে দেবে। ঝড়ের শব্দ শোনা গেলেও জানাবে।
     সারাদিন ঘোরাঘুরি, গল্প-গুজব ক’রে কাটিয়ে রাত্রে আমরা কথা-মত যে-যার জায়গায়—বসলাম আর কথাবার্তা চলতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদে বলবন্ত ঝিমাতে লাগল; বিজয় আর আমি গল্প করতে লাগলাম। হঠাৎ বলবন্ত চীৎকার ক’রে উঠল “ঐ-ঐ-ঐঝড় ; একটু বাদেই আবার বলল, ঐ-ঐ-মূৰ্ত্তি ;–ব’লেই দুড়,ম ক’রে পিস্তল ছেড়ে দিল। আমরা কিন্তু ঝড়ও শুনলাম না, মূৰ্ত্তিও দেখলাম না।
     ছুটে গিয়ে বলবন্তকে দু’জনে ধ’রে টানাটানি ক’রে পশ্চিমের বারান্দায় নিয়ে এলাম ; তখনও সে অজ্ঞান হয় নি, কিন্তু টলছে। খানিকক্ষণ বাতাস করার পর তার মাথা পরিষ্কার হয়ে গেল ; তখন সে আমাদের জিজ্ঞাসা করল, ঝড়, মূৰ্ত্তি এ সব আমরা টের পেয়েছি কি না। আশ্চর্য্যের বিষয় আমরা দু’জনে ঝড়ের শব্দ একটুও শুনি নি, মূৰ্ত্তিও দেখি নি। মাথাটা খুব সামান্য ভার মনে হয়েছিল; আর কিছুই টের পাই নি। অথচ, আমরা তিনজনেই একদিকে চেয়ে ছিলাম।
     সারারাত আমি এ বিষয় বসে ভাবলাম। ছেলেবেলা থেকে সায়েন্স পড়ার সখ আছে ; দু’চারটা পুথিও নাড়াচাড়া করেছি, কাজেই এ বিষয়ের একটা বৈজ্ঞানিক মীমাংসার কথা মাথায় ঘুরতে লাগল। বিজয় আর বলবন্ত এটাকে একটা ভৌতিক কাণ্ড ব’লেই ধ’রে নিল। বলবন্ত স্পষ্টই বলল, “এতদিনে আমার ভূতে বিশ্বাস জন্মাল। চোখের দেখা তো আর অবিশ্বাস করতে পারি না ।”
     সকালে উঠে বিজয় আর বলবন্ত বাগানে বেড়াতে গেল; আমি আর তাদের সঙ্গে গেলাম না; চুপচাপ একটু তদন্ত করবার চেষ্টায় বাড়ীর দক্ষিণ দিকে গেলাম। থামের উপর বাড়ীটি তৈরী করা হয়েছে ; সেই থামের গায়ে সুন্দর লতা বেয়ে উঠেছে ; তা’তে কেমন সুন্দর সোণালী ফুল ফুটেছে ; তার গন্ধই বা কি সুন্দর। একটি লতা একটু নূতন ধরণের। তার পাতার রং লালচে গোছের ; একটি মাত্র প্রকাণ্ড বেগুনি ফুল সেই লতায় ফুটেছে। ফুলটি বারান্দার রেলিংএর গায় ; সকালবেলা আধ-ফুটে অবস্থায় রয়েছে। এমন সুন্দর ফুল আমি খুব কমই দেখেছি।
     দক্ষিণ দিকের শোভাটা এত সুন্দর যে আমি ভূতের বিষয় তদন্তের কথা একেবারেই ভুলে গেলাম। চারিদিক দেখতে দেখতে আবার বারান্দার দক্ষিণ দিকে উঠে গেলাম ; ইচ্ছা, সেই ফুলটি ভাল ক’রে দেখি। কাছে গিয়ে দেখলাম ফুলটি দূরে থেকে যত সুন্দর, কাছ থেকে আরও অনেক বেশী সুন্দর দেখায়। ফুলের গায়ে কি সুন্দর কাজ করা ! কাছ থেকে ফুলের গন্ধটিও খাসা। রাত্রে যে গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছিল সে এই ফুলেরই গন্ধ।
     একটু বাদেই ফুলের গন্ধে আমার মাথাটা ঘুরতে লাগল— আমি চট্‌ ক’রে সরে এলাম। তখনই কানের মধ্যে একটু সোঁ সোঁ আওয়াজ হ’লো, আর চোখের সামনে একটা সাদা গোছের পর্দার মত জিনিষ দেখা দিল ; সঙ্গে সঙ্গে মাথাটাও ঘুরে গেল। কিছুক্ষণ বাতাসে বসার পর আবার মাথা পরিষ্কার হয়ে গেল ; সঙ্গে সঙ্গে ভূতের ব্যাপারও অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল। তখন বুঝলাম, ঐ ফুলের গন্ধেই আমাদের নেশার মত হ’তো আর তা’রই ফলে ঝড়ের শব্দ, মূৰ্ত্তি দেখা, এ সব আমরা শুনতাম এবং দেখতাম। নেশা ক্রমে ঘোর হয়ে অজ্ঞান ক’রে ফেলত এবং অজ্ঞান হবার অল্পক্ষণ আগেই চোখের সামনে ঝাপসা সাদা মূৰ্ত্তি দেখা যেত। আমরা কেউ মূৰ্ত্তিটি আবছায়া গোছের ছাড়া স্পষ্ট দেখি নি এবং মুহুর্তের মধ্যেই সেটি মিলিয়ে যে ; তার পর চেতন থাকত না। সেই ফুলের লতা নাকি বলবন্তের বাবার এক বিশেষ বন্ধু হনলুলু থেকে এনেছিলেন। ফুলের দোষ-গুণ তিনি জানতেন না; তার অপরূপ চেহারা দেখেই লতাটি অনেক টাকা দিয়ে কিনে, খুব যত্ন ক’রে ভারতবর্ষে এনে বলবন্তের বাবাকে উপহার দিয়েছিলেন। আগের দিন বাগানে বেড়াবার সময় বলবন্ত ঐ ফুলের লতার কথা আমাকে বলেছিল। শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্না রাতে ফুল ফুটুত।
     সেদিন রাত্রে আমি দক্ষিণের বারান্দায় থাকব ঠিক করলাম ; বলবন্ত থাকবে পশ্চিমের বারান্দায়, বিজয় দক্ষিণের ঘরে।
     রাত্রে আমরা যে-যার জায়গায় বসে গল্প করতে লাগলাম। আমি মাথাটাকে পিছনে হেলিয়ে সেই বেগুনি ফুলটি থেকে যথাসম্ভব দূরে রেখেছি আর তা’র দিকে নজরও রেখেছি। জ্যোৎস্না দেখা দেবার সঙ্গে সঙ্গে ফুলটি আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে দেখছি, আর সঙ্গে সঙ্গে তার গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে।
বুঝলাম, বেশী দেরি করা উচিত হবে না ; তাই হঠাৎ "ঐ-ঐ বলে চেঁচিয়ে, চট্‌ ক’রে উঠে ফুলটিকে ছিঁড়ে দূরে ফেলে দিলাম ; সঙ্গে সঙ্গে দুড়ুম্ ক’রে পিস্তলও ছেড়ে দিলাম। তার পর আস্তে আস্তে হেঁটে বলবস্তের কাছে গিয়ে বললাম, “দেখলে না, ভূতকে গুলি ক’রে মেরে ফেললাম?” বলবন্ত ভয়ে কাঁপছিল। আমার কথা শুনে বলল, “ভূত আমি দেখতে পাই নি ; তবে তাকে মেরে ফেলেছ শুনে নিশ্চিন্ত হ’লাম।” আমি বললাম, “চল যাই ঘুমাই গিয়ে।”
     পরদিন সকালে উঠেই আগে আমি বাগানে গিয়ে সেই ফুলটি দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি, ফুল একেবারে শুখিয়ে গেছে। তখনই তা’কে মাটিতে পুতে ফেললাম। তার পর সেই লতার শিকড়টি টেনে উপড়িয়ে ফেলে দিলাম ;—যা”তে আর না গজায়। আশে-পাশে বেশ করে খুজে দেখলাম সেই লতা আর আছে কিনা —দেখলাম একটিও নাই ।
সে রাত্রে আমরা তিনজনেই দক্ষিণের বারান্দায় রইলাম। রাত্রে সুন্দর জ্যোৎস্না উঠল ; ফুরফুরে বাতাস বইল ; চমৎকার ফুলের গন্ধ পাওয়া গেল—কিন্তু, সেদিনের গন্ধটা যেন একটু অন্য ধরণের । বলবন্ত বলল, “ভূত পালাবার সঙ্গে সঙ্গে কি ফুলের গন্ধও বদলে গেল ?” আমি শুধু “হু” বললাম। সে রাত্রে আর ভূত দেখা দিল না ;—এমন কি, তখন থেকে নাকি সেখানে ভূত আর দেখাই দেয় নি। এর জন্য বলবন্ত আমার প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ; সে বলল, “পিস্তল তো অনেকেই ছোড়ে ; কিন্তু, তোমার মত অব্যর্থ হাত কারো নাই।”

গল্পটির ইপাব (Epub) ডাউনলোড করো
ডাউনলোড : Epub
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য