বুড়ীর পাল্লায় মানুষ খেকো কুমীর -- মোহাম্মদ নাসির আলী

     নারায়নগঞ্জ বাংলাদেশের একটি প্রসিদ্ধ নদীবন্দর। এ বন্দর থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার পাট রপ্তানী হয় দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে। নারায়নগঞ্জ থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে ব্ৰহ্মপুত্র নদের পাড়ে এক সময়ে একটি কুঠিবাড়ী ছিল। বাড়ীটি ব্যবহৃত হতো ডাকবাংলো হিসেবে। সরকারী কর্মচারির কাজে এসে সময় সময় সেই বাড়ীতে আশ্রয় নিতেন। ঢাকা জেলায় জরিপের কাজ তদারকের জন্যে মিঃ অগাস্টাস সোমার ভাইল নামে একজন ইংরেজ কিছুকাল সেই বাড়ীতে ছিলেন। পুরাতন এ বাড়ীটির আশেপাশে গ্রাম্য লোকজন অনেক ছিল কিন্তু সাহেবের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে এমন লোক সেই তল্লাটে ছিল না বললেই চলে। কাজেই মিঃ অগাস্টাসের অবসর ছিল অফুরন্ত। এই অফুরন্ত অবসর তিনি কাটাতেন বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে কখনো বই পড়ে, কখনো বা নদীর দৃশ্য দেখে।
     একদিন দুপুরবেলা এমনি এক অবসর সময়ে তিনি আরাম কেদারায় শুয়ে ঝিমুচ্ছিলেন, হঠাৎ অদূরে নদীর ঘাটে গ্রাম্য স্ত্রীলোকদের হৈ-চৈ শব্দে তার তন্দ্র ছুটে গেল। তিনি দাঁড়িয়ে দেখলেন, স্নানরতা মেয়েরা ঘাট থেকে পাড়ে উঠে ব্যস্তভাবে  ছুটোছুটি করছে আর প্রাণপণে চীৎকার করছে। ব্যাপার কি খবর নিয়ে জানা গেল, সঙ্গিনীদের চোখের সামনেই গ্রামের এক বৌকে কুমীরে নিয়ে গেছে। আশেপাশের গ্রামের মেয়ের প্রতিদিনই এ সময়ে দল বেঁধে নদীতে স্নান করতে আসে কিন্তু এ রকম অঘটন স্মরণকালের ভেতর কখনো ঘটেনি।
     শোনা যায়, কুমীর শিকার ধরেই টুপ করে গিলে খেয়ে ফেলে না বরং শিকার মুখে নিয়ে বার কয়েক নদীতে ভেসে ওঠে তারপরে এক সময়ে একবারেই ডুবে যায়। মিঃ অগাস্টাস বন্দুক হাতে তাড়াতাড়ি ছুটে এলেন নদীর পাড়ে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে এদিক ওদিক কুমীরের খোঁজে চাইতে লাগলেন। কিন্তু কুমীরের আর দেখা পাওয়া গেল না।
     ভারতবর্ষে চাকুরী নিয়ে এসে অবধি মিঃ অগাস্টাস নানান জায়গায় ঘুরে অনেক জীবজন্তু শিকার করেছেন। তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, যেমন করেই হোক এই কুমীরটাকে জব্দ করতেই হবে।
     এই দুর্ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে একদিন ভোরবেলা হঠাৎ খবর পাওয়া গেল, সেই কুমীরটা কাছেই এক চরের ওপর উঠে দিব্যে আরামে শুয়ে আছে।
     তখন শীতকাল। রবিবারের সেই ভোরবেলায় ছিল কনকনে শীত। সেই সঙ্গে যোগ দিয়েছে হাড় কাঁপানো ঝিরঝিরে উত্তুরে বাতাস। সাহেব গরম জামা কাপড় পরে বারান্দায় রোদে বসে আরাম করছিলেন। চায়ের পেয়ালা তার হাতে। খবর পেয়েই পেয়ালা নামিয়ে রেখে বন্দুক নিয়ে তিনি ছুটলেন চরের দিকে নদীর পাড় ধরে চর বরাবর গিয়ে দেখা গেল, সত্যিই বিশালাকায় এক কুমীর চরের ওপরে উঠে রোদে পিঠ দিয়ে পড়ে আছে, ঠিক যেন প্রকাণ্ড গাছের একটা গুড়ি। আশেপাশে দু’একটা গাংচিল জাতীয় পাখী ছাড়া আর কিছুই কোথাও দেখা যাচ্ছেনা। তবু এতদূর থেকে গুলি করে কুমীরকে কাবু করা সহজসাধ্য কাজ নয়। কুমীরের শ্যাওলাপড়া পিঠে গুলি বরং ফসকে অন্য দিকে চলে যাবে কুমীর তাতে সামান্য আঘাত পেলেও ঘায়েল হবে না। কজেই, দরকার একটি নৌকোর। নৌকো করে কুমীরের মুখ বরাবর গিয়ে গুলি করতে হবে।
     সাহেবের কথা মতো দু'জন সাহসী যুবক তাড়াতাড়ি গিয়ে একটি ডিঙ্গি নৌকো নিয়ে এল। নৌকোর ওপরটা ছেয়ে ফেলা হ’ল গাছের ডালপালা আর জংলা লতাপাতা দিয়ে। তারপর সঙ্গী দু’জনকে নিয়ে সাহেব নৌকো ভাসিয়ে দিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, কচুরিপানার মতো ঠিক যেন আস্ত একটা ঝোপ নদীর জলে ভেসে চলেছে।
     মিঃ অগাস্টাসের মনে আনন্দ আর ধরে না। কুমীর যেন তার হাতের মুঠোয় এসে গেছে এমনি মনের ভাব। লতাপাতার আড়ালে লুকিয়ে থেকে বন্দুক হাতে তিনি কুমীরের দিকে একদৃষ্টি চেয়ে আছেন আর ভাবছেন কুমীর কোথায় পালায় তিনি এবার দেখে নেবেন।
     ওদিকে কুমীরও বোধহয় আড়চোখে চেয়ে সাহেবের কীর্তিকলাপ লক্ষ্য করছিল আর মনে মনে হাসছিল। নৌকো এগিয়ে চলল। সাহেব বন্দুকের গোড়ায় হাত দিলেন। আঙ্গুলগুলো তার নিশপিশ করতে লাগল। আর ঠিক সেই মুহুর্তে-ঝুপ ঝুপ করে নদীতে পড়েই ধূর্ত কুমীর এক সেকেন্ডে অদৃশ্য হয়ে গেল। বন্দুক হাতে শিকারী সাহেব বোকার মতো হাঁ করে চেয়ে রইলেন ।
     কিন্তু মজা হল তার পরে। নৌকো ফিরে চলেছে। বোধহয় চারপাঁচ গজ তারা এগিয়েছে, হঠাৎ নৌকো নড়ে উঠল--নড়েই ক্ষান্ত হল না, নদীতে যেন সহসা ঢেউ উঠেছে এমনি দোলা দুলতে লাগল। দেখতে দেখতে নৌকোর একটা দিক ক্রমশঃ উপরে উঠতে উঠতে বেশ খানিক কাত হয়েই পড়ল। ব্যাপারটা কি হচ্ছে ভালো করে বুঝবারও অবসর হল না, ভয়ে তখন বীরত্রয়ের হাত-পা কাঁপছে ঠকঠক কযরে-চোখ উঠেছে কপালে। সাহেব মনে মনে স্মরণ করছেন ত্রাণকর্তা পিতা যিশুর নাম। এমন সময় নৌকোর গা ঘেঁষেই ভোঁ-ও ও-স্‌-স্‌ করে ভেসে উঠল কুমীরের এক বিশাল মাথা। আর দেরি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কম্পমান হাতেই মিঃ অগাস্টাস গুলি ছুড়লেন কুমীরের চোয়াল লক্ষ্য করে। ঠিক জায়গা মতো গুলি লাগল কিনা কিছুই বোঝা গেল না, কুমীর মাথা নীচু করল কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ঝাঁকুনির চোটে নৌকোখানাকে এক সেকেণ্ডেই উলটে দিয়ে গেল।
     ঠিক সেই মুহুর্তে সেভ মি, ও মাই গড়’ বলে ভয়ে আধমরা সাহেব উপায়য়ান্তর না দেখে নদীতে লাফিয়ে পড়লেন। বন্দুকটা কিন্তু তখনো তিনি হাড়ছাড়া করেননি। জলের তলায় ডুব দিয়ে কুমীর শিকার করবেন কিনা তা তিনিই জানেন।
     ভাগ্যিস মদীর সে জায়গাটায় জল ততো গভীর ছিল না। ভয়ে আর শীতে কাঁপতে কাঁপতে সাহেব পাড়ের দিকে ছুটলেন। অতিকষ্টে হাঁপাতে হাঁপাতে অনেক হাবুডুবু খেয়ে আর বেশ খানিকটা ঠাণ্ডা জল গিয়ে ঠিক ভিজে বেড়ালটির মতো হামাগুড়ি দিয়ে তিনি এসে ডাঙ্গায় উঠলেন। সঙ্গী দু'জন তার আগেই ডাঙায় উঠে হাসতে আরম্ভ করেছে। তাই দেখে সাহেবও এবার একটু হাসলেন—অতিকষ্টের কণ্ঠহাসি। অসহ্য শীতে তখনো তিনি কাঁপছেন হি-হি করে। তার এ দুরবস্থা দেখে স্বাভাবতই মনে হ’ল কুমির শিকারের সাধ বোধহয় বেচারার মিটেই গেছে।
     কিন্তু আসলে তা নয়। এভাবে নাকানি-চুবানি খেয়ে নাজেহাল হওয়ার পরে মাথায় যেন তাঁর খুন চেপে গেল। রাত নেই, দিন নেই-অবসর পেলেই বন্দুক হাতে নিয়ে তিনি পাগলের মতো নদীর পাড়ে কুমীরের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
     এক মাস কেটে গেল। 
    এবার মিঃ অগাস্টাসের মনের অবস্থা একেবারেই কহিল। মনে মনে হার মেনে তিনি তখন ভাবছেন, এবার হাল ছেড়েই দেবেন। তিনি তখন নারায়নগঞ্জ থেকে ত্রিশ মাইল দূরে ছোট্ট একটা গাঁয়ে। সেখানে হঠাৎ খবর পেলেন, পাশের গায়ের একটি মেয়েকে কুমীরে নিয়ে গেছে।
     এ খবর পেয়ে সরকারী কাজকর্ম তার মাথায় উঠল। কাগজপত্র গুটিয়ে রেখে তিনি গিয়ে আস্তান গাড়লেন নদীর পাড়ে। মেয়েদের কাপড় কাচা, বাসন মাজা ঘাটের পাশেই নদীতে ঝুঁকে পড়েছে একটা ঝাকড় গাছ। বন্দুক হাতে সাহেব গিয়ে সেই গাছে লুকিয়ে রইলেন।
     সন্ধ্যা উত্‌রে গিয়ে রাত হল। সারা রাতের ভেতর দু’বার তিনি টের পেলেন, আশেপাশে কোথাও কুমীরটা মাথা উঁচু করে সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলছে। কিন্তু ঠিক কোথায় যে সে মাথা তুলেছে তা বোঝা গেল না। কুমীর বোধহয় মানুষের উপস্থিতি টের পেয়েছিল, তাই সারা রাতের ভেতর সে আর ঘাটের কাছেই ভিড়ল না।
     ভোর হল। সাহেব চটেমটে গাছ থেকে নেমে এলেন। সারাটা রাত ঠায় গাছে বসে থেকে সারা গায়ে তার ব্যাথা ধরে গেছে। নদীর দিকে চেয়ে আক্রোশে হাত পা নেড়ে তিনি নিমকহারাম কুমীর জাতটাকে অভিসম্পাত দিতে লাগলেন। এ ছাড়া করবার কি-ই বা আছে।
     ঘুম ভাঙ্গতেই কৌতুহলী গ্রামবাসীরা দু’একজন করে নদীর পাড়ে এসে জমতে লাগল তামাশা দেখবার জন্যে । তাদের সঙ্গে লাঠিভর করে এসে দাঁড়াল খুনখুনে এক বুড়ী। ফোকলা দাঁতে এক গালে হেসে বুড়ী মিঃ অগাস্টাসের সামনে গিয়ে বলল, ওটা কুমীর নয় সায়েব, ওটা শয়তান ও শয়তানকে মারা তোমার কাজ নয়। ওকে কি করে মারতে হবে, এসো আমার সঙ্গে, শিখিয়ে দিই তোমাকে।
     বুড়ী তার হাতের লাঠি নেড়ে নেড়ে কি বলছে তার এক বর্ণও বুঝতে না পেরে হতবাক সাহেব এদিক ওদিক চাইতে লাগলেন। বুড়ী তখন হাত ইশারায় তাকে ডেকে নিয়ে গেল নিজের বাড়িতে। তারপর তিনটে টাকা চেয়ে নিয়ে ছেলেকে পাঠাল কি একটা জিনিস কিনে আনতে।
     আধঘণ্টা পরে ছেলেটি ফিরে এল দু’বগলে দুটা ছাগলের বাচ্চা নিয়ে। তাই দেখে মিঃ অগাস্টাস ভাবলেন, বুড়ী বোধহয় তাকে বাড়িতে পেয়ে ভোজের আয়োজন করছে। বুড়ী তার মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল, “সবুর করো সায়েব ! কি করি তাই দেখো। গরীব মানুষ আমি ভোজ তোমাকে দেবো না,-ভোজ দেবো কুমীরকে।
     এই বলে একটা ছাগলের বাচ্চা কেটে সে নাড়ীভুড়ি সব বের করে ফেলল। ঘর থেকে নিয়ে এল থলে বোঝাই সাদা খড়িমাটির মতো কি একটা জিনিস। সেগুলো সব ছাগলের পেটে বোঝাই করে সেলাই করে ফেলল। তারপর সাহেবের কোলে বাচ্চা দুটো দিয়ে বলল, "চলো তোমার কুমীর কোথায় আছে দেখি গে।
     নদীর পাড়ে গিয়ে বুড়ী সাহেবকে লুকিয়ে রাখল একটা ঝোপের আড়ালে। মরা ছাগলটা নিজের কোলে লুকিয়ে রেখে জ্যান্তটাকে বেঁধে রেখে এল নদীর কিনারে জলের ধারে। বুড়ী উঠে আসতেই জ্যান্ত ছাগলটা ভয়ে ভ্যা-ভ্যা করতে লাগল। বুড়ীর সেদিকে খেয়াল নেই। মরা ছাগলটা কোলে নিয়ে সে পাড়ে উঠে বসেছে। বসে বসে মাথা নীচু করে ঘুমের ভান করছে। জ্যান্ত ছাগলটার ভ্যা-ভ্যা চীৎকার তখন আরো বেড়ে গেছে। এমনিভাবে কেটে গেল প্রায় ঘণ্টাথানেক! সাহেব ঝোপের আড়ালে চুপটি করে বসে বিষ পিঁপড়ের কামড় উপভোগ করছেন। মরা ছাগল কোলে বুড়ী আরামে ঝিমুচ্ছে। ভীত ছাগলছানা প্রাণপণ চীৎকার করছে-ভ্যা-ভ্যা-ভ্যা ।
     কোথাও কিছু নেই-হঠাৎ নদীর এক জায়গায় দেখা দিল ছোট ছোট ঢেউ। একটু পরেই একেবারে পাড়ের কাছে নিঃশব্দে জেগে উঠল গাছের একটা প্রকাণ্ড গুড়ির মতো সেই কুমীরটি। অতি ধীরে ধীরে ডাঙ্গায় উঠে সে ছাগলের দিকে এগোতে লাগল। তাই দেখে বুড়ীর যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাড়াতাড়ি একটা গাছের ভাঙ্গা ভাল হাতে নিয়ে সে চীৎকার করতে করতে কুমীরকে তাড়া করে গেল। কুমীরটাও এক সেকেণ্ডে নদীতে পড়ে টুপ্‌ করে ডুবে গেল।
     বুড়ী তখন জ্যান্ত ছাগলটা খুলে দিয়ে তার পরিবর্তে মরাটাকে ঠাকনা দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে এল জলের ধারে। তারপর জ্যান্তটাকে নিয়ে এসে বসল তার আগের জায়গায়। বসে বসে বাচ্চাটাকে খোঁচাতে লাগল। বিরক্ত হয়ে বাচ্চাটাও আবার সেই একটানা চীৎকার জুড়ে দিল।
     আশেপাশে কোথাও কিছুর শব্দ নেই, কিন্তু বিরাম নেই সেই ছাগলের চীৎকারের। তারপর সহসা আবার সেই পরিচিত শব্দ-ভো-ও-ওস্‌! কুমীর মশাই আবার মাথা তুলেছেন।
     এদিকে বুড়ীও মাথা নীচু করে ঝিমুতে শুরু করেছে-ছাগলছানা করছে চীৎকার। অনেকক্ষণ ধরে তাই লক্ষ্য করে কুমীরভায়া এক লাফে উঠে মড়া ছাগলটি কামড়ে ধরল। ধরেই ঝাপিয়ে গিয়ে পড়ল নদীতে। আর তাকে পায় কে!
এবার সত্যিই বুড়ীর ঘুম ভাঙল ঝটপট সে উঠে দাঁড়াল লাঠিহাতে খুনখুনে বুড়ী এবার ধাই ধাই করে নাচতে লাগল; ব্যাপার দেখে সাহেব তো অবাক। ঝোপ থেকে তিনিও বেরিয়ে এলেন হাসতে হাসতে। আসল ব্যাপারটার কিছুই কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি।
     হঠাৎ নদীতে যেন ঝড় উঠল। সারাটা নদীর জল তোলপাড় হয়ে উঠল। পিঠের কাঁটাগুলো জাগিয়ে কুমীরটা তীরের মতো ছুটে চলল। একবার ওদিকে ছুটে যায় আবার তেমনি বেগে উলটো দিকে ছুটে আসে। সেই ভীষণ ছুটোছুটির আর যেন বিরাম নেই। মিনিটের পর মিনিট কাটে, ছুটোছুটি বেড়েই চলে। তারপর নদীর জলে টিকতে না পেরে বেচারা উঠল এসে ডাঙ্গায়৷ উঠেই মাটিতে মাথা আছড়াতে লাগল।
     গায়ের লোকজন অনেকে এসে তখন নদীর পাড়ে জড়ো হয়েছে। তারা সব চীৎকার করে উঠল। চারদিক থেকে শিলাবৃষ্টির মতো ইটপাটকেল পড়তে লাগল। তাদের অসহ্য উৎপাতে তিষ্ঠোতে না পেরে আবার গড়াতে গড়াতে কুমীর গিয়ে পড়লে নদীতে। নদীতে পড়েও চিৎপাত হয়ে সেই অস্থির সাতার। কিছুক্ষণ সাঁতারের পরেই আবার উঠে এল ডাঙ্গায়।
     শুরু হল গ্রাম্য মেয়ে-পুরুষের মিলিত চীৎকার আর সঙ্গে সঙ্গে অবিরাম ঢিলপাটকেল। এবার কুমীরের আর হুশ নেই। মরার মতো পড়ে সে হাঁপাতে লাগল। বিশাল চোয়ালের দু’কুল বেয়ে ঝলকে ঝলকে বেরোতে লাগল ফেনিল রক্ত!
বিরাটকায় এ জীবটির মরণযন্ত্রণা সাহেবের আর সহ্য হচ্ছিল না। তাড়াতাড়ি তিনি বন্দুক ওঠালেন। ঘোড়া টিপবার আগেই বুড়ী তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে বলে উঠল, মরাকে মারতে পারে সবাই। সবুর করো সায়েব, মরতে কি কষ্ট ওকে বুঝতে দাও।”
     তার কথায় এবার কান না দিয়ে মিঃ অগাস্টাস কুমীরের ঘাড়ের কাছে একটি গুলি করেই তার ভবযন্ত্রণার অবসান করে দিলেন। তারপর আসল ব্যাপারটা জানতে চাইলেন বুড়ীর কাছে। বুড়ী আবার ফোঁকলা দাঁতে এক গাল হেসে বলল, চুন, সাহেব, চুন-পান খাবার পাথরচুন। ঘরে খানিকটা পাথরচুন ছিল তাই রক্ষে। বলি নিজের চক্ষেই দেখলে তো তোমার ঐ বন্দুকের চেয়ে আমার পাথরচুনের তেজ কতো বেশী!"
     বিস্ময়ে অবাক হয়ে মিঃ অগাস্টাস সোমারভাইল চেয়ে রইলেন বুড়ীর মুখের দিকে। আমাদের বাংলাদেশের অশিক্ষিতা গেঁয়ে এক বুড়ীর বুদ্ধির কাছে তাকে কিনা মাথা নত করতে হল!
     বাকি জীবনে এ ব্যাপারটা তিনি ভুলতে পারেননি। দেশে গিয়েও অনেক বন্ধুর কাছে তিনি গল্প করেছেন। তারপর বিলেতী এক পত্রিকায় আগাগোড়া কাহিনীটা তিনি প্রকাশ করে গেছেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য