ছ্যাঁচড়া -- শেখর আহমেদ

     ছ্যাঁচড়া, এই ছ্যাঁচড়া, বলি ও ছ্যাঁচড়া-- যাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা, তার কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই। শুনতে পাচ্ছেন না। যদি শুনতে পাচ্ছেন,তবে আসছে না যখন, তখন পাচ্ছেন কি করে? নোলাপদর মগজে এটাই খেলে। আর ততই সে হেঁড়ে গলায় হাক পাড়ে—ছ্যাঁচড়া, অ্যাই ছ্যাঁচড়া--
     কিন্তু তিনি যে বিলক্ষণ শুনতে পাচ্ছেন, তা বোঝা গেল। অকস্মাৎ এগারে হাত লাফ দিয়ে এসে দাঁড়ালেন নোলাপদর সুমুখে। একেবারে খোদ রয়্যালবেঙ্গলের ঢঙে। আর একটু হলে পাতের মধ্যিখানেই পড়ত তার শ্রীচরণ। রাণী বাঘের মতোই দীত খিঁচিয়ে গর্জে উঠলেন,-আই, ছ্যাঁচড়া কে? ছ্যাঁচড়া কাকে বললি, অ্যা?
     --আঞ্জে আপনিই যে ছ্যাঁচড়া দিচ্ছিলেন। কুঁকড়ে গেল নোলাপদ।
     --তো কী? দিচ্ছিলুম তো কী? তাই বলে চিরকাল ছ্যাঁচড়া থাকব? এখন আমি পান্তো না?--ধমকে উঠে নিজের বালতি কাত করে ধরলেন। সত্যিই তো, বালতি ভর্তি ইয়া ইয়া পান্তুয়া। ক্রিকেট বলের মতো গোবদা গোবদা।
     মিষ্টির সময় এসে গেছে বৈকি। চৰ্ব-চোষ্য-লেহ্যপেয়—-কোনও কিছুর অভাব রেখেছে নাকি মামদো? মোটেই না। কব্জি ডুবিয়ে খাচ্ছে সবাই। পটলভাজা দিয়ে শুরু। মুখ্যু মানুষদের মতো মুড়ো ডাল-টাল নয়। ওসব বিয়েশাদিতে চলে। কিন্তু শ্ৰাদ্ধ? পটলতোলার কারণেই যে অনুষ্ঠান, সেখানে প্রথম পদে পটল ছাড়া আর কার কথাই বা ভাবা যায়? না ভাবা উচিত?
মামদো তার সাকরেদদের পরিষ্কার করে বলে দিয়েছিল,-- বাবা যখন পটলই তুলেছেন, তোমরাও তোল। এর ওর ক্ষেতে যেখানে যত পটল আছে সব তুলে আনো। খাইখরচ রাহাখরচ-সব আমার। তারপর নানা পদে ব্যঞ্জন বানিয়ে পদে পদে পাতে তুলে দাও। পটলভাজা, পটলি, পটলের দোলমা, পটলেল ঝাল, পটোলের ঝোল, পটলের চাটনি আর পটলের মেঠাই অব্দি।। হ্যাঁ, পটল তুলে তুলে ক্লান্ত হয়ে পড়লে অবশ্য শুরু কর নতুন অধ্যায়। তুলে দাও মুড়িঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া—এইসব ।
     খরচপত্রে একটুও কসুর করেনি মামদো। বরং শ'চারেক বেল আর শ্যাওড়া গাছ বন্ধকই দিতে হয়েছে তাকে বেলগেছে ঠাকুদ্দার কাছে কিন্তু বাপের শ্রাদ্ধ মামদো রাজ্যি কাঁপিয়েই করবে। তার ওপরেই নির্ভর করছে বাপটার ভবিষ্যৎ। মরণের মুখে বাপের কুষ্ঠি দেখে বেহ্মদত্যি পণ্ডিত ডুকরে উঠেছিলেন, হায় হয়, এর যে আবার মনুষ্যপ্রাপ্তিযোগ দেখি। তাই ভাবি, এত জোয়ান ভূতটাকে এমন নিশ্চিত মরণরোগে ধরলে কেন?
     তো মরণকালে বাপ তার দুহাত জড়িয়ে বলে গেল, কত পাপের ফলে মানুষকুলে পুরো এক জন্ম পচতে হয়েছিল রে বাপ। আর আমি ও নরকে যেতে চাই না। বাপ আমার, আমি তো অপঘাতে যাচ্ছিনে। শান্তিস্বস্ত্যেন, যাগযজ্ঞ--যে করেই হোক, তুই মানুষজন্ম আমার ঠেকাস।
     তা ঠেকাবার যাবতীয় বিধিব্যবস্থা করেছে মামদো। স্বামী ভূতেশ্বরানন্দ,স্বামী প্রেতনাথ,শ্যাওড়াবাবা—সব শাস্ত্রজ্ঞদের ডেকে প্রায় চাঁদের হাট বসিয়ে দিয়েছিল। তার ফসল এই শ্ৰাদ্ধবাসর-মহাশ্রাদ্ধ। যেমনি দান, তেমনি ভোজন। পচা ডোবার পাড়ে পিণ্ডি, কাদা জলে তর্পণ,---সব শেষ। কোনও মানুষের আর সাধ্য নেই যে বাপের ঘাড়ে ভয় করে।
     আজ নিয়মভঙ্গ, খাও, যত পার গিলে যাও! যতক্ষণ না পেট ফাটি-ফাটি করে। নোলাপদ খাচ্ছে। সেই শুরুর পটলের পদ থেকেই। গপগপ। তার পাতে কম পড়েছিল? মোটেই না। পুরো একটা বালতিই প্রায় উপুড় করা হয়েছিল তার পাতে। কিন্তু এটাই তার স্বভাব। থেকে থেকে নোলো চাগিয়ে ওঠে। ওইজন্যই তো তোর নাম নেলাপদ; সাবেক জন্মে ওই নাম ছিল, এ জন্মেও চালু হয়ে গেছে।
     ছ্যাঁচড়া ওরফে পান্তো তখনও ধমকে যাচ্ছে তাকে— হতচ্ছাড়া,উজবুক কাঁহাক, খেয়ে আর হয় না? গাণ্ডে-পিণ্ডে কম তো গিললে না। মেঠাই চলছে,এখন দাও ছ্যাঁচড়া ছ্যাঁচড়া কোথাকার ছ্যাঁচড়ামির আর জায়গা পাওনা?
     কথাতেই ছ্যাচড়াপ্রাপ্ত হয় নোলাপদ! মাত্তর দিনকয়েক হয়েছে তার সমাজে। এ ঠ্যাঙ ধরে টানে, ও পিছন থেকে দেয় খোঁচা। রীতিমতে র‌্যাগিং যাকে বলে আর কি। এখনও সে নবীশের দলে কিনা। ভয়ে মুখে তার বাকি সরে না। 
     হৈ চৈ শুনে ছুটে আসে স্বয়ং মামাদো—আহা দাও দাও, দিয়ে দাও আর এক বালতি। ওর ছ্যাঁচড়ামিতে যদি বাপের ভূতাত্মার শান্তি হয়, তো হোক।
     এসে গেল। পঙক্তিতে তখন চলছে নানা কিসিমের মেঠাই। দইটই পেরিয়ে পান। ফুলকচি সুপুরি আর ধুতরো বীজ দিয়ে স্পেশাল বানানো, সঙ্গে সিদ্ধি। পানও নিলে নোলাপদ ডজনদুয়েক। নোলা তার সবেতেই। পানেও।
     কিন্তু পান চিবোতে চিবোতেই প্রমাদ। সবাই যখন উঠে দাঁড়াচ্ছে, তার নোলা সকসকিয়ে উঠল মুরগীর রোস্টের জন্যে, যা কিনা আজকের মেনুতেই নেই! নোলার টানে নোলাপদর মনে হল, এত আয়োজন, আর একটু রোস্ট নেই? হতেও তো পারে, ভুলে গেছে। আহা, সাবেক জন্মে কলকাতায় ভিক্ষে করার কালে দত্তদের কাজের বাড়ির উচ্ছিষ্ট পাতায় একটুকরো রোষ্ট পেয়েছিল সে। সে স্বাদ যেন জিভে লেগে রয়েছে। এই জন্মান্তরেও।
     উঠতে পারেনা আর নোলাপদ জিভ তার অজান্তেই যেন মুরগী, মুরগী করে খাবি খায়। পাত কুড়োতে কুড়োতে সামনে হাজির সেই পান্তো। তাকে তখনও বসে থাকতে দেখে রাগে তার চোখ গোল্লা-গোল্লা। মিনমিন্‌ করে নোলাপদে,-আজ্ঞে বলছিলুম কি যদি একটু--
     মুরগী পর্যন্ত এগোতে পারে না সে আর। পান্তো ফেটে পড়ে রাগে,-এখনও নোলা মেটেনি তোমার? মারব অ্যা— এক চড়! হ্যা, চড়চড় করে রাগ চড়ছে আমার। সরে পড়, ভালোয় ভালোয় সরে পড় বলছি সামনে থেকে।
     সরেই পড়ে নোলাপদ। অমন রুদ্রমূর্তি দেখে পিলে চমকায় তার। ত্রাহি ত্ৰাহি করে আত্মা। সরে পড়লেও মুরগীর লোভ থেকে রেহাই পায়না মন তার।
     এদিক ওদিক চলতে ফিরতে হঠাৎ দুচোখে খুশির ঝিলিক। আমগাছের গোড়ায় ওটা কি? বড়গোছের একটা নধর মুরগীছানা না? চিৎপটং হয়ে আছে। কাছাকাছি গিয়ে টিপে টুপে নিঃসন্দেহ যাকে বলে গতায়ুপ্রাণ। মাথাটা একটু থ্যাতলানো। কারও ইটপাটকেল খেয়ে পঞ্চত্ন প্রাপ্তি ঘটেছে বুঝি। কোথায় মুরগীর তেল-মশলা চোবানো রসালো রোস্ট
আর কোথায় আলুনি কাঁচা মুরগীছনা! তা নোলার মুখে তাই সই। মুরগী তো বটে।
     ইতিউতি চেয়ে টুক করে এক কামড় তার ঘাড়ে। আর বিপদ তাতেই ক্যাঁ ক্যাঁ করে চেল্লানি ফেটে বের হয় সেই মরা মুরগিছানার পেট থেকে। দেহ থেকে ভূতমুক্তি হয়নি তখনও তার। অপঘাতে মৃত্যু। যাকে বলে একেবারে খুন। নোলাপদর মোটা মাথায় এত বিবেচনা কি খেলে?
     মুরগীর অন্তরাত্মা ওরফে অন্তর্ভূত চেল্লাচ্ছে—একী, এ কী অলুক্ষূণে কাণ্ড? এটা কোথাকার ভূত রে? ভূত হয়ে তুই ভূত খেতে চাস? উল্লুক, হামবাগ,বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী, ভূতদ্রোহী।--
     ছুটে এল সব দলে দলে। ভৌত সমাজে নজিরবিহীন ঘটনা।তাদের গিনেস বুকে ঠাঁই পেতে পারে অন্য সমাজের হলেও, পাশের জঙ্গল থেকে ছুটে এল মুরগী-ভূতের কর্তারা । একেবারে ঝাণ্ডটাণ্ডা বাগিয়ে !
     হৈ হৈ ব্যাপার। রৈ রৈ কাণ্ড। নানা ভূতের নানা মত— 
     —ঘোল ঢালো ওর মাথায়। 
    --ব্যাটাকে মানুষের হাতে ধরিয়ে দাও। 
     --দূর করে দাও ভূতের রাজ্যি থেকে। 
    -- থামাল শেষে সেই মামদোই-ছাড়ান দ্যান। কদিন মাত্র বয়স ওর? সমাজের আদব কায়দা শেখেনি এখনও। তাছাড়া আমার মরা বাপ! হ্যা, তার ভূতাত্মার শান্তি কামনায় এই বারের মতো মাপ করে দ্যান ওকে। আয়, আয় তো নোলু আমার কাছে।
     কিন্তু নোলাপদ নড়ে না। বড়ই আঁতে লেগেছে তার। চূড়ান্ত হয়েছে। আর নয় ; যেদিকে দুচোখ যায়, নিরুদ্দেশ হবে সে। এত অপমান! রেগেমেগে বলে, না, তোমাদের ছায়াও মাড়াব না আমি। ছায়া অবিশ্যি নেই তোমাদের। থাকলেও মাড়াতুম না। আর থাকি তোমাদের ত্রিসীমানায়? রাম কহো—
     বলেই নোলাপদর বেরিয়ে পড়ে একহাত জিভ। পটাপট সকলের দুকানে আঙুল। ভূতের মুখে রামনাম! কারও মুখে রা নেই। পাতা পড়লে শোনা যায়। খালি পান্তোই বলে বুঝি—ছ্যাঁ-চ্‌ড়া!
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য