গপ্পী-বৌ -- রাশিয়ার উপকথা

    এক ছিল চাষী আর তার বৌ। বৌটা ভারি গপ্পী ছিল, কোনো কথা পেটে থাকত না। কানে তার কোনো কথা পৌছলেই অমনি সেটা সারা গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে যেত।
     একদিন চাষী তো বনে গেল। বনের মধ্যে নেকড়ে ধরার গর্ত খুড়তে গিয়ে হঠাৎ গুপ্তধন পেয়ে গেল। চাষী ভাবল, “এখন কী করি? আমার বৌ তো গুপ্তধনের কথা শুনলেই সারা পাড়ায় রটিয়ে দেবে। জমিদারের কানে কথাটা যাবে — ব্যস — টাকাও আর পেতে হবে না। জমিদারই সবটা গায়েব করবে।”
     ভাবতে ভাবতে একটা বৃদ্ধি মাথায় এল। গুপ্তধনটা আবার পুতে রেখে জায়গাটা চিহ্ন দিয়ে ফিরে গেল। নদীর কাছে আসতে জালের দিকে তাকিয়ে দেখে, জালের মধ্যে মাছ ছটফট করছে। মাছটা বের করে নিয়ে চাষী আবার চলল। একটু পরেই তারই পাতা একটা ফাঁদের কাছে এসে দেখে একটা খরগোস তাতে আটকা পড়েছে।
     চাষী খরগোসটা বের করে নিয়ে মাছটা সেই জায়গায় রাখল। তারপর খরগোসটা জড়ালে জালের মধ্যে।
     বাড়ী ফিরল বেশ রাত হয়ে যাবার পর। 
    ‘উনুন জ্বেলে বেশ কিছু সরু চাকলি বানাও তো, তাতিয়ানা!’ 
    সে কী? সন্ধ্যার পর কেউ কখনো উনুন ধরায় নাকি? এত রাতে কেই বা আবার সরু চাকলি তৈরী করে! খেয়াল দেখো!’
     ‘যা বলছি করো! তর্ক করো না। গুপ্তধন পেয়েছি আমি, আজ রাতেই বাড়ী নিয়ে আসব।'
      চাষীর বৌয়ের তো আর খুশি ধরে না। এক নিমেষে উনুন ধরিয়ে সরু চাকলি বানাতে বসে গেল সে।
     বলল, ‘গরম, গরম খাও গো!’ 
    চাষী একটা করে সরু চাকলি খায় আর বৌয়ের অজান্তে গোটা দু’চার করে থলিতে পোরে, একটা করে খায়, আর গোটা দুই করে রাখে।
     চাষীর বৌ বলল, ‘আজ যে দেখি তুমি গোগ্রাসে গিলছো, আমি যে ভেজে উঠতেই পারছি না!’
     বহুদূর যেতে হবে গো, গুপ্তধনটাও খুব ভারি, তাই পেট পরে খেয়ে নিচ্ছি।’
     সরু চাকলি দিয়ে থলিটা ভরে নিয়ে চাষী বলল:‘আমার পেট ভরেছে, এবার তুমি কিছু খেয়ে নাও আর চলো বেরিয়ে পড়ি, তাড়াতাড়ি করো।’
     খুবে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল বৌ, তারপর দুজনে বেরিয়ে পড়ল। ততক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে। চাষী আগে আগে যায় আর থলি থেকে একটা একটা করে সরু চাকলি বার করে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়।
     সরু চাকলিগালো চোখে পড়ল চাষী বৌয়ের। ‘দেখো দেখো, সরু চাকলি হয়ে রয়েছে গাছে!’
     এ আর এমন কি? এই মাত্র দেখলে না সরু চাকলি ভৃষ্টি হচ্ছিল।’ 
     ‘না, কই দেখিনি তো! আমি মাটিতে চোখ রেখে হাঁটছিলাম, যাতে গাছের শিকড়ে পা বেঁধে হমেড়ি খেয়ে না পড়ি।’
     চাষী বলল, ‘এইখানে একটা খরগোস ধরা ফাঁদ পেতেছিলাম। একবার দেখে আসি চলো তো।”
     ফাঁদের কাছে গিয়ে চাষী একটা মাছ বের করে আনল।
    ‘আরে! মাছ এসে কী করে এই ফাঁদে ঢুকল? চাষীর বৌ জিজ্ঞেস করল। 
     ‘তাও জানো না? জলের মাছের মতো ডাঙার মাছও যে আছে!’
     ‘জানতাম না তো! নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হত না!’ 
     তারপর ওরা এল নদীর ধারে। চাষীর বেী বলল: এখানেই নিশ্চয়ই কোথাও তোমার জাল পাতা আছে। চলো একবার দেখে আসি।”
     ওরা যেই জালটা টেনে তুলেছে, দেখে একটা খরগোস। ‘মা গো! কী কাণ্ড!” চাষীর বৌ গালে হাত দিল। ‘কী সব হচ্ছে আজ। খরগোস কিনা আটকা পড়ল মাছ-ধরা জালে!’
     চাষী বলল, ‘এতে অবাক হবার কী আছে? জীবনে যেন জল-খরগোস দেখোনি!”
    ‘সত্যি দেখিনি তো।’ ইতিমধ্যে যেখানে গুপ্তধন পোঁতা রয়েছে সেই জায়গাটায় এসে পৌছল ওরা। চাষী খুড়ে খুড়ে টাকার পাত্র বের করে আনল, তারপর যতটা করে পারে টাকাটা ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে চলল বাড়ী।
     রাস্তাটা আবার জমিদারের বাড়ীর পাশ দিয়ে। বাড়ীটার কাছে যেতেই ওরা শোনে: ‘ব্যা... ব্যা... এ্যা...’ করে একটা ভেড়া ডাকছে।
     চাষীর বৌ ফিসফিস করে বলল, ‘ও বাবা, ওটা কী গো! ভীষণ ভয় করছে আমার !”
     "দৌড়ে চলো শীগগির! জমিদার বাবুকে গলা টিপে মারছে ভূতে। আমাদের যেন ওরা দেখতে না পায় !"
     দুজনেই ভীষণ হাঁপাতে হাঁপাতে এক দৌড়ে বাড়ী।
    টাকা লুকিয়ে রেখে দুজনে ঘুমতে গেল। 
    চাষী বলল, “দেখো, তাতিয়ানা, গুপ্তধনের কথা আবার কাউকে বলে বেড়িয়ো না যেন। তাহলে বিপদে পড়তে হবে।’     ‘কী যে বলো, ঘুণাক্ষরেও কাউকে বলব না! 
     পরদিন ওরা ঘুম থেকে উঠল দেরী করে। চাষীর বৌ উনুনে আগুন দিয়ে, বালতি নিয়ে গেল জল আনতে। কুয়োর কাছে পাড়াপড়শীরা জিজ্ঞেস করল, ও তাতিয়ানা, আজ এত দেরীতে উনুনে অাঁচ পড়ল যে?’
     ‘আর বোলো না, কাল সারারাত বাইরে ছিলাম কিনা, ঘুম ভেঙেছে দেরী করে।’
     ‘কেন, রাতে গিয়েছিলে কোথায়?’
    ‘আমার স্বামী গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে যে, রাতে গিয়েছিলাম টাকা আনতে।’ 
     ব্যস, সারাদিন গ্রামে শুধু ঐ এক আলোচনা: ‘তাতিয়ানা আর তার স্বামী গুপ্তধন পেয়েছে। দু’বস্তা ভর্তি করে টাকা এনেছে।”
     সন্ধ্যাবেলাতেই কথাটা কানে উঠল জমিদারের। জমিদার ডেকে পাঠাল চাষীকে।
    ‘গল্পগুধন পেয়েছো, আমায় জানাওনি কেন?’ 
     চাষী বলল, গুপ্তধন? জীবনে কোনোদিন কথাটা কানেও শুনিনি, বাবু।’ 
     জমিদার চীৎকার করে উঠল, ‘বাজে কথা রাখো! আমি সব জানি, তোমার বৌ-ই তো সবাইকে বলে বেড়িয়েছে!’
    ‘ওর মাথার ঠিক নেই, বাবু। এমন সব কথা বলে যার মাথামুন্ডু নেই।’ 
    ‘বেশ, পরীক্ষা করে দেখছি, দাঁড়াও !’ 
     জমিদার চাষীর বৌকে ডেকে পাঠাল। 
    ‘তোমার স্বামী কি গুপ্তধন পেয়েছে?’ 
    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ বাবা, পেয়েছে।’ 
     ‘তোমরা দু’জনে টাকা আনতে বেরিয়েছিলে রাত্তিরবেলা?’ 
     ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বেরিয়েছিলাম।’
     সব কথা বলো তো দেখি, কী হয়েছিল।’ 
     ‘প্রথমে তো আমরা বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, দেখি কী, গাছে গাছে সর চাকলি ফলে রয়েছে।’
     ‘সরু চাকলি?’ 
     আজ্ঞে হ্যাঁ, 
    সরু চাকলি বৃষ্টি হচ্ছিল কিনা। তারপর খরগোস ধরা ফাঁদে দেখি একটা মাছ আটকে রয়েছে। মাছটা আমরা বের করে নিয়ে আবার চলতে লাগলাম। নদীর ধারে এসে জালটা টেনে তুলে দেখি, জালে পড়েছে একটা খরগোস! খরগোসটাও নিয়ে নিলাম। তারপর নদী থেকে খানিকটা দূরে জমি খুড়ে আমার স্বামী গুপ্তধন বের করল। আর আমরা দু’থলি ভর্তি টাকা নিয়ে বাড়ী ফিরে গেলাম। আপনার বাড়ীর পাশ দিয়ে আমরা যখন পেরিয়ে যাচ্ছি, ঠিক তখনই তো হুজুরের গলা টিপে ধরেছিল ভূতে।”
     এই না শুনে জমিদার তো ভীষণ রেগে, মাটিতে পা ঠুকে চীৎকার করে বলল :
    ‘বেরিয়ে যাও এখান থেকে, হাঁদা মেয়ে কোথাকার!” 
     চাষী বলল, দেখলেন তো, আমার বৌয়ের কোনো কথাই বিশ্বাস করা চলে না। এইভাবেই জীবন কাটাচ্ছি ওকে নিয়ে, অশান্তির শেষ নেই।”
     ‘খুব বুঝতে পারছি, এবার তুমি বাড়ী যেতে পারো,’ জমিদার হাত নেড়ে বলল ।
    বাড়ী চলে গেল চাষী। সুখেস্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করতে লাগল। এখনো পর্যন্ত সে বেঁচে আছে, আর জমিদার বাবুর কথা ভেবে মনে মনে হাসে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য