বারবেলা -- সুবিনয় রায়চৌধুরী

     বড়দিনের ছুটি। পরীক্ষাও হয়ে গেছে ; স্কুল খুললে প্রমোশন হবে। এ কয়দিন কোন ভাবনা-চিন্তা নাই, পড়াশুনাও নাই; কাজে-কাজেই দুপুরে একটু বিশ্রাম করার ইচ্ছা হয়। সেদিন বিকালে হুঁকোটোলার ময়দানে মেলা দেখতে যাবার কথা; তারপর সন্ধ্যা ৬টায় আমাদের ক্লাসের নীলমাধব তপাদারের কাকার বাড়ীতে বায়োস্কোপ আর ম্যাজিক দেখার আর রাত্রে সেখানে ভোজের নেমস্তন্ন। নীলমাধবের কাকা প্রভঞ্জন তপাদার সিঙ্গাপুরে ডাক্তারী করেন; বিস্তর টাকা। তাঁর একটি খানসামা আছে, সে নাকি ফরাসী দেশে থেকে রান্না শিখেছে—তাকে নাকি তিনি পঁচাত্তর টাকা মাইনে দেন। প্রভঞ্জন বাবুর খাওয়াবার সখটাও খুব। কাজেই রাত্রে ভোজের ব্যাপার যে ভাল-রকম হবে সেটা বলাই বাহুল্য।
     প্রভঞ্জন বাবুর ছেলে নিরঞ্জনের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল; তাই সেদিন সে আমার মামার বাড়ীতে টেলিফোন ক'রে বলল, “দয়া ক’রে পাশের বাড়ী থেকে ভ্যাবলাকে ডেকে দিন না।” ( ভ্যাবলা আমার ডাক নাম )। আমি টেলিফোন ধরতেই সে বলল, “পরশু রাত্রে আমাদের বাড়ীতে তোমার নেমস্তন্ন রইল—আসতে হবে কিন্তু ভাই। আর, সন্ধ্যা ৬টায় বায়োস্কোপ আর ম্যাজিক হবে; তা’তেও তোমার নেমস্তন্ন। আমাদের টেলিফোনের নম্বরটা টুকে নাও। যদি আসতে পার তো ৫টায় ফোন ক’রে, মোটর পাঠিয়ে দেবো।” আমি “আচ্ছা” ব’লে তা’র টেলিফোন নম্বরটা জিজ্ঞাসা ক’রে দেওয়ালে লিখে রেখে দিলাম ;–পাছে হারিয়ে ফেলি।
     কখন সেই ‘পরশু আসবে দু'দিন শুধু তাই ভেবেছি। সেদিন বিকালে মেলা দেখে প্রভঞ্জন বাবুর বাড়ী যাব ঠিক করেছি। তারা থাকেন সহরের অন্য মাথায়; কাজেই তাদের মোটরে সেখানে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই; আমি বাড়ীও চিনি না।
     দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে সবে-মাত্র একটু বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছি—মতলবটা, এক্‌চোট ঘুমিয়ে নিই—এমন সময় কে যেন ডাক দিল “ভ্যাবলা!” মনে করলাম নিরঞ্জন, তাই ছুটে নীচে গেলাম। গিয়ে দেখি আমাদের ক্লাশের নরেশটা দাঁত বের ক’রে হাসছে। তখন যা রাগটা হ’লো –ঘুমটা একেবারেই মাটি! -- আমাকে দেখেই নরেশ বলল, “আজ হুকোটোলার মেলায় যাবি নাকি ভাই? চল না, আমিও যাব।” আমি বললাম, “খেয়ে দেয়ে আর কাজ নাই; এই দুপুর রোদে মেলায় যাব কোন দুঃখে। তাছাড়া, বেলা ৩টা পৰ্য্যন্ত বারবেলা’, ‘যাত্রা নাস্তি’ পঞ্জিকায় লিখেছে। তিনটের আগে কিছুতেই আমি বেরুচ্ছি না। শেষটায় রাত্রের বায়োস্কোপ, ম্যাজিক, দারুণ ভোজ, সবই মাটি হোক আর কি! মেলা দেখতে বড় জোর একটি ঘণ্টা ; যেতে আসতে আধ ঘণ্টা!”
     নরেশ বেচারা আর করে কি? সে আস্তে আস্তে বাড়ী ফিরে চলল। আমি তাকে ডেকে বললাম, “যাস না ভাই; আয় ততক্ষণ একটু গল্প করি; পোনে তিনটার সময় বেরোবার ব্যবস্থা করা যাবে— কি বলিস্ ভাই?”
     আড়াইট পৰ্য্যন্ত তো গল্প করা গেল; তারপর, হঠাৎ আমার মনে হ’লো, নিরঞ্জনরা তো বেজায় সাহেব; তাদের বাড়ীতে সাহেবী পোষাক পরে যাওয়াই ভাল। তখনই চট্‌ করে উঠে, বাক্স থেকে কোট, প্যান্ট, টাই, সার্ট বের করে নিয়ে পরতে আরম্ভ করলাম। তিনটের আগেই পুরো-দস্তুর সাহেব সেজে, টুপি মাথায় দিয়ে মেলার পথে রওয়ান হয়ে পড়লাম। নরেশকে দেখে মনে হ’লো আমার সঙ্গে যেতে যেন তার লজ্জ হচ্ছে।
     মেলায় পৌছে দেখলাম খুব ভিড় জমেছে। সব চেয়ে বেশী ভিড় জমেছে একটা গোলক ধাঁধার সামনে । সেখানে মস্ত বড় সাইন-বোর্ডে লেখা রয়েছে—

“প্রোফেসার গোলকচাঁদের গোলক ধাঁধা। 
বিংশ-শতাব্দীর অত্যাশ্চর্য্য আবিষ্কার। 

ভিতরে প্রবেশ করিয়া দশ মিনিটের মধ্যে বাহিরে আসিতে পারিলে তৎক্ষণাৎ ২৫ টাকা পুরস্কার। প্রবেশিকা মাত্র ২ আনা।”
     এক পাশে দেখলাম, কতগুলো লোক একটা সাঁকোর উপর দাড়িয়ে গোঁলক ধাধার একটা জানালার দিকে চেয়ে হাসাহাসি করছে আর ভিতরের লোকদের ঠাট্টা করে হাততালি দিচ্ছে। নরেশ যাচ্ছিল সেদিকে দেখত ; আমি তাকে ধমক্‌ দিয়ে বললাম, “দেখ বার আর জিনিষ পাও নি! বেচারারা ফাঁপড়ে পড়েছে; তাই নিয়ে আবার ঠাট্টা ;–ছিঃ—!”
     নরেশ বলল, “তবে চল এখান থেকে; অন্য তামাসা দেখি গিয়ে; পাঁচটা তো বাজে প্রায়।” আমি বললাম, “নাঃ! পঁচিশটে টাকা ছাড়া যায় না। দশ মিনিট ছেড়ে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি বেরিয়ে আসতে পারব। গোলক ধাঁধার পথ বের করতে আমি ওস্তাদ ”—একথা বলেই আমি গোলক ধাঁধার ফটকে দুই আনা দিয়ে ঢুকে পড়লাম; নরেশ বাইরেই রয়ে গেল।
     প্রথমেই একটা ছোট কামরা; তার মধ্যে খুব উজ্জল আলো; তারপর গোলক ধাঁধার ভিতরের রাস্তা। কামরায় একটা ঘড়ি রয়েছে, আর একটা খাতায় নাম লেখা হচ্ছে। আমি আমার নামটি খাতায় লিখলাম আর অমনি কামরার মধ্যের একটি ভদ্রলোক বললেন, “পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিট দশ সেকেণ্ড—যান, ঢুকে পড়ন।” আমিও ঢুকলাম, ভদ্রলোকটিও সময়টা টুকে নিলেন। ঠিক ঢুকবার মুখেই একটি মোটা ভদ্রলোক ঘেমে ঝুল হয়ে বেরিয়ে এলেন, আর কামরার ভদ্রলোকটি তাঁকে দেখে বললেন, “আদিত্যনাথ চক্রবর্ত্তী ?—আপনার এক ঘণ্টা সাত মিনিট লেগেছে।” আমি ভাবলাম, যেমন মোটা লোক, বুদ্ধিও তেমনি মোটা ; না হ’লে কি আর এক ঘণ্টা সাত মিনিট লাগে?
     গোলক ধাঁধার পথটি অন্ধকার ; চোখে অতি কমই দেখা যায়। আমিও খুবই সাবধানে চললাম। খানিকটা গিয়ে বাঁধা পেলাম, আবার ফিরলাম, অন্য পথে গেলাম, আবার খানিকট গিয়ে বাঁধা পেলাম, আবার একটু ফিরে একটা চৌমাথায় এলাম। যাঁহাতক আসা, অমনি মাথার উপর দপ, ক’রে উজ্জল ইলেক্‌টিক লাইট্‌ জ্বলে উঠল, আর আমার চোখ একেবারে ঝলসে গেল। অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে চলতে লাগলাম—আবার একটা চৌমাথায় এসে ঐ রকম ঘটল। এই রকম ৩৪ বার ঘটার পর আমার মনে হ’লো গোলকধাধার প্রায় মাঝামাঝি এসেছি । ইতিমধ্যে একবার মনে হ’লো, যেন সেই জানালাটার পাশ দিয়ে চলে গেলাম,—পোলের ওপর থেকে যেটার দিকে লোকেরা দেখ ছিল আর হাত-তালি দিচ্ছিল। তখন আর ও সব দেখবার সময় ছিল না—আমি কেবল মাঝখানে যাবার জন্য ব্যস্ত।
     খানিক বাদেই টের পেলাম একটা বড় কামরায় এসে পৌছে গেছি—সেটাই গোলক ধাধার মাঝখান। কামরার মাঝখানে একটা তক্তার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে—

“এমনি সংসার পথ ধাঁধায় ভ্রমণ, 
যে পায় প্রকৃত পথ সে-ই বিচক্ষণ ।” 

সেখানে একটি লোক ব’সে ছিল, সে আমার নাম জিজ্ঞাসা করল। আমি নাম বলতেই সে টেলিফোনে বাইরের কামরার ভদ্রলোকটিকে বলে দিল, ওমুক বাবু মাঝে পৌছিয়েছেন। মাঝের কামরায় ঘড়ি ছিল, সেটা নাকি বাইরের ঘড়ির সঙ্গে কাটায় কাটায় ঠিক মেলানো। সেটাতে দেখলাম, আমার ঠিক ছয় মিনিট লেগেছে ভেতরে ঢুকতে। ভাবলাম, বাইরে বেরুতে তা’র অর্ধেকের পেশী সময় লাগতেই পারে না। পাশে একটি বুড়ো ভদ্রলোক হাড়িমুখ ক’র দাঁড়িয়েছিলেন; তিনি বললেন, “দেখছ কি সাহেব? বেরোতে ঠেলাখানা বুঝবে এখন। আমি সাত মিনিটে ঢুকেছিলাম; এক ঘণ্টা বেরুতে চেষ্টা ক’রে আবার মাঝখানে ফিরে এসেছি। চার আনা পয়সা দিলে নাকি বের হবার পথ এরা দেখিয়ে দেবেন ;—তবে, এক ঘণ্টার আগে নয়, আর চোখ বেঁধে বের ক'রে দেবেন। এ পর্য্যন্ত পাচঁশো পচাত্তর জন লোক হিমসিম খেয়ে গেছে। সাহেব বুঝি শুধু ঘুঘুই দেখেছ, ফাঁদটি আর দেখ নি!”
     আমি বুড়োর কথায় ততটা মনোযোগ না দিয়ে চট্‌ করে বের হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়লাম। পিছনের রাস্তাটা ধরে কিছুদূর গিয়ে আবার মাঝখানেই ফিরে এলাম; আবার অন্য রাস্তা ধরে কিছুদূর গিয়ে দেখলাম সামনেটা বন্ধ; খানিকটা ফিরে অন্য রাস্তা ধরে আবার দেখলাম সামনে বন্ধ ; আবার অন্য রাস্তা ধ’রে খানিকট গিয়ে দেখি আবার মাঝখানেই পৌছে গেছি।”
     তখন যা রাগটা হ’লো! আবার চেষ্টা করলাম বের হতে; সাতবার সামনে বাঁধা পেয়ে যখন রাগটা চড়তে আরম্ভ করেছে তখন দেখি সেই জানালাটার সামনে পৌছেছি। মনে হলো একটু আগেই একবার জানালাটার সামনে দিয়ে গেছিলাম— আবার মনে হলো যাই নি। যা হোক, একটু এগিয়ে বাঁয়ে একটা রাস্তা পেলাম, সেটা দিয়ে খানিকাটা গিয়ে দেখি আবার সেই জানালার পাশে! তখন রাগে আমার গা জ্বলে গেল। সামনে একটা টুপি পড়ে ছিল, তাতেই দিলাম এক লাথি। টুপিটা দেয়ালে লেগে আমার পায়ের কাছেই এসে পড়ল। আর কিছুর উপর রাগ ঝাড়তে না পেরে এক লাফে টুপির উপর পড়ে দিলাম তা’কে চ্যাপ্টা করে একেবারে থেতলিয়ে। লাফাবার সময় নিজের মাথার টুপিটা হাত দিয়ে সামলাতে গিয়ে দেখি—ও মা ! মাথা যে খালি ! আমারই টুপি আমি পা দিয়ে থেত লিয়ে দিয়েছি। কি আর করা যায়? মানে মানে রওয়ানা হওয়াই ভাল। বাইরের লোকগুলো পোলের উপর থেকে আমার কাণ্ড দেখে হে হে ক’রে হেসে হাত-তালি দিয়ে উঠল। একজন বলল, “বা রে সাহেব! আবার নাচ হচ্ছ !” নরেশের মত গলায় কে যেন বলল, “সাড়ে পাঁচটা কিন্তু বাজে!”—তখন রাগে অামার সৰ্ব্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছিল, কিন্তু, সাড়ে পাঁচটা বাজে শুনে আর থাকতে পারলাম না—দৌড়ে আগে যেতে লাগলাম। সামনেই দেখি এক বুড়োকে চোখ বেঁধে একটা দরোয়ান হাত ধরে নিয়ে চলেছে। বুঝলাম, এ সেই বুড়ো, যে আমায় ঠাট্টা করেছিল। তাড়াতাড়ি তার পিছু ধরলাম ! পা টিপে চলার দরুণ দরোয়ানও কিছু টের
পেল না; আমিও অল্পক্ষণের মধ্যে নির্বিববাদে বেরিয়ে এলাম। এসেই আর কথাবাৰ্ত্তা নেই, সটান সেই পোলের কাছে!
নরেশ বলল,—“চল যাই ; সময় হয়েছে!” আমি বললাম, “একটু দাড়া ভাই ; জানলা দিয়ে ভেতরের লোকগুলোকে দেখা যাক।” ঠিক সেই সময় একজন ভদ্রলোক জানালার সামনে দিয়ে গেলেন, আমি তাকে দেখেই, “দুয়ো! দুয়ো!” বলে হাততালি দিলাম। পোলের উপরের দুটি লোক আমাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল “ওরে, সেই সাহেব রে!”—আমি মানে মানে প্রস্থান করলাম ! তখন ঠিক সাড়ে পাঁচটা।
     উৰ্দ্ধশ্বাসে মামার বাড়ীর দিকে ছুটুলাম। সেখানে পৌছেই টেলিফোনের ঘরের দিকে গেলাম। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল । ঠেলাঠেলি করতে কে যেন বলে উঠল, “একটু দাঁড়ান্‌ ; এখনই খুলছি।”
     একটু বাদেই দরজা খুলে দু’জন রাজমিস্ত্রি বেরিয়ে এল; তাদের হাতে পোঁচড়া আর চুণের বালতি। ঘরে ঢুকে দেখি, সৰ্ব্বনাশ! এই মাত্র ঘর চুনকাম করা হলো ; দেয়ালে লেখার নামগন্ধও নাই । টেলিফোনের নম্বরটা যে লিখে রেখেছিলাম তার চিহ্নও নাই। এখন করা যায় কি?
     ছুটে নীলমাধবদের বাড়ী গেলাম ; তাদের সঙ্গে যদি যেতে পারি। গিয়ে শুনলাম তা’রা ৫ মিনিট হ’লো রওয়ান হয়েছে ; বাড়ীতে চাকর ছাড়া আর কেউই নাই ; সেও নিরঞ্জনদের বাড়ী জানে না ।
     কি আর করি? হেঁটে বাড়ী পানে রওয়ানা হ’লাম। ফুটপাথ থেকে নেমে রাস্ত পার হবার সময় একটা প্রকাণ্ড সবুজ মোটর সামনে দিয়ে “ভঁ—অঁ—অঁ—প” করে হর্ণ বাজিয়ে চলে গেল আর আমার নতুন ইস্তিরি করা প্যাণ্টে কাদা ছিটিয়ে দিয়ে গেল। রাগে আমার গা জ্বলে গেল। বাড়ীর এত কাছে এসে কিনা এই কাণ্ড।
     বাড়ী পৌছা'বা মাত্র রামা চাকরটা বলল, “দাদাবাবু! এই মাত্তর একটা সবুজ মোটর গাড়ী এয়েছিল; আপনাকে নিয়ে যাবার তরে, ন্যারজ্জুন বাবু নাকি গাড়ী পাঠিয়েছিলেন। আমি বললুম, দাদাবাবু বেইরে গেছেন।”
     তখন আর আমার বুঝতে বাকি রইল না কোন সবুজ মোটর এসেছিল, আর কেই বা ‘ন্যারজ্জুন বাবু। রাগটা যা হলো ! বারবেলা কেটেই তো গেছিল; তবে কেন এমন হলো?

এই গল্পটির ইপাব (Epub) ডাউনলোড করে রাখো
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য