ঝাউগাছের কথা -- হ্যন্স অ্যান্ডারসন

     অনেক দূরে ঘোর বনের মাঝখানে, এক ঝাউগাছ গজালো । তার সারা গায়ে রোদ লাগত, তার চারদিকে খোলা বাতাস খেলে বেড়াত। আশেপাশে তারই মতো আরো অনেক ঝাউগাছ ছিল, কেউ ওর চেয়ে বড়ো, কেউ ছোটো । কিন্তু ছোটো ঝাউগাছের মনে সুখ ছিল না। ওর সদাই ইচ্ছা আরো উঁচু হয়। গরম রোদ, খোলা বাতাসের কথা একবার ভাবতও না। চাষীদের ছোটাে-ছোটাে ছেলেমেয়েরা বনে ফল কুড়তে এসে কত হাসত, কত গল্প করত, ও তাদের দিকে ফিরেও তাকাত না। ঘটে জল ভরা আর খড়ের সুতোয় ছোটো-ছোটো ফল গাঁথা হয়ে গেলে, ওরা মাঝে-মাঝে ছোটো ঝাউগাছটিকে ঘিরে বসে বলত, “এই ছোটো ঝাউগাছটি বড়ো সুন্দর ” তাই শুনে ছোটো ঝাউগাছ বেজায় বিরক্ত হত।
     দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে সে বলত, “আহা, যদি দাদাদের মতো উঁচু হতাম, তা হলে ঐ অত দূর অবধি ডালপালা মেলে দিতাম আর সবার উপরে মগডালটি তুলে চারদিকের বিশাল জগৎটাকে কেমন দেখতাম! পাখিরা এসে আমার ডালপালায় বাসা বাঁধত। বাতাস বইলে আমার দাদাদের মতো আমিও সগৰ্বে মাথা লুইয়ে ভদ্রতা করতাম। গায়ে মিঠে সূর্যের আলো লাগলে, পাখিদের গান শুনলে, সকাল সন্ধ্যায় মাথার উপর দিয়ে লালচে মেঘ বয়ে গেলে, ঝাউগাছ এতটুকু আনন্দ পেত না।
     শীতকালে মাটিটা সাদা ঝকঝকে বরফে ঢেকে যেত। তখন একটা খরগোস বেরিয়ে এসে ছুটোছুটি করত, কখনো-বা ক্ষুদে ঝাউগাছের মাথার উপর দিয়েও লাফিয়ে যেত; তাতে ঝাউ যা চটত! এইভাবে দুটো শীত কাটল। তৃতীয় শীত যখন এল, ঝাউগাছ এতটা উঁচু হয়ে উঠেছে যে খরগোসকে তার চারদিক ঘুরে দৌড়তে হত, মাথা ডিঙোবার জো ছিল না। গাছটা কেবলই ভাবত, ‘আহা, আরো বাড়ব, আরো অনেক বাড়ব, এই এত উঁচু হব, বয়স হবে, নইলে পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কি লাভ?
     হেমন্তকালে কাঠুরেরা এসে সবচাইতে বড়ো-বড়ো গাছগুলোর কয়েকটাকে কেটে ফেলল। প্রত্যেক বছরেই এমনি হত। ততদিনে ছোটাে ঝাউগাছটিও দিব্যি উঁচু হয়ে উঠেছিল, ঐ বিশাল বিশাল সুন্দর গাছগুলোকে ভীষণ শব্দ করে, ঝোপঝাড় ডালপালা ভেঙে মাটিতে পড়তে দেখে, বেচারা শিউরে উঠত। মাটিতে পড়বার পর, গাছগুলির ডালপালা সব কেটে ফেলা হত; কাণ্ডটাকে বিশ্ৰী ন্যাড়া, রোগা, লম্বা দেখাত; চেনাই যেত না। তার পর বড়ো-বড়ো গাড়িতে একজনের উপর একজনকে চাপানো হত। শেষে গাড়িগুলোকে ঘোড়ায় টেনে নিয়ে যেত জঙ্গলের বাইরে, অনেক দূরে, কোথায় কে জানে!
     কোথায় যাচ্ছে, তাদের কপালে কি আছে কে বলবে?
    পরের বছর বসন্তকালে, দোয়েল ফিঙে সারসরা যখন বিদেশে শীত কাটিয়ে আবার ফিরে এল ছোটো ঝাউ তাদের জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা কি জানো গাছগুলিকে কেটে কোথায় নিয়ে গেল?”
     দোয়েল ফিঙের কিছুই জানত না। সারস একটু ভেবে নিয়ে, মাথা নেড়ে বলল, “মনে হচ্ছে যেন দেখেছি ওদের। মিশর দেশ থেকে এখানে আসবার পথে, অনেক জাহাজ দেখলাম, তাদের মাস্তুলগুলো কী উঁচু, কী চমৎকার! ঐ নিশ্চয়ই তোমার সেই ঝাউগাছ, সেইরকম গন্ধও পেলাম। আহাঁ, কি অপূর্ব ভঙ্গিতে জাহাজগুলো ভেসে যাচ্ছিল, তাই তোমাদের অভিনন্দন না জানিয়ে পারছি না।”
     “আহা, আমি যদি ঐরকম উঁচু হতাম, তা হলে আমিও সাগরের বুকে ভেসে পড়তাম। বলো-না, ঐ সাগর জিনিসটি কিরকম, সে দেখতে কেমন?”
     সারস বলল, “আরে না, না, অত সব বলতে গেলে মেলা সময় লাগবে।” এই বলে খুট খুট করে সে সরে পড়ল।
     সূর্যের কিরণ বলল, “তোমার এই নবীন বয়সের জন্য খুশি হও, ভাই। কি সজীব তুমি, তোমার ডালপালায় প্রাণের স্রোত বইছে, তাই আনন্দ কর।”
     বাতাস এসে ঝাউগাছকে চুমে খেল, শিশির কত চোখের জল ফেলল ; ঝাউগাছ কিন্তু তার কিছুই বুঝল না।
তার পর বড়োদিন কাছে এল, তখন বেশ ছোটো-ছোটো অনেক গাছ কাটা হল। সে-সব গাছের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের ঐ অস্থির ঝাউগাছটির মতোই লম্বা, কিম্বা তার চেয়েও ছোটো। এদিকে আমাদের গাছ তো অন্য কোথাও যেতে পারলে আর কিছু চায় না। বেছে বেছে সবচাইতে সুন্দর দেখতে গাছগুলিকে কাটা হল! ওদের ডালপালা ছাঁটা হল না ; একটি ঘোড়ায়টানা গাড়িতে চাপিয়ে ওদের বনের বাইরে অনেক অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হল।
     আমাদের ঝাউগাছ জিজ্ঞাসা করল, “ওরা কোথায় যাচ্ছে ? ওরা তো আমার চেয়ে লম্বা নয়, একজন তো দস্তুরমতো বেঁটে। ওদের ডালপালা ছাটল না কেন? কোথায় গেল কে জানে?” চড়াইরা অমনি কিচির-মিচির করে উঠল, “আমরা জানি! আমরা জানি! নীচের শহরের বাড়ির জানলা দিয়ে উকি মেরে সব দেখেছি! কোথায় গেছে আমরা জানি! আহা, ওদের কত আদর, কি সম্মান, সে তুমি ভাবতেই পার না! জানলার শার্শী দিয়ে দেখলাম একটা গরম ঘরে নিয়ে গিয়ে টবে পুতে ওদের সারা গায়ে কী সুন্দর সুন্দর জিনিস ঝুলিয়ে সাজানোগোজানো হল, রাঙতা মোড়া আপেল, মিষ্টি, খেলনা আর শত শত ঝলমলে মোমবাতি! ”
     ঝাউগাছ বলল, “তারপর? তারপর? তার পরে কি হল?”
     “কি জানি, তার বেশি কিছু দেখি নি । কিন্তু যা দেখলাম সে যে কী সুন্দর, কী যে সুন্দর, তার তুলনা হয় না ।”
আহ্লাদে গলে গিয়ে ঝাউগাছ বলল, “আহা, আমার কপালেও কি এত সম্মান লেখা আছে? সমুদ্রের উপর দিয়ে ভেসে চলার চেয়ে এ যে অনেক বেশি ভালো। আমার যে আর তর সয় না। আবার কবে বড়োদিন আসবে! এখন আমি মাথায় উঁচু হয়েছি, কত ডালপালা আমার, গত বছর যাদের কেটে নিয়ে গেছিল, ঠিক তাদের মতোই ; এক্ষুণি যদি সেই গাড়িতে চাপতে পারতাম, সেই গরম ঘরটিতে গিয়ে যদি সেইরকম আদর যত্ন পেতাম ! তার পরে—তার পরে নিশ্চয়ই আরো ভালো কিছু হয়, নইলে অত সাজাবে-গোজাবে কেন? নিশ্চয়ই তার চেয়েও সুন্দর, তার চেয়েও জমকাল কিছু হয়—কিন্তু সেটা কি? উঃ, এ কি জ্বালা, আগ্রহের কি জ্বালা! আমার মনের মধ্যে কেমন হচ্ছে, সে আমি ভাষায় বলতে পারছি না !”
     তখন বাতাস আর রোদ তাকে বলল, “আমরা তোমাকে ভালোবাসি, তাই জেনে সুখী হও। তোমার এই তরুণ বয়স, এই স্বাধীনতা নিয়ে আনন্দ কর!”
     কিন্তু আনন্দ করা ওকে দিয়ে হল না। কি শীতে কি গ্রীষ্মে গাছটি কেবলই বাড়তে লাগল; গাঢ় সবুজ পাতায় সেজে, যেন সবুজ পোশাক পরে, বনের মাঝখানে তার সে কী শোভা! যারাই তাকে দেখত তারাই বলত, “আহ, কী সুন্দর গাছ? তার পরের বছর বড়োদিনের আগে সব গাছের আগে ওকেই কাটা হল। তার কাঠের গায়ে যেই কুড়লের কোপ পড়ল, গভীর একটা ব্যথার শব্দ করে গাছটি পড়ল মাটিতে। এত বেদনা, এত দুর্বলতা সে আশাই করে নি। এখন তার সৌভাগ্যের কথা মনেই পড়ল না, এই তার চিরদিনের আবাস, তার জন্মস্থান ছেড়ে যেতে হচ্ছে বলে মনটা দুঃখে ভরে
গেল ।
     মনে মনে সে বুঝল আজন্মের এই-সব প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে, ওরই ছায়ায় যে-সব ছোটো-ছোটো ঝোপঝাপ, ফুলের গাছ বেড়ে উঠেছিল তাদের সঙ্গে, এমন-কি, হয়তো পাখিদের সঙ্গেও আর কখনো দেখা হবে না। গাড়ি চড়ে যেতেও এতটুকু ভালো লাগল না ।
     অন্য গাছদের সঙ্গে তাকে একটা উঠোনে নিয়ে ফেলা হল।
    সেখানে একজন লোকের কথা শুনে তার প্রথম চেতনা হল । সে লোকটি বলল, “বাঃ, এই তো খাসা একটি গাছ, ঠিক এমনটিই তো আমরা খুজছিলাম।”
তার পর ফিটফাট পোশাক পরা দুজন চাকর এসে বাউগাছটিকে কাঁধে করে চমৎকার একটা মস্ত বৈঠকখানায় নিয়ে গেল। ঘরের দেয়ালে কত ছবি, তাকের উপরে বড়ে-বড়ো চীনে ফুলদানি, তাদের ঢাকনিতে সিংহের নকশা করা। কত দোলাকেদারা, রেশমী কৌচ, টেবিলে কত ছবির বই, কত খেলনা !
     মস্ত একটা বালি ভরা পিপের মধ্যে ঝাউগাছটাকে পোঁতা হল। সবুজ কাপড়ে জড়িয়ে নানা রঙের নকশা করা গালচের উপর যখন সেটাকে বসানো হল, পিপে বলে চেনে কার সাধ্যি! গাছটা তো কেঁপেই অস্থির। এর পর না জানি কী হবে। একজন অল্পবয়সী মেয়ে এসে তাকে সাজাতে বসল, চাকররা তাকে সাহায্য করতে লাগল। রঙিন কাগজ কেটে ছোটো-ছোটো সাজি বানিয়ে, তাতে ফলের মোরব্বা ভরে, ডালে ডালে ঝুলিয়ে দিল। কোথাও-বা রাঙতা মোড়া আপেল কিম্বা আখরোট ঝোলালো ! দেখে মনে হচ্ছিল যেন সেগুলো ঐভাবেই ফলেছে। তা ছাড়া একশোর বেশি ক্ষুদে-ক্ষুদে লাল নীল সাদা মোমবাতি ডালপালার মধ্যে এখানে ওখানে বসিয়ে দিল। কত পুতুল, দেখতে যেন সত্যিকার মানুষ, পাতার রাশির মধ্যে নেচে বেড়াচ্ছে ; ঝাউগাছ এমনটি দেখে নি কোনোদিনও। আর সবার উপরে, একেবারে গাছের মগডালে সোনালি রাঙতার তৈরি মস্ত একটি তারা ! বাস্তবিক এত সাজ, এত শোভার তুলনা হয় না।
     ওরা বলাবলি করছিল, “আজি সন্ধেবেলায় সব আলোগুলো জ্বেলে দেওয়া হবে।”
     গাছ ভাবল, ‘আহ, এখনি যদি সন্ধেবেলা হত ! আহ, সব আলো যদি জ্বেলে দেওয়া হত ! তা হলে—তা হলে কি হত? বন থেকে কি গাছরা সবাই আমাকে দেখতে আসবে? চড়াইরা কি উড়ে এসে জানলার কাচের ভিতর দিয়ে আমাকে দেখবে? আমি কি এইরকম সেজেগুজে সারা শীত, সারা গ্রীষ্ম কাটাব?
     কেবলই ঐ এক ভাবনা । ভাবতে ভাবতে গাছের ছালে ব্যথা ধরে গেল, তাতে আমাদের মাথা ধরলে যেমন কষ্ট পাই, গাছেরও তেমনি কষ্ট হয়।
     শেষে মোমবাতিগুলো সত্যি জ্বালানো হল। সে কী আলোর ছটা! গাছটির ডালপালা উত্তেজনার চোটে কঁপিতে লাগল। একটি ডালে আগুন ধরে গেল ! অল্পবয়সী মেয়েটি বলল, “ও মা ও কি হল ।” তাড়াতাড়ি আগুন নিবিয়ে দেওয়া হল।
ভয়ের চোটে গাছটার কঁপিবারও জো রইল না। তার মনে বড়ো ভয়, কি জানি, শেষটা যদি সাজসজ্জা নষ্ট হয় ! এত ঘট, এত আলো দেখে বেচারি হকচকিয়ে গেছিল। অবশেষে হঠাৎ দুই ঘরের মাঝখানের মস্ত-মস্ত দরজা দুটি হাট করে খুলে দেওয়া হল, একদল ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়ে হুড় মুড় করে ঘরে এসে ঢুকল ; তাদের উৎসাহ দেখে মনে হল এই বুঝি গাছের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বড়োরা ধীরে সুস্থে ঘরে ঢুকলেন। এক মুহূর্তকাল ছোটোরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার পর তাদের ফুর্তি দেখে কে ! এমনি চ্যাঁচাতে লাগল সবাই যে দেয়ালগুলো গমগম্‌ করে উঠল। তার পর গাছের চারদিকে ঘুরে ঘুরে সে কী নাচ ! একটি একটি করে উপহার গাছ থেকে পেড়ে ফেলা হল।
     গাছ ভাবল, ও কি ! ওরা করছে কি! এবার তা হলে কি হবে? মোমবাতিগুলো জ্বলে জ্বলে ফুরিয়ে এসেছিল, পাছে ডালপালায় আগুন লেগে যায়, তাই সেগুলোকে নিবিয়ে দেওয়া হল। ছেলেমেয়েদের বলা হল, গাছের সাজসজ্জা যার যা খুশি পেড়ে নিতে পারে। অমনি তারা গাছের উপর হুড় মুড়, করে পড়ল, ডালপালাগুলো চড় চড় করে উঠল। ভাগ্যিস মগডালের তারাটি ছাদের সঙ্গে ঝকঝকে মালা দিয়ে বাধা ছিল, নইলে গাছটাই উলটে পড়ত আর কি !
     গাছের চারদিকে ছেলেমেয়েরা তাদের সুন্দর সুন্দর খেলনা নিয়ে নেচে-কুঁদে হেসে-খেলে বেড়াতে লাগল। কিন্তু শুধু বুড়ি ধাই-মা ছাড়া গাছের কথা কারও মনেও এল না। ধাই-মা এসে ডালপালার ফাঁকে ফাঁকে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল, অবিশ্বি তার মনে শুধু একটি কথাই ছিল, যদি ফাঁকতালে একটি পাকা ডুমুর কিম্বা আপেল খুঁজে পায়।
     একটা মোটা বেঁটে লোককে গাছের দিকে টানতে টানতে ছেলেমেয়েরা বায়না ধরল, “গল্প বলো, গল্প বলো!” লোকটি গাছতলায় বসে পড়ে বলল, “বাঃ, সবুজ ডালপালার তলায় বসতে কি আরাম! তা ছাড়া আমার গল্প শুনলে এই গাছটিরও উপকার হতে পারে। কিন্তু শুধু একটি গল্প বলব। কোনটা শুনতে চাও, ইবেদি-আবেদির গল্প, নাকি সেই যে হাম্পটি-ডাম্পটি ধুপ করে একতলায় পড়েও রাজ্য আর রাজকন্যে পেয়েছিল, তার গল্প ?”
কয়েকজন চ্যাঁচাতে লাগল, “ইবেদি-আবেদির গল্প !” আবার কেউ-বা বলল, “হাম্পটি-ডাম্পটির গল্প।” মহা হট্টগোল
শুরু হল !
     খালি ঝাউগাছ চুপ করে ভাবছিল, ‘আমারও কি ওদের মতো চ্যাঁচামেচি করা উচিত? নাকি কিছু না করাই ভালো ? সেও তো ওদের দলের একজন, তার যা যা করবার কথা ছিল সবই তো সে করেছে।
     মোট বেঁটে লোকটি হাম্পটি-ডাম্পটির গল্প বলল। হাম্পটি-ডাম্পটি একতলায় গড়িয়ে পড়লেও, রাজ্য আর রাজকন্যে দুইই পেয়েছিল । গল্প শুনে ছেলেমেয়েরা হাততালি দিয়ে উঠল । তার পর আরো গল্পের বায়না ধরল। ওদের ইবেদি-আবেদির গল্পটিও শোনার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সে আর হল না।
     এদিকে ঝাউগাছ গল্প শুনে চুপ করে ভাবতে লাগল !
     বনের পাখিরা তো কখনো এমন কথা বলে নি। বাউগাছ মনে মনে বলল, ‘হাম্পটি-ডাম্পটি একতলায় পড়ে গেছিল, তবু সে সিংহাসনে উঠল, রাজকণ্যেকে পেল! পৃথিবীতে কী আশ্চর্য ঘটনাই-না ঘটে। তার ধারণা ঐরকম ভালোমানুষ যখন রয়েছে ; তখন গল্পটি নিশ্চয় সত্যি। সে ভাবল, কে জানে, আমিও হয়তো একদিন পড়ে গিয়ে, তার পর রাজকন্যে পাব!’
     তার মনে ভারি আনন্দ, সে আশায় আশায় রইল যে পরদিন আবার তাকে মোমবাতি আর খেলনা, রাঙতা আর নানারকম কল দিয়ে সাজানো হবে। সে মনে মনে ঠিক করল, ‘কাল আর কেঁপে-টেপে একসা হব না! কাল সাজগোজ নিয়ে আনন্দ করব। কাল আবার হাম্পটি-ডাম্পটির গল্প শুনব; কে জানে হয়তো ইবেদি-আবেদির গল্পও শুনব? এই সুখের স্বপ্নেই গাছ রাত কাটাল ।
     সকালবেলায় দাসীরা এল। গাছ ভাবল, ‘এবার আমার নতুন করে সাজসজ্জা শুরু হবে ? কিন্তু তারা করল কি, ওকে ধৱে টেনে হিচড়ে সিঁড়ির ওপরে চিলেকোঠার ঘরে তুলে, একটি অন্ধকার কোণে গুজে রাখল। সেখানে এক চিলতে আলো পর্যন্ত পৌছয় না। গাছ মনে মনে বলল, ‘এর কি কোনো মানে হয়? এখানে করবটাই-বা কি আর শুনবটাই-বা কি? এই বলে দেয়ালে ঠেস দিয়ে প্রাণপণে ভাবতে লাগল। ভাববার সময়ও পেল ঢের ; দিনের পর দিন গেল, রাতের পর রাত কাটল, চিলেকোঠার ঘরে কারও পা পড়ল না। শেষটা একদিন একজন কেউ এল বটে, কিন্তু এক পাশে কয়েকটি তোরঙ্গ ঠেসে দিয়েই সে চলে গেল। গাছটি এবার একেবারে আড়াল হয়ে গেল; তাৱ মনে হল সবাই তার কথা ভুলেই গেছে।
     গাছ ভাবল, ‘আবার শীত এসেছে, বাইরের মাটি বরফে ঢাকা, বেজায় শক্ত। এখন আমাকে মাটিতে পোতা যাবে না, সেই বসন্তকাল অবধি অপেক্ষা করতে হবে। মানুষরা বড্ডো ভেবেচিন্তে কাজ করে। তবে এত অন্ধকার আর এমনি বেজায় একলা না হলে বেশ হত।
     ঠিক সেই সময় কিচ কিচ শব্দ করে ছোটো একটি ইঁদুর এগিয়ে এল! তার পিছনে আরেকটি। তারা ঝাউগাছের আশেপাশে ছোকছোক করে খানিক শুকে বেড়ালো, তার পর ডালপালার মধ্যে ছুটোছুটি করতে লাগল।
তারা বলল, “বাপ রে, কী শীত!
নইলে এ জায়গাটা বেশ আরামের ছিল, কি বল বুড়ো ঝাউগাছ?”
     ঝাউগাছ বলল, “আমি কিছু বুড়ো নই। আমার চাইতে ঢের ঢের বুড়ো অনেকে আছে।”
     তারা জিজ্ঞাসা করল, “তা তুমি এখানে এলে কি করে? কি কি জানো তুমি ?” তাদের বেজায় কৌতুহল। “বলো-না পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে ভালো জায়গাটা কোথায়! সেখানে কখনো গেছ নাকি! ভাড়ারঘরে গেছ কখনো? সেখানে তাকের ওপর গোটা গোটা পনীর পড়ে থাকে, ছাদ থেকে শুকনো মাংস ঝোলে। সেখানে চর্বি দিয়ে তৈরি মোটা-মোটা মোমবাতির ওপর নাচানাচি করা যায় ; সেখানে রোগী হয়ে ঢুকে, মোটা হয়ে বেরিয়ে আসা যায়।”
     গাছ বলল, “কই, না তো, ও-সব কথার তো আমি কিছুই জানি না ! তবে বনকে জানি, সেখানে সূর্য রোদ দেয়, পাখিরা গান গায়।” তার পর সে তার ছোটোবেলাকার কথা বলতে লাগল, কি আনন্দেই না ছিল তখন। ইঁদুররা এরকম কথা জন্মে শোনে নি। তারা খুব মন দিয়ে সব শুনে বলল, “বাঃ, বাঃ, যা বলেছ! কত কি দেখেছ ভাই, কি আনন্দেই না দিন কাটিয়েছ!”
     গাছ তবাক হয়ে বলল, “আনন্দে?” তার পর তাদের কথাটি নিয়ে একটু ভেবে আবার বলল, “তা মোটের ওপর আনন্দেই দিন কাটত!” তখন সে ইঁদুরদের কাছে সেই বড়োদিনের উৎসবের কথাও বলল, তাকে কেমন মোমবাতি দিয়ে, মিষ্টি দিয়ে সাজানো হয়েছিল।
     ছোটো-ছোটো ইদুরগুলো তো অবাক । “ইস্, কি মজাই না করেছ, বুড়ো ঝাউগাছ ”
     ঝাউগাছ আবার বলল, “মোটেই আমি বুড়াঁ নই। মাত্র গত শীতকালে বন ছেড়েছি ; এই তো আমার উঠতি বয়স ”
ইঁদুররা বলল, “বাঃ, তুমি কী সুন্দর কথা বলাঁ ভাই!”
     পরদিন রাতে ইঁদুররা আবার এল, সঙ্গে নিয়ে এল আরও। চারটে ইঁদুর, তারাও গাছের জীবনের গল্প শুনতে চায়। যতই না গাছ বনের মধ্যে তার ছোটোবেলার কথা বলে, ততই তার আরো স্পষ্ট করে সে-সব দিনের কথা মনে পড়ে যায়। গাছ বলল, “হ্যাঁ, সে বড়ো সুখের সময় ছিল, তবে আবার সে দিন ফিরে আসতে পারে, আবার ফিরে আসতে পারে। হাম্পটি-ডাম্পটি নীচের তলায় পড়ে গেল, তবু সে রাজকন্যে পেল ; কে জানে, আমিও হয়তে একদিন রাজকন্যে পাব!” অমনি তার সেই বনের একটি সুন্দর কচি বাৰ্চগাছের কথা মনে পড়ে গেল। বাউগাছের মনে হল সে-ই একজন রাজকন্যের মতো, কী সুন্দর সে-ই রাজকন্যে ! ক্ষুদে ইঁদুররা জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, এই হাম্পটি-ডাম্পটিটি আবার কে?” তখন বাউগাছ ওদের হাম্পটি-ডাম্পটির কথা বলল। গল্পটির প্রত্যেকটি কথা তার মনে ছিল। শুনে আনন্দের চোটে তারা গাছের মাথায় চড়ে বসে আর কি ! পরের রাতে আরো অনেকগুলো নেংটি ইঁদুর এল ; রবিবার দিন তাদের সঙ্গে এল দুটো বড়ো ইঁদুর। তারা কিন্তু গল্প শুনে বলল, “এ কি বাজে গল্প!” ছোটো ইঁদুররা তাতে চটে গেল! কিন্তু তাদের কথা শোনার পর ওদেরও আর গল্পটাকে তেমন ভালো লাগল না !
     বড়ো ইদুররা জিজ্ঞাসা করল! “তুমি কি শুধু ঐ একটি গল্পই জানো নাকি?”
     গাছ বলল, “হ্যাঁ, ভাই, ঐ একটাই জানি। আমার জীবনের সবচাইতে সুখের সন্ধ্যায় ঐ গল্পটি শুনেছিলাম। অবিশ্যি তখন আমি নিজেই জানতাম না আমি কত সুখী।”
     “কি যা তা গল্প ! শুকনো মাংস কি চর্বির মোমবাতির গল্প জানো না ? ভাড়ারঘরের কথা বলতে পারো না?”
     গাছ বলল, “না ভাই ।” বড়ো ইদুররা বলল, “ঢের হয়েছে, আর শুনে কাজ নেই!” এই বলে যে যার পথ দেখল। ছোটো ইঁদুররাও আর এল না। গাছ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, “বেশ লাগত, ওরা কেমন আমাকে ঘিরে বসে আমার কথা শুনত, এদিকে কেমন চুলবুলে চটপটে সব। এখন সে-সবই চুকেবুকে গেল। যাই হোক, এখান থেকে যখন আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হবে, এ-সব কথা মনে করতে ভালোই লাগবে।”
     কিন্তু সেদিন কবে আসবে? একদিন সকালে লোকজন এসে চিলেকোঠা সাফ করতে লেগে গেল। তোরঙ্গগুলোকে সরানো হল, গাছটিকেও কোন থেকে টেনে বের করা হল। ওকে ওরা অযত্নে মাটিতে ফেলে রেখেছিল কিন্তু একজন চাকর ওকে তুলে নীচে নিয়ে গেল। আবার সে আলোর দেখা পেল। গাছ ভাবল, এই আমার নতুন জীবন শুরু হল। গায়ে খোলা হাওয়া লাগল, নরম রোদ লাগল। তাকে আবার টেনে উঠোনে এনে ফেলা হল। সব কিছু এমনিই তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে গাছটির আর নিজের দিকে তাকাবার কথা মনেই হল না। চারদিকে তাকিয়ে দেখবার মতো কত জিনিস। উঠোনের পাশেই বাগান। সেখানকার সব কী সবুজ, কী সুন্দর ! বেতের বেড়ার উপর থোপা থোপা গোলাপ ফুল, কী তাদের রঙের বাহার, কি-বা সুগন্ধ! লেবুগাছ ফুলে ভরা, সোয়ালে পাখিরা কিচির-মিচির করতে করতে একবার আসছে, একবার যাচ্ছে ।
     ঝাউগাছের মন আশার আনন্দে ভরে উঠল। ‘আমি বাঁচব ! আমি বাঁচব ! ডালপালাগুলিকে সে মেলে ধরবার চেষ্টা করল, কিন্তু হায়, সেগুলি শুকিয়ে হলদে হয়ে গেছিল! আগাছা আর বিছুটির গাদার উপর ঝাউগাছকে ওরা ফেলে রাখল। তার মাথার উপরে যে সোনালি রাঙতার তারা পরানো ছিল, রোদ লেগে সেটি ঝকমক্‌ করে উঠল। আশেপাশে যারা ছিল, তার মধ্যে সবচাইতে ছোটো যারা, তাদের একজন সোনালি রঙের তারাটিকে দেখতে পেয়ে, সেটাকে খুলে নেবার জন্য ছুটে এল।
     ছেলেটি চেঁচিয়ে বলল, “দেখ, দেখ, বিশ্ৰী পুরনো গাছটির মাথায় এখনো তারাটি আটকে আছে!” গাছের ডালপালা মাড়িয়ে ভেঙে ছেলেটি একাকার করল।
     ঝাউগাছ তখন বাগানের ফুলগুলির দিকে চেয়ে দেখল, কী তাদের শোভা, কী সজীব, সুন্দর। নিজের দিকে তাকিয়েই মনে হল, ‘হায়, হায়, এর চাইতে যে চিলেকোঠার অন্ধকার কোণে পড়ে শুকিয়ে মরাও শত গুণে ভালো ছিল? কত কথাই তার মনে পড়ল, বনের মাঝে সেই সুখের জীবনের কথা, বড়োদিনের উৎসবের আনন্দের কথা, সেই ছোটো-ছোটো ইঁদুরদের কথা, আহ ওদের হাম্পটি-ডাম্পটির গল্প বললে, কি আগ্রহেই না শুনত ! গাছ বেচারি মনে মনে বলতে লাগল, “সব গেল, সব গেল ! আহা কত সুখীই-না হতে পারতাম ! এখন সব শেষ।”
     তার পর চাকররা এসে গাছটিকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলল। তার পর টুকরোগুলো এক জায়গায় জড়ো করে, তাতে আগুন লাগিয়ে দিল। গাছের বুক থেকে গভীর বেদনার শব্দ বেরিয়ে এল, মনে হল যেন পটকা ফাটছে। ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়েরা দৌড়ে এসে, আগুনের সামনে লাফালাফি করতে লাগল।
     একেকটি বেদনার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে গাছটির কিন্তু কত কি মনে পড়তে লাগল, বনের মাঝে একটি রোদে ভর দিনের কথা, তারা ভরা রাতের কথা, বড়োদিনের কথা, হাম্পটি-ডাম্পটির কথা, ঐ একটি বৈ আর গল্প গাছ জানতও না, বলতেও পারত না । শেষে গাছটি পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
     ছেলেরা উঠোনে খেলে বেড়াতে লাগল। জীবনের সবচেয়ে সুখের সন্ধ্যায় গাছের মাথায় যে সোনালি তারাটি পরানো ছিল, সবার ছোটো ছেলেটির বুকে আজ সেই তারা জ্বলজ্জ্বল করতে লাগল। কিন্তু সব কিছু শেষ হয়ে গেল, গাছও শেষ হল, গল্পও শেষ হল। কোনো-না-কোনো সময়ে সব গল্পেরই শেষ হয়।

গল্পটির ইপাব(Epub) ডাউনলোড করো
ডাউনলোড : Epub
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য