পরী-টিলার কথা -- হ্যান্স অ্যান্ডারসন

     বুড়ো গাছের ফাটলে ফোকরে অনেকগুলো গিরগিটি চটপট, দৌড়োদৌড়ি করছিল। একজন বলল, “শোনো একবার পুরনো পরী-টিলায় কিসের হড়হড়, ঘড়ঘড় শব্দ! দুরাত্তির চোখের দুপাতা এক করতে পারি নি, দাঁত-ব্যথার চাইতে কিসে কমটা হল বল দিকিনি৷”
     অন্য গিরগিটি বলল, “ওখানে একটা কিছু ব্যাপার পাকাচ্ছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। ভোরে মোরগ-ডাকা পর্যন্ত চারটে লাল থামের ওপর টিলাটাকে তুলে রাখে; আর সে কী ঝাঁটপাট ধুলো বাড়ার ঘটা! ওদের মেয়েরা নতুন নতুন নাচ শিখছে, তাতে সে কী পা ঠোকার ধুম! একটা কিছু যে ঘনাচ্ছে সেটা ঠিক।” পরী-টিলাতে ক্ষুদে-ক্ষুদে এক জাতের পরী থাকে, তাদের বলে এলফ।
     তৃতীয় গিরগিটি বলল, “যা বলেছ। আমার চেনা একটা কেঁচোর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল। সে সবেমাত্র ওখান থেকে এসেছে, বেশ কিছুকাল ওখানে দিনরাত মাটি তুলতে তুলতে অনেক কথাই ওর কানে গেছে। অবিশ্যি বেচারা চোখে কিছু দেখতে পায় না, কিন্তু বুঝতে শুনতে ওর জুড়ি নেই। ওখানে নাকি বাইরে থেকে গণ্য-মান্য অতিথি আসবে ; তবে কারা আসবে সে কথা কেঁচো জানে না। যত রাজ্যের জোনাকিদের বায়না দিয়েছে, মশাল-মিছিল করতে হবে, তাই নাকি বলল ওরা। তা ছাড়া পরী-টিলার সোনা-রুপোর চাঁইয়ের কথা তো সবাই জানে, সেগুলোকে ঘষে মেজে চাঁদের আলোয় পেতে রাখা হবে, তাতে জৌলুস বেরুবে।”
     ঠিক সেই সময় পরী-টিলা দুফাঁক হল আর ভিতর থেকে এক বুড়ি-মতো পরী মহিলা বেরিয়ে এল। তার কাজ হল পরীরাজার ঘর-সংসার দেখা ; এদিকে তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়া হয়, তাই কপালে একটি হলদে পাথরের হরতন বাঁধা, পরনে কাপড়-চোপড় অবিশ্বি খুব সাদাসিধে। সব ক্ষুদে পরীদের মতো বুড়ির পিঠটাও ফোঁপরা। ভারি তাড়াতাড়ি খুরথুর করে হাটে। খুট খুট করে সোজা জলার ধারে গেল বুড়ি; সেখানে রাত-জাগা দাঁড়কাক থাকে। তাকে বলল, “আজ রাতে তোমার পরী-টিলায় নেমন্তন্ন। কিন্তু ভাই, তার আগে আমাদের একটি মস্ত উপকার করবে কি? অন্য অতিথিদের কাছে নেমন্তম পৌঁছে দেবে? তুমি নিজে তো আর সংসারী নও, কাজেই এটুকু করতে তোমার কোনোই অসুবিধা হবে না। আমাদের ওখানে ভারি গণ্যমান্য অতিথি আসবার কথা, অর্থাৎ কিনা উত্তর দেশের ট্রোলরা। আমাদের রাজামশাই নিজে তাদের অভ্যর্থনা করবেন।” 

     দাঁড়কাক জিজ্ঞাসা করল, “কার কার নেমন্তম হচ্ছে?” 
     “দুনিয়াসুদ্ধ সবাই আসতে পারে; এমন-কি, যে-সব মানুষ ঘুমের ঘোরে কথা কয়, কিংবা অন্য কোনোভাবে আমাদের মতো আচরণ করে, তারা পর্যন্ত বাদ নয়। তবে ভোজসভায় শুধু বাছা বাছা লোকদের ডাকা হচ্ছে, সবচাইতে উঁচু পদের লোক ছাড়া আর কেউ আসতে পাবে না। সত্যি কথা বলতে কি, এই নিয়ে রাজামশাইয়ের সঙ্গে আমার একটু তর্কাতর্কি হয়ে গেছে। আমি জোর গলায় বলেছি আজ রাতে ভূত-প্রেতদের পর্যন্ত বলা হবে না। সবার আগে সাগররাজ আর তাঁর মেয়েদের বলতে হবে; তারা অবিশ্যি শুকনো ডাঙায় আসাটা খুব-একটা পছন্দ করে না, তবে আমি কথা দেব যে প্রত্যেককে বসবার জন্য একটা করে ভিজে পাথর, কিম্বা তার চেয়েও ভালো কিছু দেওয়া হবে।
     এ কথা শুনলে আমার মনে হয় এবার আর ওদের কোনো আপত্তি থাকবে না। প্রথম শ্রেণীর বুড়ো ট্রোলদের সকলকেই ডাকতে হবে তা ছাড়া নদীর দেওকে আর নিস্-পরীদের বলতে হবে। মরণ-ঘোড়া আর কির্কেগ্রিমকে বাদ দেওয়া চলে না । এটা সত্যি যে এরা কেউই আমাদের দলের নয়, কি গম্ভীর রে বাবা ! তবে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, নিয়মিত যাওয়া আসা করে, কাজেই বলতেই হয়।”
     দাঁড়কাক বলল, “ক্ক !” এই বলে নেমন্তম পৌছে দিতে উড়ে চলল।
     টিলার বড়ো সভাঘরটিকে খালি করে নিয়ে তকতকে পরিষ্কার করা হল। চাঁদের আলো দিয়ে মেঝে ধোয়া হল, দেয়ালে কষে ডাইনীর চর্বি ঘষা হল, যতক্ষণ না টিউলিপ ফুলে আলো পড়লে যেমন রঙ বেরোয় সেইরকম ছটা দিতে লাগল। রান্নাঘরে ব্যাঙের শিককাবাব হচ্ছিল; তা ছাড়া আরো কত মুখরোচক জিনিস রান্না হচ্ছিল, যেমন ব্যাঙের-ছাতার বীচি, বিষ-পাতার সুরুয়া ইত্যাদি। কিছু কিছু আগেই হয়ে গেছিল। এই হল প্রথম দিকের পদ। শেষে মিষ্টিমুখ করার জন্য কত কিসের ব্যবস্থা ছিল, মর্চেধরা পেরেক, রঙিন কাঁচের কুচি, এই-সব। তা ছাড়া ছিল সোরার সোরাব, জলার পেত্নীর ঘরে চোলাই করা মদ।
     আয়োজন যাতে নিখুঁত হয়, তাই শ্লেট-পেনসিল গুড়ো করে, তাই দিয়ে পরীরাজের সোনার মুকুট পালিশ করা হয়েছিল।
     সবচেয়ে ছোটে রাজকন্যে বললেন, “বাবা গো, এই-সব গণ্যমান্য অতিথিরা কারা, তা বলবে না?”
     রাজামশাই বললেন, “বেশ, কথাটা আর গোপন করে কি লা ? ব্যাপারটা কিছুই নয়, আমার মেয়েদের মধ্যে দুজন যেন বিয়ের জন্য তৈরি থাকে। দুজনের নিশ্চয়ই এবার বিয়ে হয়ে যাবে। নরওয়ের ট্রোলদের সর্দার আসছেন। তাদের দেশের পাথুরে পাহাড়-পর্বতের মধ্যে তাঁর মেলা প্রাসাদ দুর্গ ইত্যাদি আছে, তা ছাড়া সোনার খনি আছে। সোনার খনি থাকা বড়ো ভালো, এই আমি বলে দিলাম। মোট কথা তিনি এখানে আসছেন, সঙ্গে আনছেন তার দুই ছেলে, তারা নিজের কনে পছন্দ করবে। এই পাহাড়ী সর্দারের মতো সাধু, খোলাখালা, আদর্শ উত্তর দেশবাসী আর হয় না। তার উপর কী অমায়িক আর ফুর্তিবাজ ! আমার পুরনো বন্ধু ; অনেককাল আগে একবার এসেছিলেন নিজের জন্য কনে দেখতে। শুনেছি নাকি ছেলে দুটো ভারি অভদ্র অসভ্য, তবে শোনা কথা ভুলও হতে পারে। সে যাই হোক, বছর দুই যেতে না যেতেই নিশ্চয় ওদের স্বভাব শুধরোবে।”
     ছোটে রাজকন্যে বললেন, “কত শিগগির আসবে ওরা?” রাজামশাই বললেন, “সেটা নির্ভর করছে জল-হাওয়ার উপর। ওরা কম খরচে যাতায়াত করে, জাহাজের যেমন সুবিধা পায়। আমার ইচ্ছা ছিল সুইডেন পার হয়ে আসে, তা বুড়ো কিছুতেই রাজি হল না । বড্ডো সেকেলে, ঐ ওর একটিমাত্র দোষ।”
     ঠিক সেই সময় দুটো আলেয়া ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে এসে হাজির, কে কার আগে আসতে পারে এই চেষ্টা, খবরটা কে আগে
দেবে !
     এসেই দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল, “আসছে! আসছে ” রাজামশাই বললেন, “দাও দেখি মুকুটটা, চাঁদের আলোয় দাঁড়াই গিয়ে।” সাত রাজকন্যে তখন তাদের লম্বা-লম্বা শালগুলি তুলে ধরে মাটি পর্যন্ত নিচু হয়ে নমস্কার করল।
     মাথায় বরফের ঝালর আর পালিশ করা সরলগাছের গুটির মুকুট পরে ট্রোল সর্দার সামনে এসে দাঁড়ালেন। গায়ে ভালুক ছালের পোশাক আর হাঁটু ঢাকা, ভিতরে লোম দেওয়া, শ্লেজগাড়িতে চড়বার বুট। তাঁর ছেলেদের কাপড়-চোপড় অনেক হালকা ধরনের, দুজনারই গলা খোলা। সবাই জানুক যে শীতকে তারা পরোয়া করে না।
     বুড়ে বললেন, “দেখ, বাপু, ভদ্র ব্যবহার করবে। যাঁর বাড়িতে এসেছ তিনি যেন আবার ভেবে না বসেন যে তোমরা কখনো ভদ্র সমাজে মেশনি ।”
     তার পর সবাই মিলে পরী-টিলার ভিতরে, সেই চমৎকার সভাঘরে গেলেন। সেখানে বাছাই করা উচ্চপদস্থ কয়েকজন বসেছিলেন। প্রত্যেকটি অতিথির আদর-আপ্যায়নের জন্য যতদূর পারা যায় ভালো ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যেমন, সাগররাজের পরিবারের সবাই জল-ভরা বড়ো-বড়ো টবে বসে খেলেন। সবাই একবাক্যে বললেন, যে-যার নিজেদের বাড়ির মতো আরামে আছেন, কারও কোনো সঙ্কোচ হচ্ছে না । সকলেই অতি ভদ্রে কায়দা-দুরস্ত ভাবে আচরণ করতে লাগলেন, উত্তরদেশের সেই দুই ট্রোল ছোকরা বাদে । তারা দুজন ভদ্রতা ভুলে টেবিলের উপর ঠ্যাং তুলে দিল।
     তাদের বাবা চটে লাল। “এ কি ! থালার পাশে ঠ্যাং রাখা ! নামা বলছি !” ঠ্যাং নামাল তারা, তবে যতটা তাড়াতাড়ি নামান যেত, ততটা তাড়াতাড়ি নয়। তার পর দুই ছোড়া পকেট থেকে সরলগাছের গুটি বের করে, দুজনার মাঝে যে মহিলাটি বসেছিলেন, তার গায়ে ছুড়ে মারতে লাগল। তার পর বুট পায়ে দিয়ে সুবিধা হচ্ছিল না বলে, জুতো খুলে মহিলা বেচারাকে ধরতে বলল! কিন্তু ওদের বাবা, বুড়ো সর্দারের ব্যবহার একেবারে অন্যরকম। কী সুন্দর কথাবার্তা তার ! কত কথাই-না বললেন, নরওয়ের আকাশ-ছোয়া পাহাড়-পর্বতের কথা, সেখানকার ঝর্নার কথা সেখানে ফিনকি দিয়ে জল ছোটে, ফেনায় ফেনায় সাদা ! সে-দেশে ঝড়ের দেবতা তার সোনার বীণায় স্থর তুললে, উদামসাগরের ঢেউ থেকে সামন মাছরা লাফিয়ে ওঠে। তারার আলোয় ভরা শীতের রাতে সেখানে শ্লেজ-গাড়ির ঘণ্টায় সে কী উল্লাস! হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে, বরফের উপর দিয়ে যুবকরা কেমন দৌড়-বাজ খেলে। কাঁচের মতো পাতলা স্বচ্ছ সে বরফ, তার ভিতর দিয়ে দেখা যায় জলের নীচে মাছরা ভয়ের চোটে পাগলের মতো পাক খাচ্ছে! আরো কত কি বললেন সর্দার, উত্তর দেশের বাহাদুর জোয়ানরা আর সুন্দরী মেয়ের কেমন সেকালের কথা গান গেয়ে শোনায়, কেমন, হালিঞ্জ নাচ নাচে তারা । কি চমৎকার গল্প বলার ধরন বুড়োর, শুনে মনে হচ্ছিল যেন সব কিছু স্পষ্ট চোখে দেখা যাচ্ছে, কানে শোনা যাচ্ছে ।
     তার পর পরী-মেয়েদের নাচ দেখাবার জন্য ডাক পড়ল। প্রথমে তারা সহজ নাচ দেখাল ; তার পর পা ঠুকে তাল রেখে নাচল; দুরকম নাচই চমৎকার হল। সবার শেষে সবচাইতে কঠিন নাচ। তাকে বলে নাচের সেরা নাচ! সাবাস, সাবাস ! মনে হল ওদের পাগুলো যেন টান খেয়ে লম্বা হয়ে উঠেছে । সে কী ঘূর্নি-ঘোরা আর পাক-খাওয়ার ধুম ! সে কী দোলন-দোলা, ঝুলন-দোলা, সে কী বোঁ-বোঁ ঘোরা ! শেষপর্যন্ত তাই দেখে মরণ-ঘোড়ার এমনি মাথা ঘুরতে লাগল যে সে টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে বাধ্য হল।
     পাহাড়ী সর্দার বললেন, “বাহবা ! বাহবা ! হাত-পা চালাতে তো দারুণ শিখেছে ! কিন্তু নাচ ছাড়া আর কিছু জানে না নাকি ?”
     রাজামশাই বললেন, “সেটা আপনি নিজেই পরখ করে দেখুন-না।” এই বলে বড়ো মেয়েকে ডাকলেন। তার গায়ের রঙ চাঁদের আলোর মতো সাদা, স্বচ্ছ । রাজকন্যে নিজের ঠোটের ফাঁকে যেই-না একটা সাদা কাঠি রাখলেন, অমনি তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ঐ তাঁর বিদ্যে ।
কিন্তু পাহাড়ী সর্দার বললেন, “বাবা! এমন বিদ্যে বৌয়ের না থাকাই ভালো ! আমার ছেলেদেরও বোধ হয় সেই মত।”
     দ্বিতীয় রাজকন্যে ছায়ার মতো নিজের পাশে পাশে হাঁটতে পারতেন। ছোটো পরীদের কিংবা ট্রোলদের ছায়া থাকে না।
     তৃতীয় রাজকন্যের অন্যরকম গুণ। জলার পেত্নীর কাছ থেকে তিনি মদ চোলাই শিখেছিলেন। তা ছাড়া জোনাকি পোকা দিয়ে অলডার গাছের ডালে তেল লাগাতে জানতেন। বুড়ো সর্দার বললেন, “এ মেয়ে খুব ভালো গিন্নী হবে।”
     চতুর্থ কন্যা নিয়ে এল একটা মস্ত সোনার বীণা, তাতে একটু তান ধরতেই সভার সকলে বা পা তুললেন—ছোটো পরীর সর্বদা বেঁয়ো হয়—দ্বিতীয় তান ধরতেই রাজকন্যে যা বলেন তাঁদের তাই করতে হল !
     বুড়ো ট্রোল সর্দার বললেন, “বাপ রে, কী সর্বনেশে বিদ্য৷” তাঁর দুই ছেলেই পত্রপাঠ উঠে পড়ে, পরী-টিলা থেকে পিট্টান দিল ! এদের বিদ্যে জাহির দেখে তাদের বিরক্তি ধরে গেছিল।
     পাহাড়ী সর্দার বললেন, “তার পরের কন্যে কি করতে পারে?”
     সে বলল, “আমি উত্তর দেশকে ভালোবাসতে শিখেছি। সেখানে বিয়ে না হলে, আমি বিয়েই করব না।”
     সবার ছোটে রাজকন্যে তখন বুড়োর কানে কানে বললেন, “তার কারণ হল দিদি একটি পুরনো ছড়া শুনেছে, তাতে আছে যে, পৃথিবী যখন ধ্বংস হয়ে যাবে, নরওয়ের পাহাড়-পর্বত তখনো ধ্বংসের মাঝখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে। ও মরণকে বড়ে ভয় করে, তাই নরওয়ে যেতে চায়।”
     পাহাড়ী সর্দার বললেন, “ওহে, এই বুঝি ব্যাপার। কিন্তু সবার ছোটো সপ্তম রাজকন্যে কি করতে পারে শুনি ?”
     পরীদের রাজামশাই বললেন, “আহা, সপ্তমের আগে তো ছয় নম্বরের পালা।” রাজার গোনায় কখনো ভুল হত না । ছয় নম্বরের কিন্তু এগিয়ে আসার খুব একটা ইচ্ছা দেখা গেল না । সে বলল, “আমি খালি সবাইকে সত্যি কথা বলতে পারি। আমার জন্য কাউকে মাথা ঘামাতে হবে না। আমি আমার কবর-ঢাকা সেলাই করে আর কিছু করার সময় পাই না।”
     তার পর সবার ছোটো সপ্তম রাজকন্তের পালা। তিনি পরীদের গল্প বলতে পারতেন, যত শুনতে চাও তত।
     পাহাড়ী সর্দার বললেন, “এই দেখ আমার হাতের পাঁচটা আঙুল, একেকটার জন্য একেকটা গল্প বল দিকিনি।”
     ছোটো পরীদের রাজকন্যে তখন তাঁর হাতের কব্জিটি-না ধরে একটার পর একটা গল্প বলতে লাগলেন। হাসতে হাসতে সর্দারের পেটে খিল ধরে গেল। গল্প বলতে বলতে রাজকন্যে যখন বুড়োর আংটি পরার আঙুলে পৌছলেন—আঙুলটা মনে হল আগে থেকেই জেনে রেখেছিল যে একটা আংটির দরকার হবে—তখন সর্দার বলে উঠলেন, “রোখো! এই হাতটাই তোমাকে দিলাম। আমি নিজেই তোমাকে বিয়ে করব। বাকি গল্পগুলো শীতকালের জন্য তুলে রাখ। তখন শোনা যাবে। আমরা, নরওয়ের লোকরা, পরীদের গল্প শুনতে বেজায় ভালোবাসি আর তোমার মতো এমন ভালো গল্প কেউ বলতে পারে না। শীতকালে আমরা আমাদের পাথরের ঘরে বসব, উনুনে ঝাউগাছের গুড়ি দাউদাউ করে জ্বলবে, মটমট করে ফাটবে ; সেকালে নস রাজাদের সোনার শিঙায় ভরে মদ খাব—কী মজাই না হবে । আরে! ছেলেদুটো গেল কোথায় ?”
     কোথায় আবার যাবে? তারা তখন মাঠেঘাটে আলেয়া তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল ! সে বেচারির সবে মশাল-মিছিলের জন্য তৈরি হচ্ছিল !
বুড়ো বললেন, “এরকম দাঙ্গা-হাঙ্গামা করার মানেটা কি শুনি ? এতক্ষণ আমি তোমাদের জন্য একটা মা পছন্দ করতে ব্যস্ত ছিলাম। এবার এসে দিকি বাছাধনরা, মাসিদের মধ্যে থেকে একটা করে বৌ বেছে নাও।”
     ছেলেরা বলল বিয়েটিয়ে তাদের দিয়ে হবে না, তার চাইতে বরং তারা বক্তৃতা দিতে আর অভিনন্দন করতে রাজি আছে। শেষপর্যন্ত তাই হল ; ছেলেগুলো বক্তৃতা দিল, অভিনন্দন জানাবার জন্য টপাটপ, মদের গেলাস খালি করে, টেবিলের উপর সারি সারি সাজিয়ে রাখল, যাতে সবাই বুঝতে পারে গেলাসগুলো খালি। তার পর গায়ের জামা খুলে, আদব-কায়দা ভুলে, টেবিলের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে, ভোস্-ভোস্ করে ঘুমুতে লাগল। এদিকে বুড়ো সর্দার নতুন বৌয়ের সঙ্গে সভাঘরের চারদিক ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগলেন। তার পর বুট বদল করে বিয়ে হল ; তাতে আংটি বদলের মতো অতটা অভদ্রতা হয় না।
     তার পর যে ভদ্রমহিলা রাজামশাইয়ের সংসার দেখতেন,তিনি এসে বললেন, “ঐ শোনো, মোরগ ডাকছে। এবার তাড়াতাড়ি করে জানলার খড়খড়ি বন্ধ করা যাক, নইলে রোদ ঢুকে আমাদের গায়ের রঙ ঝলসে দেবে !”
তখন পরী-টিলা বন্ধ হয়ে গেল ।
বাইরে কিন্তু সেই ফাটল-ধরা গাছের গুড়িতে গিরগিটির তখনো ছুটে ছুটে একবার উঠছে, একবার নামছে। তারা সবাই বলল, “বুড়ো ট্রোল সর্দার কিন্তু খাস লোক !” শুধু কেঁচো বলল, “না বাপু, আমার ঐ ছেলেদুটোকে বেশি পছন্দ।” তবে সে বেচারা তো আর ছেলেদেরও দেখে নি, তাদের বাপকেও দেখে নি, কাজেই তার মতামতের কতটুকুই-বা দাম।

এই গল্পটির ইপাব (Epub) ডাউনলোড করো
ডাউনলোড: Epub
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য