শিবে ডাকাতের আর এক গল্প -- ধীরেন্দ্রলাল ধর

    সিপাহী যুদ্ধের আমল। মুর্শিদাবাদ শহর তখন জমজমাট। নবাবী আমল। বাংলা বিহার ওড়িশার রাজধানী মুর্শিদাবাদ। দোকান-পসারি, পদাতিক, গাড়ি, ঘোড়া সব মিলিয়ে শহরে বুঝি আর মানুষের জায়গা নেই।
    বাইরে থেকে লোকজন আসে অহরহ। সেজন্যে মুসাফিরখানাও আছে বহু, কোনো মুসাফিরখানাই কোনোদিন খালি থাকে না।
    গঙ্গার ধারে এক মুসাফিরখানা নিয়েই আমাদের এই গল্প। মুসাফিরখানার মালিক হিন্দু। হিন্দুরাই এখানে আশ্রয় নেয়। হোটেল কথাটার চলন তখনও হয়নি, তা হলে এর নাম হত হিন্দু হোটেল। এদিকটায় এই একটাই হিন্দু আবাসিক ভোজনালয়। গঙ্গার ধার দিয়ে যারা দূরদূরান্তে যাওয়া-আসা করে তারা এই ভোজনালয়টির সঙ্গে বিশেষ পরিচিত। 
সেদিন সন্ধ্যার পর এক বাঙালি ঘোড়সওয়ার মুসাফিরখানার সামনে এসে ঘোড়া থেকে নামল। নেমেই ডাক দিল— বাচ্চু—বাচ্চু—!
    একটা বছর বারোর ছেলে বেরিয়ে এল। ঘোড়সওয়ারকে দেখে বলল, সেলাম!
    ফটকের মাথায় একটা তেলের লণ্ঠন জ্বলছিল, সেই আলোয় ঘোড়সওয়ার ছেলেটির মুখের পানে তাকিয়ে বলল, কীরে, কেমন আছিস?
    —ভালো।
    —গলার স্বর অমন কেন রে? কাঁদছিস বুঝি?
    — না
    —হ্যাঁ তুই কাঁদছিস, চোখে জল চিকচিক করছে।
    বাচ্চু চুপ করে রইল।
    —কী হয়েছে রে ?
    —মেরেছে।
    —কেন, মারল কেন?
    —দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
    —সেইজন্য মেরেছে?
    —একটু দোষ দেখলেই তো মারে।
    —যাক, কাঁদিসনে, আমি তোকে এবার এক রুপেয়া বকশিশ দিয়ে যাব।
    —দিলে কী হবে, তুমি চলে যাবার পর তো কেড়ে নেবে।
    —তোর বকশিশ কেড়ে নেবে?
    —তাই তো নেয়।
    সওয়ার কয়েক মুহুর্ত ছেলেটির মুখের পানে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বলে, আমার ঘোড়াটা আস্তাবলে নিয়ে যা—
    বাচ্চু বলল, মালিককে কিছু বলবেন না বাবুজি, তাহলে আবার মারবে।
    —ঠিক আছে।
    ঘোড়সওয়ার মুসাফিরখানায় প্রবেশ করল।
সামনের বারান্দায় বলছিল মালিক নন্দলাল, ঘোড়াসওয়ারকে দেখেই চিনল, বলল, শিবদাসবাবু নাকি! নমস্কার! নমস্কার!
    শিবদাস প্রতিনমস্কার করে বলল, আমার ঘর খালি আছে?
    —দোতলা, কোণের ঘর? আছে। সাফ করিয়ে দিই। ওরে বাচ্চু—
    —বাচ্চু আমার ঘোড়া রাখতে গেছে আস্তাবলে।
    —ঠিক আছে, আসুক। আপনি ততক্ষণ বসে একটু তামাক খান।
    শিবদাস সামনের কুরসির উপর বসল। নন্দলাল তামাকের হুকুম দিল। শিবদাসকে সে খুশি রাখতে চায়। শাঁসালো খরিদ্দার। এই সরাইখানায় যখনই আসে যথেষ্ট খরচ করে, ঝি-চাকরদের রীতিমতো বকশিশ দেয়। ব্যবসা করতে
হলে এদের খুশি রাখতে হয়।
    তামাক খেতে খেতে কাজ কারবারের কথা শুরু হল। এ কথা পুরনো কথা— এ বছরের ব্যবসা গত বছরের চেয়ে খারাপ, কী যে হবে, কী করে সব চলবে ইত্যাদি।
    ইতিমধ্যে বাচ্চু এসে পড়ল, শিবদাস বাচ্চুর সঙ্গে দোতলায় চলে গেল। বাচ্চু ঘরখানি সাফসুফ করে দেয়, একটা লণ্ঠন জ্বেলে নিয়ে আসে। একখানি সতরঞ্চি এনে পেতে দেয় তক্তাপোশের উপর, তারপর চাদর বিছিয়ে দেয়। শিবদাস এবার বেশভুষা বদলাতে ব্যস্ত হয়। বলে, হাত মুখ ধুয়েই কিছু খেতে হবে। বাচ্চু, সেরখানেক দুধ আর চারটে মিঠাই নিয়ে আয়, দুটো গেলাস নিয়ে আসবি।
    শিবদাস হাত-মুখ ধুয়ে আসতে বাচ্চু দুধ, মিঠাই নিয়ে আসে। শিবদাস ঘটি থেকে এক গেলাস দুধ ঢেলে নিয়ে বাচ্চুর দিকে এগিয়ে দেয়, বলে, তুই খা, আর এই দুটো মিঠাই।
     —আমি?—বাচ্চু তো অবাক। 
    —তুই মার খেয়েছিস, এবার মিঠাই খা। ঝটপট খেয়ে নে, দেরি করিসনে। এখনই হয়তো মালিক ডাকবে। নে হাত পাত— 
    মিঠাই দুটো শিবদাস বাচ্চুর হাতে দিয়ে দেয়। আর বলতে হয় না, বাচ্চু মিঠাই মুখে ভরে, দুধের গ্লাসে চুমুক দেয়। বাকি মিঠাই দুটো খেয়ে শিবদাস ঘটির দুধ গলায় ঢালে। বাচ্চু মুখ মুছে, ঘটি নিয়ে চলে যায়। শিবদাস লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে তক্তাপোশের উপর।
    ঘণ্টা দুয়েক পরে বাচ্চু আসে ডাকতে—বাবুজি, খানা তৈরি। 
    শিবদাস নীচে নেমে আসে খেতে। আহার শেষে শিবদাস মালিককে বলল, বাচ্চুকে খানিকক্ষণের জন্য ছেড়ে দিতে হবে, আমার কোমরে একটু তেল মালিশ করে দেবে। কোমরটা বড় কনকন করছে।
নন্দলাল বলল, বাচ্চু কেন, আমি অন্য লোক দিচ্ছি, শক্ত লোক মিশির ডলে দেবে।
    না না, ওই বাচ্চুই ভালো। 
    —ও যে এখন পরিবেশন করবে, লোকজন খাবে। 
    —মিশির পরিবেশন করুক। বাচ্চুর মালিশই ভালো হবে। দরদের জায়গায় হালকা হাতের মালিশই ভালো।
    নন্দলাল বলল, বেশ, এখনই গরম তেল দিয়ে বাচ্চুকেই পাঠিয়ে দিচ্ছি। একটু পরেই বাচ্চু তেলের বাটি নিয়ে ঘরে এল। শিবদাস হেসে বলল, তেল মালিশ করতে তোকে ডাকিনি, তোকে ডেকেছি গল্প করতে।
    বাচ্চু তো থ। এর আগেও বাচ্চু অনেক ভালো লোক দেখেছে। মিষ্টি কথা বলে বকশিশ দেয়। শিবদাসও কবার এসেছে। কিন্তু তার সঙ্গে গল্প করতে চায় এমন মানুষ সে দেখেনি।
    —কী চুপ করে রইলি যে—শিবদাস বলল, বল, তোর দেশ কোথায়? বাড়িতে কে আছে—বাবা মা ভাই বোন?
    এবার যেন বাচ্চু কথা খুঁজে পায়, বলে, বাবা ? বাবা মরে গেছে, মা আছে, আর মায়ের কাছে আছে ছোট ভাই। এই যে বহরমপুর যাবার সড়ক গেছে, এই পথে দুক্রোশ গেলে আমাদের গ্রাম রামপুর।
    —জ্যাঠা খুড়ো কে আছে? 
    —কেউ না। দশ বিঘে ধান জমি ছিল, সে বছর বিষ্টি হল না। চাষ হল না, খাজনা বাকি পড়ল, জমিদার জমি কেড়ে নিলে। খাব কি, তাই এলাম এখানে কাজ করতে। খাওয়াদাওয়া আর মাসে এক টাকা মাইনে, তা এরা বড্ড মারে। আমার আর এ কাজ ভালো লাগে না, ছেড়ে দেব। এক একদিন আবার রাতের খাওয়া বন্ধ করে দেয়! কত লোক খুশি হয়ে দু-এক পয়সা বকশিশ দিয়ে যায় তাও কেড়ে নেয়।
    ছেলেমানুষ সহানুভূতির আমেজে বলে যায় অনেক কথা। সেই সকাল হবার আগে উঠতে হয়। সারা বাড়ি ঝাট দিতে হয়। জল তুলতে হয়। যাত্রীদের ফাইফরমাশ খাটতে হয়। খাটতে হয় রাত দুপুর অবধি। এক-একদিন পা ব্যথা করে, একটু বসার উপায় নেই, সঙ্গে সঙ্গে ডাক পড়বে—এটা কর, ওটা কর! সকালে উঠতে একটু দেরি হলেই মারবে। ডেকে সাড়া না পেলে গাল দেবে। সারাদিন একটু সুস্থির হয়ে বসার উপায় নেই। আজ তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে বিকেলবেলা হাত থেকে থালা পড়ে গিয়েছিল বলে আমায় মারলে।
    শিবদাস চুপ করে শুনে যায়। কোনো একসময় শিবদাস প্রশ্ন করল, তোর বাবা কী কাজ করত ? 
    —বাবা ছিলেন ঘরামি। খুব ভালো ঘর ছাইতে পারত। সবাই বাবাকেই ডাকত ঘর ছাইতে। বৃষ্টির দিনে কাজ থাকত না, বাবা তখন দাওয়ায় বলে গল্প বলত। কত গল্প—রাক্ষসের গল্প, ভূতের গল্প, ব্রহ্মদত্যির গল্প, ডাকাতের গল্প। একজন ডাকাতকে তেষ্টার জল দিয়েছিল, নারকেল-মড়ি খেতে দিয়েছি বলে সে এক থলি টাকা দিয়েছিল। তেমন কোনো ডাকাতের ঠিকানা পেলে আমি তার সঙ্গে একবার দেখা করতাম। 
    —দেখা করলে কী হত? 
    —ভিক্ষে চাইতাম, বলতাম, আমরা বড্ড গরিব, মা বাবুদের বাড়িতে ধান ভাঙে মুড়ি ভাজে, তুমি আমাদের দশ-বিশটা টাকা দাও।
    —দশ-বিশ টাকায় তোদের কদিন চলবে? 
   —তার মধ্যে আমি অন্য জায়গায় চাকরি জোগাড় করে নেব, এখানে আর কাজ করব না। এখানে আর একটুও ভালো লাগে না, এরা মারে, আবার চুরি করে। বকশিশের পয়সা কাপড়ের খুঁটে বেঁধে রাখলাম, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম কিছু নেই। সেই পয়সার কথা জিজ্ঞেস করলে আবার এক চড় বসিয়ে দিলে। এখন আর তাই কেউ বকশিশ দিলে নিই না। বকশিশের পয়সা সব থাকলে আজ আমার চার-পাঁচ টাকা হয়ে যেত।
    শিবদাস শুনতে শুনতে হঠাৎ কী ভেবে কোমরে জড়িয়ে রাখা টাকার থলিটা খুলে ফেলে, ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটা সিকি বের করে বলে, এই নে, তোকে আমি চার আনা বকশিশ দিলাম, আমার সামনে কাপড়ের খুঁটে বেঁধে কোমরে জড়িয়ে নে।
    —কেন দিচ্ছেন বাবু, ও থাকবে না। কাল ঘুম থেকে উঠেই দেখব গিট খোলা !
    —খুলুক না, আমাকে বলবি, আমি ব্রহ্মদত্যি পাঠিয়ে দোব।
    —ব্রহ্মদত্যি?
    —গল্পের ব্রহ্মদত্যি। যার কাজ হল দুষ্ট লোকদের শায়েস্তে করা।
    —সে কি সত্যি আছে নাকি? বাবার কাছে সে গল্প শুনেছি। জমিদারের গোমস্তা গরিব চাষীর সব কেড়ে নিয়েছিল, সে মনের দুঃখে বনে যাচ্ছিল। কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছিল, পথে এক গাছ থেকে ব্রহ্মদত্যি নেমে এসে বলল, কাঁদছিস কেন? তারপর সব শুনে বললে, আয় আমার সঙ্গে। ব্রহ্মদত্যি গোমস্তার বাড়ি গিয়ে তাকে এমন মার দিলে যে গোমস্তা চাষীকে দশ গুণ টাকাপয়সা দিয়ে তবে রেহাই পায়।
    —সেই বেহ্মদত্যিই আমি ডেকে আনব।
    —সত্যি ?
    —সত্যি।
    —বাচ্চু সিকিটা কাপড়ের খুঁটে বেঁধে ভালো করে কোমরে জড়িয়ে নিলে। শিবদাস বলল, আমার ঘুম পাচ্ছে, যা, এবার তোর ছুটি।
    পরদিন প্রত্যুষে গঙ্গাস্নান সেরে শিবদাস যখন ফিরল মুসাফিরখানার দেউড়িতে দাঁড়িয়ে বাচ্চু তখন কাঁদছে।
    —কী হল রে বা্চ্চু ?
    নন্দলাল কাছেই ছিল, ওকে জবাব দিলাম। ঘুম থেকে উঠেই ব্যাটা বলে, আমার কাপড়ের খুঁটে চার আনা পয়সা বাঁধা ছিল, তোমরা খুলে নিয়েছা! ব্যাটা আমাকে বলে চোর! ওর মা হাতে-পায়ে ধরেছিল তাই রেখেছিলাম, যতদিন যাচ্ছে তত ব্যাটা মাথায় উঠছে! পাজি, নচ্ছার, বদমায়েস! খবরদার, আর এ মুখো হসনি।
    এবার বাচ্চু মুখ তুলে বলল, আমার মাইনে চুকিয়ে দাও, আমি চলে যাচ্ছি।
    —তোকে আমি এক পয়সাও দোব না। তোর মাকে আসতে বলবি।
    —মা কেন আসবে? আমার ছমাসের মাইনে আমাকে দিয়ে দাও, আমি চলে যাই।
    —তোকে আমি এক পয়সাও দোব না।
    বাচ্চু চুপ করে দাড়িয়ে রইল।
    নন্দলাল বলল, এখনও দাঁড়িয়ে আছিস ? যা ব্যাটা আমার সামনে থেকে, না হলে ঘাড় ধরে দূর করে দোব।
    —মাইনে না দিলে আমি যাব না।
    নন্দলাল মারতে উঠল।
    শিবদাস মাঝে পড়ল, বলল, আহা মেরো না, মাইনে দিয়েই দাও না, চলে যাক।
    —ওর মা-ই বারণ করে গেছে, ওর হাতে টাকা দিতে। নন্দলাল বলল।
    বাচ্চু রুখে উঠল, না মা কখনো একথা বলেনি।
    নন্দ ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল।
    বাচ্চু চিৎকার করে উঠল, মিথ্যাবাদী! 
    —ফের কথা—নন্দলাল আবার মারতে উঠল। 
    বাচ্চু ছিটকে বেরিয়ে গেল। 
    শিবদাস আর কিছু বলল না, নিজের ঘরে চলে গেল। আধঘণ্টার মধ্যে শিবদাস গোটা চারেক মিঠাই আর এক ঘটি ঘোল খেয়ে ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়ল।
    রীতিমতো ঘোড়া ছুটিয়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে শিবদাস এসে ধরল বাচ্চুকে। বাচ্চু স্নান মুখে পথ দিয়ে চলেছিল। শিবদাস ঘোড়া থামিয়ে বলল, তোর গায়ের দিকেই যাচ্ছি, আয়—
    শিবদাস বাচ্চুকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিলে। বাচ্চু জীবনে ঘোড়ায় চড়েনি, বলল, তোমার ঘোড়াটা তো বেশ তেজি! শিবদাস বলল, ঘোড়াই হোক, আর মানুষই হোক, তেজ না থাকলে কারও দাম থাকে না।
    ক-মিনিটের মধ্যেই তারা রামপুরে এসে পৌছল। বাচ্চু বলল, গায়ে এসে গেছি, আমাকে নামিয়ে দিন। 
    —চল তোর বাড়িতেই যাই। পরপর গোলপাতায় ছাওয়া কয়েকখানি মেটে বাড়ি, তারই একটার সামনে এসে বাচ্চু ডাকল, মা!
    এক রমণী বেরিয়ে এল। বাচ্চুকে দেখে অবাক হয়ে গেল। বাচ্চু বলল, রোজ রোজ আমার বকশিশের পয়সা চুরি করে, সেই কথা বলেছিলাম বলে আমাকে মেরে তাড়িয়ে দিলে।
    —তাড়িয়ে দিলে ? 
    —হ্যাঁ। 
    —মাইনের টাকাগুলো দিয়েছে? 
   —না। 
    —ছমাস যে কাজ করলি তার মাইনে দেবে না ? 
    —তোমাকে যেতে বলেছে। রমণী কী বলতে যাচ্ছিল থেমে গেল, শিবদাসের দিকে তার নজর পড়ল। দরজার আড়ালে সরে গিয়ে বলল, সঙ্গে কে?
  —উনি সরাইখানায় থাকেন, আমাকে পৌছে দিয়ে গেলেন। 
    এবার শিবদাস বলল, তোমরা মায়ে-ব্যাটায় আজ সন্ধেবেলা যাবে, সন্ধ্যার সময় আমি থাকব, টাকা আদায় করে দোব।
    রমণী আড়াল থেকে বলল, ও মাসে দুবার গেছিলাম, এক পয়সা দেয়নি। 
    —আজ যাবে, দেখব। ইতিমধ্যে দাদা’ দাদা’ বলতে বলতে একটা ছেলে লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর ঘোড়ার পিঠে তলোয়ার-ঝোলানো শিবদাসকে দেখেই থমকে গেল। শিবদাস ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে গন্তব্য পথে রওনা হল।
    সন্ধেবেলা বাচ্চু আর তার মা এল নন্দলালের সরাইখানায়। নন্দলাল দেখেই তো গর্জন করে উঠল, আবার তুমি ছেলেকে নিয়ে এলে কেন? ওকে আমি রাখব না।
    —মাইনের টাকাটা দিন, আপনি আসতে বলেছিলেন। 
   —মাইনে কীসের? কাজ করলে তো মাইনে? গন্ডেপিন্ডে গিলেছে আর ঘুমিয়েছে, তুমি হাতে-পায়ে ধরে বলে গিয়েছিলে বলে রেখেছিলাম, না হলে অনেক আগেই বিদায় দিতাম।
    —আমি কোনো কাজ করিনি?
    —বাচ্চু বলে উঠল। 
    —ওকে কাজ বলে না –নন্দলাল খেঁকিয়ে উঠল, মাইনে আমি একটি পয়সাও দোব না, এইভাবে লোক রাখা আমার লোকসান।
    —কিছু দেবেন না? ছমাস কাজ করল। 
   —না বাচ্চু মা কেঁদে ফেলল। 
    —কাঁদাকাটা করো না বাবু। তবে তুমি যখন নিজে এসেছ, আট আনা পয়সা নিয়ে যাও।
    —আট আনা ? 
    —আর কথা বলো না, এই আট আনাই আমার লোকসান। ঘরের ভিতর থেকে একটা আধুলি এনে নন্দলাল ঝনাৎ করে ফেলে দিল।
    বাচ্চুর মা মিনতি করল, অর্ধেক দিন, তিনটে টাকা অন্তত। 
    —আর এক পয়সা নয়। আমি দাতব্য করতে বসিনি। 
    বাচ্চুর মা আধুলিটাই তুলে নিলে। শিবদাস কাছেই দাঁড়িয়েছিল, এবার এগিয়ে এল, বলল, কীরে বাচ্চু, মাইনে পেলি?
    বাচ্চু বলল, ছমাস কাজ করে আট আনা পয়সা। 
   —তোর মাইনে কত? 
   —মাসে এক টাকা করে। শিবদাস নন্দলালকে বলল—ছেলেমানুষ কাজ করেছে, মাইনেটা চুকিয়ে দিন।
    নন্দলাল বলল, কাজ করলে তো মাইনে। এ তো দিচ্ছি দাতব্য! 
   —কেন, আমি তো দেখেছি ও অনেক কাজ করে। 
    —হ্যা, কাজ করে! তারপর বাচ্চুর পানে তাকিয়ে বলল—যা দিয়েছি ভাগ্যি বলে মানগে যা, যা—
    বকশিসের পয়সাগুলো? সেও মাসে এক টাকা তো হবে? তাহলে বারো টাকা। বারোটা টাকা একে দিয়ে দিন নন্দবাবু।
    —মানে ? 
    —মানে এদের পাওনাটা চুকিয়ে দিন। গরিব মানুষের সঙ্গে জুয়াচুরি করবেন না।
    —আমি জোচ্চোর! 
    —চ্যাঁচাবেন না—শিবদাস খাপ থেকে তলোয়ার খুলে ফেলল। 
    —মারবেন নাকি? 
   —না, ধড় থেকে মুণ্ডুটা খসিয়ে দোব। নন্দলাল এক লাফে ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকল, শিবদাসও তার পিছনে গিয়ে ঢুকলে ঘরে, বলল, আমি কে জানেন?—শিবদাস—শিবে ডাকাতের নাম শুনেছেন, সেই আমি। টাকা বের করুন। একটা কথা বললেই মুগুপাত!
    নন্দলালের কথা হারিয়ে গেল। একটু পরেই শখানেক টাকার একটা ছোট থলি হাতে নিয়ে শিবদাস ঘর থেকে বেরিয়ে এল, থলিটা বাচ্চুর হাতে দিয়ে বললে, নিয়ে যা—
    বাচ্চু বলল, এ যে অনেক টাকা! 
    —তোদের সঙ্গে জুয়াচুরি করার জন্য নন্দলাল জরিমানা দিল। যা— 'বাচ্চুর মা বলল, এত টাকা নিয়ে যাব কোথা? পথে কেড়ে নেবে।
    শিবদাস বলল, কেউ কাড়তে এলে বলবে শিবে ডাকাত দিয়েছে। যে কাড়বে তার মুণ্ডু খসে যাবে।
    শিবে ডাকাত। বাচ্চু হা হয়ে গেল। 
    —হ্যাঁ।—শিবদাস হেসে বলল, টাকাটা নিয়ে যা, একটা দোকান-পসারি করে খাবি।
    বাচ্চু ও তার মা বেরিয়ে গেল। তাদের পিছনে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে বেরোল শিবদাস, প্রাঙ্গণে ঘোড়া ছিল, ঘোড়ায় উঠে বসল। তারপর চিৎকার করে হাঁক দিল— নন্দলাল—নন্দলাল!
    নন্দলাল বেরিয়ে এল। 
    —হুশিয়ার! গোলমাল পাকালেই তোমার শেষ। 
    শিবদাস ঘোড়া ছোটাল। নন্দলাল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল দেউড়ির সামনে। অনেকের অনেক পয়সা সে মেরেছে কিন্তু সেজন্য এমনভাবে কোনোদিন খেসারত দিতে হয়নি।

গল্পটি মোবাইলে ডাউনলোড করে পড়
ডাউনলোড : Epub
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য