ডাকাত বাবা -- অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত

     তৃতীয়বার দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছে সারদা। যাচ্ছে পদব্রজে। সঙ্গে ভূষণ মণ্ডলের মা ও আরও বর্ষীয়সী মহিলা। আর যাচ্ছে লক্ষ্মী, আর তার ভাই শিবরাম। কামারপুকুর থেকে আরামবাগ—আট মাইলের ধাক্কা। আরামবাগ পেরিয়েই তেলোভেলোর মাঠ। সে মাঠ পেরিয়ে তারকেশ্বর। তারপরে আবার আর এক মাঠ—কৈকলার মাঠ। কৈকলার মাঠ পেরিয়ে বৈদ্যবাটি। বৈদ্যবাটি থেকে গঙ্গা পেরিয়ে দক্ষিণেশ্বর।
     তেলোভেলো আর কৈকলা এই দু’মাঠে ডাকাতের আস্তানা। আর ওই মাঠ ছাড়াও পথ নেই। পথচারীদের উপর কখন যে হামলা হবে তা ডাকাত-কালীই বলতে পারেন। তেলো আর ভেলো, পাশাপাশি দুই গ্রাম, মাঝখানের মাঠে এক ভীমদৰ্শন করালবদনা কালীমূর্তি। ডাকাতে-কালী। দস্যুদের আরাধনীয় ধান্যদা। ধনদায়িনী ডাকনামে তলোভেলোর ডাকাত কালী। ভূতপ্রমথসেবিকা ঘোরচণ্ডী। রণরামা |
     শুধু লুণ্ঠন নয়, চক্ষের পলকে খুন করে ফেলা, লাশ লোপাট করে দেওয়া। যাকে বলে গায়েবি খুন। ডাকাতের সে লাঠি বজ্রের চেয়েও নৃশংস। টাকাকড়ি যা আছে খুলে দিচ্ছি ঝুলি ঝেড়ে—এটুকু প্রস্তুত হবারও সময় দেয় না। আগে লাঠি, শেষে লুঠ। কাড়ো আর মারো নয়, মারো আর কাড়ো। এর থেকে একমাত্র উপায় হচ্ছে দল পাকিয়ে পথ হাঁটা। দল দেখে ডাকাতেরা যদি ভয় পায়। দল থাকলে পথচারীদের অন্তত সাহস বাড়ে।
     সন্ধ্যের বেশ আগেই পৌঁছেছে আরামবাগ। চলতে চলতে সারদার পা দুখানি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাতটা আরামবাগে কোথাও বিশ্রাম করলে হয়! কিন্তু সঙ্গীরা নারাজ। তারা বলে—আঁধার লাগবার আগেই বেলাবেলি তেলোভেলোর মাঠ পেরিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এখনও দিব্যি দিন আছে, সহজেই পেরিয়ে যেতে পারব। মিছিমিছি এক রাত নষ্ট করি কেন?
     পথক্লান্তির কথা কাউকেও বললে না সারদা। তোমরা যখন চলেছ, আমিও চলি তোমাদের পিছে পিছে।
     কেবলই পিছিয়ে পড়ছে থেকে থেকে। পা টেনে টেনে তবু চলে এসেছে চার মাইল। কিন্তু তার সঙ্গীরা কোথায়? সঙ্গীরা থেমে পড়ছে বারে বারে। থেমে পড়ছে যাতে পা চালিয়ে এসে সারদা তাদের সঙ্গ ধরতে পারে। কিছুতেই তাড়াতাড়ি চলতে পারছে না মেয়েটা।
     কাহাতক তোমার জন্যে এমনি করে দাঁড়াই বলো তো!’ বিরক্তি জানায় সঙ্গীরা, বেলা ঢলে পড়ল, এখন একটু তাড়াতাড়ি পা চালাও।
     সাধ্যমতো পদক্ষেপ দ্রুত করে সারদা। কিন্তু তার সাধ্য কী, সঙ্গীদের সঙ্গে তাল রাখে। আবার সে পিছিয়ে পড়েছে। বিশ-পঁচিশ হাত নয়, প্রায় সিকি মাইল।
     ‘এমনি করে চললে কী করে চলবে? আবার ধমকে ওঠে সঙ্গীরা, “তোমার জন্যে কি সবাই শেষকালে ডাকাতের হাতে মারা পড়ব? পশ্চিমের আকাশখানা একবার দেখছ?’
     সন্ধ্যার শেষ লালিমাটুকু মিলিয়ে যায় বুঝি। সত্যিই তো! তার একলার অক্ষমতার জন্যে সবাই কেন বিপন্ন হবে? ওদের দেহে যখন শক্তি আছে তখন ওরা যাবেই তো আগ বাড়িয়ে। নিজের সুবিধের জন্যে ওদের সে অসুবিধে ঘটাবে কেন?
     ‘তোমরা আমার জন্যে দাঁড়িয়ো না—চলে যাও সোজাসুজি। সঙ্গশূন্যতার ভয়ে এতটুকু কাতর নয় সারদা, নেই এতটুকু অসহায়তার সুর। বললে, ‘একেবারে তারকেশ্বরের চটিতে গিয়ে উঠো। আমি সেখানে গিয়েই ধরব তোমাদের। আমার শরীর আর বইছে না—আমি যাচ্ছি আস্তে আস্তে।
     যত শিগগির পারিস বেরিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। চারদিক আঁধার হয়ে এল। মাঠের বড় দুর্নাম—’
     পিছনে.ফিরে তাকিয়েও দেখল না। সারদাকে ফেলেই দ্রুতবেগে এগিয়ে গেল সঙ্গীরা। মিলিয়ে গেল চোখের বাইরে। জনমনুষ্যহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সারদা একা। শরীরে আর দিচ্ছে না, তবু কষ্টে পা টেনে টেনে চলেছে, অন্ধকারে পথঘাটের ইশারা পাচ্ছে না। কোথায় যেতে কোথায় চলে আসছে কে জানে।
     ‘কে যায়! কে একজন বাঘের গলায় হুমকে উঠল। প্রকাণ্ড একটা কালো লোক চোখের সামনে দাড়িয়ে পড়েছে। দৈত্যের মতন চেহারা। মাথায় ঝাকড়া চুল, হাতে রুপোর বালা, কাধে মস্ত লাঠি।
‘কে যায়!” 
     ‘তোমার মেয়ে গো—সারদা। নির্জন মাঠের মধ্যে, সন্ধ্যার অন্ধকারে, আমার মেয়ে! লোকটার কানে কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল। এত বছর ধরে ডাকাতি করছি, কই, এমন কথা তো কখনো শুনিনি! সারদার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল ডাকাত। স্থির প্রতিমার মতোই দাঁড়িয়ে রইল সারদা। প্রতিমার মতোই স্থির নেত্রে।
     ‘কে তুমি? এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?’ 
    ‘বাবা, দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছিলাম। চলতে পারছিলাম না, তাই আমার সঙ্গীরা আমাকে ফেলে গিয়েছে। অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছি।’
     ‘দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছ কেন?’ 
     ‘দক্ষিণেশ্বরে যে তোমার জামাই থাকে। রাণি রাসমণির কালীবাড়ি আছে না? সেই কালীবাড়িতে তিনি থাকেন। তার কাছেই আমি যাচ্ছি।’
     কেমন যেন মধুময় লাগল কণ্ঠস্বর। বাগদি ডাকাতের বুকের ভিতরটা আনচান করে উঠল। শুধু ডাকাতের নয়, সেই কণ্ঠস্বরের আমেজ এসে গেল যেন আরও একজনের কানে। কাছেই কোথায় ছিল, ছুটে এল সে ব্যাকুল পায়ে। সারদা তো অবাক, এ যে দেখি স্ত্রীলোক। দেখেই বুঝল, বাগদি ডাকাতের স্ত্রী।
     তার হাত দুখানা চেপে ধরল সারদা। যেন অকূলে কুল পেল। 
   ‘তুমি কে গা? ডাকাত-পত্নীর চোখে মেহকরুণ জিজ্ঞাসা।’ 
    ‘তোমার মেয়ে সারদা। চিনতে পাচ্ছ না। যাচ্ছিলুম দক্ষিণেশ্বরে, তোমার জামাইয়ের কাছে। সঙ্গীরা পিছে ফেলে আগে আগে পালিয়ে গিয়েছে। ফাঁকা নির্জন মাঠে অন্ধকারের মধ্যে কী বিপদেই পড়েছিলুম, মা। তোমাদের পেয়ে ধড়ে প্রাণ এল। তোমাদের না পেলে কী সর্বনাশ যে হত কে জানে।’
     প্রাণ জুড়িয়ে গেল। কঠিন পাথর ফেটে বেরুল সুধাধারা। দয়াহীন মরুভূমির আকাশে নম্র মেঘের মাধুর্য।
     ‘মেয়ে আমার নেতিয়ে পড়েছে যেন গো। কিছু ওকে খেতে দাও আগে। ডাকাত-বউ বললে ডাকাতকে।
     ‘না, আমি এগোই। তারকেশ্বরে গিয়ে ধরব আমার সঙ্গীদের।’
   ‘অসম্ভব, পথের মাঝেই পড়বে টাল খেয়ে। বাপ হয়ে মেয়েকে কেউ পাঠাতে পারে না এ বিপদের মুখে। এ ঘোর অন্ধকারে, জনশূন্য মাঠের মধ্যে দিয়ে। তার শরীরের এ অবসন্ন অবস্থায়। তার চেয়ে চলো, কাছে পিঠে যে দোকান আছে, সেখানে তোমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করি। রাত ফুরুলে খোজা যাবে ফের পথের নিশানা। তোমার সঙ্গীদের উদ্দেশে।’
     তেলোভেলোর ছোট একটি মুদিদোকান। সেখানেই নিয়ে গেল সারদাকে। নিজের হাতে শয্যা রচনা করল ডাকাত -বউ। ডাকাত নিজে গিয়ে মুড়িমুড়কি কিনে আনল। বাপের দেওয়া খাবার তৃপ্তি করে খেল সারদা। মায়ের করা বিছানায় শুলে আরাম করে। ছোট মেয়েকে মা যেমন করে ঘুম পাড়ায় তেমনি করে ডাকাত-বউ ঘুম পাড়াল সারদাকে। আর সারারাত লাঠি হাতে দুয়ার আগলে দাঁড়িয়ে রইল ডাকাত-বাবা।
     কোথায় সবকিছু লুটপাট করে, চাই কী গুম খুন করে ফেলবে—তা নয়, নিদ্রাহীন দীর্ঘ রাত্রি দুয়ারে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে!
     উপায় কী! এ যে তার মেয়ে! যে মেয়ে সে-ই আবার মা! 
     ভোরে ঘুম ভাঙতেই মেয়েকে নিয়ে এগোল তারকেশ্বরের পথে। খেতে কড়াই-শুঁটি ফলেছে। তাই ছিঁড়ে ছিঁড়ে ডাকাত বউ দিতে লাগল সারদাকে। বললে, “তোর খিদে পেয়েছে খা।” মুখ ধোয়া হয়নি, তবু ছোট মেয়ের মতো তাই খেতে লাগল সারদা। স্বাদে অপূর্ব মাতৃস্নেহ। চার দণ্ড বেলা হয়েছে, পৌঁছুল তারকেশ্বর।
     ‘আমার মেয়ে কাল সারারাত কিছু খায়নি। যাও শিগগির, শিগগির বাবাকে পুজো দিয়ে বাজার করে নিয়ে এসো। মাছ-তরকারি দিয়ে মেয়েকে ভালো করে  খাওয়াতে হবে। ডাকাত-বউ তাগিদ দিল স্বামীকে।
     বাগদি ডাকাত বাজার করতে ছুটল। তার মেয়ে শ্বশুরঘরে যাচ্ছে। যাবার আগে বাপের বাড়িতে আজ তার শেষ খাওয়া।
     সঙ্গীদের সন্ধান পেল সারদা। ওমা, তুই বেঁচে আছিস? আসতে পেরেছিস পথ চিনে? কোথায় ছিলি তুই সারারাত?
     ‘বাবা-মার কাছে ছিলাম। ছিলাম নিৰ্ভয়ের আশ্রমে, নিশ্চিন্তের ক্রোড়নীড়ে। বাৎসল্যরসের সরসীতে।’
     খাওয়া-দাওয়ার পর বিদায়ের পালা এল। যাত্রীদল এবার বৈদ্যবাটির পথ ধরবে। বাগদি বাপ-মা কাঁদতে লাগল অঝোরে। মেয়ে সারদাও নিজেকে সামলাতে পারল না। সেও কান্নায় ভেঙে পড়ল। এক রাতের পরিচয়ে এক জন্মের সম্পর্ক। কণ্ঠের একটু মাতৃ সম্বোধনেই অনন্ত জীবনের বন্ধন। এমন মেয়ের বিচ্ছেদ সয়ে কী করে বাঁচবে তারা? কাঁদতে কাঁদতে অনেক দূর পর্যন্ত এগোল বাগদি-বাগদিনি। বাগদিনি কড়াইশুটি ছিড়ে মেয়ের আঁচলে বেঁধে দিল যত্ন করে। বললে, মা সারু, রাতে যখন মুড়ি খাবি, তখন এগুলো দিয়ে খাস। বললে বলতে নিজের আঁচল চেপে চেপে ধরল।
     বাগদি বললে, যদি পায়ের বোঝা স্ত্রী না সঙ্গে থাকত, সোজা তোমাকে পৌছে দিয়ে আসতাম। দেখে আসতাম জামাইকে।’
     ‘কিন্তু বলো দক্ষিণেশ্বরে তুমি যাবে।’ সারদা পীড়াপীড়ি করতে লাগল। রাজি করাল ডাকাত বাবাকে। মাঝে মাঝে গিয়ে মেয়েকে না দেখে এসে কি সে থাকতে পারবে? মা কি মেয়েকে পাঠিয়ে দেবে না তার নিজের হাতে গড়া মোয়ানাডু?
     পথ ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। ডানদিকের রাস্তায় বাবা আর মা চলে গেল, সারদা আর সঙ্গীরা চলল বাঁদিকে। যতদূর দেখা যায় বাবা আর মা ফিরে ফিরে তাকায় আর কাঁদে। সারদাও থেকে থেকে তাকায় পিছন ফিরে আর আঁচলে চোখ মোছে। ডাকাতের ছদ্মবেশে কে এরা বাগদি-বাগদিনি?
     ‘জানিস আমরা কী দেখলুম? গায়ে ফিরে এসে বলতে লাগল বাগদি দম্পতি। ‘দেখলুম, স্বয়ং কালী এসে দাঁড়িয়েছেন। যে কালীর পুজো করি সেই কালী।”
     ‘বলো কী গো? দেখলে ? ঠিক তাই দেখলে!’ 
    সত্যিসত্যিই দেখলুম। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখি এমন সাধ্য কী। আমরা যে পাপী। আমরা পাপী বলে সে রূপ গোপন করে ফেললে। সারাক্ষণ দেখতে দিলে না।’
     চকিতে যখন একবার দেখেছ তখন পলকেই পাপ চলে গিয়েছে। চকিতের দেখাই অনন্তকালের দেখা। যা চকিত তাই চিরকালিক।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য