বিক্রম-বেতালের গল্প: পরামর্শ

   মণিপুরে রাজা ছিলেন মণিকেত। তাঁর কোন ছেলে মেয়ে ছিল না। অনেক বছর পরে তাঁর একটি মেয়ে হল। বাচ্চা বয়স থেকে মেয়েটিকে ওঁরা আদরযত্নে লালন-পালন করল। মেয়েটি যা ইচ্ছে তাই করত, যা মুখে আসত তাই বলত। যখন-তখন সে রেগে যেত। রাগের মাথায় হাতের কাছে যা পেত তাই দিয়ে যাকে তাকে মারত। তার এত রাগের কারণ যে কি তা মণিকেত রাজা অনেক চেষ্টা করেও আবিষ্কার করতে পারেননি। রাজার এই বদমেজাজী ও খেয়ালী মেয়েটির নাম মণিমঞ্জরী।
   মণিমঞ্জুরী বড় হল। তার বিয়ের বয়স হওয়ার পর মণিকেত রাজার দুশ্চিন্তা অনেকগুণ বেড়ে গেল। এত রাগী খেয়ালী মেয়েকে কে বিয়ে করবে? তাছাড়া মেয়েটির বিয়ের আগে যদি মণিকেতের মৃত্যু হয়, তাহলে মণিমঞ্জরীকেই দেশের শাসনভার কাঁধে নিতে হবে। আর যাই হোক, দেশের শাসন বদমেজাজী লোককে দিয়ে হয় না। এই অবস্থায় একটিমাত্র পথ খোলা ছিল। তা হল আগে থেকেই ঘোষনা কার যে মণিমঞ্জরীকে যে বিয়ে করবে তাকেই মণিপুরের সিংহাসনে বসানো হবে। ফলে যে সব রাজকুমার মণিমঞ্জরীকে তার মেজাজ এবং খেয়ালের জন্য ভয় পেয়ে বিয়ে করতে রাজী হয়নি রাজা হওয়ার আশায় তাদের কারো কারো মনে মণিমঞ্জরীকে বিয়ে করার ইচ্ছা জাগতে পারে। আর যে রাজকুমার রাজা হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে তার মধ্যে মণিমঞ্জরীর মত মেয়েকে পরিবর্তন করার ক্ষমতাও থাকতে পারে।
   এই  কথা ভেবে রাজা মণিকেত বিজয় ও জয় নামে দুই রাজকুমার সহ বিভিন্ন দেশের রাজকুমারদের ডেকে পাঠালেন। তারপ এক এক রাজকুমারকে ডেকে রাজা গোপনে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে রাগলেন।

   রাজা মণিকেত বিজয়কে নিজের মেয়ের সমস্ত ব্যাপার জানিয়ে শেষে বললেন, “আমার মেয়েকে বিয়ে যে করবে কার্যত সেই হবে আমার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারী। তবে একটি কথা আবার বলছি, আমার মেয়ে ভীষণ বদ-মেজাজী। বিনা কারণে সে যখন তখন চটে যায়। রাগের মাথায় সে যে কি করবে তা কেউ বলতে পারে না। মানে বলা চলে দুর্বাশার একটি নারী সংস্করণ। তাই তাকে বিয়ে করলে সম্পত্তি পাওয়ার আনন্দ যেমন হতে পারে, তেমনি এহেন রাগী মেয়েকে বিয়ে করার ফলে দুঃখ হাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এখন তোমাকে সব কথা জানিয়েছি। ভেবেচিন্তে তোমার মতামত আমাকে জানাও।”
   বিজয় বিরক্ত হয়ে বলল, “ওসব আমি জানি। জেনেই এসেছি। এখন বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করুন।”

   রাজা তাকে বিদায় দিয়ে জয়কে ডেকে সমস্ত কথা জানালেন।
   ধৈর্যের সঙ্গে রাজার সমস্ত কথা শুনে জয় বলল, “মহারাজ, যে কোন লোকের রাগের মূল দুর্বলতা। কেন জানিনা, রাগী লোককে দেখে আমার মনে করুণা জাগে। যে কোন লোক রেগে গেলে আমি রাগী লোকের ওপরে রাগ না করে রাগের কারণ আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। আপনি যা বললেন তা শুনেই বলছি, মণিমঞ্জরীকে বিয়ে করায় আমার আপত্তি নেই।”

   এই দুজনের মধ্যে কার সঙ্গে মণিমঞ্জরীর বিয়ে দিলে ভাল হবে তা রাজা বুঝে উঠতে পারলেন না। দুজনের মধ্যে কেউ কম নয়। এই অবস্থায় রাজা মণিকেত মন্ত্রীর পরামর্শ চাইলেন।

   মন্ত্রী কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ মহারাজ, আপনার মেয়েকে আপনি সবচেয়ে স্নেহ করেন। এই দেশের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আপনি। তাই মেয়েকে এবং প্রিয় দেশকে কার হাতে তুলে দেবেন তা ভালভাবে যাচাই করতে পারেন। আমি আর কতটুকু বুঝি।”
   রাজা বললেন, “মন্ত্রী, পিতা এবং রাজা হলেই যে একজন সর্বজ্ঞ হবেন এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। সাধারণ নিয়ম অনুসারে কোন বিষয়ে রাজা পরামর্শ চাইলে মন্ত্রীর কর্তব্য হল সেই বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া।”
   মন্ত্রী আর এড়াতে না পেরে বলল, “মহারাজ, বিজয় ভীষণ অধৈর্য্য এবং অবুঝ ছেলে। মণিমঞ্জরীর সঙ্গে খাপ খাবে না। জয়ের ধৈর্য্য আছে। তাই আমার ধারণা, জয়ের সঙ্গে মণিমঞ্জরীর বিয়ে হলে ভাল হবে।”

   জয় এবং মণিমঞ্জরীর বিয়ে হল। বিয়ের পর থেকেই মণিমঞ্জরীর সঙ্গে জয়ের কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। প্রত্যেক দিন মণিমঞ্জরী জয়ের সঙ্গে ঝগড়া করত। জয় কিন্তু মণিমঞ্জরীকে তেমন কিছু বলত না। তার কথা ধৈর্য্য ধরে শুনত, শুনে চুপ করে থাকত।

এসব কিছু লক্ষ্য করে রাজা মন্ত্রীকে বললেন, “আমার ধারনা, জয় মণিমঞ্জরীর স্বভাব বদলাতে পারবে। এই কাজে সফল হলেই জয়কে সিংহাসনে বসিয়ে দেবো। কার যে নিজের স্ত্রীকে ঠিক পথে আনতে পারবে না সে গোটা দেশের প্রজাদের সঠিক পথে চালিত করবে কি কি করে?”
   মন্ত্রী কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “মহারাজ, আমি তো প্রথমেই আপনাকে বলেছি দেশের মঙ্গল কিভাবে হবে তা আপনি সবচেয়ে ভাল করে জানবেন, তাছাড়া পরামর্শ চাইলেই তো হয় না, পরামর্শ অনুসারে কিভাবে কাজ করলে কাজটা সফল হয় সে প্রশ্নও থেকে যায়।”

   মন্ত্রীর কথা শুনে রাজা বুঝলেন, তাঁর ভূল কোথাও হয়েছে।

   বেতাল এই কাহিনী শুনিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্য বলল, “রাজা, মণিকেত মন্ত্রীর পরামর্শ চেয়ে কি ভুল করেছেন? মন্ত্রীই বা প্রথমে পরামর্শ দিতে চায়নি কেন? আমার এই প্রশ্নের জবা জানা থাকা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।”
   বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, “মণিকেত রাজার মতে মন্ত্রীর পরামর্শ দেওয়া উচিত। আসলে রাজা দুটো সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন। মণিমঞ্জরীকে কে বিয়ে করবে আর যোগ্যতার সঙ্গে দেশ শাসন কে করবে? আসলে একজন দুটোর উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই রাজা মন্ত্রীকে যে প্রশ্ন করলেন সেই প্রশ্নের জবাবে যে পরামর্শ তিনি পেলেন সেই পরামর্শ তিনি অনুধাবন করতে পারেননি।
   রাজা মন্ত্রীর পরামর্শ অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করেছেন, ফলে জয় রাজা হওয়ার উপযূক্ত কিনা সে প্রশ্ন রাজার মনে দীর্ঘকাল থেকে গেছে।”
   রাজা বিক্রমাদিত্যের এই সঠিক পর্যালোচনা ও প্রশ্নের উপযুক্ত ও যথার্থ উত্তর শুনে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।


(কল্পিত)
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য