Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

    ১৮৮২ থেকে ১৮৯০২ সালের মধ্যে শার্লক হোমস যেসব রহস্য সমাধানের ভার হাতে নিয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটিতে তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে প্রক...

পাঁচটা কমলা-বিচির ভয়ংকর কাহিনি [দ্য ফাইভ অরেঞ্জ পিপল ] | অংশ-১ |

    ১৮৮২ থেকে ১৮৯০২ সালের মধ্যে শার্লক হোমস যেসব রহস্য সমাধানের ভার হাতে নিয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটিতে তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে প্রকাশের সুযোগ পায়, কয়েকটিতে তার ক্ষমতা থই পায়নি— অমীমাংসিত থেকে গিয়েছে। আবার কয়েকটিতে আংশিক সমাধান ঘটেছে। এই শেষের কেসগুলোর মধ্যে একটা বেশ চমকপ্রদ। ঘটনাচক্র কিন্তু আজও পুরো স্পষ্ট হয়নি— হবে বলেও আর মনে হয় না।
    ১৮৮৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলেছে। প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টি লন্ডন শহরের ওপর দাপাদাপি করে চলেছে সারাদিন। বউ বাপের বাড়ি যাওয়ায় আমি বেকার স্ট্রিটে এসে উঠেছি দিন কয়েকের জন্যে। চুল্লির ধারে বসে বই পড়ছি। হোমসও মুখখানা কালো করে বসে আছে। মেজাজ বেশ খিটখিটে।
      এমন সময় ঘণ্টাধ্বনি শোনা গেল সদর দরজায়।
      হোমস বললে, “এ সময়ে কেউ যদি সমস্যা নিয়ে দ্বারস্থ হয়, বুঝতে হবে সে-সমস্যা খুবই গুরুতর।’
     করিডরে পায়ের আওয়াজ শুনলাম। তারপরেই দরজায় টোকা পড়ল। 
    'আসুন, বলল হোমস। বছর বাইশের এক যুবক ঘরে ঢুকল। রুচিবান, ফিটফাট, খানদানি চেহারা। হাতে ভেজা ছাতা, গায়ে জলঝরা বর্ষাতি। চোখ উদবিগ্ন, মুখ ফ্যাকাশে। খুব দুশ্চিন্তায় আছে যেন।
     চোখে সোনার প্যাঁসনে চশমা লাগিয়ে বলল,‘এই ঝড়বাদলাকে গায়ে নিয়ে হুট করে ঘরে ঢুকে পড়ার জন্যে ক্ষমা করবেন।
     যুবকের ছাতা আর বর্ষাতি নিয়ে আংটায় ঝুলিয়ে দিল হোমস। 
     বলল, “দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল থেকে আসছেন দেখছি।’ 
    ‘আজ্ঞে হ্যা, হর্সহাম থেকে আসছি। মেজর প্রেনডেগাস্ট আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তাকে মস্ত কেলেঙ্কারি থেকে আপনি বাঁচিয়েছিলেন। উনিই বললেন, আপনি কখনো হারেন না।’
     ‘অতিরঞ্জন করেছেন। মোট চারবার হেরেছি আমি। তিনবার পুরুষের কাছে একবার একটি মহিলার কাছে।’
    ‘তার চেয়ে অনেক বেশিবার জিতেছেন। আমার কেসেও আপনি তাই হবেন এই আশা নিয়ে আমি এসেছি। ব্যাপারটা খুব রহস্যময়। আমাদের পরিবারে এ-রকম দুর্বোধ্য ব্যাপার কখনো ঘটবে ভাবতে পারিনি।’
    ‘কৌতুহল বাড়িয়ে দিলেন দেখছি। বলুন আপনার দুর্বোধ্য কেস— শোনা যাক। চেয়ার টেনে নিয়ে আগুনের সামনে পা মেলে বসল যুবকটি। 
    বলল, “আমার নাম জন ওপেন-শ। যে-কেস নিয়ে আপনার কাছে এসেছি, তার জের চলেছে বাপ-কাকার আমল থেকে।
     আমার বাবারা দু-ভাই। এলিয়াস আমার কাকা, জোসেফ আমার বাবা। কভেন্ট্রিতে সাইকেলের টায়ারের কারখানা চালিয়ে প্রচুর পয়সা কনে। পরে মোটা টাকার কারবার বেচে দেন এবং বাকি জীবনটা স্বচ্ছন্দে কাটাবেন স্থির করেন।
     কাকা বয়সকালে আমেরিকা গিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময়ে কর্নেল হয়েছিলেন। 
    যুদ্ধ শেষ হলে ফ্লোরিডায় বাড়ি ফিরে যান। বছর তিন চার সেখানে থাকার পর ১৮৬৯ কি ৭০ সালে ফিরে আসেন হর্সহ্যামের সাসেক্সে। জমিজমা কিনে বসবাস শুরু করেন। আমেরিকায় টাকা করেছিলেন, কিন্তু থাকতে পারেননি নিগ্রোবিদ্বেষের জন্যে। নিগ্রোদের ভোট অধিকার তিনি মানতে পারেননি। কাকা ছিলেন বদমেজাজি, অসামাজিক আর ঘরকুনো। খুব মদ খেতেন, তামাক খেতেন, কারো সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন না— বাবার সঙ্গেও না। বাড়িতেই থাকতেন— নয়তো বাড়ির পাশের মাঠে ময়দানে প্রাত্যহিক ব্যায়াম সেরে নিতেন।
    আমাকে কিন্তু স্নেহ করতেন কাকা। ইংলন্ডে আসার আট-নয় বছর পর বাবাকে বলে আমাকে ওঁর বাড়িতেই রেখেছিলেন। চাকরবাকর আর বাইরের লোকের সঙ্গে কথাবার্তা ব্যাবসার আলাপ আমিই চালাতাম। চাবি-টাবি সব আমার কাছেই থাকত। মাত্র ষোলো বছর বয়সেই বলতে পারেন বাড়ির কর্তা হয়ে বসেছিলাম। সর্বত্র অবাধ গতি ছিল আমার— ছাদের চিলেকোঠার ঘরটা ছাড়া। চাবির ফোকর দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি সে-ঘরে রাশি রাশি ভাঙা তোরঙ্গ আর কাগজের তাড়া ছাড়া কিছুই নেই।
     ১৮৮৩ সালের মার্চ মাসের সকাল বেলা আমি আর কাকা টেবিলে বসে আছি, এমন সময়ে একটা চিঠি এল কাকার নামে। নির্বান্ধব ছিলেন বলে ওঁর নামে চিঠিপত্র বড়ো একটা আসত না। খামখানা তুলে নিয়ে বললেন, “পন্ডিচেরি পোস্ট অফিসের ছাপ দেখেছি— ভারতবর্ষ থেকে এসেছে।”
    বলে, খামের মুখ ছিড়লেন। ভেতর থেকে শুধু পাঁচটা শুকনো খটখটে কমলাবিচি ঝরে পড়ল টেবিলে— আর কিচ্ছু না।
    আমি হেসে ফেললাম পত্ৰলেখকের রসিকতা দেখে। কিন্তু কাকার মুখ ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নিঃসীম আতঙ্কে চোয়াল ঝুলে পড়ল, চোখ যেন কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে এল। বললেন বিকট ভাঙা গলায়, “K.K.K.! এবার আর রক্ষে নেই আমার! পাপের সাজা পেতেই হবে!”
     আমি তো অবাক। বললাম, “কাকা ব্যাপার কী? এসব কী?” 
    “মৃত্যু! মৃত্যু!” বলতে বলতে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কাকা। ছুটে নিজের ঘরে চলে গেলেন। ভয়ের চোটে আমার বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। খামটা তুলে নিয়ে দেখলাম, আঠা দিয়ে জোড়া মুখের কাছে লাল কালিতে K অক্ষরটা তিনবার লেখা— ভেতরে ওই কমলার পাঁচটি বিচি ছাড়া কিছু নেই।
     এর সঙ্গে মৃত্যুর কী সম্পর্ক থাকতে পারে ভেবে না-পেয়ে ওপরে যাচ্ছি, দেখলাম সিঁড়ি বেয়ে কাকা নামছেন। হাতে একটা জংধরা চাবি– চিলেকোঠা খুলেছিলেন নিশ্চয়— আর একটা ছোটো পেতলের বাক্স।
     বললেন, “এবার ওদের টেক্কা দোব। জন, মেরিকে বলো আমার ঘরে আগুন জ্বেলে দিতে। আর তুমি উকিল ফোর্ডহ্যামকে ডাকতে পাঠাও।”
     উকিল এল। কাকার ঘরে আমার তলব পড়ল। দেখলাম, আগুনের চুল্লির লোহার ঝাঁঝরির ওপর অনেক কাগজ পোড়া ছাই পড়ে আছে। পাশেই সেই পেতলের বাক্স ডালা খোলা অবস্থায় রয়েছে। আঁতকে উঠলাম ডালার ওপর K অক্ষরটা তিনবার খোদাই করা দেখে।
    আমি ঘরে ঢুকতেই কাকা বললেন,“শোন জন, আমার সমস্ত সম্পত্তি দাদাকে দিয়ে যাচ্ছি। তার মানে তুমিই সব পাবে। যদি বোঝ শান্তিতে ভোগ করতে পারছ না— তোমার যে পরম শত্ৰু, তাকে সব দিয়ে দিয়ো। সাক্ষী হিসেবে উইলে সই করো।”
     আমি তো ভয়ে সিটিয়ে গেলাম কথার ধরন শুনে। সই দিলাম বটে, কিন্তু সেইদিন থেকে কাঠ হয়ে রইলাম। অষ্টপ্রহর কাকার হঠাৎ পরিবর্তন দেখে। নেশা করা, ঘরের মধ্যে নিজেকে চাবি দিয়ে রাখা, কারো সঙ্গে দেখা না-করা, আগের চাইতে বাড়ল। নতুন উপসর্গের মধ্যে দেখা গেল চেঁচামেচি। মাঝে মাঝে মদে চুর হয়ে রিভলভার হাতে বেরিয়ে এসে বাড়ির সামনে মাঠে ছুটতেন আর গলা ফাটিয়ে চেঁচাতেন। কারো ধার ধারেন না তিনি, কারো ভয়ে জুজু হয়ে থাকতে চান না। ঘোর কেটে গেলেই কিন্তু ফের ঘরে ঢুকে চাবিবন্ধ করে দিতেন। দারুণ শীতেও তখন তাকে দেখেছি ঘেমে-নেয়ে যেতে। ভয় যে রক্তে বাসা নিয়েছে, তা ওই মুখ দেখলেই বোঝা যেত। 
     একদিন রাত্রে এইরকম মাতলামি করতে করতে ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেলেন— আর ফিরে এলেন না। বাগানের ডোবায় মাত্র দু-ফুট জলে মুখ গুজে পড়ে থাকতে দেখা গেল তাকে। শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। সাম্প্রতিক পাগলামির বৃত্তান্ত শুনে জুরি বললেন আত্মহত্যা। আমার মনে কিন্তু ধোঁকা থেকে গেল। মৃত্যুর খপ্পর থেকেই বাঁচবার জন্যে উনি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। শেষকালে কিনা ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে সেই মৃত্যুর খপ্পরেই পড়লেন।
     যাই হোক, উইল অনুসারে কাকার সম্পত্তি আর ব্যাঙ্কে গচ্ছিত প্রায় হাজার চোদ্দো পাউন্ড বাবা পেলেন।”
    এই পর্যন্ত শুনে হোমস বললে, ‘এ-রকম অদ্ভুত কাহিনি আগে কখনো শুনিনি। আচ্ছা, চিঠিখানা উনি কবে পেয়েছিলেন? মৃত্যু বা আত্মহত্যাটা কোন তারিখে হয়েছিল মনে আছে? 
     “চিঠি এসেছিল ১৮৮৩ সালের ১০ মার্চ, মারা গেলেন ২ মে রাত্রে— মানে, ঠিক সাত সপ্তাহ পরে ’
     ‘তারপর কী হল ?’
    ‘সম্পত্তি বুঝে নেওয়ার পর আমার কথায় চিলেকোঠা তন্নতন্ন করে খুঁজলেন বাবা। সেই পেতলের বাক্সটা পাওয়া গেল। ডালার ভেতর দিকে একটা কাগজ সাটা । তাতে লেখা K.K.K.— তার নীচে লেখা— পত্র, স্মারকলিপি, নিবন্ধ, রসিদ। কিন্তু ওই ধরনের কোনো কাগজ বাক্সে নেই”— নিশ্চয় সব পুড়িয়ে ফেলেছেন। এ ছাড়া ঘরের মধ্যে যা পাওয়া গেল, তা সবই তার সৈনিকজীবন সংক্রান্ত। আর কিছু রাজনীতির কাগজপত্র।
     ১৮৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম সপ্তাহে ব্রেকফাস্ট খেতে বসেছি আমি আর বাবা, এমন সময়ে একটা খাম এল তার নামে। ছিঁড়েই চেঁচিয়ে উঠলেন।
     দেখলাম, ভয়ে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। এতদিন যা নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিলেন, এখন তাই দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেন। হাতের তেলোয় রয়েছে শুধু পাঁচটা কমলা-বিচি।
     তোতলাতে তোতলাতে কোনোমতে বললেন, “এ. এ আবার কী!” K.K.K. নাকি? গলা শুকিয়ে এল আমার।তার ওপরে এসব আবার কী লিখেছে?”
      ঘাড় বাড়িয়ে পড়লাম, সূর্য-ঘড়ির ওপর কাগজগুলো রাখো। 
     'কাগজই-বা কী, সূর্য-ঘড়িই-বা কোথায়? বললেন বাবা। 
    ‘সূর্য-ঘড়ি বাগানে একটা আছে বটে, কিন্তু কাগজ তো সব পুড়িয়ে ফেলেছেন কাকা। 
    ‘যত্তো সব!’ অনেকটা সামলে নিয়ে বাবা বললেন, ‘এটা সভ্য দেশ। গাড়োয়ানি ইয়ার্কির জায়গা নয়। কোথেকে এসেছে চিঠিটা ?”
    ‘ডাকঘরের স্ট্যাম্প দেখে বললাম— ডান্ডি থেকে! 
    ‘ফেলে দাও! ইয়ার্কির আর জায়গা পায়নি।’ 
     ‘পুলিশে খবর দেওয়া দরকার।’ 
    ‘ছাড়ো তো! লোক হাসাতে হবে না।’ 
    ‘আমি নিজে খবর দিতে চাইলাম— বাবা বেঁকে বসলেন, চিরকাল বড়ো গোয়ার। আমি কিন্তু সেইদিনই অমঙ্গলের অশনি সংকেত পেলাম চিঠিখানার মধ্যে।
 চিঠি পাওয়ার তিন দিন পরে বাবা ছেলেবলোর বন্ধু মেজর ফ্রিবাডির সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। দ্বিতীয় দিনে টেলিগ্রাম এল মেজরের কাছ থেকে। গিয়ে শুনলাম বাবা আর নেই। খাদ থেকে পড়ে মারা গেছেন। জুরিরা’ বললেন, দুর্ঘটনা। আমার মন বলল, হত্যা। অথচ কোনো পায়ের ছাপ কোথাও নেই, আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই, রাস্তাঘাটেও অচেনা মুখ দেখা যায়নি। ষড়যন্ত্র যে ক্রমশ চেপে বসছে, সমস্ত সত্তা দিয়ে তা উপলব্ধি করলাম।
    এইভাবেই অনেক দুর্ভাগ্যের মধ্যে দিয়ে সম্পত্তি এল হাতে। বলতে পারেন, কেন বেচে দিয়ে সরে পড়লাম না। কিন্তু আমার মন বলছে, পালিয়ে গিয়ে কাকার অতীতের জেরকে ফাকি দেওয়া যাবে না।
     বাবার রহস্যজনক মৃত্যুর পর দু-বছর আট মাস বেশ সুখেই কাটল। কমলবিচির আতঙ্ক মন থেকে মুছে গেল। ভাবলাম বুঝি, অভিশাপটা শেষ পর্যন্ত রেহাই দিল বংশের শেষ পুরুষকে।
      কিন্তু ভুল... ভুল... সব ভুল। কাল সকালে আবার এসেছে সেই খাম। এই দেখুন।
    ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে একটা খাম বার করে উপুড় করল যুবাপুরুষ। টেবিলে কড়মড় করে ঠিকরে পড়ল পাঁচটা শুকনো কমলালেবুর বিচি।
     বলল, ‘ডাকঘরের স্ট্যাম্প মারা হয়েছে লন্ডনের পুব অঞ্চলে। ভেতরে লেখা K.K.K.– “কাগজপত্র সূর্য-ঘড়ির ওপর যেন থাকে।”
    ‘চিঠি পেয়ে কী করলেন?’
     ‘কিছুই না।’
    ‘সে কী! কিছু করেননি?’
    কাঁপা হাতে মুখ ঢেকে শিউরে উঠল জন ওপেন-শ, কী করব বলতে পারেন? একটা কুটিল চক্রান্ত আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরেছে আমাকে— বড়ো অসহায়, বড়ো দুর্বল আমি। এমন একটা ক্রুর কুটিল অমঙ্গল আমাকে শেষ করে আনছে যার খপ্পর থেকে রেহাই বাবা কাকারাও পায়নি— আমিও পাব না।’
     ‘আপনি কি চুপ করবেন? চিৎকার করে ওঠে শার্লক হোমস। এখন কি ভেঙে পড়ার সময়? বাঁচতে যদি চান, তো উঠে-পড়ে লাগুন।
     ‘পুলিশের কাছে ধরনা দিয়েছিলাম।
     ‘কী বলল তারা ?’
     ‘হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল, ঠাট্টা করেছে কেউ।’
     ‘ইডিয়ট! মানুষ যে এত বোকা হতে পারে ভাবাও যায় না।’
     ‘অবশ্য সঙ্গে একজন কনস্টেবল দিয়েছে।’
    ‘সঙ্গে এনেছেন তো ?’
    ‘না, বাড়িতে রেখে এসেছি। সেইরকমই অর্ডার আছে তার ওপর।’
    এবার ভীষণ রেগে গেল হোমস। শূন্যে মুষ্টি নিক্ষেপ করে চিৎকার করে বললে, ‘তাহলে এখানে আসতে গেলেন কেন ? এলেনই যদি তো চিঠি পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে এলেন না কেন?’
    ‘আপনার নাম তখনও শুনিনি। মেজর প্রেনডেগাস্টের কাছে শুনেই দৌড়ে আসছি।’
    ‘খুব করেছেন। রাগে গরগর করতে করতে বলল হোমস। চিঠি পাওয়ার পর দু-দুটাে দিন বেবাক বসে কাটিয়েছেন। জোগাড়যন্ত্র আগেই করা উচিত ছিল। যত্তো সব! ছোটোখাটো সূত্র-টুত্র কিছু দিতে পারেন? ব্যাপারটা আন্দাজ করার মতো যা হয় কিছু?
     পকেট থেকে একটা নীল কাগজের টুকরো বার করে টেবিলে রাখল জন।
    ‘কাকা যেদিন কাগজ পোড়ান, সেদিন কীভাবে জানি না এই কাগজটা উড়ে এসে মেঝেতে পড়েছিল। ছাইয়ের মধ্যেও এইরকম নীলচে রঙের আধপোড়া কাগজের অনেক টুকরো দেখেছিলাম। এই কাগজটাও মনে হয় ওইসবের মধ্যেই ছিল।’
     বাতির আলোয় ছেড়া কাগজটার ওপর আমরা দুই বন্ধু হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। একটা দিকই ছেড়া হয়েছে— যেন খাতার পাতা— ছিড়ে নেওয়া হয়েছে। ওপরে লেখা মার্চ, ১৮৬৯। তলায় একটা হেঁয়ালি :
    ৪ঠা।।  হাডসনের মত পালটায়নি। এসেছিল।
    ৭ই।।   বিচি পাঠানো হল ম্যাকাউলি, প্যারামোর আর জন সোয়েনকে।
    ৯ই।।  ম্যাকাউলি পরিষ্কার।
    ১০ই।। জন সোয়েন সাফ।
    ১৩ই।।  প্যারামোরকে দেখে এলাম। ঠিক আছে।
    কাগজটা ফিরিয়ে দিল হোমস।
    বলল, "নষ্ট করার মতো সময় আর নেই। এক্ষুনি বাড়ি গিয়ে কোমর বেঁধে লেগে যান।
    ‘কী করব ?
   ‘এই যে কাগজটা, এই সেই পেতলের বাক্সে রাখবেন। আর একটা কাগজে লিখবেন— “সব কাগজ কাকা পুড়িয়ে ফেলেছেন, এইটেই কেবল রয়ে গেছে।” লিখে কাগজটাকে পেতলের বাক্সে রেখে সবসুদ্ধ সূর্যঘড়ির ওপর সঙ্গেসঙ্গে রেখে আসবেন।
    ‘বেশ, তাই করব।”
    ‘এ ছাড়া করণীয় আর কিছুই এখন নেই। আগে নিজে বাঁচুন, পরে বাপ কাকার মৃত্যুরহস্যের কিনারা করতে যাবেন।
    উঠে দাঁড়াল জন, আপনি আমাকে নতুন শক্তি দিলেন।
    ‘একদম সময় নষ্ট করবেন না। মনে রাখবেন, মাথার ওপর সাংঘাতিক বিপদের খাড়া নিয়ে এখানে আপনি এসেছেন। সত্যিই জীবন বিপন্ন আপনার। বাড়ি ফিরবেন কী করে?
     ‘ট্রেনে '
     ‘ন-টা এখনও বাজেনি। রাস্তায় যদিও লোক থাকবে, তাহলেও খুব একটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছি না।’
     ‘সঙ্গে হাতিয়ার আছে।’
    ‘চমৎকার। কাল থেকে শুরু করব আপনার রহস্য সমাধান।’

রহস্যের শেষ অংশ এখানে পাবে: শেষ অংশ

0 coment�rios: