টুকিটাকি পাখি -- জার্মানের রূপকথা

    এক সময় এক জাদুকর ছিল । ভিখিরি সেজে বাড়ি-বাড়ি সে ভিক্ষে করতে যেত আর চুরি করে নিয়ে পালাত সব সুন্দর-সুন্দর মেয়েদের। কোথায় যে তাদের সে নিয়ে যেত কেউ সে কথা জানত না। কারণ সেই-সব মেয়েদের আর কখনো দেখা যেত না। কখনো শোনা যেত না তাদের কথা। একদিন সেই জাদুকর একটি লোকের বাড়িতে হাজির হল। তার ছিল সুন্দরী তিন মেয়ে। খুব গরিব অসুস্থ এক ভিখিরির ছদ্মবেশে সে গিয়েছিল। কাঁধে তার একটা ঝোলা। দেখে মনে হয় যে, ভিক্ষে করে সামান্য যে খাবার পায় ঝোলাটায় সে রাখে৷ এসে সে এক টুকরো রুটি চাইল। বড়ো মেয়ে বেরিয়ে এসে রুটির টুকরোটা তাকে যেই-না দিতে গেছে, জাদুকর আলতোভাবে তাকে ছুল। আর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি বাধ্য হল টুক করে তার ঝোলার মধ্যে লাফিয়ে পড়তে। সঙ্গে সঙ্গে বড়ো-বড়ো পা ফেলে তাড়াতাড়ি সে মেয়েটিকে নিয়ে এল ঘন এক বনে। সেখানেই তার বাড়ি। বাড়ির সব-কিছুই ভারি চমৎকার। মেয়েটি যা চাইল সব-কিছু দিয়ে তাকে সে বলল, “মানিক আমার। এখানে থাকতে নিশ্চয়ই তোমার খুব ভালো লাগবে। যা চাইবে তাই দেব।” এভাবে কিছুদিন কাটার পর জাদুকর বলল, “আমি কয়েকদিনের জন্য বাইরে বেরুচ্ছি। কটা দিন তোমায় একলা থাকতে হবে। এই নাও বাড়ির চাবিগুলো। বাড়ির মধ্যে যেখানে খুশি যেতে পার, সব-কিছু দেখতে পার। কিন্তু এই ছোট্টো চাবিটা দিয়ে যে ঘর খোলা যায় শুধু সেই ঘরটায় যাওয়া বারণ। গেলে মারা পড়বে।” সেইসঙ্গে মেয়েটিকে একটি ডিমও সে দিল। দিয়ে বলল, “ডিমটা যত্ন করে সব সময় সঙ্গে রেখো। নইলে বিপদ ঘটতে পারে।”
    ডিম আর চাবিগুলো নিয়ে মেয়েটি কথা দিল—তার নির্দেশ মেনে চলবে। জাদুকর চলে যেতে বাড়ির মধ্যে ঘুরে ঘুরে সব-কিছু সে দেখল। ঘরে ঘরে ঝক ঝক করছে রুপো আর সোনার জিনিসপত্র। মেয়েটির মনে হল এমন ঐশ্বর্য আগে কখনো দেখে নি। শেষটায় সে পৌছাল সেই নিষিদ্ধ দরজার কাছে। সেটার পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়েও সে যেতে পারল না। পারল না তার কৌতুহল দমন করতে চাবিটার দিকে সে তাকাল। অন্য চাবিগুলোর মতোই সেটা দেখতে। তার পর সেটা দরজায় লাগিয়ে সামান্য চাপ দিতেই সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল দরজাটা। আর দরজা খুলতে সে দেখে ঘরের মাঝখানে রয়েছে প্রকাণ্ড একটা রক্তাক্ত গামলা আর সেটার মধ্যে কুচিকুচি করে কাটা মানুষের দেহ। কাছেই কাঠের বিরাট একটা টুকরো আর চকচকে একটা কুড়াল। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে মেয়েটি এমন জোরে শিউরে উঠল যে, তার হাতের ডিমটা পড়ে গেল গামলার মধ্যে। সেটা তুলে নিয়ে রক্তটা ধুতে সে চেস্টা করল। কিন্তু পারল না। ধুয়ে ফেলার পরের মিনিটেই সেই রক্তের দাগ আবার ফুটে ওঠে। বার বার সে ধুলো বার বার মুছল। কিন্তু কিছুতেই গেল না রক্তের দাগ।
    কিছুদিন পরে জাদুকর ফিরল। ফিরেই প্রথম চাইল সে সেই ডিম আর চাবিটা। কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটি সেগুলো তার হাতে দিল। আর ডিমের গায়ে রক্তের ছোপ দেখে জাদুকর সঙ্গে সঙ্গে বুঝল—মেয়েটি রক্ত-ঘরে গিয়েছিল। তখন মেয়েটিকে সে বলল, “আমার আদেশ অমান্য করে ঘরটার মধ্যে তুমি গিয়েছিলে। তোমার ভালো লাগুক চাই নাই লাওক—আবার সেখানে তোমায় যেতে হবে। তোমার জীবন শেষ হয়ে এসেছে।” মেয়েটিকে মাটিতে ফেলে তার চুলের মুঠি ধরে হিড় হিড়, করে টানতে টানতে তাকে সে নিয়ে গেল সেই ঘরে। তার পর সেই কাঠের টুকরোয় তার মাথা রেখে কুড়লটা দিয়ে কুপিয়ে চলল। দেখতে দেখতে—ঝরঝর করে রক্ত ঝরে ভিজিয়ে ফেলল ঘরের মেঝে। তারপর সেই গামলার মধ্যে তাকে ছুড়ে ফেলে সে ভাবল, “এইবার মেজো মেয়েটাকে আনব।” 
    জাদুকর তাই আবার গরিব লোকের ছদ্মবেশে গেল সেই বাড়িতে ভিক্ষে করতে। বড়ো মেয়েটির মতো মেজো মেয়েটিও এল এক টুকরো রুটি নিয়ে। তাকেও একবারমাত্র আলতোভাবে ছুয়ে ঝুলিতে ভরে নিয়ে গেল জাদুকর। তার বেলাতেও ঘটল একই ঘটনা । কারণ সে-ও কৌতুহল দমন করতে না পেরে তাকিয়েছিল সেই বিভীষিকার ঘরে। ফলে জাদুকর ফেরার পর পেল একই শাস্তি। তার পর জাদুকর গিয়ে নিয়ে এল ছোটো মেয়েকে। কিন্তু ছোটো মেয়েটি ছিল জাদুকরের মতোই ধূর্ত। সেই চাবি আর ডিম নিয়ে বাড়িময় ঘুরে শেষটায় সে এল সেই নিষিদ্ধ ঘরের সামনে। তার দুই সুন্দরী বোনকে নৃশংসভাবে খুন হয়ে গামলাটার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখে সে আঁতকে উঠল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে তাদের কাটা হাত-পা ইত্যাদি প্রত্যেকটি অঙ্গ ঠিক ঠিক জায়গায় বসাতে শুরু করে দিল আর ঠিকমতো জোড়া লাগার পর তার দুই বোন চোখ মেলে তাকিয়ে নিশ্বেস নিয়ে আবার বেঁচে উঠে ভারি খুশি হয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল ।
    বাড়ি ফিরে জাদুকর চাইল সেই চাবি আর ডিম। ডিমের উপর রক্তের ছোপ না দেখে সে বলল, “পরীক্ষায় তুমি উতরেছ। তুমিই আমার বউ হবে ।”
    তার পর থেকে ছোটো মেয়ের উপর জাদুকরের আর কোনো জাদুর প্রভাব রইল না। মেয়েটির সব কথা বাধ্য হয়ে তাকে শুনতে হয়। মেয়েটি বলল, “এক ঝুড়ি মোহর প্রথমে তোমায় পিঠে বেঁধে নিয়ে যেতে হবে আমার মা-বাবার কাছে। তুমি যাবার পর ভোজের ব্যবস্থা আমি করে রাখব।” তার পর সে উপরতলার ছোটো এক ঘরে ছুটে গেল । বোনেদের সেখানে সে লুকিয়ে রেখেছিল। তাদের বলল, “এবার তোমাদের আমি বাঁচাতে পারব। হতভাগাটা নিজেই পিঠে করে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে। কিন্তু বাড়ি পৌছেই আমাকে উদ্ধার করার জন্যে লোকজন পাঠাতে ভুলো না।” বোনেদের একটা ঝুড়িতে রেখে এমনভাবে তাদের সে মোহর দিয়ে ঢেকে দিল যে, তাদের শরীরের কোনো অংশ দেখা গেল না। তার পর জাদুকরকে ডেকে সে বলল ঝুড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। বলল, “পথে কোথাও বিশ্রাম নেবে না । আমার ছোটো জানলা দিয়ে লক্ষ্য রাখব তুমি কী কর। অতএব সাবধান ।”
    ঝুড়িটা পিঠে বেঁধে জাদুকর যাত্রা করল। কিন্তু সেটা খুব ভারী বলে দর দর, করে তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। এক মিনিট বিশ্রাম নেবার জন্য যেই-না সে থেমেছে অমনি ঝুড়ি থেকে একটা স্বর শোনা গেল, “আমার ছোট্টো জানলা দিয়ে দেখছি, তুমি বিশ্রাম করছ। এক্ষুনি চলতে শুরু কর ।”
    জাদুকর ভাবল, তার ভাবী বউ কথাগুলো বলছে। তাই সে পা হাকিয়ে চলতে শুরু করল। খানিক পরে আবার তার ইচ্ছে হল বসতে। কিন্তু আবার শোনা গেল সেই স্বর, “আমার ছোটো জানলা । দিয়ে দেখছি, তুমি বিশ্রাম করছ। এক্ষুনি চলতে শুরু কর।” এই— ভাবে যখনি সে থামে তখনি সেই স্বর তাকে তাড়া দিয়ে বলে এগিয়ে যেতে। মেয়েদের বাড়িতে জাদুকর পৌছল টলতে টলতে, হাঁফাতে হাঁফাতে। এইভাবে এক ঝুড়ি মোহর নিয়ে দুই মেয়ে নিরাপদে পৌছল। তাদের বাবার বাড়িতে।
    ইতিমধ্যে বিয়ের কনে বিয়ের ভোজের আয়োজন করতে শুরু করে দিয়েছিল। জাদুকরের সব আত্মীয়স্বজনকে সে নেমন্তম করে পাঠাল। তার পর সে একটা দাঁত বার করা হাসি হাসি মড়ার খুলি এনে সেটায় ইয়ারিং, গয়না আর ফুলের মুকুট পরিয়ে উপরে নিয়ে গিয়ে জানলার সামনে দিল রেখে। এই-সব তোড়জোড় শেষ হবার পর এক পিপে মধুর মধ্যে সর্বাঙ্গ ডুবিয়ে নিয়ে বিছানার চাদর ছিঁড়ে ছিঁড়ে গায়ে সে জড়িয়ে নিল। তাকে দেখাতে লাগল একটা অদ্ভুত পাখির মতো। তাকে দেখে কারুরই চেনার জো রইল না। তার পর সে গেল বাড়ির বাইরে। বিয়ের জন্য নিমন্ত্রিত অতিথিরা তখন আসতে শুরু করে দিয়েছে। তাদের কয়েকজন প্রশ্ন করল, “টুকিটাকি পাখিকোথা থেকে আসছ?”
   “আমি আসছি মিস্টার ফিটজ টুকিটাকির বাড়ি থেকে।” “বিয়ের কনে কী করছে ?”
ঘর-সংসার ছারখার,
জানলায় দেখোগে—
মুখ তার ”
    খানিক পরে দেখা হল তার বিয়ের বর সেই জাদুকরের সঙ্গে।
    ধীরে ধীরে সে ফিরছিল বাড়ির দিকে। অন্যদের মতো সে-ও প্রশ্ন করল, “টুকিটাকি পাখি, কোথা থেকে আসছ?”
   “আমি আসছি ফিট্‌জ টুকিটাকির বাড়ি থেকে ৷”
    “আমার ভাবী বউ কী করছে ?”
“ঘর-সংসার ছারখার,
জানলায় দেখোগে
— মুখ তার ”
    জাদুকর উপর দিকে তাকিয়ে দেখল ফুলের মুকুট পরা মড়ার সেই খুলিটা। সেটাকে সে ভাবল তার ভাবী বউ-এর মুখ। তাই সে মাথা হেলিয়ে চেঁচিয়ে জানাল প্রীতি-সম্ভাষণ। কিন্তু নিমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে যেই-না সে বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে অমনি বিয়ের কনের ভাই আর আত্মীয়-স্বজনরা ভিতরে এল হুড় মুড়িয়ে। তারা এসেছিল ছোটো মেয়েকে, উদ্ধার করতে। তার পর তারা বাড়ির সব জানলা দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে এটে দিল কুলুপ, যাতে জাদুকর আর তার আত্মীয়স্বজনদের কেউ না বেরিয়ে আসতে পারে ।
    কুলুপ আঁটা শেষ হলে বাড়িটায় তারা আগুন ধরিয়ে দিল ।আর এইভাবে পুড়ে মরল জাদুকর আর তার জাতি-গোষ্ঠী ।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য