বাহাদুরীর ফল -- বিনয় দাস

    এক দেশে মাণিক্যবৰ্মা নামে এক গেরস্থ ছিল। কোন কাজ সে করত না। পূর্বপুরুষেরা অনেক বিষয় সম্পত্তি রেখে গিয়েছিল। ও সেই অর্থ ভাঙ্গিয়ে থেত। আর চারদিকে বড় বড় বুলি আউড়ে বেড়াত! কোন কোন জিনিস দশ টাকায় কিনে লোককে হয় কমিয়ে অথবা বাড়িয়ে বলত। নিজের বিদ্যাবুদ্ধি যা ছিল তা সে এই ধরনের গালগল্প প্রচার করতেই খাটত।


    একদিন মাণিক্যবর্মা সময় কাটাতে পালাগান শুনতে গেল। ওখানে অন্য একটা লোকের সাথে তার পরিচয় হোল। পালাগান শেষ হবার পর দুজনে এ কথা সে কথা বলতে বলতে পথ চলতে লাগল। নানান কথার পর মাঝপথে লোকটা মাণিক্যবর্মাকে বলল, “আজকে রাজার ঘরে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। রাজা রাজ-সভায় বসে আছেন। বিভিন্ন লোকের সাথে কথা হচ্ছে, এমন সময় খবর এলো রাণীর ভীষণ পেটের যন্ত্রণা হচ্ছে। রাজার কাছে যারা বসে ছিল তাদের মধ্যে একজন বৈদ্যও ছিল। ঐ খবর পেয়ে রাজা ঐ বৈদ্যকে ভেতরে গিয়ে রাণীকে ওষুধ দিতে বলল। ,
    বৈদ্য ভেতরে গিয়ে এতটা শুঁঠ চেয়ে ভেঙ্গে বেটে সেদ্ধ করে গুড় মিশিয়ে রাণীকে খাইয়ে দিল। খাওয়ার সাথে সাথে জাদুর মত পেট ব্যথা কমে গেল। তখন রাণী কী করল জানেন? কাছাকাছি কেউ আছে কিনা দেখে নিজের গলার রত্নহার বের করে ঐ বৈদ্যকে উপহার দিল। রাণী তাকে উপদেশ দিল ; খুব সাবধানে রাখবে। কাউকে বলবে না দেখলেন, ঐ টুকু ওষুধ খাইয়ে উপহার পেল কিনা রত্নহার। সেই জন্যই বলি, সেবা করতে হয় তো বড় লোকদেরই করা উচিত। গরীব-টরিবদের সেবা করলে কি আর হয়। ঐ বৈদ্য আমার বন্ধু হওয়ায় এই সব গোপন কথা আমি জানতে পারলাম। কাউকে বলবেন না!
    কথা বলতে বলতে পৌছাল এক কূয়োর কাছে। এই কুয়োটা অন্যধরনের। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামা যায়। যে লোকটা রাণীর পেট ব্যথার গল্প বলছিল সে ঐ কূয়োতে নামল। মাণিক্যবর্মা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হঁটিতে লাগল। কিছুক্ষণ পর

আবার ওরা মিলিত হয়ে পরক্ষণে তু’পথে দুজনে হাঁটা দিল।
    মাণিক্যবর্মার বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল।
    “এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে?” মাণিক্যকর্মর স্ত্রী প্রশ্ন করল ।
    মাণিকবৰ্মা চিরকাল সব ব্যাপারেই বাহাদুরী দেখাতে চায়। তাই সে বলল, “আজ এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, জান?
আমি এমনি একটু রাজাকে দেখে আসতে গিয়েছিলাম। ঠিক তক্ষুণি রাণীর ভীষণ পেটের ব্যাথা শুরু হয়ে গেল! আমি সরিয়ে দেব বললাম। গেলাম অন্তঃপুরে। এই অন্তঃপুরের বাহার কী আর বর্ণনা করা যায়! হাঁসের পালকের উপর যেন রাণী শুয়ে ছটফট করছে। আমি তাড়াতাড়ি এতখানি শুঁঠ বাটিয়ে গুড় চেলে ফুটিয়ে রাণীকে খাইয়ে দিলাম। ঐ জিনিস পেটে যেতে না যেতেই রাণী সেরে উঠল। আমার ওষুধ মন্ত্রের মত কাজ করল। রাণী ভীষণ খুশী হোল। নিজের গলা থেকে তৎক্ষণাৎ রত্নহার বের করে দিলে আমার হাতে। এইসব ঘটনার জন্যই এত রাত হোল ফিরতে।
    “কই দেখি সেই রত্নহার ।" ওর স্ত্রী বলল ।
    “ওটা কেমন দেখতে জান? জ্বল জ্বল করছে। অমন অপূর্ব রত্নহার এত রাত্রে আমাদের ঘরে রাখা নিরাপদ নয় ভেবেছি। তাই ফেরার পথে সিড়িওয়ালা কুয়োতে নেমে গোপনে এক জায়গায় লুকিয়ে রেখে এসেছি। ভোর রাত্রে গিয়ে নিয়ে আসবখন ৷” বলল মাণিক্যবর্মা।
    সেই রাত্রে মাণিক্যবর্মার স্ত্রী চোখের পাতা জুড়তে পারেনি। ঐ রত্নহার যতক্ষণ না নিজের চোখে দেখছে ততক্ষণ তার চোখে ঘুম নেই, পেটে খিদে নেই। পূর্ব দিকটা একটু ফর্সা হতেই কলস কাঁখে বেরিয়ে পড়ল মাণিক্যবর্মার স্ত্রী সেই সিঁড়িওয়ালা কূয়োর কাছে। এদিক ওদিক দেখে নেমে গেল কূয়োতে ।
    ভেতরে নেমে যেখানে হাত দিল সেখানেই রত্নহার ছিল। রত্নহার হাতে নিয়ে মহানন্দে চিৎকার করে উঠতেই তার পা হড়কে গেল। তখন ডুবে যাওয়ার ভয়ে আর্তনাদ করতে লাগল।
    মাণিক্যবর্মার বউ এর আর্তনাদ শুনে চারপাশের লোক জেগে উঠে কূয়োর কাছে এলো। তাকে কূয়ো থেকে তুলল। ওর হাতের রত্নহার সকলের নজরে পড়ল। মুহুর্তে রাজার প্রহরীদের কানে গেল এই খবর। আগের দিন রাণীর রত্নহার হারিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে রাজার প্রহরীরা নানান দিকে ছড়িয়ে পড়ে ঐ রত্নহার খুঁজছে।
    আগের দিন রাণীর পেট ব্যথা করার ঘটনা সত্য। রাণীকে যে-লোকটা ওষুধ দিয়েছিল, সে আর কেউ নয়, পালাগান শুনে ফেরা পথে মাণিক্যবর্মকে ঐ সব কথা যে জানিয়েছিল সেই। সেই লোকটাই রত্নহারও চুরি করেছিল। সেই ফেরা পথে ঐ সিঁড়িওয়ালা কূয়োতে লুকিয়ে রেখেছিল। ওর কাছে গল্প শুনে ওর কাণ্ড কারখানা দেখে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মাণিক্যবৰ্মা বউএর কাছে গল্প করেছিল।
    মাণিক্যবৰ্মা যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক না কেন রাজার বিশ্বাস হোলনা। রাজা ওকেই চোর হিসেবে ধরল ! মাণিক্যবর্মাকে চাবুক মারার হুকুম দিল। সেই চাবুক খেয়ে বাড়িয়ে বলার বা রাজা উজীর মেরে বেড়ানোর অভ্যেস মাণিক্যবর্মার চিরকালের জন্য ছুটে গেল।


Previous
Next Post »
0 মন্তব্য