জ্ঞানভাণ্ডার

    যমুনা নদীর তীরে বাদশা আকবরের একটি প্রমোদভবন ছিল। যখন রাজ্য শাসন করতে করতে শ্ৰান্ত হয়ে পড়তেন তখন এই ভবনে এসে আমোদ-প্রমোদে তিনি মেতে থাকতেন। রাজ্যের কথা, প্রজাদের কথা সব একেবারে ভুলে যেতেন। একদিন তাঁর এই প্রমোদভবনে সভাসদদের নিয়ে আসর বসেছে। যমুনার জল বয়ে চলেছে তার আপন খেয়ালে। প্রমোদের প্রধান অঙ্গ হিসেবে সুরের ফোয়ারা ছুটেছে। সেউ সঙ্গে নানারকম রঙ্গ-রসিকতা আর রসাল গল্প।
    বাদশা এতই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন যে নিজেই আতর ঢালতে গিয়ে খানিকটা আতর বহুমূল্যবান মসলিনের ওপর পড়ে গেল। এতে নিজেই বড় অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। যদিও ব্যাপারটা খুবই সাধারণ কিন্তু তিনি পাত্র- মিত্রদের সামনে খুবই লজ্জায় পড়ে গেলেন।  তাড়াতাড়ি সবার দিকে একবার তাকিয়ে  তাড়াতাড়ি যেখানটায় আতর পড়েছিল সেখানটা মুছে ফেলতে গেলেন কিন্তু ততক্ষণে আতর অদৃশ্য হয়ে  গিয়েছে। আর কেউ ব্যাপারটা না  দেখলেও কিন্তু তিনি বীরবলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করতে পারলেন না।  বীরবলের কাছে নিজেকে ভীষণ অপরাধী বলে মনে হতে লাগল।
    পরদিন বাদশা তাঁর অনেক কাছের মানুষদের ডেকে এনে আতর দিয়ে একরকম স্নান করিয়ে দিলেন। বীরবল মনে মনে একটু হেসে  ভাবলেন, অনেক খেয়ালের মধ্যেও বাদশার  এটাও একটা খেয়াল। বীরবল অন্যান্য সভাসদদের থেকে একটু  বেশি আশকারা পেয়েছিলেন বলে বাদশাকে ছেড়ে কথা কইতেন না। তিনি হেসে হেসে বললেন, জাঁহাপনা, আপনি যাই করুন না কেন, মসলিনের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া সেই আতর কিন্তু আপনি আর কোনওদিনই ফিরে পাবেন না।’
   এই কথায় বাদশা আকবর বীরবলের ওপর খুবই চটে গেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বীরবলকে প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে বললেন।
    এমন ঘটনা ইতিপূর্বেও অনেকবার ঘটেছে। বাদশা রেগে গিয়ে তাকে সভাগৃহ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার মুখ আর আমি কোনওদিন দর্শন করব না, কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই আবার তাকে ডেকে পাঠিয়ে অনেক পুরস্কার দিয়ে সন্তুষ্ট করেছেন। অন্য সবার থেকে তিনি বীরবলকে বেশি পছন্দ করতেন, বেশি ভালবাসতেন।
    এবার বাদশা এতই চটেছেন যে, তিনি আর বীরবলকে ডাকলেন না। বীরবলও বাদশাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন তাই বাদশা তাকে না ডাকায় তিনি মনের দুঃখে এবং অভিমানে রাজধানী দিল্লি ছেড়ে চলে গেলেন এক অজানা পথের উদ্দেশ্যে।
    খবরটা চারদিকে জানাজানি হয়ে গেল। বাদশার মোসাহেবরা এতে খুবই সন্তুষ্ট হল, তারা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। এতদিন বীরবল তাদের অনেক জ্বালিয়েছে। তার জন্য বাদশার কাছে তারা অনেক অপদস্থ হয়েছে। বীরবলের বুদ্ধির কাছে তারা বারবার হেরে গিয়েছে।
    কথাটা বাদশার কানেও গেল। শুনে তিনি খুবই দুঃখ পেলেন। এই কদিন বীরবল কাছে না থাকায় তিনি বড়ই বিমর্ষ, মনমরা হয় ছিলেন। তিনি ভাবলেন, কাজটা তিনি ভাল করেননি। লঘু পাপে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় ভুল সংশোধনের আর কোনও রাস্তা রইল না।
    তুর্কী বাদশার কানেও কথাটা যেতে দেরি হল না। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন এইবার বাছাধনকে জব্দ করতে হবে। বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ বীরবলের জন্য বাদশা আকবরকে এতদিন জব্দ করতে পারেননি, এবার তাকে জব্দ করবেন।
    তিনি বাদশা আকবরের কাছে দূত পাঠিয়ে জানালেন, তার একটা জ্ঞানভাণ্ডারের বিশেষ প্রয়োজন। এক মাস সময় দেওয়া হল, ওই সময়ের মধ্যে ওই বস্তুটি তার কাছে না পৌছলে তার সঙ্গে আর কোনও সুসম্পর্ক থাকবে না, এমনকী এর জন্য যুদ্ধ পর্যন্ত হতে পারে।
    তুর্কীরা যুদ্ধবাজ। বাদশা আকবর যুদ্ধ চান না। যুদ্ধ মানেই অর্থ এবং লোকক্ষয়। তিনিও কম ক্ষমতাবান নন, কিন্তু সামান্য কারণে যুদ্ধ তিনি চান না। কিন্তু এই বিপদে তাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই। জ্ঞানভাণ্ডার বস্তুটি কী তাই তিনি জানেন না। তার যারা সভাসদ আছেন তাঁদের বুদ্ধি এত কম যে, তাঁরাও এ ব্যাপারে তাকে কোনওরকম সাহায্যই করতে পারবেন না। হ্যাঁ, একজন ছিলেন যিনি তাকে এই বিপদে সাহায্য করতে পারতেন। বীরবল, তিনিই একমাত্র উপযুক্ত লোক। এই বিপদের দিনে তাকে চাই। যেমন করে হোক তাঁকে খুঁজে বের করতেই হবে। কাজটা সামান্য হলেও তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। দেশে দেশে তিনি লোক পাঠালেন। কেউই আর ফিরে আসছে না বীরবলকে নিয়ে। এদিকে এক মাস শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। অবশেষে মালওয়ায় তাকে পাওয়া গেল। বাদশার অনুরোধ জানিয়ে অনেক সাধ্যসাধনা করে বীরবলকে রাজধানী দিল্লিতে আনা হল। বাদশা স্বীকার করলেন যে, বীরবলের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এজন্য তিনি ভীষণ দুঃখিত।
    যাই হোক, কেন তাকে খুঁজে আনা হয়েছে সেই জ্ঞানভাণ্ডারের কথাটি বাদশা বললেন, ও বীরবলকে অনুরোধ করলেন যেন বুদ্ধি খাটিয়ে এর একটা বিহিত করেন।
    সুলতানের সঙ্গে এই সামান্য কারণে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চান না তিনি। যুদ্ধে অনেক লোকক্ষয় হবে, অনেক অর্থের অপচয় হবে।
   বীরবল বুঝলেন বাদশা আকবর কত মহান। তিনি কয়েকটা দিন ভাববার সময় চেয়ে নিয়ে রাজদরবার. থেকে বিদায় নিলেন।
    বীরবলের এখন মাথায় চিন্তা। মুশকিল আসান। এই বিপদ থেকে যদি বাদশাকে রক্ষা করা না যায় তবে বৃথাই তাঁর বুদ্ধির অহঙ্কার।
    একটা সুদৃশ্য পাথরের কলস নিয়ে হাজির হলেন দরবারে। বীরবলকে দেখে বাদশা তার কাছে ছুটে গিয়ে জানতে চাইলেন কোনও সমাধানসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে কিনা।
    বীরবল বললেন, জাঁহাপনা, চলুন আপনার আবাদে একবার ঘুরে আসা যাক। বাদশার আবাদ মানে সে একটা দেখবার মতো জিনিস। কত বিচিত্র রকমের সব সবজির চাষ হচ্ছে। কত বিচিত্র সব গাছে গাছে ফল ধরে আছে। ঘুরতে ঘুরতে কুমড়োর খেতে ঢুকে পড়লেন বীরবল।
    আহা! কী বড় বড় কুমড়ো ধরে আছে গাছে। অনেক বেছে একটি বড় জাতের কুমড়োকে সেই কলসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। কুমড়োটি কলসের মধ্যে বড় হয়ে উঠল কয়েকদিনের মধ্যেই। বীরবল যেদিন দেখলেন কুমড়োটি কলসটার মধ্যে কলসের মাপে বড় হয়েছে তখন তিনি বোটাটি কেটে বেশ ভাল করে মুখটা বন্ধ করে বাদশা আকবরকে দিয়ে বললেন, ‘এইটি সেই জ্ঞানভাণ্ডার যা তুর্কী সুলতান আপনার কাছে চেয়েছেন। আপনি লিখে দিন আপনার নির্দেশমতো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই জ্ঞানভাণ্ডার পাঠিয়ে দেওয়া হল। জ্ঞান আহরণের সময় এই ভাণ্ডটির যদি কোনও ক্ষতি হয় তবে আপনার কাছে প্রচুর ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে। আপনি জেনে রাখুন বাদশা আকবর কারও যুদ্ধের হুমকিকে ভয় করে না।’
    কলসটি দেখে তুকী সুলতান খুব খুশি হলেন। তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে নিশ্চয়ই সেই তীক্ষ্ণবুদ্ধির অধিকারী বীরবল পুনরায় বাদশার দরবারে ফিরে এসেছেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য