নীল পদ্মরাগ [দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ব্লু কারবাঙ্কল]- শেষ অংশ

   হোমস কড়া ভাষায় বলল, “চেয়ারে গিয়ে বোসো। খুব তো নাকে কাঁদছ এখন। ওই বেচারি নির্দোষ করনারকে ফাঁসাবার আগে মনে ছিল না এসব কথা!”
   “আমি পালিয়ে যাবো, মিস্টার হোমস। এই দেশ ছেড়েই পালিয়ে যাবো মশাই। তাহলে ওর বিরুদ্ধে মামলাটা আর টিকবে না।”
   “আচ্ছা! সেকথা পরে ভাবব। আগে বলো দেখি, তারপর ঠিক কী কী করলে। পাথরটা হাঁসের পেটে গেল কী করে? আর সেই হাঁসই বা খোলা বাজারে এলো কী করে? যদি বাঁচতে চাও তো সব খুলে বলো।”
   রাইডার একবার জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁটদুটো চেটে নিল। তারপর বলল, “যেমন যা ঘটেছে সবই বলছি, মশাই। হরনার গ্রেফতার হওয়ার পর মনে হল, পাথরটা নিজের কাছে রাখা আর নিরাপদ হবে না। যে কোনো মুহুর্তে পুলিশ আমার ঘরে খানাতল্লাশি করতে পারে। হোটেলেও এমন কোনো নিরাপদ জায়গা নেই যেখানে ওটা রাখা যেতে পারে। তাই আমার বোনের বাড়ি চলে গেলাম। আমার বোন ওকশট নামে একজনকে বিয়ে করে ব্রিক্সটন রোডে থাকে। সেখানেই সে বাজারে বিক্রির জন্য হাঁস পালন করে। মনে হচ্ছিল, সারা রাস্তায় পুলিশ আর গোয়েন্দারা আমার পিছু নিয়েছে। ওই শীতের রাতেও ব্রিক্সটন রোডে যেতে ঘেমেনেয়ে গেলাম। বোন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, আমাকে এত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন। আমি শুধু বললাম, হোটেলে একটা দামি রত্ন চুরি গেছে। তাই মন খারাপ। তারপর বাড়ির পিছনের উঠোনে গিয়ে কী করা যায় ভাবতে লাগলাম।”
   “মডসলি নামে আমার এক বন্ধু আছে। স্বভাব ভাল না। পেন্টনভিলে জেল খেটে সদ্য ছাড়া পেয়েছিল। তার সঙ্গে একদিন দেখা হল। সে আমাকে চোরেদের কাজকারবারের কথা বলল। চোরাই মাল কিভাবে কোথায় বেচা যায়, সেও বলল। লোকটার কিছু গোপন কথা আমি জানি, তাই জানতাম ও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। ও থাকে কিলবার্নে। সেখানেও যাওয়া স্থির করলাম। ওই ভাল দামে মাল বিক্রির ব্যবস্থা করে দিত। কিন্তু নিরাপদে ওর কাছে যাবো কি করে? অনেক কষ্টে হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। যেকোনো মুহুর্তে আমার দেহতল্লাশ করলেই তো আমার ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে পাথরটা বেরিয়ে পড়বে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় দেখলাম, আমার পায়ের কাছে হাঁসগুলো ঘুরছে। হঠাৎ মাথায় একটা মতলব খেলে গেল। ভাবলাম, এটাকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়ার সেরা গোয়েন্দাকেও বোকা বানিয়ে ছাড়ব।
   “কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বোন আমাকে বলেছিল যে আমি বড়োদিনের উপহার হিসেবে একখানা হাঁস নিতে পারি। আমার বোন কথার খেলাপ করে না। ভাবলাম, এই মওকায় একখানা হাঁস বেছে নিই, সেটাই আমার সঙ্গে কিলবার্নে পাথরটা বয়ে নিয়ে যাবে। উঠোনে একটা ছোটো ছাউনি মতন ছিল। আমি তার পিছনে একখানা হাঁসকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। বেশ বড়োসড়ো একটা হাঁস। সাদা। কালো দাগওয়ালা লেজ। ধরলাম হাঁসটাকে। ওটার মুখ হাঁ করে যতখানি আঙুল যায় ঢুকিয়ে পাথরটা পুরে দিলাম। হাঁসটা পাথরটা গিলে নিল। কিন্তু হাঁসটা খুব ডানা ঝাপটাতে লাগল। আমার বোন ব্যাপারটা কি দেখার জন্য বেরিয়ে এল। আমি যখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য পিছন ফিরেছি ওমনি হাঁসটা আমার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে দলের সঙ্গে মিশে গেল।
   “আমার বোন জিজ্ঞেস করল, ‘হাঁসটা নিয়ে কী করছিস্, দাদা?’
   “আমি বললাম, ‘কিছু না। তুই বলেছিলি বড়োদিনে আমাকে একখানা হাঁস দিবি। আমি দেখছিলাম, কোনটা সবচেয়ে মোটা।’
   “বোন বলল, ‘ও, ওই যে তোর জন্য আলাদা করে রেখেছি। আমরা ওটাকে বলি ‘দাদার হাঁস’। ওই যে বড়ো সাদা হাঁসটা। মোট ছাব্বিশটা আছে। একটা তোর, একটা আমাদের, বাকি দু-ডজন বাজারে যাবে।’
   “আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ, ম্যাগি। তবে তোর কাছে সবগুলোই একরকম হয় তো আমি যেটা ধরেছিলাম, সেটাই নিই।’
   “বোন বলল, ‘কিন্তু অন্যটার ওজন অন্তত তিন পাউন্ড বেশি। তোর জন্যই ওটাকে খাইয়ে দাইয়ে মোটা করেছি।’
   “আমি বললাম, ‘আমার ওটাই বেশি পছন্দ। ওটাই নেবো। এখনই নিয়ে যাই?’
   “আমার বোন একটু অসন্তুষ্ট হল। কিন্তু মুখে বলল, “আচ্ছা, তুই যা ভাল বুঝিস্! কোনটা নিবি?
   “ওই যে কালো ডোরা লেজওয়ালা সাদা হাঁসটা। পালের মধ্যে ঘুরছে।’
   “ঠিক আছে, মেরে নিয়ে যা।”
  “তারপর, মিস্টার হোমস, আমার বোন যেমনটা বলল, তেমনটাই করলাম। একটা হাঁস নিয়ে গেলাম কিলবার্নে। আমার বন্ধুকে আমার ফন্দির কথা বললাম। ওই লোকটাকেই একমাত্র সব কথা খুলে বলা যেত। আমরা খুব হাসলাম। তারপর একটা ছুরি নিয়ে হাঁসটা কাটলাম। কিন্তু পাথরটা সেখানে ছিল না। আমার তো মাথায় বজ্রাঘাত। নিশ্চয় কোনো ভুল হয়েছে। হাঁসটা ফেলে বোনের বাড়ি ছুটে এলাম। পিছনের উঠোনে গেলাম। কিন্তু সেখানে একটা হাঁসও ছিল না।
   “বোনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাঁসগুলো কোথায় গেল, ম্যাগি?’
   ‘দোকানে গেছে, দাদা।’
   ‘কোন দোকানে?’
   ‘কভেন্ট গার্ডেনের ব্রেকিনরিজের দোকানে।’
  ‘আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা আমি যে হাঁসটা নিয়েছি, ওই রকম দেখতে আরও একটা হাঁস আছে কী?’
  ‘হ্যাঁ, দাদা। ওই রকম লেজওয়ালা দুটো হাঁস আছে। একই রকম দেখতে। আমি দুটোকে আলাদা করে চিনতে পারতাম না।’
  “তখনই ব্যাপারটা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল। দৌড়ে গেলাম ওই ব্রেকিনরিজ লোকটার কাছে। কিন্তু ততক্ষণে সে সব হাঁস বেচে দিয়েছে। আমাকে বললও না, কার কাছে বেচেছে। আপনারা তার কথাই শুনেছেন আজ রাতে। সবসময় ওইরকমভাবেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে ও। আমার বোন ভাবছে, আমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছি। আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, আমি পাগল হয়ে গেছি। আর এখন… এখন আমি দাগি চোর! যেটা চুরি করে চোর হলাম, সেটাই হারালাম। ভগবান আমাকে রক্ষা করুন! ভগবান আমাকে রক্ষা করুন।’ লোকটা দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।
অনেকক্ষণ কারো মুখে কোনো কথা ফুটল না। শুধু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। আর টেবিলের কানায় হোমসের আঙুল চালানোর টিপ টিপ শব্দ। তারপর হোমস উঠে দরজাটা খুলল।
   বলল, “বেরিয়ে যাও!”
   “অ্যাঁ, মশায়? ও! ঈশ্বর আপনার ভাল করুন!”
  “একটাও কথা নয়। বেরিয়ে যাও!”
   কোনো কথার দরকারও পড়ল না। লোকটা ছুটে বেরিয়ে গেল। দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে রাস্তায় গিয়ে পড়ল। তারপর শুনলাম রাস্তা দিয়ে তার ছুটে পালানোর পায়ের শব্দ।
   পাইপটা টেনে নিয়ে হোমস বলল, “কথা হল, ওয়াটসন, পুলিশ আমাকে তাদের খামতি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রাখেনি। হরনারের বিপদ থাকলে সে ব্যাপার আলাদা। তবে এই লোকটা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। মামলাটাও আর টিকবে না। আমি যেটা করলাম, সেটা বেআইনি। কিন্তু এতে একটা লোককে বাঁচানো গেল। লোকটা আর চুরিচামারি করবে না। সাংঘাতিক ভয় পেয়েছে। এই লোকটাকে জেলে পাঠালে এ শেষটায় দাগি অপরাধীতে পরিণত হত। তাছাড়া এই উৎসব ক্ষমার উৎসব। কাকতালীয়ভাবে আমাদের দরজায় একটা রহস্য এসে পড়েছিল। সেটার সমাধান করতে পারাটাই আমার পুরস্কার। খাবার ঘণ্টাটা বাজাও, ডাক্তার, এবার অন্য একটা রহস্যের সমাধান করি। অবশ্য সেটাও এক পক্ষীরহস্য।”
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য