বিক্রম-বেতালের গল্প: নাস্তিকের দৈবভক্তি

   কোন এক দেশে রামেশ্বর নামে একজন লোক ছিল। গরিবদের সে খুব সাহায্য করত। গরিবের দুঃখে তার প্রাণ কাঁদত। তবে তার ঠাকুরদেবতার প্রতি ভক্তি ছিল না। কোন মন্দিরে ঢুকত না। সে ছিল নাস্তিক। তার ধারণা ছিল অসহায় মানুষকে সেবা করার চেয়ে ইহজগতে বড় ধর্ম আর কিছু নেই।
   একবার রামেশ্বরের মেজ ছেলের কঠিন অসুখ করল। তার কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নগরের বড় বড়  বৈদ্য এসেও রামেশ্বরকে ভরসা দিতে পারল না। তার ঐ বিপদের সময়ে বন্ধু আত্মীয়স্বজনরা তাকে বলল, ‘যেহেতু তুমি নাস্তিক সেইহেতু তোমাকে ভগবান পরীক্ষা করে দেখছেন। ভাল চাও তো প্রায়শ্চিত্ত কর। ঠাকুরের নামে মানত কর।”

“আমি নাস্তিক হয়ে ভগবান অথবা মানুষের ক্ষতি করিনি। নাস্তিক বলে যদি ঠাকুর আমাকে শাস্তি দিতে চান তাহলে তিনি কি ধরনের ঠাকুর! যা ঘটে ঘটুক, আমি কোন দেবতার নামে মানত করব না।” রামেশ্বর পরিষ্কার বলল।

রামেশ্বরের স্ত্রী স্বামীকে না জানিয়ে একহাজার এক টাকা খরচ করে পূজো দেওয়ার মানত করল। কিন্তু তাতেও কোন ফল হল না। কিছুদিন পরে ঠাকুরদেবতার  উপর রামেশ্বরের স্ত্রীরও বিশ্বাস কমে গেল।

কিছুদিন পরে সেই গ্রামে এক মহাপুরুষ এল। চারদিকে রটে গেল ঐ মহাপুরুষের ক্ষমতা অসীম। তার হাতের ছোঁয়া পেলে অন্ধ লোক আলো দেখতে পায়, যে কোন কঠিন অসুখ সে নাকি সারিয়ে দিতে পারে। রামেশ্বরের স্ত্রী স্বামীকে বলল,“কে নাকি মহাপুরুষ এসেছেন, ছেলেকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে দেখালে হত না! উনি নাকি দেবতা।”
   “মানুষ আবার দেবতা হবে কি করে? আমি তো শুনেছি একটা সাধু এসেছে। সাধু যদি রোগ সারায় বৈদ্য করবে কি? এসবে আমার বিশ্বাস নেই।”
   তারপর ছেলেকে নিয়ে রামেশ্বর বিভিন্ন দেশ ঘুরে বহু নামকরা বৈদ্যকে দেখাল। কিন্তু কোন ফল হল না।
   কিছুদিন পরে মহাবিষ নামে এক বৈদ্য দেশে দেশে ঘুরতে ঘুরতে রামেশ্বরের গ্রামে এল। ঐ বৈদ্যের হাত দিয়ে নাকি নানা ধরনের রুগী সেরে উঠেছে। মহাবিষ গ্রামে ঢোকার পরের দিন থেকে চারদিকের লোক এসে ভেঙে পড়ল। রামেশ্বরের ছেলেকে নিয়ে গিয়ে ঐ বৈদ্য দেখল। ছেলেকে পরীক্ষা করে মহাবিষ তিনটি পুরিয়া দিল। দিনে একটি করে খেতে হবে।
    এক পুরিয়া খাওয়ার পরেই ছেলের ঠোঁট নড়ে উঠল। মুখে ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। দ্বিতীয় পুরিয়া খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ভালোভাবেই কথা বলতে পারল। তৃতীয় পুরিয়া খাওয়ানোর পর রামেশ্বর মহাবিষের কাছে গিয়ে বলল, “প্রভু, আপনি অসামান্য বৈদ্য। আমার দুর্ভাগ্য যে আমি এতদিন আপনার সন্ধান পাইনি।”

মহাবিষ হেসে বলল, “আমার কাছে নানা ধরণের অষুধ আছে। রোগ যদি সেরে থাকে ওষুধের জন্যই সেরেছে। অন্য কোন কারনে নয়। সাধারন রোগ যে কোন বৈদ্যই সারাতে পারে। কিন্তু আমার কাছে বহু কঠিন কঠিন রোগ সারানোর ওষুধ থাকায় আমি দেশে দেশে ঘুরি। ওষুধ খেয়ে সেরে ওঠার পর যে যায় আমাকে দেয় আমি তাই নিই।”
   রামেশ্বর তার হাতে একহাজার টাকা দিয়ে প্রণাম করে বলল,“প্রভু, এতদিন ভেবেছিলাম ভগবান নেই কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আপনিই ভগবান।”
   মহাবিষ রামেশ্বরকে হাত দিয়ে ধরে তুলে বলল, “দেবতার প্রতি তোমার কোন বিশ্বাস নেই? তুমি হয়তো প্রত্যক্ষ দৈবস্বামীর দর্শন পাওনি। তাঁর দর্শন পেলে দেবতার উপর তোমার বিশ্বাস জাগত। আমি তাঁর ভক্ত। তাঁর নির্দেশেই আমি দেশে দেশে ঘুরে রুগীদের দেখি। পারলে একবার তুমি তাঁর র্দশন দিয়ে এস।”
   মহাবিষ যেহেতু বলল সেহেতু কথাটা  যেন রামেশ্বরের মনে গেঁথে গেল। সে প্রত্যক্ষ দৈবস্বামী দর্শন করে এলেন। ফেরার পর স্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে রামেশ্বর বলল, “ওঁকে দেখে তো এমন কিছু মনে হল না। লোকে যে তাঁকে কেন ভগবান মনে করে বুঝতে পারিনা। আমার কাছে মহাবিষই হল সাক্ষাৎ দেবতা।”


   বেতাল এই কাহিনী শুনিয়ে বলল, “রাজা, এখন তুমিই বল, রামেশ্বরকে কি বলা যায়? নাস্তিক না আস্তিক?  যে লোকটা কোনদিন মন্দিরে ঢোকেনি সে মহাবিষের মধ্যে দেবতার সন্ধান পেল কি করে? মাহবিষ যাঁর শিষ্য তাঁর মধ্যে সে দেবতার সন্ধান পেল না কেন? আমার প্রশ্নের জবাব জানা স্বত্ত্বেও না দিলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।”
   রাজা বিক্রমাদিত্য এই প্রশ্নের জবাবে বললেন, “ভগবানের কোন আকার নেই। তিনি যে কখন কাকে কোনরূপে দেখা দেবেন তা কেউ জানে না। বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মত। একমতের লোক অন্য মতের মানুষকে নাস্তিক বলে। যাঁরা ঠাকুরদেবতা বিশ্বাস করে তারা সবকিছুর জন্য ঠাকুরদেবতাকেই দায়ী করে। তা না করাতেই রামেশ্বর ওদের চোখে নাস্তিক হয়ে গেল। মহাবিষ রুগীদের রোগ সারানই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছে। নিজের ছেলে সেরে ওঠার পর মহাবিষের মধ্যে দেবতার দর্শন লাভ রামেশ্বরের পক্ষে স্বাভাবিক। যিনি এক জায়গায বসে উপদেশ বিতরণ করেন তাঁর মধ্যে দেবতার সন্ধান পায়নি রামেশ্বর। তাকে দেখে রামেশ্বরের মনে হয়েছে একজন সাধারন মানুষ।তাই রামেশ্বরের মধ্যে পরস্পরবিরোধী কোন মত নেই। সে যা ছিল তাই রইল।”
   বিক্রমাদিত্য রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শবসহ আবার ফিরে গেল সেই গাছে।

(কল্পিত)
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য