হৃদয়ফলক -- এ.সি.সরকার

    সুন্দরপুরের যুবরাজ সুশীলকুমার পোশাক বদলে দেশান্তরে গেল। ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ছমাস ধরে ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু শিখল। তারপর ফেরার পথেও অনেক নতুন দেশ দেখতে দেখতে শেষে রাজপাট নামক দেশে পৌছাল। সুন্দর দেশ রাজপাট। সেখানকার মহল, বন আর উদ্যান দেখে যুবরাজ মুগ্ধ হোল।
    সেই নগরে ঘুরতে ঘুরতে সুশীলকুমার হঠাৎ দেখতে পেল এক বিরাট প্রাচীর। দ্বারপালককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে সেটা রাজকুমারী শালিনীর নিজস্ব উদ্যান। সেই উদ্যানে কোন পুরুষের ঢোকা নিষেধ।
    কিন্তু সুশীলকুমারের ভীষণ ইচ্ছা করল সেই উদ্যানে ঢোকার। সে উঁচু দেয়ালের চারদিক একবার ঘুরে দেখে পেছন দিক থেকে লাফ দিয়ে সেই উদ্যানে ঢুকল। সেই উদ্যান সত্যি ইন্দ্রের নন্দনকাননের চেয়ে সুন্দর ছিল। সুশীলকুমার কিছুক্ষণ ধরে উদ্যানের বিভিন্ন গাছ এবং ফুল অার ফল দেখে অবাক হয়ে গেল। শেষে একটি গাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতে লাগল। কাছের একটি সাপের ভিপির গর্ত থেকে এক জাত-সাপ বেরিয়ে ফণা তুলে সুশীলকুমারের সামনে দুলতে থাকে। অত বড় সাপ দেখেই সুশীলকুমার বাঁশি বাজানো বন্ধ করে দেয়। পরক্ষণেই ঐ সাপ তাকে ছোবল মেরে পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মুখ লীল হয়ে গেল। সুশীলকুমার অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল সেই স্থানে।
    সুশীলকুমারের বাঁশির আওয়াজ ঐ উদ্যানের ক্রীড়াভবন থেকে রাজকুমারী শালিনী শুনতে পায়। কোথায় কে বাঁশি
বাজাচ্ছে দেখার জন্য সে পথে কয়েকজন সখীদের নিয়ে ঐ ভবন থেকে বেরুল।
    রাজকুমারী কাছে গিয়ে দেখে এক যুবক অজ্ঞান হয়ে হাতে বাঁশি নিয়ে পড়ে আছে। শালিনী তার চিকিৎসা করাল। তাকে ক্রীড়া ভবনে নিয়ে গেল। সেখানে চারদিন তাকে গোপনে রেখে তাকে ভালভাবে সারিয়ে তুলল। .
    রাজকুমারী নিজস্ব উদ্যানে ঢোকাই সুশীলকুমারের এক মস্ত বড় অপরাধ। রাজা অথবা তার পরিষদ কেউ জানতে পারলে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। সেই জনাই রাজকুমারী তাকে নিজের ক্রীড়াভবনে গোপনে রেখে সখীদের সাহায্যে চিকিৎসা করালো। তারপর রাজকুমারী জানতে পারল সেই যুবকের পরিচয়। সে এক দেশের যুবরাজ। কথাবার্তায় আচার আচরণে তার ব্যবহার দেখে রাজকুমারী মুগ্ধ হয়। তাদের দুজনের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অবশেষে ওরা শপথ করল পরস্পরকে বিয়ে করবে।


    তারপর সুশীলকুমার গোপন পথে উদ্যানের বাইরে গিয়ে নিজের আস্তানায় গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি ফিরে এলো।
    যুবরাজের ফেরার পর রাজা খুব খুশী হলেন। মন্ত্রীকে ডেকে যুবরাজের যোগ্য কণে খোঁজ করার নির্দেশ দিলেন। সুশীলকুমার কিন্তু বাবাকে জানায় নি যে সে ইতিমধ্যেই এক রাজকুমারীকে বিয়ে করার কথা দিয়েছে। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিয়ের কথা বলতে তার ভীষণ সঙ্কোচ হচ্ছিল। অার একটি কারণ হল তার বাবা যদি একবার ঐ রাজকুমারী শালিনীর সাথে বিয়ে হবে না বলে আর কোন ক্ৰমেই তাকে রাজী করানো মাবে না!
    তারপর যখন সে জানতে পারলে যে বাবা তার জন্য কনে খুঁজতে মন্ত্রীকে বলেছেন তখন সে খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে একটা ঘরে চুপচাপ বসে থাকত।
    তার শরীর ভেঙ্গে পড়ছিল। মন্ত্রীপুত্র দেবদত্ত সুশীলকুমারের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল। সবার আগে সেই বুঝতে পেরেছিল সুশীলকুমারের মনের অবস্থা।
    নানান কথার পরে দেবদত্ত জানতে পারল সুশীলকুমারের ঐ উদ্যানে যাওয়ার কথা। রাজকুমারীকে বিয়ে করার শপথের কথা। রাজকুমারের অসহায় অবস্থার কথা!
    “যুবরাজ, কিচ্ছু ভেবোনা। তেমন যদি দরকার পড়ে তো আমাদের দরবারী জাদুকরের সাহায্যে এমন এক উপায় বের করব যাতে তোমার বিয়ে ঐ রাজকুমারীর সাথেই হয়।” এই কথা বলে দেবদত্ত রাজকুমার সুশীলকুমারকে আশ্বাস দেয় ।
    কয়েকদিনের মধ্যেই নানান দেশের রাজারা সুশীলকুমারের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে দূত পাঠাতে থাকে। ঐ রাজাদের মধ্যে শালিনীর বাবাও ছিলেন।
    কিন্তু রাজা এবং মন্ত্রী দেখে শুনে যে তিন চার জন কনেকে ঠিক করলেন তাদের মধ্যে শালিনী নেই। এই কথা দেবদত্ত বাবার কাছে জেনে নেয়। তখন দেবদত্ত ভেবে ঠিক করল সুশীলকুমারের ইচ্ছা পূরণ করতে হলে এমনি কাজ হবেনা। জাদুর সাহায্যেই কাজ সারতে হবে।
    রাজা মন্ত্রীকে বললেন, "মস্ত্রীবর, আমরা যে রাজকুমারীদের বাছাই করেছি তাদের ঠিকুজী জানিয়ে জ্যোতিষীকে দেখানো দরকার।"
    “মহারাজ, তার আগে যুবরাজের মতামত বোধহয় জেনে নেওয়া ভাল।” মন্ত্রী বুঝিয়ে বলল।
    “আমার মতই আমার ছেলের মত। সে আমার মুখের উপর কথা বলবেন। আপনি আপনার কাজে এগোতে পারেন।" বলল রাজা । রাজা বাচ্চা বয়স থেকেই ছেলেকে মনের মত করে গড়ে নিয়েছেন।
    “কথাটা সত্য। কিন্তু এতো কোন রাজনীতির ব্যাপার নয়। বিয়ে ব্যাপারটা যতই হোক যুবরাজের নিজের সমস্যা। আপনি অনুমতি দিলে আমি তার মতামত জেনে নিতে পারি।” মন্ত্রী বলল।
    “ঠিক আছে। তাই করুন।” রাজা বললেন।
    দেবদত্ত অনেকক্ষণ ধরে সুশীলকুমারকে বুঝিয়ে রাজার কাছে নিয়ে এলো।
    “আমার হাদয়-ফলকে যে তরুণীর নাম আঁকা আছে তার সাথেই আমার বিয়ে করান।” সুশীলকুমার বলল।
    “কার নাম আঁকা আছে বল, তুমি যার নাম বলবে আমি তার সাথে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারি।” মন্ত্রী বলল।
    “আমি জানলে তো বলব। আমি জানিনা তার নাম। আপনারাই চেস্টা করে জানার চেস্টা করতে পারেন।” সুশীলকুমার বলল ।
    “তা কি করে সম্ভব যুবরাজ?” মন্ত্রী নিরাশ হয়ে প্রশ্ন করল।
    কথার পিঠে দেবদত্ত বলল, “হৃদয়ের কথা ইচ্ছে করলে জানা যায় বলে আমাকে জাদুকর মায়াধর জানিয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করব?”
    এই কথায় মন্ত্রী দরবারী জাদুকর মায়াধরকে ডেকে পাঠাল। তাকে সব কথা জানিয়ে বলল, “আমাদের যুবরাজের হাদয়-ফলকে কোন কনের নাম খোদাই করা আছে তা যুবরাজ যদি নিজে না জানে, অন্যের পক্ষে জানা কি সম্ভব?"
    মায়াধর স্বাভাবিক ভাবে হেসে বলল, “যোগবলে জানা যায়। যুবরাজকে আমার কাছে একটি রাত রাখতে হবে। তারপর আমি তার হাদয়-ফলকের লিখন সভার সমক্ষে দেখাতে পারব। কিন্তু যে কনের নাম বুকে ফুটে উঠবে সেই কনের সাথেই বিয়ে দেওয়া উচিত। তা না হলে যুবরাজের পাগল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। আপনি এবং রাজা যদি রাজী থাকেন তো আমি কাজ শুরু করব। আশা করি, আজ্ঞা দিবেন।”
    মায়াধরের কথা শুনে রাজার মনে যুগপৎ সন্দেহ এবং বিস্ময় জাগে। কিন্তু রাজা ভাবলেন, যোগের ফলে কি হবে কে জানে, আগে দেখা যাক কি ভাবে কি করে এই জাদুক । এইসব ভেবে রাজা মত দিলেন।
    একটি রাত সুশীলকুমার জাদুকরের ঘরে কাটাল। পরের দিন তাকে দরবারে আনা হোল। মন্ত্রী সমস্ত রাজকুমারীদের নাম জোরে জোরে পড়ে ঐ নাম লেখা কাগজ জাদুকরের হাতে দিল। জাদু দেখার জন্য সবাই হা করে বসে আসে। জাদুকর ঐ কাগজ একটি থালায় রেখে সেই কাগজ পোড়াল। সেই ছাই নিজের হাতে রগড়াল। তারপর যুবরাজের নগ্ন বুকে সেই ছাই মাখা হাত ঘষল। শীঘ্রই যুবরাজের বুকে শালিনী নাম ফুটে উঠল। সভার সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ়। পরক্ষণেই সভার সবাই সরব হোল।
    “বাকী কাজ আপনার করুন" বলে জাদুকর নিজের আসনে বসল।
    রাজা শালিনীর সাথে যুবরাজের বিয়ে দিয়ে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন। বিয়ের রাতে যুবরাজ শালিনীকে একটি সাবান উপহার দিল ।


    “এ আবার কেমনতর উপহার। এর চেয়ে দামী জিনিস আপনি পাননি?" শালিনী আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
    “এই সাবানের সাহায্যেই আমি তোমাকে বিয়ে করতে পেরেছি। জাদুকর মায়াধর এই সাবান দিয়েই তোমার নাম আমার বুকে লিখে তার উপর কায়দা করে ছাই ঘষে তোমার নাম ফুটিয়ে সভার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল। এই ভাবে কৌশল করে তোমাকে বিয়ে না করলে বাবা হয়তো তোমার সাথে আমার বিয়ে দিতেন না।” সুশীলকুমার বললে !
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য