নিজের জীবন

    বীরবলের বুদ্ধি এবং জ্ঞানের পরীক্ষার জন্য বাদশা মাঝে মাঝে এমন এক-একটা কঠিন প্রশ্ন করতেন যে, তা কোনও পণ্ডিত লোকেরও জ্ঞানের বাইরে। কিন্তু বাদশা ভেবে অবাক হতেন যে, সেইসব প্রশ্নের উত্তর বীরবল খুব সহজেই দিয়ে দিতেন । এমনি একবার এক কঠিন প্রশ্ন করলেন বাদশা, ‘বলো তো বীরবল, খোদার দেওয়া এইসব অসংখ্য প্রাণীদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোনটি?’
    অন্য যে কেউ এই প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে যেত কিন্তু বীরবল এর জন্য একটুও ঘাবড়ালেন না। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘কেন জাঁহাপনা, এ তো অতি সহজ কথা, সব প্রাণীর কাছেই তার নিজের জীবনই সবচেয়ে প্রিয়।’
    বীরবলের উত্তর শুনে বাদশা দ্বিধায় পড়লেন। তার এতদিন ধারণা ছিল সন্তানের চেয়ে আপন আর বোধহয় কেউ নেই। নিজের জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করে যে কোনও প্রাণী, সে মানুষ বা জন্তু-জানোয়ার যেই হোক না কেন, তার সন্তানকে বাঁচাতে চায়।
    বাদশা বললেন, ‘দেখো বীরবল, এ ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। তোমাকে আমি সময় দিলাম, এর সত্যতা তোমাকে প্রমাণ করতে হবে।’
    ‘জাঁহাপনা, আপনার এই অধম প্রমাণ ছাড়া কোনও কথা বলে না, তা আপনি ভালই জানেন, আগামীকালই এর সত্যতা আপনাকে প্রমাণ করে দেব।’
    পরদিন বীরবল বাদশা এবং তার পাত্র-মিত্রদের নিয়ে বাদশার নিজস্ব চিড়িয়াখানায় গিযে ঢুকলেন।
    ঘুরতে ঘুরতে একসময় দেখতে পেলেন একটা মা-বাঁদর তার দুটি বাচ্চাকে পরম আদরে দুধ খাওয়াচ্ছে।
    বীরবল মা-বাঁদরের কোল থেকে বাচ্চা দুটোকে ছিনিয়ে নিয়ে পাশের একটা গভীর গর্তের মধ্যে ফেলে দিলেন।
    বাদশা এই অমানুষিক ব্যবহারে ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, এ কী করলে বীরবল, এমন নিষ্ঠুর আচরণ তোমার কাছ থেকে আমি আশা করি নি।’
    বীরবল বাদশাকে চুপ করে থাকতে বলে ব্যাপারটা দেখার জন্য অনুরোধ করে সেই শূন্য গর্তের মধ্যে জল ঢালতে লাগলেন। গর্ত জলে ভরে আসছে দেখে আতঙ্কে মা-বাদর বাচ্চা দুটােকে কোলের মধ্যে দুই হাত দিয়ে জাপটে
ধরে রাখল। জল যখন ক্রমেই গর্তটাকে প্রায় ভরে ফেলল তখন বাঁদরটা তার প্রিয় সন্তান দুটিকে বাঁচাবার জন্য তার মাথার ওপর তাদের তুলে রাখল, যাতে সস্তান দুটি জলের হাত থেকে বাঁচতে পারে।
    বাদশা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন বীরবলের এসব করার উদ্দেশ্য। তিনি ব্যাপারটায় বেশ উৎসাহ বোধ করলেন।
‘দেখো বীরবল মা তার সন্তানদের বাঁচাবার জন্য নিজের জীবনকেও কীভাবে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। সে কিন্তু নিজের বাঁচার জন্য কোনও চেষ্টাই করছে না। এরপরও বলবে তোমার কথাই ঠিক ?’
    বাদশার কথায় বীরবল মৃদু হাসলেন, যেন বললেন, ‘তিষ্ট ক্ষণকাল। তিনি তখনও জল ঢেলেই চলেছেন। তারপর বাদশাকে বললেন, জাঁহাপনা, নাটকের শেষ দৃশ্য এখনও বাকি। শেষ দৃশ্যে প্রমাণ হবে কার কথা সত্য।
    জল যখন মা-বাঁদরটিকেও ডুবিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছে তখন মা-বাঁদরটি বুঝতে পারল তার নিজের জীবন বিপন্ন। এবার সে সন্তান দুটিকে জলের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিয়ে গর্তের ওপরে ওঠার জন্য হাকপাক করতে লাগল।
    বাদশা বুঝলেন বীরবলের কথাই ঠিক। নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয় আর কিছুই নেই।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য