পাঁচটা কমলা-বিচির ভয়ংকর কাহিনি [দ্য ফাইভ অরেঞ্জ পিপল ] | শেষ অংশ |

     ‘হর্সহ্যামে আসছেন ?’
     ‘না। রহস্যের চাবিকাঠি হর্সহামে নেই— লন্ডনে রয়েছে। এখানেই কিনারা করব।’
     ঠিক আছে। দু-একদিনের মধ্যেই বাক্সের খবর দিয়ে যাব আপনাকে।
     হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিল যুবাপুরুষ। বাইরে তখন দামাল ঝড় আর পাগলা বৃষ্টির তাণ্ডব নাচ চলছে। খটখট ঝমাঝম শব্দ শোনা যাচ্ছে জানলায়।
     আগুনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ নিশচুপ হয়ে বসে রইল শার্লক হোমস। তারপর তাম্রকুট সেবন করে চলল শিবনেত্র হয়ে।
      শেষকালে বললে, ‘ওয়াটসন, “সাইন অফ দি ফোর” মামলার পর এ-রকম ভয়ংকর বিচিত্র মামলা আর হাতে আসেনি আমার।’
     ‘জন ওপেন-শ-র মাথায় কোন বিপদের খাড়া ঝুলছে বলো তো?
     'ভায়া, যুক্তিবিদ্যায় তাকেই পারঙ্গম বলব যে ঘটনা-শৃঙ্খলের একটা আংটা দেখেই শৃঙ্খলের শেষ পর্যন্ত আঁচ করতে পারে। অস্থিবিদ্যায় যিনি পণ্ডিত, তিনি যেমন কঙ্কালের একটা হাড় দেখেই সব হাড়ের বর্ণনা দিতে পারেন— এও তেমনি একটা উঁচুদরের আর্ট। এ-আর্টে বড়ো আর্টিস্ট হতে হলে দরকারি সব খবর মগজে জমিয়ে রাখা দরকার। মার্কিন বিশ্বকোষের “K’’ খণ্ডটা তাক থেকে নামাও । এবার ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা যাক। কর্নেল ওপেন-শ আমেরিকা ছেড়ে হঠাৎ চলে এলেন কেন? ইংলন্ডের পল্লিঅঞ্চলে নির্জনবাস শুরু করলেন কেন? বাড়ি ছেড়ে বেরোনো বন্ধ করলেন কেন? নিশ্চয় কারো ভয়ে— তাই নয় কি? ভয়টা কী ধরনের, এই চিঠিগুলো থেকেই আঁচ করা যায়। পোস্ট অফিসগুলোর ছাপ মনে আছে?’
      ‘প্রথমটা পণ্ডিচেরির, দ্বিতীয়টা ডান্ডির, তৃতীয়টা পূর্ব লন্ডনের। 
     ‘এ থেকে কী আন্দাজ করা যায় ?’
     ‘সবগুলোই তো দেখছি জাহাজঘাটা। চিঠির লোক জাহাজে বসে চিঠি লিখেছে। ‘অপূর্ব। এই তো বেরিয়ে গেল একটা সূত্র। এবার দেখো আর একটা ইঙ্গিতময় ব্যাপার। পন্ডিচেরি থেকে হুমকি দিয়ে খুন করতে সময় লেগেছে সাত সপ্তাহ। কিন্তু ডান্ডি থেকে হুমকি দিয়ে খুন করেছে মাত্র তিন চার দিনে। বলো কী বুঝলে এ থেকে?
      ‘আসতে সময় লেগেছে।’
     ‘চিঠিকেও তো সেই পথেই আসতে হয়েছে।
     ‘তাহলে ?’
     'ভায়া, হুমকি যে দিয়েছে, সে এসেছে এমন একটা জাহাজে যে-জাহাজ চিঠি-বওয়া জাহাজের চেয়ে আস্তে চলে। মানে, পাল তোলা জাহাজ। চিঠি এসেছে কলে-চলা জাহাজে?
      ‘তা হতে পারে।’
      ‘হতে পারে না, তাই হয়েছে। ওপেন-শকে এই কারণেই পইপই করে হুশিয়ার করলাম— জীবন তার সত্যিই বিপন্ন।কেন জান ? ওর চিঠিটা এসেছে পূর্ব-লন্ডন থেকে। তার মানে আর সময় নেই।’
      সর্বনাশ! কিন্তু এই অমানুষিক অত্যাচারের কারণটা কী বলতে পার?
      কারণ ওই কাগজপত্র। এই হুমকি আর খুনের পেছনে একজন নেই– অনেকজন আছে। চিহ্ন বা প্রমাণ না-রেখে এইভাবে পর-পর দুটাে খুন করা আনাড়ি বা বোকার পক্ষে সম্ভব হয় না। এরা গোয়ার, বুদ্ধিমান, ধনবান। বাক্সের কাগজপত্র তারা ফিরে চায়— যার কাছেই থাকুক না কেন। কাজেই K.K.K. অক্ষর তিনটে কোনো বিশেষ একজনের নামের আদ্যক্ষর নয়— একটা সংস্থার নাম।
     ‘কী সংস্থা?”
     ঝুঁকে পড়ল হোমস।
     বলল, ‘ওয়াটসন, কু-ক্লুক্স -ক্ল্যানয়ের’ নাম কখনো শুনেছ?
     ‘না।’
     বিশ্বকোষের পাতা উলটােল বন্ধুবর।
     বলল, “এই দেখো কু ক্লুক্স ক্ল্যান! আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রিগার টেপবার সময় একরকম ধাতব শব্দ হয়— তার সঙ্গে মিল রেখেই এই নামের সৃষ্টি। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের পর পতন ঘটে ভয়ংকর এই সংস্থাটির। উদ্দেশ্য নিগ্রো হয়েও যারা ভোট দিতে চায়, তাদের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা। যাকে দেশ থেকে তাড়াতে অথবা খুন করতে চাইত তার কাছে আগে হুমকি পাঠানো হত অদ্ভুত চিহ্ন মারফত। কখনো কমলা-বিচি, কখনো তরমুজ-বিচি, কখনো ওক-গাছের পাতা। হুমকি চিহ্ন পেয়ে যারা তোয়াক্কা করত না, অদ্ভুতভাবে তাদের সরিয়ে দেওয়া হত ধরাধাম থেকে। অনেক চেষ্টা করেও দমন করা যায়নি সংস্থাটিকে — আকাশে বজ্রের মতোই এরা ছিল ভয়ংকর আর অমোঘ। ১৮৬৯ সালে সংস্থাটি আচমকা টুকরো টুকরো হয়ে যায়— কারণ জানা যায়নি। মাঝে মাঝে অবশ্য মাথা চাড়া দিয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে।
      বিশ্বকোষ বন্ধ করে হোমস বললে, ‘কর্নেল ওপেন-শ আমেরিকা থেকে চলে আসেন ১৮৬৯ অথবা ৭০ সালে সংস্থাটি ভেঙেছে ১৮৬৯ সালে। এ থেকে কি বোঝা যায় না যে তিনিও এর মধ্যে ছিলেন এবং সংস্থার অনেকের নামধাম সমেত কাগজপত্র নিয়ে পালিয়ে এসে ঘাপটি মেরেছিলেন ইংলন্ডে? নিশ্চয় ওদেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির রাতের ঘুম ছুটে গেছে সেইদিন থেকে— কাগজ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে তখন থেকেই।’
      ‘আমরা যে-পাতাটা ছেড়া দেখলাম—’
     ‘ডায়েরির পাতা। খুন আর হুমকির রেকর্ড। আজ আর কথা নয় ওয়াটসন। বেহালাটা দাও, এই জঘন্য আবহাওয়া আর তার চাইতে জঘন্য মানুষ জাতটাকে ভুলে-থাকা যাক।
     সকাল বেলা আকাশ অনেকটা পরিষ্কার হল। সূর্য স্নান মুখে উকি দিল কুয়াশা ফুঁড়ে। ঘুম থেকে উঠে দেখি প্রাতরাশ খাওয়ার টেবিলে আগেই হাজির হয়েছে হোমস।
      আমাকে দেখেই বললে, ‘ওহে, আজ থেকেই ওপেন-শ মামলার তদন্ত শুরু করব— এই লন্ডন শহরেই।’
     সেদিনকার সদ্য-আসা খবরের কাগজখানা তুলে নিয়ে বললাম, কীভাবে? 
     ‘দেখি খোঁজখবর নিয়ে।’ 
     হঠাৎ চোখ পড়ল দৈনিকের একটা শিরোনামায়। রক্ত হিম হয়ে গেল আমার। আঁতকে উঠে বললাম, ‘হোমস— হোমস— বড্ড দেরি করে ফেললে!’ 
     ‘তাই নাকি! হাতের কাপ টেবিলে নামিয়ে রাখে হোমস। কণ্ঠস্বর সংযত, কিন্তু মুখভাব দেখে বুঝলাম ভেতরে তার কী আলোড়ন শুরু হয়ে গেল।
     ‘কাল রাতে ওয়াটারলু ব্রিজে হঠাৎ একটা চিৎকারের সঙ্গেসঙ্গে ঝপাং করে একটা শব্দ শোনা যায়। কনস্টেবল দৌড়ে যায় জলের ধারে। লোক নামিয়েও তখন তাকে পাওয়া যায়নি। পরে জলপুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে। পকেটের মধ্যে একটা খাম ছিল। তা থেকেই জানা যায়, তার নাম জন ওপেন-শ। বাড়ি হর্সহ্যামের কাছে। পুলিশের বিশ্বাস, শেষ ট্রেন ধরার জন্যে ধড়ফড় করতে গিয়ে অন্ধকারে আর জল-ঝড়ে পথ হারিয়ে নদীর পাড়ে চলে যায়। সেখানেই পা ফসকে পড়ে গেল জলে। দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি।’
     চোখ তুলে শার্লক হোমসের মুখের চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কথা বলতে পারলাম না কিছুক্ষণ। এভাবে তাকে ভেঙে পড়তে কখনো দেখিনি আমি।
     তারপর আর বসে থাকতে পারল না চেয়ারে। অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল ঘরময়। মুখ লাল, আঙুল অস্থির— ক্রমাগত হাত মুঠো করছে আর খুলছে।
      আর বলছে, ‘বাঁচবার জন্যে এসেছিল আমার কাছে— কিন্তু আমিই তাকে মৃত্যুর হাতে তুলে দিলাম। ধড়িবাজ শয়তানের দল! ব্রিজের ওপর লোক ছিল বলে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে জলের ধারে নদীর পাড়ে— কিন্তু কীভাবে সেটা বুঝছি না! ঠিক আছে, দেখা যাক কে হারে কে জেতে!— চললাম ওয়াটসন।’
     ‘কোথায়? পুলিশের কাছে? 
    ‘পুলিশ। আমিই আমার পুলিশ। সারাদিন ডাক্তারি নিয়ে কাটালাম। হোমস ফিরল রাত দশটা নাগাদ। চোখ-মুখ উদ্রাস্ত, যেন একটা ঝোড়ো কাক। একটা শুকনো রুটি নিয়ে জলে ভিজিয়ে গিলতে লাগল কোৎকোৎ করে। বলল, সকালে সেই যে খেয়েছি— পেটে আর কিছু পড়েনি। খাবার কথা মনেও ছিল না। 
     ‘রহস্যের সমাধান হল?” ‘অনেকটা হয়েছে। শয়তানগুলোকে কবজায় এনেছি, এবার হুমকি পাঠাব ওদেরই রীতিতে। ওপেন-শ’দের খুন করার বদলা এবার নেব।’
     বলতে বলতে একটা কমলালেবু নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে ফেলল হোমস। কোয়ার মধ্যে থেকে পাঁচটা বিচি নিয়ে ভরল একটা খামে। ভেতরের ভাঁজে লিখল 'শা.হো, পাঠাচ্ছে জে.কা.কে’।
     খামের মুখ এঁটে ওপরে লিখল :
     ক্যাপ্টেন জেমন কালহাউস,‘লো০স্টার’ জাহাজ, স্যাভানা, জর্জিয়া।
     শুকনো হেসে বলল, ‘জাহাজঘাটায় এসেই পাবে এই চিঠি। ওপেনশ-দের মতো ওকেও ভয়ে উৎকণ্ঠায় অর্ধেক হয়ে যেতে হবে। শয়তান কোথাকার।’
     ‘কালহাউন লোকটা কে, হোমস ?’ 
     ‘পালের গোদা, নাটের গুরু। চক্রান্ত এর স্যাঙাৎরাও করেছে, লজ্জায় আনব প্রত্যেককেই ’ পকেট থেকে এক তাড়া কাগজ বার করে দেখাল আমাকে। কাগজ ভরতি কেবল নাম আর তারিখ ।
     পুরানো ফাইল আর দলিল ঘেঁটে, কাটিয়েছি সারাদিন। ১৮৮৩ সালের জানুযারি আর ফেব্রুয়ারিতে পন্ডিচেরিতে নোঙর ফেলেছিল অনেকগুলো পালের জাহাজ। তার মধ্যে একটা জাহাজের নাম যুক্তরাষ্ট্রের একটা রাষ্ট্রের নামানুসারে— লোন-স্টার।’
      ‘তারপর?’ 
    ‘ডান্ডিতে ১৮৮৫ সালের জানুয়ারিতেও এই লোন-স্টার নোঙর ফেলেছিল দেখে নিঃসন্দেহ হলাম। খোঁজ নিলাম লন্ডন বন্দরে। হ্যাঁ, এখানেও এসেছে লোন-স্টার। তৎক্ষণাৎ গেলাম জাহাজঘাটায়। শুনলাম সকালে রওনা হয়েছে স্যাভানার দিকে— মানে, দেশে ফিরছে।’
     ‘অতএব!’ 
    ‘টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছি স্যাভানায়— পুলিশ ওত পেতে থাকবে। কলের জাহাজে আমার এই চিঠিও ওদের পাল তোলা জাহাজের আগে পৌছে যাবে। ক্যাপ্টেন কালহাউন আর তার দুজন সহকারীই কেবল আমেরিকার লোক— বাদবাকি সবাই অন্য দেশের খালাসি। কাল রাতে এই তিনজন জাহাজে ছিল না— সে-খবর নিয়েছি! কাজেই ওপেন-শ-কে খুনের অপরাধে ত্রিমূর্তিকে গ্রেপ্তারের জন্যে পুলিশ তৈরি হয়েই থাকবে স্যাভানায়।
     কিন্তু হায় রে কপাল। নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম। কুচক্ৰী কালহাউন কোনোদিনই জানতে পারেনি তার চাইতেও ধুরন্ধর এক ব্যক্তি ধরে ফেলেছে তার শয়তানি। পাঁচটা কমলাবিচি কোনোদিন তার হাতে পৌছোয়নি। সে-বছরের সেই দামাল ঝড় সমুদ্রের বুকে যে তাণ্ডব নাচ নেচেছিল, তার খপ্পর থেকে রেহাই পায়নি পালতোলা জাহাজ লোন-স্টার। বিধ্বস্ত একটা খোলকে ঢেউয়ের ডগায় ভাসতে দেখা গিয়েছিল কেবল— গায়ে লেখা ছিল— লোন-স্টার!
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য