সুতোরস্তু | পর্ব-শেষ | -- মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    এর মাঝে আমার ছোট খালার বিয়ে উপলক্ষে বাসার সবাই দল বেঁধে নেত্রকোন চলে গেল। রয়ে গেলাম আমি এবং জিতু মিয়া। জিতু মিয়া কাজের ছেলেটি, বয়স দশের কাছাকাছি। মহা ধুরন্ধর ব্যক্তি, সুযোগ পেলে জাতীয় পরিষদের মেম্বার হয়ে যাবে সেটা আমি লিখে দিতে পারি। সেদিন সন্ধেবেলাবাসায় ফিরতেই জিতু মিয়া একগাল হেসে বলল, বাই, আফনে লাটকের চান্দা দেন নাই মনে আছে? 
    বাই মানে ভাই, লাটক মানে নাটক-আমার একটু চিন্তা করে বের করতে হল। কিছুদিন আগে গুণ্ডা ধরনের কিছু ছেলে নাটক করবে বলে চাঁদা চাইতে এসেছিল। অপরিচিত ছেলে, তাই কী নাটক, কোথায় হবে, কে পরিচালনা করবে এসব নিয়ে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম। তখন একজন গরম হয়ে গেল বলে পুরো দলটাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলাম। বাসার সবার ধারণা কাজটা সুবিবেচনার হয় নি। আমি একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? কী হয়েছে?
    আফনের গরে গিয়া দেহেন বাংলায় অনুবাদ করলে যার অর্থ—আপনার ঘরে গিয়ে দেখেন।
    আমি আমার ঘরে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ঘরের দেয়ালে মৃত প্রাণীর নাড়ির্ভুড়ি ছুড়ে ছুড়ে মেরেছে। কিছু এখনো দেয়ালে লেগে আছে,কিছু দেয়াল থেকে খুলে নিচে পড়েছে। দেয়ালে বীভৎস রং, ঘরের ভিতর উৎকট দুর্গন্ধ। আমি রাগে প্রায় অন্ধ হয়ে গেলাম। হাতের কাছে জিতুকে পেয়ে তাকেই দু-এক ঘা লাগানোর জন্যে হুঙ্কার দিয়ে বললাম, জানালা খুলে রেখেছিলি কেন?
    খুলি নাই বাই! খোদার কসম । তা হলে ? 
   জানালা বন্ধ থাকা অবস্থায় কেমন করে দেয়ালে এগুলি ছুড়ে মারা যায় সেটা নিয়ে জিতু মিয়াকে ভাবিত দেখা গেল না। থাটি রাজনীতিবিদদের মতো সে সমস্যার সামনাসামনি এলে মস্তিষ্ক সুইচ টিপে বন্ধ করে দেয়।
    একজন লোক ডাকিয়ে সময় লাগিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করা হল। আজকালকার ছেলেরা এরকম নোংরা কাজ করতে পারে, নিজের চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতাম না।
    রাতে খেতে বসার পর জিতু মিয়া আমাকে দ্বিতীয় খবরটি দিল। বলল, আম্মার মশা মারণের ওষুধ একেবারে
ফাস কেলাশ।
    মা মশা মারার ওষুধ কিনেছেন সেটা মশাদের বিরুদ্ধে খুব কার্যকর শুনে আমি শঙ্কিত হয়ে উঠলাম। যেটা মশার জন্যে বিষাক্ত সেটা মানুষের জন্যেও বিষাক্ত। বিদেশে যেসব কীটনাশক ওষুধ বাজেয়াপ্ত করে দেয়া হয়েছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এ দেশে পাঠানো হয়। আমি জিতু মিয়াকে বললাম, নিয়ে আয় তো মশা মারার ওষুধটা। সাবধানে ধরবি।
    জিতু মিয়া স্টোর রুম থেকে ফিনাইলের একটা কৌট নিয়ে এল। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এটা মশা মারার ওষুধ ?
    জ্বে
    এটা দিয়ে মশা মারা হচ্ছে?
    জ্বে। বাসায় কুনো মশা নাই।
    কোনো মশা নেই?
    না বাই।
   আমার বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। আনিস বলেছিল, সুতোরস্তু যখন আসবে তখন বাসায় কোনো কীটপতঙ্গ পশুপাখি থাকবে না।
আমি দেয়ালের দিকে তাকালাম ; লাইটের কাছে একটা পুরুষ্ট টিকটিকি পোকা ধরে খায়। আজ পোকাও নেই, কোনো টিকটিকিও নেই। আলমারির কোনায় মাকড়সার জালে কিছু নিরীহ মাকড়সা থাকে, সেখানেও কিছু নেই। আমি জিতুকে বললাম,জিতু,স্টোররুমে কি তেলাপোকা আছে ?
    তেউল্যাচুরা?
    হাঁ।
    আছে বাই। ক্যান ?
    একটা ধরে আনতে পারবি?
    মনের মতো একটা কাজ পেয়ে জিতু মিয়ার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কী বলেন বাই! পারুম না ক্যান!
    জ্যান্ত ধরে আনতে হবে কিন্তু ।
   দীর্ঘ সময় জিতু মিয়া স্টোররুমে জিনিসপত্র টানাটানি করে মুখ কালো করে ফিরে এল। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, স্টোররুম অাঁতিাঁঁতি করে খুঁজেও সে কোনো তেলাপোকা পায় নি। আমিও ঘরের আনাচেকানাচে খুঁজে দেখেছি কোনো ধরনের পোকামাকড় কীটপতঙ্গ কিছু নেই। সব যেন ম্যাজিকের মতো উবে গেছে। তবে কি আনিসের কথাই সত্যি? সুতোরস্তু আসছে আজ রাতে? একটা প্রাণ নিয়ে যাবে? আমার? জিতুর ?
    আমার সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠল হঠাৎ।
    রাত এগারটায় আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম। ঘরে ঢুকেই আমি চমকে উঠি । দোয়ালে ছোপ ছোপ রক্ত কোথা থেকে এল? সারা ঘরে বাসি রক্তের একটা বেঁটক গন্ধ। শুধু তাই নয়, ঘরের ভিতরটা কেমন যেন ঠাণ্ডা, শরীর শিউরে ওঠে। আমি ঘরের মাঝখানে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
   যখন ইলেকট্রিসিটি চলে যায় যায় করে ফিরে আসে, তখন এরকম হয়। কিন্তু আজ পরিষ্কার আকাশ! যদি ইলেকট্রিসিটি সত্যি চলে যায়, তখন কী হবে? বাসায় কোথায় যেন একটা টর্চলাইট আছে, সেটা এখন নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ বাসায় কোনো জিনিসপত্র ঠিক জায়গায় রাখা হয় না, দরকারের সময় জিনিস খুঁজে পাওয়ার ঘটনা এ বাসাতে এখনো ঘটে নি। সিগারেট খাই বলে পকেটে ম্যাচ থাকে। এখন সেটাই একমাত্র ভরসা।
    ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই আমি হঠাৎ শুনলাম শো-শোঁ করে বাতাসের শব্দ হল, তারপর হঠাৎ সবগুলি জানাল দড়াম করে খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল। ভয়ানক চমকে উঠলাম আমি—আর জীবনে প্রথমবার ভয় পেলাম। মনে হল আমার পিছনে ভয়াবহ কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে, এক্ষুনি আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার কণ্ঠনালি ছিঁড়ে নেবে।
    তা হলে সত্যিই সুতোরস্তু আসছে? আমি বসার ঘরে এসে দেখি সেখানে জিতু মিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি কেমন জানি বিভ্রান্ত। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে জিতু?
    বাই, বাসাড়া কাফে ক্যান? 
   কাঁপে? 
    জে বাই, কাফে। আমার কেমুন জানি ডর করে বাই। 
   তাহলে আমি এক নই, জিতুও ব্যাপারটা টের পেয়েছে। কিছু একটা হচ্ছে এই বাসায়। আনিসের কথা মনে পড়ল, সুতোরস্তু এসে একটা প্রাণ নিয়ে যাবে। সত্যি?
    আমি মানিবাগ থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে জিতুর হাতে ধরিয়ে বললাম, টাকাটা সাথে রাখ। আজ রাতে তুই বাসায় আসবি না।
    জিতু অবাক হয়ে বলল, কই যামু তাইলে? জানি না, যেখানে ইচ্ছা, কিন্তু এই বাসায় না। যা, বের হ। এক্ষুণি বের হ! মনে রাখিস কাল সকালের আগে বাসায় ঢুকবি না।
    জিতু অবাক হয়ে খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু না বলে বের হয়ে গেল।
    আমি দরজা বন্ধ করে ফিরে এসে দেখলাম খাবারের টেবিলের উপর একটা কাক মরে পড়ে আছে। আমার হঠাৎ গা গুলিয়ে বমি এসে গেল। আমি আস্তে আস্তে অনেকটা নিজের মনেই বললাম, ঠিক আছে সুতোরস্তু, তুমি এস। দেখি তুমি কী করতে চাও।
    স্টোররুমে একটা শাবল থাকে, সেটা খুঁজে বের করে আনলাম। অশরীরী প্রাণীর সাথে এটা কী কাজে লাগবে জানি না, কিন্তু একেবারে খালি হাতে কীভাবে কারো সাথে মুখোমুখি হই? বাসার আলো নিভুনিভু করছে, টর্চলাইটটা পেলে ভালো হত কিন্তু খুঁজে পেলাম না। ড্রয়ারে একটা বড় মোমবাতি পাওয়া গেল, পকেটে দেশলাই রয়েছে, সেটাই ভরসা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় বারটা, এই কালরাত কি কখনো শেষ হবে ?
    আমি বসার ঘরে দেয়াল ঘেঁষে একটা চেয়ার নিয়ে এসে বসে একটা সিগারেট ধরালাম। সিগারেটে দুটো টান দিয়েই স্নায়ু একটু শীতল হল। কী আশ্চর্য! এই বিংশ শতাব্দীতে বসে আমাকে সত্যিই অপদেবতা দেখতে হবে?
    সিগারেট খেতে খেতে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলাম। হঠাৎ একটা বিচিত্র জিনিস ঘটতে শুরু করল। সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আবছা আবছা একটা প্রাণীর রূপ নিতে শুরু করে। সত্যি দেখছি না চোখের ভুল? আমি ফুঁ দিতেই প্রাণীটা মিলিয়ে গেল, কিন্তু সাথে সাথে ঝনঝন শব্দ করে দেয়াল থেকে ফ্রেমে ঝোলানো একটা জলরঙের ছবি খুলে পড়ল, কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে। আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম, অবিশ্বাস্য ব্যাপার, হঠাৎ মনে হতে লাগল আমি ছাড়াও ঘরে আরো কেউ আছে! ভয়ানক কিছু একটা আছে।
    প্রচণ্ড আতঙ্কে আমার চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পেয়ে গেছে, অনেক কষ্ট করে আমি নিজেকে শান্ত করে রাখলাম, দেখা যাক কী হয়। আমি চেয়ারে শান্ত হয়ে বসে আস্তে আস্তে কিন্তু জোর দিয়ে বললাম, সুতোরস্তু,তুমি যাও। তুমি চলে যাও ।
    নিজের কাছে নিজের কণ্ঠস্বরটি শোনাল ভারি অদ্ভূত। আর সাথে সাথে বাসা যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। টেবিল পেয়ালা, পিরিচ, টেবিল ল্যাম্প, ঘরের শেকল ঝনঝন শব্দ করে কেঁপে উঠল, আমি দেখলাম লাইটটা ডান থেকে বামে ঝুলতে শুরু করেছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সেটা শব্দ করে ফেটে গেল, সাথে সাথে সারা বাসা অন্ধকার হয়ে গেল। ফিউজ কেটে গেছে নিশ্চয়ই।
    হা-হা-হা শব্দ করে সারা ঘরে কী যেন একটা ছুটে গেল, একটা গরম বাতাসের হলকা টের পেলাম আমি। পকেট থেকে দেশলাই বের করে একটা কাঠি জ্বালালাম কাঁপা হাতে, ঘরের অন্ধকার দূর না হয়ে যেন আরো বেড়ে গেল । আমি আবছা দেখতে পেলাম ঘরের এক কোনায় মেঝেতে গুড়ি মেরে কী যেন বসে আছে। মনে হল তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, ঝাঁপিয়ে কি পড়বে আমার উপর? আমি সাবধানে মোমবাতিটা জ্বালালাম, দপদপ করে শিখা কাঁপতে লাগল, মনে হতে লাগল নিভে যাবে যে কোনো মুহূর্তে। আমি মোমবাতিটা শক্ত করে ধরে রেখে ঘরের কোনায় তাকালাম, সত্যি কি কিছু আছে? কিছু দেখা গেল না।
    ঠকঠক করে দরজায় শব্দ হল হঠাৎ। আমি চমকে উঠলাম, পর মুহূর্তে শুনলাম জিতুর গলার স্বর। ভেউ ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, বাই, বাই গো, ও বাই
    আমি ভয় পেয়ে দরজা খুলতে খুলতে বললাম, কী হয়েছে জিতু ?
    আমার ট্যাহ!—
    দজা খুলতেই জিতু হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে বলল, আমার ট্যাহা দেয় না—
    হঠাৎ করে জিতু চুপ করে গেল। আমি ভয় পেয়ে তাকলাম, জিতু---
   জিতু কোনো কথা না বলে আমার দিকে তাকাল। মোমবাতির আলোতে হঠাৎ বিচিত্র দেখাল জিতুকে। চোখ দুটিতে আতঙ্ক, রক্তহীন মুখে যেন প্রাণের চিহ্ন নেই। আমি বললাম, কী হয়েছে জিতু ? কী হয়েছে?
    জিতু উদভ্রান্তের মতো একবার চারদিকে তাকাল। কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু বলতে পারল না। তার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আমার বুকটা ধক করে উঠল। মোমবাতির শিখাটা দপ দপ করে হঠাৎ নিভে গেল আর আমি শুনলাম একটা প্রাণফাটানো আর্তচিৎকার।
    আমি শক্ত করে জিতুকে আঁকড়ে ধরি, জিতু থরথর করে কাঁপছে, তাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না।
    জিতু—আমি চিৎকার করে ডাকলাম, জিতু—কী হয়েছে তোর ?
    জিতু কোনো উত্তর দেয় না। থরথর করে কাঁপতে কঁপতে অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মতো শব্দ করতে থাকে। মনে হয় যেন সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।
    আমার হঠাৎ আনিসের কথা মনে পড়ল। বলেছিল সুতোরস্তু একজনের প্রাণ নিয়ে যাবে। তা হলে জিতুই কি সেই একজন ?
    ঠিক তখন আমার মনে পড়ল আমার হাতের চিহ্নটার কথা। আনিস বলেছিল হাতটা বুকের কাছে ধরে রাখতে, ভয় চলে যাবে তা হলে? আমি জিতুকে শক্ত করে চেপে ধরে হাতটা জিতুর বুকের উপর চেপে ধরলাম, ফিসফিস করে জিতুর কানের কাছে বললাম, জিতু, কোনো ভয় নেই---
    বলার সাথে সাথে সত্যি সত্যি আমার ভিতর কেমন জানি সাহস ফিরে এল ; সত্যি মনে হতে থাকলো কোনো ভয় নেই। জিতুকে আঁকড়ে ধরে আবার বললাম, আমি আছি—কোনো ভয় নেই তোর।
    ঘরের ভেতর গরম বাতাসের একটা হলকা খেলে গেল একবার। দরজা—জানাল সব খুলে গেল, তারপর হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল ।
    আমি চিৎকার করে বললাম, থাম। 
    ঝনঝন করে কী একটা যেন ভেঙে পড়ল। আমি নিঃশ্বাস নিয়ে আবার চিৎকার করে বললাম, দূর হয়ে যাও এক্ষুণি ।
    কী একটা যেন আছড়ে পড়ল ঘরের মাঝে। জমাট বাধা একটা অন্ধকার হঠাৎ যেন ছুটে আসতে শুরু করে আমার দিকে। আমি জিতুকে শক্ত করে ধরে রেখে বললাম, খবরদার---
    আর কী আশ্চর্য—সেটা যেন থেমে গেল। আশ্চর্য একটা শক্তি অনুভব করলাম আমি নিজের ভিতরে। প্রথমবার আমার মনে হল এই অশরীরী শক্তি আমাকে কিছু করতে পারবে না। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললাম, যাও তুমি। দূর হয়ে যাও--
    হঠাৎ করে মন হল সুতোরস্তু সত্যিই চলে গেছে, কোনো ভয় নেই আর ।
    আমি তবু চুপচাপ বসে রইলাম। ঘরে আর কোনো শব্দ নেই, সুনসান নীরবতা।
    জিতু আস্তে আস্তে বলল, বাই ভর করে। আমি জিতুকে শক্ত করে ধরে রেখে বললাম, ভয় কী জিতু? আমি আছি না?
   জিতু হঠাৎ ফ্যাচফাচ করে কাঁদতে শুরু করল। আমি তাকে কাঁদতে দিলাম--বেচারা বড় ভয় পেয়েছে।
    হঠাৎ শুনিকানের ভিতর একটা মশাগুনগুন করছে। খোলা জানাল দিয়ে মশা ঢুকেছে ভিতরে মশার শব্দে আমি জীবনে আর কখনো এত আনন্দ পাই নি। জিতুকে নামিয়ে বললাম, আর কোনো ভয় নেই জিতু। আয় বাতি জ্বালাই এবার।
    আনিস সব শুনে বলল, তোকে বলেছিলাম মনে আছে, মানুষের চেয়ে শক্তিশালী কিছু নেই? দেখলি তো?
    আমি বললাম,কিন্তু শেষ মুহুর্তে তোর এই চিহ্নটার কথা মনে না পড়লে কী হত কে জানে। যেই বুকের কাছে ধরলাম সাথে সাথে—
    আনিস হঠাৎ হো-হো করে হাসতে শুরু করে। আমি থতমত খেয়ে বললাম, কী হল, হাসছিস কেন?
    এই চিহ্নটার অলৌকিক শক্তির কথা শুনে।
    কেন ? 
    তুই কি ভেবেছিস এটা কোনো জাদুমন্ত্র? 
    তা হলে কী? 
    এখানে লেখা স্বরে অ—স্বরবর্ণের প্রথম অক্ষর ; উল্টো করে লিখেছি, তাই ধরতে পারিস নি।
    আমি অবাক হয়ে আমার হাতের দিকে তাকালাম । সত্যিই তাই, একে উল্টো করে লিখেছে তার উপর মাত্রা দেয় নি, সে জন্যে ধরতে পারি নি। বোকার মতো আনিসের দিকে তাকলাম আমি।
    আনিস বলল, মানুষের জোর নিজের ভিতরে। বিশ্বাসটা সেই জোরকে আরো বাড়িয়ে দেয়। আমি ওটা লিখে দিয়েছিলাম যদি ওটাকে বিশ্বাস করে আরো খানিকটা জোর পাস সে জন্যে। আর কিছু না।
    আমি মুখ হাঁ করে বসে রইলাম।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য