সেয়ানা চাষী -- রাশিয়ার উপকথা

     এক যে ছিল বুড়ী। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে মারা গিয়েছিল। ছোট ছেলেও চলে গেল দুর দেশে। তারপর তিন দিনও হয়নি এক সৈনিক এসে হাজির হল বুড়ীর কাছে। বলল:
     ‘আজ রাতটার মত থাকতে দেবে, ঠাকুমা ?’ 
     ‘এসো বাছা, এসো। তা কোথা থেকে আসা হচ্ছে ?’
     ‘আমি হলুম নিখোঁজ। আসছি ঠাকুমা, সেই পরলোক থেকে।’ 
     ‘দ্যাখো দিকি চাঁদ আমার, কী আর বলি, আমার ছেলেটিও মারা গেছে। দেখা হয়নি তার সঙ্গে?’
     ‘দেখিনি আবার ? আমি আর ও তো একই ঘরে ছিলাম।” 
     ‘বলো কী ?’
     ‘আহা রে, বেচারা! খুবই কষ্টের কাজ বোধ হয়!’
     ‘কষ্ট আবার নয়, সারসগুলো যে কেবল কাঁটা ঝোপেই ঘুরে বেড়ায়, ঠাকুমা।’
     ‘জামাকাপড়ের টানাটানি নেই তো ?’
     ‘টানাটানি নেই আবার! একেবারে ছন্নছাড়া অবস্থা।’
     ‘শোনো বাছা, আমার কাছে চল্লিশ হাত কাপড় আর দশটি রবল আছে, তুমি নিয়ে যাও, ছেলেকে দিও।'
     ‘তা দেব, ঠাকুমা।’
     দিন যায়, বড়ীর ছোট ছেলে ফিরে এল।
     ‘কেমন আছো মা ?
     ‘তুই যখন বিদেশে ছিলি, তখন পরলোক থেকে নিখোঁজ এসেছিল আমার কাছে। তোর দাদার কথা কত বলল। একই ঘরে ছিল ওরা। ওর হাত দিয়ে আমি এক থান কাপড় আর দশটি রবল পাঠিয়েছি।’
     ছেলে বলে, ‘এই যখন ব্যাপার, তখন আমি চললাম! সারা পৃথিবী ঘুরে তোমার চেয়েও বোকা যদি কোনদিন পাই, তবেই ফিরব। নয়ত আর ফিরব না।’
     এই বলে পথে নামল ছেলে।
    এল সে জমিদারদের গাঁয়ে, থামল জমিদার বাড়ীর সামনে। উঠোনে একটা শুয়োর তার কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে চরছে। তাই দেখে চাষী হাঁটু গেড়ে শুয়োরের সামনে কুনিশ করতে লাগল। জমিদার-গিন্নী ব্যাপারটা জানলা দিয়ে দেখতে পেয়ে দাসীকে ডেকে বলল:
     ‘যা তো, জিজ্ঞেস করে আয়, চাষী কেন কুর্নিশ করছে।’
     দাসী গিয়ে জিজ্ঞেস করল:
     ‘ও চাষী, তুমি হাঁটু গেড়ে বসেছ কে ? আর শুয়োরকে কেন কুর্নিশ করছ?’
    ‘মনিব-গিন্নীকে গিয়ে বল মা, তোমাদের এই শুয়োরটি হলেন আমার শালী, কাল আমার ছেলের বিয়ে, নেমস্তন্ন করতে এসেছি। শুয়োরটি হবেন বরকর্ত্রী, বাচ্চাগুলো বরযাত্রী, গিন্নীমা যেন অনুমতি দেন।’
     জমিদার-গিন্নী শুনে বলল:
    ‘আচ্ছা বোকা তো, শুয়ের আর তার ছেলেপুলেকে কিনা নেমতন্ন করছে বিয়েতে! ভালই হবে, সবাই হাসাহাসি করবে। এক কাজ কর, শুয়োরটাকে আমার লোম-দেওয়া কোটটা পরিয়ে দে। আর দুটো ঘোড়া যুততে বলে দে গাড়ীতে। জাঁকিয়ে বিয়ের আসরে যেতে হবে তো।’
     দুটো ঘোড়াকে লাগাম পরিয়ে গাড়ীতে যোতা হল। কাচ্চাবাচ্চা সমেত শুয়োর নিয়ে গাড়ীতে বয়ে দেওয়া হল চাষীকে। অমনি চাষীও উঠে বসে ঘরমুখো গাড়ী হাঁকাল।
     জমিদারমশাই শিকারে গিয়েছিল, বাড়ী ফিরে দেখে গিন্নী একেবারে হেসে আটখানা।
    ‘ওগো, শোনো শোনো, সে এক মজার ব্যাপার, তুমি দেখতে পেলে না। এক চাষী এসে আমাদের শুয়োরটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কুর্নিশ করছিল। বলে কিনা তোমাদের শুয়োরটি আমার শালী, তাই আমি এসেছি ওকে ছেলের বিয়েতে নেমতন্ন করতে। শুয়োর নাকি হবে বরকর্ত্রী আর বাচ্চারা বরযাত্রী !’
     জমিদার বলল, ‘হ্যাঁ, বুঝেছি!  ‍শুয়োরটা দিয়ে দিয়েছো তো ?’
     ‘হ্যাঁ গো, যেতে দিলাম শয়োরটাকে, আমার লোম-দেওয়া কোটটা পরিয়ে গাড়ীতে দুটো ঘোড়া যুতে পাঠিয়েছি।’
     ‘তা কোথায় থাকে চাষীটা?’
     ‘তা তো জানি না!”
     ‘দেখা যাচ্ছে তুমিই আস্ত বোকা, চাষীটা নয়!’
     বৌ বোকা বনেছে দেখে জমিদারবাব ভীষণ রেগে গেল। তক্ষুণি বাড়ী থেকে বেরিয়ে এক লাফে ঘোড়ায় চেপে চাষীর      পিছনে ধাওয়া করল। চাষীর কানে এল, পিছন পিছন কে যেন আসছে। অমনি গাড়ীটা ঘুরিয়ে ঘন বনের মধ্যে নিয়ে গিয়ে রেখে এল। তারপর টুপিটা খালে মাটিতে পেতে নিজে বসে রইল তার পাশে।
     ‘ওহে দাড়িওয়ালা, এক চাষীকে এ পথে যেতে দেখেছো? সঙ্গে তার জোড়া ঘোড়ায় টানা গাড়ী আর তাতে শুয়োর আর তার ছানাপোনা বসে,’ জমিদারমশাই চীৎকার করে জিজ্ঞেস করল চাষীকে।
     ‘দেখিনি আবার, সে তো অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে।’ 
     ‘কোন দিকে গেছে বলতে পারো? ধরতে চাই একবার লোকটাকে।’ 
     ‘ধরা কঠিন। নানা মোড়, নানা বাঁক। পথ হারিয়ে ফেলবে গো! এদিককার পথঘাট বোধ হয় তেমন চেনা নেই না?’
     দেখো হে ভায়া, তুমিই না হয় আমার হয়ে চাষীটাকে ধরে এনে দাও।’ 
     ‘না বাপু, তা হয় না। আমার টুপির নীচে একটা বাজপাখি আছে যে!’ 
    ‘আমি না হয় বাজপাখিটা দেখব।’ 
     ‘না গো, ছেড়ে দিয়ে বসবে, দামী পাখি। মনিব আমায় খেয়ে ফেলবে।’ 
     ‘দাম কত পাখিটার ?’ 
     ‘তা শ তিনেক রুবল হবে।’ 
     ‘বেশ, উড়ে গেলে দাম দিয়ে দেব।’ 
     ‘না বাবা, এখন তো বলছো, পরে কী হবে কে জানে।’
      ‘বিশ্বেস হচ্ছে না; বেশ, এই নাও তিন শ’ রুবল, এবার তো আর ভয় নেই?
     টাকাটি নিয়ে বাবুর ঘোড়ায় চেপে বনের ভিতর ঢুকে গেল চাষী আর জমিদার বসে বসে চাষীর শূন্য টুপিটা পাহারা দিতে লাগল। জমিদার বসে আছে তো আছেই। অনেকক্ষণ কেটে গেল, সূর্য প্রায় অস্ত যায়, কিন্তু চাষীর আর দেখা নেই।
     ‘দেখি তো একবার টুপিটা তুলে, সত্যিই পাখি আছে কিনা। যদি থাকে, তবে লোকটা ফিরে আসবে, আর যদি নাই থাকে তো অপেক্ষা করা বৃথা!
     এই ভেবে জমিদারমশাই টুপি তুলে দেখে ভোঁ ভাঁ। কোথায় বাজপাখি? কিছুই নেই।
     ‘হতভাগা! তাহলে এই চাষীটাই নিশ্চয়ই আমার গিন্নীকেও বোকা বানিয়েছে!’
     রেগে মেগে থুথু করতে করতে জমিদারমশাই পায়ে হেঁটেই বাড়ীমুখো রওনা দিল। চাষী এদিকে বহু আগেই নিজের বাড়ী পৌছে গিয়েছিল। মাকে
ডেকে বলল :
     ‘শোনো মা, তোমার কাছেই ফিরে এলাম। দুনিয়ায় তোমার চেয়েও বোকা আছে। দেখো, এমনি এমনি মুফতে পেয়ে গেলাম তিনটে ঘোড়া, একটা গাড়ী, তিন শ’ রুবল আর ছানাপোনাশুদ্ধ একটা শুয়োর।’
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য