বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ১৯তম উপাখ্যান

    ভোজরাজ পরদিন সিংহাসনে বসতে গেলে অপর একটি পুতুল বললো, মহারাজ, আমার নাম শৃঙ্গারকলিকা। আপনি সিংহাসনে বসবার আগে রাজা বিক্রমাদিত্যের কেমন ঔদার্যগুণ ছিল, তা শুনুন ।
    একদিন রাজা বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে বসে আছেন। সভায় নানা রাজ্যের সামন্তপুত্রর উপস্থিত আছেন। কেউ কেউ নিজের বংশের মহিমা কীর্তন করছেন, কেউ বা নিজ নিজ বাহুবলের প্রশংসা করছেন।
    এমন সময় একজন ব্যাধ এসে রাজ্যকে প্রণাম করে বললো, মহারাজ, বনের মধ্যে বিরাট এক বরাহ উপস্থিত হয়েছে। পর্বতের মত তার আকার। আপনি যদি দেখতে ইচ্ছা করেন তবে আসুন।
    ব্যাধের কথা শুনে রাজা বিক্রমাদিত্য উপস্থিত কুমারদের সঙ্গে নিয়ে বনের মধ্যে গিয়ে দেখলেন, নদীতীরে কুঞ্জবনের মধ্যে বরাহটি রয়েছে। কোলাহল শুনে বরাহটি কুঞ্জবন থেকে বেরিয়ে এল।
    তখন রাজা ছাব্বিশটি বাণের সাহায্যে সেই বরাহকে আঘাত করলেন কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় বরাহটি সেই সকল অস্ত্রাঘাত অগ্রাহ্য করে একটি গুহার মধ্যে প্রবেশ করল। রাজাও ছেড়ে দেবার পাত্র নন, তিনিও পিছনে পিছনে সেই গুহায় প্রবেশ করলেন। গুহার মধ্যে ঘোর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে কিছুদূর যাওয়ার পর সুন্দর অট্টালিকা শোভিত একটি নগরী দেখলেন। নানা দেবমন্দির ও উপবন রয়েছে সেখানে। তিনি একটি অতি মনোরম রাজভবন দেখতে পেলেন। বিরোচনপুত্র বলি সেখানে রাজ্যশাসন করছেন।
    রাজভবনে প্রবেশমাত্র রাজা বলি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে প্রভু, আপনার এখানে আসার কারণ কি?
    রাজা বললেন, আপনাকে দেখার জন্যই এসেছি, অন্য কোন কারণ নেই।
    বলি বললেন, যদি আমাকে বন্ধু ভেবে এসে থাকেন তবে দয়া করে কিছু উপহার গ্রহণ করুন।
বিক্রমাদিত্য বললেন, আমার কোন কিছুরই অভাব নেই। আপনার প্রাসাদে যা কিছু আছে তার সবই আমার প্রাসাদে আছে।
    বলি বললেন, প্রভু, আমি সে অর্থে বলছি না, বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ কিছু উপহার দিতে চাইছি।
    এই কথা বলে তিনি তাঁকে রস ও রসায়ন নামে দুটি অদ্ভুত জিনিস দিলেন।
    রাজা তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিনি ঘোড়ার পিঠে চেপে যেমনি পথে এসে পড়েছেন আমনি একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ পুত্রসহ তাঁর সামনে এসে আশীর্বাদ করে বললেন, আমি অত্যন্ত দরিদ্র এবং পীড়িত, অনাহারে দিন কাটছে, যাতে খেয়ে বাঁচতে পারি আপনি তার ব্যবস্থা করুন।
    রাজা বললেন, হে ব্ৰাহ্মণ, এখন আমার কাছে কিছুই নেই। যার দ্বারা আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারি, তবে এই রস ও রসায়ন আছে। রসের দ্বারা যে কোন ধাতু সোনায় পরিণত হয় আর এই রসায়ন যিনি খাবেন জরামৃত্যু তাঁকে স্পর্শ
করতে পারবে না। দুটির যেকোন একটি নিতে পারেন।
    ব্রাহ্মণ বললেন, যে রসায়ন খেলে জরামৃত্যু থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তাই আমাকে দান করুন।
    ব্রাহ্মণপুত্র বললেন, রসায়নে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, জরামৃত্যু রহিত হলে অনন্তকাল দারিদ্র্য ভোগ করতে হবে, যে রসের দ্বারা ধাতু সোনায় পরিণত হয় তাই আমাদের দিন।
    তখন রাজা বিক্রমাদিত্য দুটি জিনিসই তাঁদের দিয়ে দিলেন। ব্রাহ্মণ সস্তুষ্টচিত্তে রাজাকে আশীর্বাদ করে প্রস্থান করলেন। বিক্রমাদিত্যও তাঁর নগর অভিমুখে চললেন।
    গল্প শেষ করে পুতুল বললো, এবার বলুন রাজা, এমন দানশীলতা আপনার মধ্যে আছে কি? যদি থাকে তবে সিংহাসনে বসুন। 
    সেদিনও ভোজরাজের সিংহাসনে বসা হল না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য