মহাশিল্পী

   কোন এক গ্রামে হাজার বছর আগে এক মহাশিল্পী ছিল । ঐ শিল্পীর রূপরেখা অনুসারে বহু বাড়ি, ভবন, মন্দির, মহল গঠিত হত। ওর খ্যাতি দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল ।
   ঐ সময়ে নাগলোকে নাগরাজার ভবনে ভূমিকম্পের ফলে চিড় ধরল । সেটা নতুন করে গড়ে তোলার জন্য মর্তভূমি থেকে ঐ মহাশিল্পীকে ডেকে পাঠালে নাগরাজ । নাগরাজের আহ্বান শুনে এক নতুন ধরণের ভবন গড়ার আশায় ঐ মহাশিল্পী নাগলোকের দিকে রওনা হোল । অল্প সময়ের মধ্যে নাগরাজের সাথে মহাশিল্পীর সম্পর্ক জমে উঠল । তার কোন কিছুরই অভাব হোতনা। তবুও মহাশিল্পীর মন পড়ে থাকত তার বাড়িতে। তার সাধারণ বাড়ির কথা, তার মায়ের কথা ভাবত । স্ত্রীর কথাও ভাবত ।
   কেমন আছে । কি করছে ইত্যাদি ।
   একদিন মহাশিল্পী নাগরাজকে বলল, “রাজা, অামার মন বাড়িতে পড়ে আছে। আমার বাড়ির, আমার গ্রামের অবস্থা কেমন আছে জানাবেন ?” ।
   "সত্য গোপন করব না। তোমার গ্রামের দিকে কিছুকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছেনা । ওখানে এখন ভয়ঙ্কর আকাল ।” বলল নাগরাজ।
   “তাহলে ওখানে বৃষ্টি ঝরাতে পারেন না ?” বলল শিল্পী।
   “তা কিছুতেই হতে পারেনা। ঐ ভাবে বৃষ্টি ঝরানো নিয়ম বিরুদ্ধ । কবে যে কোথায় আকাল হবে তা আগে থেকে ঠিক করা থাকে । এই আকালের খেলা ওখানে আমাকে আরও নিরানব্বই দিন চালিয়ে যেতে হবে ।" বলল নাগরাজ ।
   শিল্পীর মেজাজ বিগড়ে গেল । তার চোখের সামনে সব সময় ভাসতে লাগল তার গ্রামের হাহাকারের ছবি, তার মা, তার বউ, তার বন্ধু বান্ধব সবাই না খেতে পেয়ে ধুকছে । এক একদিন মাঝ রাতে শিল্পী দেখতে পেত ভয়ঙ্কর স্বপ্নঃ তার প্রিয়জন মারা যাচ্ছে । গাছের ডালে একটি পাতাও নেই ।
   “নাগরাজ, তোমার কাছে কাতরভাবে প্রার্থনা করছি, আমার গ্রামে বৃষ্টি দাও । আমার গ্রামের মানুষ না খেতে পেয়ে ছটফট করে মারা যাচ্ছে। আমার পরিবারের লোক মারা যাবে। আমার কথা শোন নাগরাজ ।” মহাশিল্পী বলল । 
   “ওরে হরবোলা, তোমার কী দরকার এখন ওদের কথা ভেবে ! আর তা ছাড়া আমার ভবন তৈরি করে ফেললেই তো তোমাকে অনেক পুরস্কার দেব। অনেক জমি দেব, সোনা রূপা দেব অনেক। তুমি যতদিন বাঁচবে মহারাজার মতো কাল যাপন করতে পারবে ।’ বলল নাগরাজ । 
   
“আমি চাই আমার গ্রামে বৃষ্টি । তোমার পরিবারের লোক যদি এভাবে হাহাকার করত তখন তুমি পারতে নিশ্চিন্তে কাজ করতে ?” বলল শিল্পী ।
   “আমাকে অহেতুক বিরক্ত করনা । এখন বৃষ্টি হবেনা । এই শেষ কথা ।” বলে নাগরাজ উঠে পড়ল ।
   মহাশিল্পী বাড়ি ফিরে যাবার জন্য তৈরি হোল । থাকল পড়ে ভবনের কাজ । এ কথা কানে যেতেই নাগরাজ ছুটে এসে বলল, "অহেতুক এই অভিমানের কারণ কি ?”
   অহেতুক নয় নাগরাজ ! আমি গ্রামে ফিরে গিয়ে নিজের চোখে দেখে আসতে চাই প্রকৃত অবস্থা ।” শিল্পী বলল ।
   “এই, কে আছিস ; বন্দী কর এই দুরাত্মাকে ৷” বলল নাগরাজ । পরক্ষণেই নাগ সেবকেরা শিল্পীকে ঘিরে ফেলল ।
   “এখন বল আমার ভবন গড়ে তুলে যাবে কিনা ?” নাগরাজ জিজ্ঞেস করল । 
   “আমার গ্রামে বৃষ্টি ঝরাবে কিনা ?” জিজ্ঞেস করল মহাশিল্পী ।
   “বৃষ্টি ঝরাবোনা বলে তোমাকে আগেই বলেছি !” বলল নাগরাজ ।
   “তাই যদি হয় তাহলে আমিও ভবন তৈরির কাজ করবনা ’ বলল শিল্পী ।
   “ওরে, একে নিয়ে গিয়ে শিরচ্ছেদ . . ." হঠাৎ নাগরাজ থেমে গেল ! মহাশিল্পীর শিরচ্ছেদ করলে তাকে দিয়ে আর ভবন তৈরি হবে কি করে : একথা মনে জাগতেই নাগরাজ বলল,“শিল্পীকে ছেড়ে দাও !" নাগরাজ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল ।
   তাকে ছাড়লো বটে কিন্তু লাগলোক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোন ক্ষমতা শিল্পীর রইল না । শিল্পীর চোখের সামনে থেকে নিজের গ্রামের করুপ চিত্র আর কিছুতেই সরছে না। রাতদিন গ্রামের কথা ভাবতে লাগল মহাশিল্পী । এক
জায়গায় বসে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটা থামের উপর ।
   শিল্পী তৎক্ষণাৎ উঠে একটা করাত দিয়ে ঐ থাম কাটতে লাগল । থাম যত কাটা পড়ছে ভবন ততই টলছে । নাগরাজ হাঁকপাক করতে করতে এসে বলল, “আহা, করকি ? করকি ! থাম” বলে চিৎকার করতে লগল।
   “বৃষ্টি ঝরাবে বল?” শিল্পীর প্রশ্ন।
   “বৃষ্টি ঝরাবো, বৃষ্টি হবে, কথা দিচ্ছি।” বলল নাগরাজ।
   “হরিণপুরে গিয়ে অধিক বৃষ্টি ঝরিয়ে বন্যার সৃষ্টি করেছে । আমাদের গ্রামে ওসব করলে চলবেন। ঠিক যতটা বৃষ্টি প্রয়োজন ততটাই ঝরাতে হবে । মনে থাকে যেন ৷” বলল মহাশিল্পী ।
   “তুমি যা চাইছ তাই হবে ।” বলল, নাগরাজ!  বিরাট বিরাট ভবন যে শিল্পী বানাতে পারে তার পক্ষে কোন ভবন ভাঙ্গাতো আর কষ্টকর ব্যাপার নয় ।
   “তুমি যদি ঠিক বৃষ্টি করাও তাহলে আমি এমন ভবন বানিয়ে দেব যা দেখে স্বয়ং ইন্দ্রও অবাক হয়ে যাবে। ঈর্ষাণ্বিত হবে।” বলল মহাশিল্পী ।
   নাগরাজ শিল্পীর শরীর কাপড় দিয়ে ঢেকে বলল, “তুমি এক্ষুণি গিয়ে স্বচক্ষে দেখে এসো ওখানে বৃষ্টি পড়ছে কি না।”
   শিল্পী ভূলোকে এলো। দেখলো তার গ্রামে বৃষ্টি পড়ছে । গ্রামবাসীরা আনন্দে বিভোর । কিন্তু গ্রামের মানুষ তাকে দেখতে পায়নি । গ্রামবাসীদের নজরে পড়ল এক বিরাটকায় সৰ্প ।
   “এই সাপই আমাদের গ্রামে বৃস্টি আনল । এর জন্য আমরা একটা মন্দির গড়ে তুলি " ওরা বলল । অল্পদিনের
মধ্যেই মন্দির গড়ে উঠল । গ্রামের আকাল দূর হোল ।
   শিল্পী নাগলোক ফিরে গিয়ে নাগরাজকে বলল, “আমাকে যাদুকরে সাপ বানিয়ে ভূলোকে পাঠালে । স্বজনদের দেখছি, ওদের সাথে কথা বলতে পারলাম না ।"
   “তুমি খুব চতুর লোক । সেইজন্য আমি তোমার ব্যাপারে সাবধান হয়ে যা করার করেছি । আমার কথা আমি রেখেছি। এখন তোমার কথা তুমি রাখ” বলল নাগরাজ ।
   শিল্পী নাগরাজের ভবনটিকে চমৎকার করে গড়ে তুলল। ইন্দ্র গৃহপ্রবেশের দিন এসে সেই ভবন দেখে সত্যি ঈর্ষাবোধ করল। নাগরাজ শিল্পীকে অনেক উপহার দিয়ে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল ।
   মহাশিল্পীকে যারা চিনতো তারা ওকে দেখে বলে উঠল, “আরে, এতদিন তুমি ছিলে কোথায় ? তোমার না থাকার সময় এখানে ভীষণ আকাল পড়েছিল । এক সাপদেবতা এসে এখানে বৃষ্টি ঝরিয়েছে। ঐ সাপের জন্য মন্দিরও গড়ে তুলেছি ।" 


   “আমিই সেই সাপ ” বলল শিল্পী । অনেকেই ওর কথা বিশ্বাস করল না । পরে ঐ শিল্পী গ্রামের সবাইকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলল। তখন গ্রামবাসী তার কথা বিশ্বাস করল এবং সে যে উপকার করেছে তা বুঝে তার প্রশংসা করল, নিজেরাও গর্ববোধ করল ।
তারপর থেকে সেই গ্রামের নাম হল সর্পপুর ।

--বোম্মানা বিশ্বনাথম্‌
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য