দিব্যদর্শী -- কাজাখ লোককাহিনী

   বহুদিন আগে বহুদূরের এক গ্রামে এক গরীব লোক বাস করত। থাকার মধ্যে তার ছিল কেবল দুটি জিনিস: কানঢাকা শিয়ালের চামড়ার একটা টুপি আর দ্রুতগামী একটা ঘোড়া। টুপিটা একেবারেই পুরনো হয়ে গেছে-হাজারটা ফুটো তাতে, কিন্তু তার ঘোড়াটার মত ঘোড়া আর একটিও ছিল না পৃথিবীতে। তার সৌন্দর্যে সূর্যের আর দ্রুতবেগে হাওয়া রও হিংসা হয় ।
    অন্য এক গ্রামে থাকত গরীব লোকটির বড় দুই ভাই-তারা দুজনেই ধনী। তাদের ছিল ত্ৰিশটা ঘোড়ার পাল, ত্রিশটা ভেড়ার পাল, বাস করার জন্য গালিচা, বাসনপত্র আর অস্ত্রশস্ত্রে ভর্তি তিরিশটা তাবু!
    কিন্তু তবুও তাদের মনে একটুও আনন্দ নেই! এক মুহূর্তের জন্যও তারা ভুলতে পারে না যে তাদের ছোট ভাইয়ের এমন একটি ঘোড়া আছে যা সারা পৃথিবীতে দুটি নেই। তারা সবসময় ভাবত কি করে ঐ ঘোড়াটাকে শেষ করা যায়।
    একদিন ছোট ভাই তার শতছিদ্র টুপিটা মাথায় দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বড় দুই ভাইয়ের কাছে এসে হাজির।
   তারা ছোট ভাইকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল, রাগে তাদের মুখ কালো হয়ে উঠল। ছোট ভাই নীচু হয়ে সালাম জানিয়ে বলল :
    ‘ভাইরা! অভাব একেবারে শেষ করে ফেলল আমায়, খেতমজুরের কাজ নিতে চাই কারো কাছে, তা ঘোড়াটা পায়ের বেড়ি। শরৎকাল পর্যন্ত তোমরা যদি ওকে নিজেদের পালে রাখ তো উপকার হয়। এতে তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না আর আমারও দুশ্চিন্তা থাকবে না। শরৎকালে যেভাবে তোমরা বলবে সেভাবেই এর প্রতিদান দেব তোমাদের।'
    ধনী দুই ভাই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল, তারপর মিষ্টি সুরে ভাইকে বলল:
    ‘তোকে সাহায্য করতে সবসময়ই রাজী আমরা, ভাই। ঘোড়াটা আমাদের পালে রেখে যা। শরৎকাল পর্যন্ত ঘুরে ফিরে বেড়াক। এর জন্য কোনকিছুই দিতে হবে না তোকে।’
    বড় ভাইদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ঘোড়াটাকে তাদের পালের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে হালকা, খুশিমনে ফিরে গেল ছোট ভাই ।
    বসন্তকাল গিয়ে গ্রীষ্মকাল এল। ছোট ভাই খেতমজুরের কাজ করছে, নিজেরও পেটভরে খাওয়া জুটছে আর ঘোড়াটার জন্যও ভাবনা নেই, তাই নিশ্চিন্ত সে।
    একদিন এক অপরিচিত লোক তার কাছে এসে বলল যে সে গোপনে ছুটে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ খবর দিতে ।
    যখন তারা দু’জন একটা নির্জন জায়গায় গেল, লোকটি জানাল যে সে তার ভাইদের আস্তাবলের সহিস। সে বলল :
'শোন বন্ধু, তোমার ঘোড়াটা তো মরতে বসেছে। ওকে ছুটিয়ে ছুটিয়েই মেরে ফেলল তোমার ভাইরা, মনে হচ্ছে আর তিনটে দিনও বাঁচবে না। তোমার জন্য কষ্ট হল আমার, তাই তোমাকে এ খবর জানাতে এলাম। তুমি কিন্তু ভাইদের কাছে বলে দিও না আমার কথা। যদি ওরা তোমায় জিজ্ঞেস করে যে কে তোমাকে সব কথা বলেছে তো তুমি বলবে:
    আমার দিব্যদৃষ্টি আছে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে আমি সব দেখতে পাই। এই বলে লোকটি চলে গেল। মনের দুঃখে কেঁদে ফেলল গরীব ছেলেটি, তারপর রওনা দিল বড় ভাইদের কাছে ।
    রাস্তাতেই তার দেখা হল ভাইদের সঙ্গে। সে কাঁদতে কাদতে তাদের লজ্জা দিতে তিরস্কার করতে লাগল:
    'গরীব বেচারীকে মনে কষ্ট দিতে বিবেকে বাঁধে না তোমাদের? আমি তোমাদের কি ক্ষতি করেছি, কি জন্যে তোমরা আমার ঘোড়াটাকে মেরে ফেললে?
    ধনী দুই ভাই বুঝল যে ছোট ভাই সব জেনে ফেলেছে, তারা তখন অস্বীকার করতে লাগল:
    ‘তোর দেখছি মাথাটার গণ্ডগোল হয়েছে, নয়ত মাতাল তুই আজেবাজে বকছিস? তোর ঘোড়া বেঁচে আছে, ভাল আছে, নিশ্চিন্তে আছে আমাদের পালে ।
    গরীব ভাই বলল, ঠকিও না আমাকে, ছুটিয়ে ছুটিয়ে মেরে ফেলেছ ঘোড়াটাকে, তিন দিনও বাঁচবে না আর '
    'কে তোকে বলল?’ জিজ্ঞেস করল ভাইয়েরা। 
    ‘কেউ আমায় কিছু বলে নি। আমি দিব্যদৃষ্টি পেয়েছি। পৃথিবীতে কোথায় কি হচ্ছে সব দেখতে পাই আমি এখন’, বলল গরীব ভাই ।
    ক্রমশ তাদের চারপাশে লোক জড় হল, তারা জানতে চাইল কি নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে।
    গরীব ভাই তাদের সেসব কথা বলল যা তাকে ভাইদের আস্তাবলের সহিস বলেছিল। তখন লোকেরা তাদের ঘোড়ার পাল দেখতে চলল ছোট ভাই বড় ভাইদের নামে বাজে কথা রটাচ্ছে কিনা পরখ করতে। আস্তাবলে এসে তারা দেখল যে গরীব ভাই সত্যি কথাই বলেছে, তার ঘোড়াটা মৃতপ্রায়, মাটিতে পড়ে ধুঁকছে, তার পাঁজরার কাছে ঘায়ে ভরে আছে।
    তখন লোকেরা হুমকি দিয়ে বড় দুই ভাইকে বলল গরীব ভাইকে তার ঘোড়ার বদলে তাদের দশটি শ্রেষ্ঠ ঘোড়া দিয়ে দিতে ।  
    ধনী ভাইদের দশটি শ্রেষ্ঠ ঘোড়া দিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন গতি রইল না। কিন্তু সেই থেকে তার প্রতি ঘৃণা বেড়ে গেল তাদের, তাকে মেরে ফেলার সুযোগ খুঁজতে লাগল কেবল।
    একদিন সেই দেশের খানের এক মস্ত বড় অমূল্য সোনার বাট চুরি গেল। 
    থান সারা রাজ্যময় ঘোষণা করতে আদেশ দিলেন, যে বলে দিতে পারবে সোনা কোথায় লুকান আছে তাকে হাজারটা বাছাইকরা ভেড়া আর তিনশো দুগ্ধবতী ঘোড়ি দেওয়া হবে।
    যখন ধনী ভাইয়ের একথা শুনল থানের কাছে গিয়ে তারা বলল : হুজুর, আমাদের ছোট ভাই বলে যে সে দিব্যদর্শী। আমরা শুনেছি ও নিজের বন্ধুদের কাছে অহঙ্কার করে বলছে যে ও একরাতের মধ্যেই চোর ধরে দিতে পারে কিন্তু তা সে করবে না। ওকে যদি আপনি মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখান তো সকালবেলায়ই সোনা আপনার হাতে পৌছে যাবে।'
    তাদের কথায় বিশ্বাস করে খান তখুনি গরীব ছেলেটিকে ধরে আনতে আদেশ দিলেন।
    সে এসে পোঁছলে খান বললেন: শুনলাম তুই নাকি নিজেকে দিব্যদর্শী বলিস জানতে চাই একথা সত্যি কিনা। কাল ভোরবেলার মধ্যে যদি সোনার বট খুঁজে দিতে পারিস তো আমি ঘোষিত পুরস্কার ছাড়াও একপাল উটও দেব তোকে। আর যদি তুই আমার আদেশ পালন না করিস তো পাগলা ঘোড়ার লেজে বেঁধে তোকে স্তেপের মধ্যে ছেড়ে দেব।"
    গরীব ছেলেটি তখনই বুঝল ভাইদের শয়তানীর কথা, বলল : হুজুর, আপনার লোকদের আদেশ করুন যেন স্তেপের মধ্যে একটা তাঁবু খাটায় আমার জন্য। সেখানে আমি রাতের বেলায় একা বসে ঝাড়ফুক করব, হয়ত ভোরবেলায় সোনাটা খুঁজে পাব।’
    আর মনে মনে ভাবল, 'স্তেপের মধ্যে তাবু হলে মাঝরাতে পালাতে পারব।’ 
    স্তেপের মাঝে তার জন্য চমৎকার এক তাবু খাটিয়ে দেওয়া হল, গরীব ছেলেটি একা রইল সেখানে। ঠিক মাঝরাতে তার শতছিদ্র টুপিটা কপালের ওপর টেনে নামিয়ে দিয়ে সাবধানে দরজার দিকে এগোতে লাগল।
    ঐ সময়ই তাবুর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল সেই চোরটা, যে খানের সোনা চুরি করেছে। এমন চমৎকার একটা তাবু দেখে সে ভাবল এখানেও আবার কিছু চুরি করা যায় নাকি। চোরটা যেই দরজা খুলতে যাবে আমনি দরজাটা আপনা থেকেই খুলে গেল আর চোরটা টাল সামলাতে না পেরে গরীব ছেলেটির পায়ের কাছে লম্বা হয়ে পড়ে গেল !
    গরীব ছেলেটি একটুও চিন্তা না করেই চোরটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলাটা চেপে ধরল।
    চোরটা তখন কেঁদে বলল : 
    ‘ছেড়ে দাও আমাকে, মেরে ফেলো না, আমি তোমাকে খানের কাছ থেকে চুরি করা সোনার বাটটা দিয়ে দেব।'
    গরীব ছেলেটি বলল, ঠিক আছে, তোকে ছেড়ে দেব, আগে বল সোনার বাটটা কোথায় লুকান আছে?
   এখান থেকে যদি পূর্বদিকে যাও, সেখানে উঁচু একটা টিবি দেখতে পাবে, সেই টিবিটার ওপর একটা বড় কালো পাথর আছে। ঐ পাথরটার নীচেই সোনা পোতা আছে।’
    চোরটাকে ছেড়ে দিয়ে সে এবার খানের কাছে চলল, কারণ ইতিমধ্যে ভোর হতে আরম্ভ করেছে।
    তারপর খানকে নিয়ে সে চলল পূর্বদিকে আর তাদের পিছন পিছন চলল খানের অনুচর ভৃত্যের দল।
   যখন তার কালো পাথরের কাছে পৌছল, গরীব ছেলেটি খানের ভৃত্যদের আদেশ দিল সেখানকার মাটি খুঁড়তে, মাটি খুঁড়ে তারা সোনার বাটটা পেল ।
    তুমি দেখছি সত্যিই দিব্যদর্শী, বলল খান, তোমাকে আমার কাজে লাগবে। এত খুশী হল খান যে তখুনি তাকে হাজারটা ভেড়া, একশোটা দুগ্ধবতী ঘোড়ী আর একপাল উট দিতে আদেশ দিল। তারপর তাকে বাড়ী ফিরে যেতে অনুমতি দিল।
    এর কিছুদিন বাদে আবার সেই চোরটাই থানের প্রিয় ঘোড়াটা চুরি করল। দুঃখে কাতর হয়ে পড়ল খান। আবার গরীব ছেলেটিকে ডাকিয়ে এনে বলল :
    যদি তুই দিব্যদর্শী তো বল আমার ঘোড়া কোথায়, আগের বারের চেয়েও বেশি পুরষ্কার দেৰ তোকে। আর যদি তুই উত্তর দিতে অস্বীকার করিস বা ঠিক উত্তর দিতে না পারিস তো তোর মাথা কাটা পড়বে।’
    ভয়ে হাত পা ঠাণ্ড হয়ে গেল ছেলেটির, খানের কথার প্রতিবাদ করতে সাহস হল না। আবার বলল স্তেপের মাঝে তাঁবু খাটিয়ে দিতে। খানের আদেশমত তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হল।
    এক তাঁবুতে বসে গরীব ছেলেটি ভাবতে লাগল কি করে মৃত্যুর হাত এড়ান যায়। মাঝরাত পর্যন্ত বসে বসে ভাবল সে। তারপর চুপিচুপি তাবু থেকে বেরিয়ে দৌড় দিল যেদিকে দুচোখ যায়।
    দৌড়তে দৌড়তে এসে পৌছল দুটাে উঁচু পাহাড়ের মাঝে একটা নিভৃত নির্জন জায়গায়, একটা গাছের নীচে শুয়ে গভীর ঘুমে ডুবে গেল সে।
    চোরটাও ওদিকে খানের ঘোড়াটা চুরি করে ঐ গিরিখাতেই এসেছে। চারদিক দেখেশুনে সে ভাবল এখানে তার ভয়ের কিছু নেই, এখানেই রাতটা কাটাবে সে।
    ঘোড়াটাকে গাছে বেঁধে রেখে, নিজে সেই গাছের নীচেই শুয়ে পড়ে গোটা জায়গাটা কাঁপিয়ে নাক ডাকতে আরম্ভ করল। লক্ষ্যও করল না যে সেখানে আর একজন লোক ঘুমিয়ে আছে।
    সেই ভয়ঙ্কর নাকডাকার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল গরীব ছেলেটির। প্রথমে সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে বুঝতে পারল না কোথা থেকে আসছে আওয়াজটা। তারপর দেখতে পেল তার কাছেই একজন লোক শুয়ে আছে আর গাছে একটা ঘোড়া বাঁধা। সন্দেহই রইল না যে, এই সেই চোর আর এইটি থানের দ্রুতগামী ঘোড়াটা। ভয়ে আনন্দে তার বুক ধকধক করে উঠল ।
    পা টিপে টিপে উঠে দাঁড়িয়ে সে ঘোড়াটাকে খুলল গাছের থেকে, এক লাফে তার পিঠে চড়ে রওনা দিল খানের ছাউনির দিকে।
    ভোরবেলায় ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনে খান যে অবস্থায় ছিল সেভাবেই ছুটে বেরিয়ে এল ছাউনি থেকে, নিজের প্রিয় ঘোড়াটাকে দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না তার৷ খান কাছে এগিয়ে গেলে ঘোড়াটা যখন চিঁহিঁ করে উঠল তখন খান বুঝল যে এট তারই ঘোড়া। আনন্দে খান যা যা গরীব ছেলেটিকে দেবার কথা ছিল তা তক্ষুণি দিয়ে দিতে আদেশ দিল আর বিশেষ সৌজন্যের চিহ্ন হিসাবে তাকে এক পেয়ালা কুমিস খেতে আমন্ত্রণ জানাল।
    ভূত্যেরা ছাউনির ভিতর থেকে রেশমীকাপড়ে মোড়া বালিশ নিয়ে এল থানের জন্য আর সোনার পেয়ালা ভরা নেশাধরান কুমিস দিল খানের হাতে। গরীব ছেলেটি খানের থেকে একটু দূরে মাটিতেই বসল, ভূত্যেরা তাকে কাঠের পেয়ালায় ঢেলে দিল ভেড়ার দুধ মেশান টাটকা কুমিস।
    যখন খান কুমিস প্রায় শেষ করে এনেছে তখন একটা বিরাট ফড়িং লাফিয়ে পড়ল তার পেয়ালার মধ্যে। খান ধরতে চাইল ফড়িংটাকে কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে মাটিতে পড়ল সেট। হাত দিয়ে চেপে ধরতে চাইল খান সেটাকে, কিন্তু আবার লাফিয়ে পেয়ালার মধ্যে পড়ল। এবার খান কায়দা করে ধরতে পারল ফড়িংটাকে, ধরে রেখে দিল হাতের মুঠোয় ।
    গরীব ছেলেটি এসব কিছুই দেখে নি। 
    খান তাকে বলল : ‘এই দিব্যদশী, তোকে আমি শেষবারের মত পরীক্ষা করতে চাই। বল দেখি কি আছে আমার হাতে?
    গরীব ছেলেটি ভাবল, ব্যাস! এবার আমার হয়ে গেল। এবার আর ছাড়ান নেই ' গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জোরে জোরে বলল :
    ‘একবার পালায়, দুবার পালায়, তিনবারের বার মরতে হয় ' খান ভাবল ছেলেটি ফড়িংয়ের কথা বলছে, তাই বলল, সাবাস! ঠিক বলেছিস ;' গরীব ছেলেটির উত্তরটা মনে করে অনেকক্ষণ ধরে হাসল খান, তারপর তাকে দামী দামী উপহার দিয়ে ঘরে ফিরে যেতে বলল।
    সেই থেকে ছেলেটির আর কোন কিছুরই অভাব নেই আর তার দুই ধনী ভাই তার এমন সুদিনের কথা শুনে মনের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে দু'জনেই একই দিনে মারা গেল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য