বিক্রম-বেতালের গল্প: ঠাকুরের ইচ্ছা

   বসন্ত দেশের রাজা ছিল নামকরা বীর। তার সিংহাসনে বসার কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ হেমন্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হল। ঐ যুদ্ধে বসন্তদেশের রাজার জয় হল। ফলে সিংহাসনে বসতে না বসতেই বসন্তদেশের রাজা দুটি দেশের রাজা হয়ে গেলেন।
   যুদ্ধে দুটো দেশেরই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হল। লোকজন মারা গেল। ধনসম্পত্তি নষ্ট হল। রাজা ছিল মহাবীর। এত সহজে একটি দেশ জয় করে ফেলায তার মনে আরও অনেক দেশ যুদ্ধ করে জয় করার ইচ্ছা জাগতে পারে। ফলে বহু প্রজা মারা যাবে। অগাধ ধনসম্পত্তি নষ্ট হবে।  এই কথা ভেবে মন্ত্রী রাজজ্যোতিষীকে রাজার ঠিকুজীকোষ্ঠি দেখতে বলল। “মহামন্ত্রী, আমাদের রাজা শুধুমাত্র দুটি দেশেরই রাজা হতে পারবেন। কোন কারণে আরিএকটি বার যদি তাকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয় তখন কিন্তু তাকে দুটো দেশই হারাতে হবে।”

   জ্যোতিষী মন্ত্রীকে গোপনে জানাতে চাইলেও হঠাৎ রাজা সেখানে উপস্থিত হওয়ায় কথাগুলোও রাজার কানে গেল। শুনেই রাজা জ্যোতিষীকে বলল, “দেখ জ্যোতিষী বীরত্ব এমন একটা জিনিস যা দিনকে রাত করতে পারে।”
   “মহারাজ, যে কোন যুদ্ধের জয় পরাজয় শুধু রাজার উপর নির্ভর করে না। সৈন্যরা যদি ঠিকমত না চলে, তাদের খ্যাদ্য যদি ঠিকসময় না পৌছায়, যুদ্ধে জয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এছাড়া উপরে আছে দেবতাদের আশীর্বাদ। আপনার ভাগ্যে দেবতার আশীর্বাদ বলতে যা বোঝায় তার কিছু নেই।” জ্যোতিষী সুনিশ্চিত বক্তব্য বলার মত বলল।
   “তুমি যা বললে আমি তা মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে পারি। আমি আরও একটা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।”--রাজা বললেন।
   “মহারাজ, তার আগে বিভিন্ন দেশের বীরদের আপনার বিরুদ্ধে তরবারি যুদ্ধে আহ্বান করতে পারেন। আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার ক্ষমতা যে কারও নেই আগে তা প্রমাণ হয়ে গেলে খুব ভাল হবে।”
   রাজা তাই করল। বিভিন্ন দেশের বীরদের তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আহ্বান জানার। মবহুবীর এসে রাজার কাছে পরাজিত হল। যারা পরাজিত হত রাজা তাদের সম্মানে পুরস্কার দিয়ে বিদায় করত। বহু রাজা মনে মনে ভাবল, এত বড় বড় বীর আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না এটাই আমার ভাগ্য।
   এইভাবে বহুবছর কেটে গেল। রাজজ্যেতিষীর ছোটভাই ছিল সমস্ত দেশের রাজজ্যেতিষী। বসন্ত দেশের রাজার কোন ছেলে ছিল না। অপূর্ব সুন্দরী একটি মেয়ে ছিল। যেমন ছিল তার রূপ তেমনি ছিল তার গুণ। প্রকৃতপক্ষে সেই বসন্তদেশ এবং হেমন্ত দেশের উত্তরাধিকারিণী ছিল।
   সমস্ত দেশের রাজা ছির যুবক। ঐ রাজকুমারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা সমস্ত দেশের রাজারও ছিল। সে ঐ কথা রাজজ্যোতিষীর কাছে সগোপনে প্রকাশ করল।
   রাজজ্যোতিষী ঠিকুজী দেখে বলল, “মহারাজ আপনি তিনটি দেশের রাজা হবেন। এখন আপনি বসন্তদেশের রাজার কাছে দূত পাঠিযে জানিয়ে দিতে পারেন যে আপনার সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা যদি তিনি না করেন তাহলে আপনি তার দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। তারপর দেখা যাক কি হয়।”


   সমস্ত দেশের রাজা বসন্তদেশের রাজার কাছে জ্যোতিষীর কথামতই খবর পাঠাল। বসন্তদেশের রাজা তৎক্ষণাৎ সমস্ত দেশের রাজার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন।


   বেতাল এই কাহিনী বলে রাজা বিক্রমাদিত্যকে বলল, “রাজা, বসন্তদেশের রাজার মত একজন বীর রাজা সমস্তদেশের রাজার ছোট্ট হুমকিতে এতটা ভয় পেয়ে গেল কেন? অন্যর হাতেই তো চলে গেল নিজের দুটো দেশ। না কি বসন্ত রাজা নিজের বিরত্বের উপর বিশ্বাস হারিয়েছেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।”
   জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, “বসন্তদেশের রাজার জ্যোতিষীর কথার উপর পুরো বিশ্বাস ছিল। তাই তিনি জ্যোতিষীর কথামত চলেছেন। অন্য কোন দেশ জয় করার চেষ্টা করেননি। সমস্ত রাজা রাজজ্যোতিষী এই রহস্যটুকু ভালভাবেই জানত। সেই জন্যই সে সমস্ত দেশের রাজাকে ঐ পরামর্শ দিয়েছিল।”
   রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল।

(কল্পিত)
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য