ডাকাত সর্দার বিশ্বনাথ -যোগেন্দনাথ গুপ্ত

     সেকালে ত্রিবেণীতে জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন ছিলেন একজন বিখ্যাত পণ্ডিত। তাহার যেমন ছিল বিদ্যা, তেমনি ছিল অগাধ ধন-সম্পত্তি। একদিন সর্দার বিশ্বনাথ তর্ক পঞ্চাননের চতুষ্পাঠীতে আসিয়া বলিলেন: ‘তর্ক’ পঞ্চানন মহাশয়, শাস্ত্রে কৃপণের ধনে কাহার অধিকার লেখে?’
     তর্ক পঞ্চানন বলিলেন, ‘দস্যু, চোর ও রাজার’। বিশ্বনাথ তখন হাসিয়া বলিলেন: ‘পণ্ডিত মহাশয় একখানা ব্যবস্থাপত্র আমাকে দিতে হবে।’
     তর্ক পঞ্চানন বলিলেন, ‘ব্যবস্থাপত্র কি বাবু অমনি হয়। ব্যবস্থাপত্র নিতে একটি টাকা লাগবে।’
     বিশ্বানাথ তখনই একটি টাকা তর্ক পঞ্চাননের হাতে দিলেন। তর্ক পঞ্চাননও শাস্ত্রের ব্যবস্থা লিখিয়া দিলেন।
     ব্যবস্থাপত্ৰ লইয়া বিশ্বনাথ বলিলেন, মহাশয়, আমি বিখ্যাত দস্যু বিশ্বনাথ সর্দার। আপনার লিখিত এই শাস্ত্রের ব্যবস্থা অনুসারে, আপনার ধনে আমার  অধিকার, কারণ আপনি অতিশয় কৃপণ।
     বিশ্বনাথের নাম না জানে তখন এমন লোক ছিল না—দেশের লোক তখন বিশ্বনাথবাবুর নামে কাপিত।
      তর্ক পঞ্চানন বিশ্বনাথের নামে কাঁপিতেন! 
     সম্মুখে সশরীরে উপস্থিত দেখিয়া একেবারে হতজ্ঞান হইলেন। ভাবিলেন এতদিনের কর্মে সঞ্চিত অর্থ ত নিয়াছেই, আরও কত না জানি লাঞ্ছনা হয়। মুহুর্তমধ্যে বিশ্বনাথ যেমন বাঁশী বাজাইলেন, অমনি প্রায় দুই শত অস্ত্রধারী দস্যু আসিয়া তর্ক পঞ্চাননের বাড়ি ঘিরিয়া ফেলিল। তর্ক পঞ্চানন দস্যুদের ভীষণ আকৃতি দেখিয়া ভয়ে কাঁপিতে লাগিলেন।
     বিশ্বনাথ তখন হাসিমুখে তর্ক পঞ্চানন মহাশয়কে বলিলেন, মহাশয় ভয় পাবেন না। আমি কারো প্রতি কোন অত্যাচার করবো না...কিংবা অসৎ ব্যবহারও করবো না। মা ঠাকরুণদের চরণে আমার প্রণাম জানিয়ে বলে পাঠান যে, তারা নিজ বস্ত্র ও অলঙ্কার নিয়ে অন্য কারো গৃহে আশ্রয় নিন। আমি স্ত্রীলোকের ধন গ্রহণ করি না। কেবল আপনার ব্যবস্থা অনুসারে আপনার টাকা, কড়ি, স্বর্ণ, রৌপ্য ও বহু মূল্যবান দ্রব্যাদি যা আছে তাহাই নেবো।’
     কাজে তাহাই হইল। তর্ক পঞ্চাননের বহুকালের অর্থ আত্মসাৎ করিয়া সর্দার বিশ্বনাথ প্রস্থান করিলেন।
     শোনা যায় এ ঘটনার পর হইতে তর্ক পঞ্চানন আর কৃপণতা করেন নাই। একদিন নৈহাটির কাছে গঙ্গার পাড় দিয়া বিশ্বনাথবাবু চলিয়াছেন। দলের লোকেরা পেছনে আসিতেছে। একটা বটগাছের কাছে বড় একটি বকুল গাছের তলায় বসিয়া এক ব্রাহ্মণ কাঁদিতেছেন। বিশ্বনাথ কাছে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ঠাকুরমশাই, আপনি কাঁদছেন কেন?’
     ব্রাহ্মণ বলিলেন, ‘বাবা, আমি বড় গরিব। এক মা ভিন্ন ত্রি-সংসারে আমার কেউ ছিল না। রাঁধুনি বামুনের কাজ করে যা কিছু উপার্জন করতাম, সে-টাকা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতাম। মা সে টাকা ব্যয় না করে সুদে খাটিয়ে কিছু টাকা জমিয়ে আমার বিয়ে দিয়েছিলেন। অল্পদিন হলো আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। স্ত্রী আগেই মারা গেছে। আমি ভিক্ষা করে মার শ্রাদ্ধের জন্য প্রায় তিনশত টাকা সংগ্ৰহ করিয়াছি। কিন্তু পথে ডাকাতরা সে টাকা লুঠ করে নিয়েছে। এখন আমার এমন উপায় নেই যে মায়ের শ্রাদ্ধের কাজ সম্পন্ন করি’—এই বলিয়া ব্রাহ্মণ খুব কাঁদিতে লাগিলেন।
     ব্রাহ্মণের দুঃখে বিশ্বনাথবাবু দয়া হইল। তিনি ব্রাহ্মণকে তৎক্ষণাৎ এক সহস্র টাকা দিয়া বলিলেন—আর কাঁদবেন না। এই নিন, এতে আপনার মাতৃশ্ৰাদ্ধ ও বিয়ে দুই-ই হবে।’
     ব্রাহ্মণ অর্থ পাইয়া তাহাকে প্রাণ ভরিয়া আশীর্বাদ করিতে করিতে চলিয়া গেলেন।
    কার্তিকের শেষ অন্ধকার রাত্রি। ঘন বন-জঙ্গলে ঢাকা পল্লীগ্রাম। বিশ্বনাথবাবু বারান্দায় বসিয়া গড়গড়া টানিতেছেন। তাহার দলের লোকেরা— কোথায় ডাকাতি করিতে যাওয়া যাইতে পারে, কোন জেলায় কোন অঞ্চলে লিখন বা চিঠি যাইবে, সে বিষয়ে আলোচনা করিতেছিল। বিশ্বনাথ শুনিতেছিলেন এবং সে অনুসারে ব্যবস্থা করিতেছিল। ক্রমে ক্রমে রাত্রি গভীর হইয়া আসিল। গ্রাম নিস্তব্ধ হইয়া আসিতেছে। কুকুরেরা মাঝে মাঝে চিৎকার করিতেছে। শেয়ালের দল—হুক্কা—হুয়া করিয়া চিৎকার করিতেছে। শীতের বাতাস শীর্ণ গাছের পাতা কাঁপাইয়া বহিয়া যাইতেছে।
     এমন সময় দূর হইতে শোনা গেল, ভীষণ হল্লা—শত শত লোকের করুণ আর্তনাদ, বিশ্বনাথ, বৈদ্যনাথ, কাশীনাথ ও দলের অন্যান্য ডাকাতেরা উৎকর্ণ হইয়া শুনিতেছিল সেই বিকট চিৎকার।
     বিশ্বনাথ বলিলেন, ‘বৈদ্যনাথ, এ কিসের চিৎকার? কারা আসছে এদিকে?...কাশীনাথ, খোজ নাও ত একবার। কাশীনাথ একটু পথ অগ্রসর হইয়া ফিরিয়া আসিয়া বলিল,‘সর্দার লোকগুলো লন্ঠন হাতে করে পিদিম জ্বালিয়ে এদিকেই আসছে যে। বোধ হয় ওরা নীল চাষীর দল।
     বিশ্বনাথ একটি কথাও বলিলেন না। নীরবে গড়গড়া টানিতে লাগিলেন! এমন সময়ে পিপীলিকার সারির মতো প্রায় শতাধিক লোক করুণ ক্ৰন্দনে চারিদিক মুখরিত করিয়া বিশ্বনাথের বাড়ির সামনের বিরাট মাঠের মাঝে আসিয়া উপস্থিত হইল। একসঙ্গে সকলে করুণস্বরে বলিল,—সর্দার, আমাদের বাঁচান। আমাদের মান সন্ত্রম নীলকর সাহেবের হাত হতে রক্ষা করুন। বাঁচান সর্দার।’
     বিশ্বনাথ ক্রুদ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে বলিলেন, কি হয়েছে তোদের? কি হয়েছে? বল না ?
     নীল চাষীদের একজন মণ্ডল—রক্তাক্ত কলেবরে দাঁড়াইয়া বলিল, “এই দেখ। এই দেখ, কোড়া মেরে আমার পিঠ ঘায়েল করে দিয়েছে, পিঠ কেটে গেছে—দেখ দেখ সকলের দিকে চেয়ে দেখ বিশ্বনাথ বাবু।
     ‘কে করলে তোদের প্রতি এমন নির্মম অত্যাচার। কে তারা। কে সে? 
     তারা নীল কুঠির সাহেব। জানিস ত সব! আমাদের খেজুর বাগান নষ্ট করে নীল বুনিয়েছে। জোর করে ধরে নিয়ে বন্দী করে মেরেছে বেত, মেরেছে জুতো। দেড় মাসের মধ্যে চৌদ্দ কুঠির জল খাইয়েছে। আমরা যখন নীল বুনতে রাজী হইনি তখনি সাহেব হুকুম দিয়েছেন বেটাদের ধরে এনে সাত কুঠির জল খাওয়াও। ভিন্ন ভিন্ন কুঠিতে ঘুরিয়ে এনে না খাইয়ে জুতো মেরে আর বেত মেরে কি হাল হয়েছে।’
     ‘একবার চেয়ে দেখ! বিশ্বনাথ বাবু।’
     বিশ্বনাথ বাবু বলিলেন, হারে তোরা মানুষ না কুকুর? আধমরা সাপটাও একবার শক্রকে কামড়াবার জন্য ফণা তুলে ওঠে, আর তোরা এতগুলো মানুষ নীলকর সাহেব বেটাদেরও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে তাদের মাথা ভেঙে চুরমার করে চূণীর জলে ভাসিয়ে দিতে পারলি না।’
     —পারলাম কই ? 
     —তবে মরলি না কেন ? 
     —মরতে পারলাম কই ? 
     —ব-টেরে! তবে আমার কাছে কি চাস ? 
     —আমাদের বাঁচাতে হবে নীল কুঠির সাহেবদের হাত হতে। দোহাই তোমার সর্দার। আমাদের রক্ষা কর, রক্ষা কর।
     একসঙ্গে চিৎকার করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল চাষীর দল। বিশ্বনাথ বলিলেন। চটপট কুঠির সাহেবদের নাম বল না মণ্ডল। 
 পাঁচু মণ্ডল বলিল,‘ফেড্ডি (Mr. Faddy), লেডিয়ার্ড (Mr. Lediard)।
     বিশ্বনাথ বলিয়া উঠিলেন, মায়ের নামে শপথ কর। তোরা কারো কাছে আমাদের দলের কথা বলবি না। আর দলের গোয়েন্দার কাছে খবর দিবি.......কোন বেটা সাহেবের খবর যোগায় বুঝলি?’
     প্রজারা দলে দলে সেই নিবিড় নিশীথে বিশ্বনাথের গৃহ-সংলগ্ন ভীষণ দর্শনা জগজ্জননীর মন্দিরের দ্বারে প্রতিজ্ঞা করিল অন্যায়ের প্রতিশোধ তারা নিবে।
     তারপর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া নীলচাষীর দল অন্ধকারে অদৃশ্য হইল। একদিন ফেড্ডি সাহেব কুঠির বারান্দায় চেয়ারে বসিয়া চা পান করিতেছেন এমন সময় একটা লোক তাহার টেবিলের ওপর একখানা চিঠি রাখিয়া পলকের মধ্যে মিলাইয়া গেল। ফেড্ডি সাহেব চিঠিখানা খুলিয়া পড়িলেন। চিঠিতে লিখিত আছে।
     ফেড্ডি সাহেব সাবধান। তুমি নীল চাষীদের ওপর যে অত্যাচার করেছ এবং করছো তার জন্য উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হবে। যে-কোন দিন সুযোগমতো তোমার কুঠি লুঠ করবো। সাবধান—বিশ্বনাথ সর্দার।
     ফেড্ডি সাহেব এইরূপে চিঠি পাইয়া চমকিয়া উঠিলেন। আপনার মনে বলিয়া উঠিলেন ‘The famous out law, by name Biswanath Sardar, who had for years terroized the district! Awful'. সাহেব তৎক্ষণাৎ ঘোড়সোয়ার পাঠাইলেন নদীয়ার ম্যাজিষ্ট্রেট (Mr. Banquire) সাহেবের কাছে বিশ্বনাথের চিঠিসহ উপযুক্ত পুলিশ দারোগা পাঠাইয়া তাহাদিগকে বিশ্বনাথের আক্রমণ হইতে রক্ষা করার জন্য।
     ঘোড়সোয়ার বেগে কৃষ্ণনগরের দিকে ছুটিয়া গেল। সাহেব তাহার বিশ্বস্ত ভৃত্য জয়নালকে কুঠিরের চারিদিকের বন-পথে, গায়ের কিনারায় গোপন সন্ধান লইতে নিযুক্ত করিলেন। সাহেব নিজেও সতর্ক হইলেন পাইক বরকন্দাজ, লাঠিয়াল, তীরন্দাজ, বন্দুক-ধারী সব সতর্ক প্রহরী রইল কুঠির চারদিকে বেড়িয়া। ফেড্ডি ও লেডিয়ার্ড কৃষ্ণনগর হইতে পুলিশ ফৌজের আগমনের জন্য উৎকণ্ঠিত ভাবে প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন।
     রাত্রি শেষ হইয়া আসিয়াছে, মিঃ ফিড্ডি ও লেডিয়ার্ড সারারাত জাগিয়া দস্যুদের আগমনের প্রতীক্ষা করিয়া সবে বাংলোর ভিতরে প্রবেশ করিয়াছেন। এমন সময় বিশ্বনাথ সর্দার তাহার আটজন মাত্র দলের লোক লইয়া দেওয়াল টপকাইয়া বাংলোর কাছে আসিয়া পড়িলেন। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছিল। দশমীর চাঁদ ডুবিয়া গিয়াছে। শেষরাত্রির ঘনবর্ষণে আর ঠাণ্ডা বাতাসে লোকজন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। বিশ্বনাথ সিঁড়ি বাহিয়া ওপরে উঠিলেন, আর একটা জানালা ভাঙ্গিয়া সাহেবদের শুইবার ঘরে প্রবেশ করিলেন।
দুমদাম্ গুডুম শব্দে ঘরের লণ্ঠনগুলি ভাঙ্গিয়া পড়িল। বিশ্বনাথ ও তাহার দুইজন সঙ্গী পলক মধ্যে এই কাজটি করিয়া ফেলিলেন।
     মিঃ ফেড্ডি ও লেডিয়ার্ড সামান্য একটু নিদ্রাভিভূত হইয়াছিলেন। ভীষণ শব্দে জাগিয়া দেখিলেন ঘর অন্ধকার। বাইরে মেঘের ঘন ঘন গর্জন আর ঘরের ভিতরে ও বাহিরে ডাকাতদলের কল কল শব্দ। সাহেব দুইজন দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হইয়া অসীম সাহসের সহিত বন্দুক ছুঁড়িতে লাগিলেন। ব্যর্থ হইল সব গুলি। সাহেব দুইজন নিরুপায়। বিশ্বনাথের গুলির ঘায়ে সাহেব দুইজনের পায়ের গোড়ালি ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। এবার দু’জনকে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া ফেলা হইল। বরকন্দাজ, পাইক ও কুঠিরের অন্যান্য সব লোক লাঠি-শোটা, বন্দুক লইয়া ছুটিয়া আসিল—কিন্তু এক পাও যাইতে পারিল না! গুডুম গুডুম শব্দে হতভম্ব সাহেবদের হাতের বন্দুক, রিভলবার, পিস্তল ডাকাতেরা সব কাড়িয়া লইয়াছিল।
    ফেড্ডি চারিজন ডাকাত শক্ত করিয়া বাঁধিয়া তাঁহার হাতের বন্দুক কাড়িয়া লইয়া এমনভাবে প্রহার করিতে লাগিল যে তাহার সামান্য নড়িবার শক্তি রহিল না। ফেড্ডি প্রাণপণে শত্রুর আক্রমণ হইতে নিজেকে রক্ষা করিবার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইলেন এবং একেবারে হতচেতন হইয়া পড়িলেন। লেডিয়ার্ড সাহেবের বুকের উপর একজন ডাকাত এমন জোরে একটা বল্লম নিক্ষেপ করিয়াছিল যে তিনিও হত-চেতন হইয়া লুটিয়া পড়িলেন। নিরুপায় ফেড্ডি ও লেডিয়ার্ড রক্তাক্ত দেহে হস্তপদ বদ্ধ অবস্থায় মেঝেতে পড়িয়া রহিলেন।
     বিশ্বনাথ ও তাহার আটজন সঙ্গী সাহেবের বাংলোর সমুদয় আর জিনিষপত্র তছনছ করিয়া টাকা কড়ি যা কিছু ছিল লুটিয়া লইল। তারপর দুইজন দূরে চুর্ণ নদীর প্রান্তদেশে এক নিবিড় অরণ্যমধ্যে ভীষণ কালীমূর্তির নিকট টানিতে টানিতে লইয়া গেল। হতভাগ্য নীলকর সাহেব দুইজন এইরূপে নিবিড় বনে পড়িয়া রহিল মৃত্যুর প্রতীক্ষায়! প্রত্যুষে নগদ সাতশত টাকা, ঘরের সমুদয় বন্দুক, পিস্তল, তরোয়াল, চাবুক, কাগজপত্র, দলিলের স্টাম্প, চাষীদের দস্তখতি কাগজ সব কিছু কাড়িয়া লইয়া ডাকাত দল চলিয়া গেল। যাইবার সময় পাইক, বরকন্দাজ ও লাঠিয়ালদের বাড়িতে আগুন ধরাইয়া দিয়া জ্বালাইয়া পোড়াইয়া হা-রে-রে শব্দে চারিদিক সন্ত্রস্ত ও ভীত চকিত করিয়া ডাকাত দল প্রস্থান করিল।
     সাহেবদের বিশেষত নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সর্দার বিশ্বনাথই সর্বপ্রথম ভীষণভাবে বীরত্বের সহিত দণ্ডায়মান হইয়াছিলেন এবং সমুচিত দণ্ড বিধান করিয়াছিলেন। অত্যাচারিত উৎপীড়িত নীল চাষীরা সর্বপ্রথম পাইয়াছিল উপযুক্ত প্রতিবিধান। বিশ্বনাথের এই নির্ভীক সাহসিকতা ও তেজস্বিতার বলে বহুদিন পর্যন্ত নদীয়া জেলার নীলকর সাহেবরা প্রশান্ত মূর্তি ধারণ করিয়াছিল। বিশ্বনাথ এই সব কারণে জন-সমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়াছিলেন। নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে এইরূপ অস্ত্ৰধারণ ও তাহাদিগকে দমন করা বিশ্বনাথ সর্দারের এক অপূর্ব কীর্তি। নীলকুঠির সাহেবরা দাঙ্গা করিয়া ফৌজদারী মকদ্দমা বাঁধাইল। উভয়পক্ষের কত লোক খুন-জখম করিয়াছে এবং কত লোককে সর্বস্বাস্ত করিয়াছে তাহার অবধি ছিল না। বিশ্বনাথের বীরত্বে এই সব অত্যাচার বিশেষভাবে দমিত হইয়াছিল। বাংলার ডাকাতের ইতিহাসে নীলকর দমনের ইতিবৃত্তে তিনি চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য