বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ১৩তম উপাখ্যান

    পরদিন ত্রয়োদশ পুতুল বলল, মহারাজ, আমার নাম জনমোহিনী। বিক্রমাদিত্য সম্পর্কে আর একটি গল্প শুনুন।
বিক্রমাদিত্য একবার যোগীবেশে দেশ পরিভ্রমণে বেরোলেন। গ্রামে এক রাত ও শহরে পাঁচ রাত এইভাবে তিনি কাটাতে লাগলেন ।
একদিন তিনি এক নগরে এসে পৌছলেন। সেই নগরের কাছে নদীতীরে একটি মন্দির আছে। মন্দিরের চাতালে বসে মহাজনরা প্রাচীন পুরাণ পৌরণিকদের মুখে শোনেন। রাজাও স্নান করে সেই চাতালে বসে পুরাণ শুনতে লাগলেন।
    পৌরণিকরা পরোপকারের কথা বলছিলেন-- ধন, ঐশ্বর্য, এ সবই চিরদিনের জন্য স্থায়ী নয়। একমাত্র ধর্ম-কর্ম চিরদিনের, কোটি কোটি গ্রন্থে লেখা আছে, যে পরোপকার করে সেই পুণ্যবান এবং পরকে যে দুঃখ দেয় সেই পাপী। যে দুঃখিতকে দেখে নিজে দুঃখ পায় এবং সুখীকে দেখে নিজে সুখী হয় সেই প্রকৃত ধাৰ্মিক।
    যাঁরা শুনছিলেন তাঁরা সায় দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে নদী পার হতে গিয়ে প্রবল শ্রোতে ভেসে গেলেন। ভাসতে ভাসতে বেচারি আকুলভাবে ডাকতে লাগলেন, মহাজনরা, শীঘ্র আসুন, আমরা জলে ডুবে মারা গেলাম। আপনারা আমাদের এ বিপদ থেকে শীঘ্র উদ্ধার করুন।
    সকলেই জলে ভাসমান ব্রাহ্মণের দিকে তাকিয়ে রইল, কেউ এক পা নড়ল না তাঁদের বাঁচানোর জন্য। একমাত্র বিক্রমাদিত্য নদীতে লাফ দিয়ে পড়ে প্রবল স্রোত হতে ব্ৰাহ্মণ এবং তাঁর স্ত্রীকে উদ্ধার করলেন।
    তারপর ব্রাহ্মণ সুস্থ হয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যকে বললেন, হে মহাপুরুষ, আপনি আমায় প্রাণদান করে যে পরোপকার করলেন আমি তার প্রতিদানে আপনার কিছু উপকার করতে চাই। এই গোদাবরীর জলের মধ্যে বার বছর ধরে মন্ত্র জপ করে যে পুণ্যফল পেয়েছি তা আপনাকে দান করলাম। তার চান্দ্রয়ানি কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে আমার যা পুণ্য হয়েছে তাও আপনাকে দিলাম। এই বলে ব্রাহ্মণ রাজাকে আশীর্বাদ করে চলে গেলেন;
    এমন সময় এক ভয়ঙ্কর রাক্ষস বিক্রমাদিত্যের কাছে এসে উপস্থিত হলো। তাকে দেখে রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে?
    --আমি এক ব্ৰাহ্মণ, এই নগরেই আমার বাস। আমি দুষ্কৃতি করে সারা জীবন কাটিয়েছি। সব সময় গুরু, সাধু ও মহাজনদের নিন্দা করতাম, সেই পাপের ফলে ব্ৰহ্মরাক্ষস হয়ে আজ এই গাছে দশ হাজার বছর অতি কষ্টে আছি। আপনি যদি আজ দয়া করেন, তবে আমি উদ্ধার হব।
    রাজা এ কথা শুনে আগে পাওয়া সমস্ত পুণ্য ব্ৰহ্মরাক্ষসকে দান করলেন। ব্রহ্মরাক্ষস সেই পুণ্যফলে দিব্যরূপ লাভ করে রাজার প্রশংসা করে স্বৰ্গে চলে গেল। রাজাও তাঁর রাজধানী উজ্জয়িনীতে ফিরে এলেন।
আপনার যদি এমন পরোপকার গুণ থাকে এবং যদি এমন দাতা হয়ে থাকেন তবে সিংহাসনে বসুন। 
    ভোজরাজ মাথা হেট করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য