Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

     আমার খালাতো ভাই টিংকু এসএসসি পরীক্ষায় তিন তিনবার ফেল মেরেছে। তাই বলে দমবার পাত্র সে নয়। এবারও সে পরীক্ষাটা দেবে। তবে এবার আর ঢাকায় ...

ভূত ফোবিয়া -- লুৎফর চৌধুরী

     আমার খালাতো ভাই টিংকু এসএসসি পরীক্ষায় তিন তিনবার ফেল মেরেছে। তাই বলে দমবার পাত্র সে নয়। এবারও সে পরীক্ষাটা দেবে। তবে এবার আর ঢাকায় নয় মফস্বলে। মফস্বলে পরীক্ষা সেন্টার নাকি একটু লুজ থাকে। সেই চান্সটাই এবার নিতে চাচ্ছে আমাদের টিংকু। আমাদের ছোট মামা ইদ্রিস তিনি থাকেন সখীপুরে। রাজস্ব বিভাগে কি একটা চাকরি করেন। গত পরশু তাঁর এক দীর্ঘ চিঠি এসেছে। সেই চিঠি থেকেই জানা গেল সখীপুরে তিনি টিংকুর জন্য পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। তবে মামা তার নিজের সঙ্গে টিংকুর থাকার ব্যবস্থা করতে পারেননি। কারণ তাঁর নিজের বলতে কোন জায়গা নেই। তিনি থাকেন এক চা স্টল কাম হোটেলে। চা স্টলের মালিক খোদাবক্স। তার সঙ্গে মামার খুব খাতির। সেই সুবাদে চা স্টল কাম হোটেলে তিনি খান এবং ঘুমান। মামা হোটেলটির নাম দিয়েছেন ফয়েটস রেস্টুরেন্ট। রাত দশটার দিকে ফয়েটস রেস্টুরেন্টে কাস্টমারদের ভিড় কমে এলে মামা কাঁথা বালিস বগলদাবী করে ছুটেন। তারপর দুটি নোংরা ডাইনিং টেবিল একত্র করে বিছানা পাতেন এবং ঘুমান ; এখানে ওখানে ঝুল, তল্লা বাঁশের পার্টিশানের ওপারে থেকে উচ্ছিষ্ট মাছের দুর্গন্ধ ভুরভুর করে ভেসে আসছে। ডাইনিং টেবিলের নিচেই ফেলে দেয়। চা পাতার স্তুপে মাছি ঘিন ঘিন করছে। ছিছি ঘেন্নায় মরি। কোথায় মামা একটু ডাকবাংলো টাংলোয় থাকবেন তা না। তবু ভাল যে টিংকুর থাকার ব্যবস্থাটা স্থানীয় জমিদার বাড়িতে করেছেন। আসলে মামার বুদ্ধি ভাল, তারিফ করতে ইচ্ছে করে।

    সেদিন সন্ধ্যে হতেই টিংকু হই হই করে আমাদের বাসায় ঢুকেই বলল, বুঝেছিস রিন্টু, তোকে কিন্তু ছাড়ছিনে সঙ্গে
যেতে হবে। টিকিট কাটা হয়ে গেছে। পাঁচ তারিখ সকাল সাতটায় তুর্না নিশিথা ছাড়বে। টিংকুর আচমকা এই প্রস্তাবে প্রথমে আমি খানিকটা গম্ভীরতা অবলম্বন করলাম। যেন আমি রাজি নই। আসলে এ তো লুফে নেয়ার মত প্রস্তাব। আমি চাচ্ছি মাকে সে একটু ম্যানেজ করুক। মফস্বল পরীক্ষা কেন্দ্র সম্পর্কে আমার যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। কাজেই এই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাক তা আমি চাই না। মার স্বভাবটা আবার আমি জানি, আমি কোথাও যেতে চাইলে যেতে দেবেন না, আবার না চাইলে দেবেন। আমাকে গম্ভীর হতে দেখেই টিংকু বুঝে গেছে অসুবিধেটা কোথায়। সুতরাং মার কাছে থেকে পারমিশান বাগাতে তার আর বেগ পেতে হলো না। সামনে ছিল মাত্র দুদিন আমি মহাআনন্দে সব গুছিয়ে নিলাম! মহাআনন্দের বড় কারণটা হচ্ছে ওসব মফস্বলে কেন্দ্রে দারুন অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করা যায়। পত্রিকার পাতায় যেসব খবর দেখি তাতে আমার তাই ধারণা। পরিদর্শকরা নাকি হলে চটের বস্তা নিয়ে ঢুকেন। এসব বস্তায় নকল সংগ্রহ করা হয়। হলের বাইরে বসে নোট বইয়ের মেলা। কখনও কখনও ভূয়া পরীক্ষার্থও ধরা পড়ে। সবচেয়ে উৎকণ্ঠা থাকে গার্জেনদের। তারা নাকি ভাত তরকারী পর্যন্ত নিয়ে হলের বাইরে বসে থাকেন। মজাদার এসব ঘটনাবলী টিংকুর সুবাদে দেখার সৌভাগ্য যদি আমার হয় ক্ষতি কি।
    অতএব নির্ধারিত দিনে ব্যাগ বোচকা নিয়ে ছুটলাম ট্রেন স্টেশানের দিকে। সেখানে আমাদের বিদায় জানালেন টিংকুর বাবা মা অর্থাৎ আমার খালা খালু। ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি খালা আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। ততক্ষণে তুর্না নিশিথা চলতে শুরু করেছে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমন করে। আমাদের টিংকু উচ্চশিক্ষার্থে রাজধানী ছেড়ে মফস্বল চললো।
    সন্ধ্যার পরপরই আমরা সখীপুর পৌছুলাম। স্টেশান থেকে প্রায় ষোল কিলোমিটার গরুর গাড়িতে। মামা গাড়ি পাঠিয়েছিলেন। পাহাড়ি পথ। চড়াই উৎরাই। চারদিকে গজারীবন! বাড়িঘর খুব একটা চোখেই পড়ে না।
    মামার সেই বিখ্যাত ফয়েটস রেস্টরেন্টে খেয়ে দেয়ে আমরা ছুটলাম গড়গোবিন্দপুর জমিদার বাড়িতে। সেখানেই আমরা থাকব। জমিদার বাড়িটি দোতলা। প্রায় এক দেড়শ বছরের পুরনো। ভবনের কার্নিশে ফাটল। এখানে সেখানে ঝোপজঙ্গল চারদিকে প্রাচীর ঘেরা। গ্রামের অন্য বাড়িগুলো এ বাড়ি থেকে বেশ দূরে দূরে। কাজেই এ বাড়িতে ব্যবস্থা হয়েছে ওপর তলায়। নিচতলায় একজন চিত্রশিল্পী থাকেন। মামা বললেন খুব ভাল ছবি আঁকেন। একটা আর্ট মিউজিয়াম আছে সকালে গিয়ে দেখে আসিস। দেখে আসব বলে আমরা সায় দিলাম।
    বেশ কদিন পরের কথা। টিংকুর পরীক্ষা ভালই হচ্ছিল। কিন্তু টিংকুর মত একজন আদু ভাইয়ের পরীক্ষা ভাল হচ্ছে কী করে এর রহস্য আমরা ধরতে পারছিলাম না। টিংকুর যা ভুলো মন। ওদের বাড়ির নম্বরটা ঠিক মত মনে রাখতে পারেনা। এখানে এসেও যা একবার পড়ে তাই মনে থাকে। ব্যাপারটা কী। এ বাড়িতে কিছু আছে নাকি? আমি মনে মনে ভাবি আর এখানে ওখানে কী যেন খুঁজি। সেদিন খুঁজতে খুঁজতে শিল্পীর মিউজিয়ামে ঢুকলাম। দেখি একটা কংকাল। শিল্পী বললেন, কংকালটি তিনি মডেল হিসেবে ব্যবহার করেন। কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ ! আমি আর দেরি না করে উপরে চলে আসি। মামা বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা দৈনিক পত্রিকা পড়ছেন। আমি বললাম এত সকলে এখানে পত্রিকা আসে মামা? মামা হাসলেন, তারপর একটু কটাক্ষ ভঙ্গিতে বললেন, আজকের পত্রিকা দেখলি কোথায় এটাতো কালকের। এখানে একদিন লেটে পত্রিকা পৌঁছে। আমি আর কথা বাড়ালাম না। বললাম, মামা এখানে পাশাপাশি দুটো বড় দিঘী দেখলাম। আমার কথা হচ্ছে দুটাে না হয়ে একটা হলে কি হতো? মামা বললেন হতে হতো। এদুটোকে বলে কাটানী বাড়ানি দিঘী। এইযে জমিদার বাড়ি দেখছিস তাঁর পরদাদা মাটি কাটতেন আর পরদাদী অন্যের বাড়ি ঢেকিতে
ধান ভানার কাজ করতেন। পরদাদা মাটি কেটে কেটে পয়সা জমিয়ে এ দিঘী খনন করেছিলেন আর পরদাদী ধান ভানার কাজ করে পয়সা জমিয়ে এদিঘী খনন করেছিলেন এজন্যই এর নাম কাটানী বাড়ানি দিঘী। ধান ভাংগাকে ওরা বলত বাড়া ভানা এজন্য বাড়নি। দিঘীর কি দেখেছিস কাল মনে করিস দেখিয়ে আনব! থৈ মেলে না, এপাড় থেকে ওপাড় দেখাই যায় না। দেওদিঘী ইছাদিঘী সাগরদী।
    আমি বললাম,মামা থাক আর বলতে হবে না। এই নিয়ে এককথা তিনদিন বললে। মামা বললেন, বলিস কিরে আগে বলবি না। বলে মামা চুপসে গেলেন। পরদিন মামা আমাদের একটা দিঘীর পাড়ে নিয়ে এলেন। বললেন, এই সেই দিঘী যেটা তোদের দেখাতে চেয়েছিলাম। ওপাড়ে ওই যে গ্রামটা দেখা যাচ্ছে ওপাড়ের মানুষ এপাড়ের এগ্রামের মানুষকে চেনেই না, হা হা। তা জানিস কি এর নাম? আমি বললাম, নাতো।
    মামা বললেন এর নাম দেওদিঘী। দেওদানবরা কেটে ছিল। দেখনা চারপাশে কেমন জঙ্গল। মামার কথা শুনে টিংকু বললো, মামা জায়গাটা খুব সুবিধের মনে হচ্ছে না। কেমন ভয় ভয় লাগছে। টিংকুর কথা শুনে আমারও গা ছম ছম করে উঠল। আসলে জমিদার বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই আমার কেমন যেন লাগছিল। রাতে ঘুম হচ্ছিল না। কিন্তু সাহস করে কাউকে কিছু বলিনি। এখন বলেই ফেললাম, মামা রাতে ছাদের ওপর কারা যেন হাটাহঁটি করে।
    মামা অবাক হয়ে বললেন, বলিস কি ? 
    টিংকু বললো, মামা একদম ঠিক। আমারও ঘুম হয় না।
   সেরাতে সাড়ে আটটার দিকে খেয়ে দেয়ে টিংকু বলল, রিন্টু শিল্পীর রুমে টিভি আছে না। আমি মাথা নাড়ালাম। টিংকু মামাকে বলল, একঘণ্টা ছুটি চাই।
    কেন ?
    নিচে যাব? টি ভি দেখব। ইমাদাদুল হক মিলনের ধারাবাহিক নাটক রূপনগর।
    সেতো মঙ্গলবারে হয়। আজতো বুধবার।
    তুমি যে বললে এখানে একদিন লেটে পত্রিকা পৌছোয়।
    তাই বলে টিভি প্রোগ্রাম একদিন লেটে হবে নাকি গাধা কোথাকার।
    শুধু গাধা নয় ও একটা ভাল টাইপের গাধা বলেই আমি হাসিতে ফেটে পড়লাম। মামাও অনেকক্ষণ হাসলেন। তারপর বললেন, রাগ করেনা টিংকু। আসলে ও কিন্তু ভাল পরীক্ষা দিচ্ছে রিন্টু।
    আমি বললাম, রাতে ঘুম কম হচ্ছে বলেই ওর পরীক্ষাটা কিন্তু ভাল হচ্ছে মামা। দেখবে মামা ও এবারের চান্সে পাশ করবে ।
    মামা কিছু বলতে যাবেন এ সময় ছাদে দুটাে টিল এসে পড়ল। মামা চমকে উঠলেন।
    আমার আর টিংকুর ভাব গতিতে তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। কারণ এ ধরনের শব্দ আমরা আগে থেকেই শুনে আসছিলাম। তা সত্ত্বেও আমরা পুরো পরীক্ষার পিরিয়ডটা অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু মামা এত ভয়কাতুরে তাতো জানতাম না।
    ভোরের দিকে এসে চোখে মেলে দেখি মামা চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে। সারারাত ঘর জুড়ে পায়চারি করে বেড়িয়েছেন। আজ ছাদের ওপর হাটাচলার শব্দ আরো বেড়ে গিয়েছিল। শেষদিকে নুপুরের শব্দও পাওয়া গেছে। কাজেই মামা একদম চোখ বুজোতে পারেননি। সকাল সাতটার দিকে মামার ঘুম ভাঙল। তিনি চেয়ার ছেড়ে চোখ রগড়াতে রগড়াতে নিচে নেমে গেলেন। একটু পরেই হাফাতে হাফাতে ফিরে এসে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন। আমি আর টিংকু একসঙ্গে বলে উঠলাম, কী হয়েছে মামা? মামা কোন কথা বললেন না ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললাম টিংকু মামা খারাপ কিছু দেখলেন নাকি চলতো নিচে ।
    টিংকুও বলল, হ্যাঁ চল। মামার এই অবস্থা দেখে আমাদের ভয়াঁ বেড়ে গিয়েছিল। নিচে গেলাম। শিল্পীর রুমে দরজা ফাঁক করতেই টিংকু একটা চিৎকার দিল। সঙ্গে সঙ্গে আমিও দেখে ফেললাম শিল্পী মেঝেতে পড়ে আছেন। পাশেই পড়ে আছে কংকালটা। কংকালের একটা হাত শিল্পীর গলা চেপে ধরে আছে। শিল্পী মারা গেছেন। তাঁর চোখেমুখে ভয়ের ছাপ।

শেষ কথা
ঢাকায় ফেরার পর ঘটনার বিবরণ শুনে বাবা বললেন, সে রাতে ভূমিকম্প হয়েছিল। ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অদূরে। রিকটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫.৮। ভূকম্পনে কংকালটা শিল্পীর ওপর পড়ে গিয়ে থাকবে। হঠাৎ করে একটা কংকাল পড়ে গিয়ে এবং নড়াচড়া করায় শিল্পী হার্ট ফেল করে মারা যেতে পারেন। বাবার একথা সত্ত্বনার ছিল না সত্যি এটি কোন ভৌতিক কাণ্ড আজও জানি না।

0 coment�rios: