বারো ভাইদের গল্প -- জার্মানের রূপকথা

    অনেকদিন আগে এক ছিলেন রাজা আর এক ছিলেন রানী । তাদের আনন্দের সংসারে ছিল বারোটি সন্তান । কিন্তু সবকটাই ছেলে । রানীকে রাজা একদিন বললেন, “এর পর যদি তোমার মেয়ে হয় তা হলে বারোটি "ছেলেকেই মেরে ফেলব যাতে আমার সব ধনদৌলত আর গোটা রাজত্ব সেই মেয়ে পায় ।” এই-না বলে তিনি মৃত্যু-বালিশ সমেত বারোটা কফিনও তৈরি করিয়ে রাখলেন । কফিনগুলো একটা খালি ঘরে তালাবন্ধ করে রেখে রানীর হাতে চাবিটা দিয়ে তাকে তিনি বললেন সে কথা কাউকে না বলতে । রানীর খুব মন খারাপ হয়ে গেল । সারাদিন তিনি কান্নাকাটি করলেন ।
ছোটো ছেলেটি সব সময় থাকত রানীর কাছে । বাইবেল থেকে তার নাম দিয়েছিলেন বেনজামিন । রানীকে সে বলল, “মা, তুমি অমন মন খারাপ করে কেন রয়েছ ?”
    রানী বললেন, “বাছা, সে কথা তোমায় বলা বারণ ।”
    কিন্তু কারণটা না শুনে ছোটো ছেলে ছাড়ল না । রানী তাকে সেই তালা-বন্ধ ঘরে নিয়ে গিয়ে কফিনগুলো দেখালেন ।
দেখিয়ে রানী বললেন, “বাছা, তোর আর তোর ভাইদের জন্যে রাজা -এই কফিনগুলো তৈরি করিয়েছেন । তোদের কোনো বোন হলে তোদের মেরে এই কফিনগুলোয় রাখা হবে ।”
    বলতে বলতে রানী অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। দেখে তার ছোটো ছেলে সাত্বনা দিয়ে বলল, “মামণি, কেঁদো না। আমরা পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাব ।”
   রানী বললেন, “তাই কর । এগারো ভাইদের নিয়ে বনে পালা । সেখানকার সব চেয়ে উঁচু গাছে চড়ে লক্ষ্য রাখিস দুর্গের গম্বুজের ওপর । তোদের ভাই হলে সেখানে সাদা পতাকা উড়বে। সেটা দেখলে ফিরিস । কিন্তু তোদের বোন হলে লাল পতাকা উড়বে। সেটা দেখলে প্রাণ নিয়ে পালাস । ভগবান তোদের যেন রক্ষে করেন । প্রতি রাতে আমি প্রার্থনা করব শীতকালে তোরা যেন শরীর তাতাবার আগুন পাস, গ্ৰীস্মকালে যেন পাস শরীর জুড়োবার ছায়া ।”
    মায়ের আশীবাদ নিয়ে ছেলেরা বনে চলে গেল। সেখানকার সব চেয়ে
    উচু ওকগাছে চড়ে পালা করে তারা লক্ষ্য রাখতে লাগল গম্বুজটার উপর । এগারোদিন বাদে লক্ষ্য করার পালা এল বেনজামিনের। গাছে চড়ে সে দেখে একটা পতাকা উড়ছে। কিন্তু সেটার রঙ সাদা নয়, টকটকে লাল। অর্থাৎ সেটা তাদের মৃত্যুর পরোয়ানা।
   খবর শুনে তার ভাইরা সবাই ভীষণ রেগে বলল, “একটা মেয়ের জন্যে সবাই আমরা মরব কেন ? আমরা প্রতিজ্ঞা করছি এর প্রতিশোধ নেব । যেখানেই কোনো মেয়ে দেখব, তার রক্তগঙ্গা বওয়াবো ।”
এই-না বলে তারা চলে গেল বনের গভীরে । বনের মাঝখানে ছিল একটা খালি মায়াবী কুটির । তারা বলল, “এখানে আমরা থাকব । বেনজামিন, তুই সব চেয়ে ছোটো আর সব চেয়ে দুর্বল আমরা খাবারের খোজে বেরুবো তুই এখানে থেকে বাড়ি আগলাবি ।”
   প্রতিদিন তারা বনে বেরিয়ে খরগোশ, হরিণ, পাখি আর বুনো পায়রা মেরে আনে । বেনজামিন সেগুলো রাধেবাড়ে আর সবাই মিলে পেট ভরে থায় । এইভাবে দেখতে দেখতে সেই কুড়ে ঘরে তাদের দশটা বছর কেটে গেল ।
এদিকে রানীর ছোটো মেয়েটি বড়ো হয়ে উঠল । তার মুখ যেমন সুন্দর মন তেমনি নরম । কপালে তার তারার মতো সোনার টিকলি । একদিন রাজপুরীতে সব জামাকাপড় যখন কাচাকাচি হচ্ছে সে দেখল বারোটা শার্ট শুকতে দেওয়া হয়েছে । শার্টগুলো তার বাবার পক্ষে খুব ছোটো । তাই মাকে সে জিগৃগেস করল শার্টগুলো কাদের ।
রানী দীর্ঘনিশ্বেস ফেলে বলল, “বাছা, ওগুলো তোর বারো ভাইয়ের ।” রাজকন্যে অবাক হয়ে বলল, “আমার বারো ভাই ? তাদের কথা এতদিন শুনি নি কেন ? কোথায় তারা ?”
    রানী বললেন, “ভগবান জানেন । পৃথিবীতে কোথাও তারা ভবঘুরের মতো রয়েছে।” এই-না বলে সেই তালা-বন্ধ ঘরে মেয়েকে নিয়ে গিয়ে তিনি দেখালেন সেই বারোটা কফিন। তার পর বললেন, “এই কফিনগুলো তোর ভাইদের জন্যে বানানো হয়েছিল। কিন্তু তুই জন্মাবার আগেই তারা লুকিয়ে পালায় " মেয়েকে সব কথা তিনি জানালেন।
    রানীর কথা শেষ হলে তাঁর মেয়ে বলল, “মামণি কেঁদো না । ভাইদের আমি খুজতে যাব ।”
    বারোটা শার্ট নিয়ে সে বেরুল বনের দিকে । সারা দিন ঘুরে সন্ধের মুখে সে পৌছল সেই মায়াবী কুটিরে । ভিতরে গিয়ে সে দেখে একটি ছেলেকে । ছেলেটি তাকে প্রশ্ন করল—কোথা থেকে সে আসছে, কোথায় বা চলেছে। অবাক হয়ে ছেলেটি তাকাল তার সুন্দর মুখ, রাজকন্যের পোশাক আর কপালে তারার মতো সোনার টিকলির দিকে ।
মেয়েটি বলল, “আমি রাজার মেয়ে । আমার বারো ভাইয়ের খোঁজে বেরিয়েছি । যতদিন না তাদের খোঁজ পাব আমি যাব নীল আকাশ যেখানে মাটিতে মিশেছে সেই পর্যন্ত ।” তার পর তার বারো ভাইয়ের বারটা শার্ট তাকে সে দেখাল ।
    বেনজামিন সঙ্গে সঙ্গে বুঝল এ তাদের বোন। তাই সে বলল, “আমি তোমার সব চেয়ে ছোটো ভাই বেনজামিন " আনন্দে তাদের দুজনের চোখেই জল এল। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল । তার পর বেনজামিন বলল, “বোনটি, কিন্তু একটা কথা ভাবার আছে। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি মেয়ে দেখলেই মেরে ফেলব, কারণ একটি মেয়ের জন্যেই আমাদের রাজ্য ছাড়তে হয়েছে ।”
    তাই-না শুনে মেয়েটি বলল, “আমি মরলে আমার ভাইদের যদি প্রাণ বাঁচে তা হলে মরতে আমি রাজি ।”
   বেনজামিন বলল, “না। আমি দেখব যাতে তুমি না মর। এগারো ভাই না ফেরা পর্যন্ত এই জালাটার মধ্যে তুমি লুকিয়ে বসে থাক। তারা ফিরলে একটা ব্যবস্থা হবে ।”
    তার কথামতো মেয়েটি সেখানে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। রাতে তার ভাইরা শিকার নিয়ে ফিরল ; রান্নাবান্না শেষ হল । টেবিলের চারপাশে সবাই মিলে যখন খেতে শুরু করছে একজন প্রশ্ন করল :
“আজ কোনো খবর আছে ?” বেনজামিন প্রশ্ন করল, “তোমরা কোনো খবর শোনো নি ?”
    তারা বলল, “না ।” 
    বেনজামিন বলে চলল, “তোমরা সারা দিন বনে বনে ঘুরছ। আর আমি তো এখানে ঠায় বসে। তবু তোমাদের চেয়ে আমি বেশি খবর রাখি।”
    তারা সবাই চেঁচিয়ে উঠল, “কী খবর বল ।” 
    “আমি বলার আগে কথা দাও, যে মেয়ের প্রথম দেখা পাবে তাকে মারবে না ।”
    তারা সবাই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে বলল, “বেশ–কথা দিলাম তাকে আমরা মারব না । এখন বল খবরটা কী ?”
    “আমাদের বোন এখানে এসেছে", বলে বেনজামিন সেই জালার, ঢাকা খুলল। আর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল তাদের বোন । পরনে তার রাজকন্যের পোশাক । কপালে তারার মতো সোনার টিকলি । ভারি মিষ্টি সুন্দর চেহারা । তাকে দেখে সবাই খুব খুশি । তার গলা জড়িয়ে সবাই তাকে চুমু খেল, আদর করল আর সঙ্গে সঙ্গে ফেলল দারুণ ভালোবেসে ।
    বেনজামিনের সঙ্গে তাদের বোন থাকে বাড়িতে। সংসারের কাজকর্মে তাকে করে সাহায্য। আর এগারো ভাই বনে গিয়ে শিকার করে আনে। বেনজামিন আর তাদের বোন করে রান্নাবান্না ।
    আগুনের জন্য কাঠকুটো আর তরকারির জন্য ফলমূল জোগাড় করে উনুনে হাড়িকুড়ি মেয়েটি চড়িয়ে রাখে। এগারো ভাই ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি খাবার পায়। ঘরদোর সে ঝকঝকে চকচকে করে রাখে, বিছানাপত্র রাখে ধবধবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ভাইরা সবাই খুব খুশি। মিলেমিশে ভারি আনন্দে তাদের দিন কাটে ।
    একদিন তারা দু ভাইবোন মিলে খুব ভালো রান্নাবান্না করেছে। অন্য ভাইরা ফিরলে সবাই মিলে মহা আনন্দে খাওয়া দাওয়া সারল ।
    সেই মায়াবী কুটিরের সামনে ছিল ছোট্টো একটা বাগান । সেখানে ফুটেছিল বড়ো-বড়ো বারোটা পদ্মফুল। খাওয়া-দাওয়ার পর তাদের বোন গেল ভাইদের জন্য সেই পদ্মগুলো তুলতে। কিন্তু যেই-না ফুলগুলো সে তুলেছে সঙ্গে সঙ্গে তার বারো ভাই বারোটা দাঁড়কাক হয়ে বনে উড়ে গেল। আর ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল সেই কুটির আর বাগান । সেই গহন বনে বেচারি মেয়েটি একেবারে একা হয়ে পড়ল। চারি দিকে তাকিয়ে সে দেথল কাছে এক বুড়ি রয়েছে দাঁড়িয়ে ।
    বুড়ি বলল, “বাছা । ফুলগুলো তুলতে গেলে কেন ? ওগুলো ছিল তোমার ভাই যারা এখন চিরকালের জন্যে দাঁড়কাক হয়ে গেল ।”
    মেয়েটির দু’গাল বেয়ে ঝরঝর করে চোখের জল ঝরতে লাগল । কাঁদতে-কাঁদতে সে প্রশ্ন করল, “তাদের কি আবার মানুষ করার কোনে উপায় নেই ?”
    বুড়ি বলল, “একটা মাত্র উপায় আছে । কিন্তু সেটা খুব কঠিন কাজ। ওদের মানুষের চেহারায় ফিরিয়ে আনতে হলে সাত বছর তোমাকে বোবা হয়ে থাকতে হবে। একটি কথা কইতে পাবে না। একটি বার হাসতে পাবে না। এই নিয়ম ভঙ্গ করলে সব-কিছু বৃথা হবে  একটি কথা বললেই মারা পড়বে তোমার ভাইরা ।”
    মেয়েটি মনে মনে বলল, “ভাইদের যে মুক্তি দিতে পারব তাতে আমার কোনো সন্দেহ নাই।” এই-না বলে একটা উঁচু গাছের চুড়োয় উঠে সে শুরু করল তকলি দিয়ে সুতো কাটতে । একটি কথা সে কয় না, একটি বার হাসে না । একদিন হল কি, এক রাজা সেই বনে এলেন মৃগয়ায়। মেয়েটি যে গাছের চূড়োয় বসে, সেই গাছটার কাছে দৌড়ে গিয়ে রাজার গ্রেহাউণ্ড কুকুর রাজকন্যের দিকে তাকিয়ে হাক-ডাক-লাফ শুরু করে দিল। তাই-না দেখে রাজা গেলেন সেই গাছতলায়। তার পর রাজকন্যেকে সেখানে দেখে রাজা তো একেবারে মোহিত। তাকে প্রশ্ন করলেন, “আমাকে বিয়ে করবে ?” রাজকন্যে সামান্য মাথা হেলিয়ে জানাল, “করব ।”
    গাছে উঠে মেয়েটিকে নামিয়ে তাকে নিজের ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে রাজা তো নিয়ে এলেন নিজের রাজপুরীতে। খুব ধুমধাম করে তাদের বিয়ে হয়ে গেল । কিন্তু মেয়েটি না হাসে, না কয় একটি কথা । রাজার সৎমা ছিলেন ভারি কুচুটে । তরুণী রানী সম্বন্ধে নানা কেচ্ছা রটাতে তিনি শুরু করলেন। রাজার কান ভাঙাবার জন্য রাজাকে তিনি বলতে শুরু
করলেন :
    “একটা ভিখিরি মেয়েকে তুই বিয়ে করে ঘরে তুলেছিস। লুকিয়ে কী সব মতলব সে ভাঁজছে—কে জানে ! মেয়েটা বোবা হলে অন্তত হাসতে পারে। সে হাসে না, জানিস—মনটা তার খুবই খারাপ ।”
    মায়ের কথায় প্রথমে রাজা মোটেই কান দেন নি। কিন্তু রাজার সৎমায়ের বকবকানি আর থামে না।" রানীর বিরুদ্ধে অনবরত কুৎসা রটিয়ে সে যায়। শেষটায় ঝালাপালা হয়ে রাজা দিলেন মেয়েটির প্রাণদণ্ড।
    রানীকে পুড়িয়ে মারার জন্য রাজপুরীর অঙ্গনে বিরাট একটা অগ্নিকুন্ড দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। জানলায় দাঁড়িয়ে রাজা দেখতে লাগলেন। চোখ তাঁর জলে টলটলে। কারণ রানীকে খুবই ভালোবাসতেন তিনি। চিতায় তোলার জন্য রানীকে তখন বাঁধা হয়েছে। আগুনের শিখা রানীর পোশাক-আশাক ছোয়-ছোয়। আর ঠিক সেই মুহুর্তেই উত্তীর্ণ হল সেই সাতটা বছর।
    সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল আকাশে পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। আর তার পরেই মাটিতে নেমে এল সেই বারোটা দাঁড়কাক। আর কি আশ্চর্য। তখন তারা আর দাড়কাঁক নয়। মাটি ছোবার সঙ্গে সঙ্গেই তারা তখন হয়ে উঠেছে তাদের বোনের সেই বারোটা ভাই। আগুন নিভিয়ে, রাজকন্যের বাঁধন খুলে বারো ভাই তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল ৷
    তাদের বোনের তখন আর কথা বলার কোনো বাধা নেই। রাজাকে মেয়েটি তখন বলল—কেন সে কথা বলে নি, কেন সে একটিবারের জন্যও হাসে নি ।
    রানী কোনো দোষ করে নেই দেখে রাজা তো ভারি খুশি । আজীবন তারা বেঁচে রইল সুখে-স্বচ্ছদে । কিন্তু সেই পাজি শাশুড়ির বিচার হল বিচারকের সভায়। বিচারক রায় দিলেন সেই সৎমা শাশুড়িকে বিষাক্ত সাপ-ভরা গর্তেফেলে দিতে। অতএব বুঝতেই পারছ রাজার সেই সৎমা খুব একটা আরামে মরে নি।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য